ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজ আমেরিকার ডায়েরি || সুব্রত সরকার পর্ব – ৪

আমেরিকার ডায়েরি – ৪
।। ৯ অগাস্ট, ২০২৪। সিরাকিউজ- প্রথম রাত ।।
নিউইয়র্ক সিটিকে বিদায় জানিয়ে চলে এসেছি – Moynihan Hall Rail station এ। ঘড়িতে ১২. ৫০। আমাদের ট্রেন ১.২০ তে।
সামান্য অপেক্ষার পর প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে চললাম। এই প্রথম আমেরিকান রেলপথে লম্বা সফর করব। নিউইয়র্ক সিটিতে মেট্রোরেল চড়েছি। এবার চড়ব অন্য ট্রেন।
প্ল্যাটফর্মে নেমে অবাক হয়ে গেলাম। কি ছোট্ট! সামান্য চওড়া। আর কেমন যেন আলো অন্ধকার। লাগেজ নিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হল। তারপর তো হুড়মুড় করে উঠলাম একটা কামড়ায়। উঠলাম না ঠিক, উঠিয়ে দিল এক রেলওয়ে কর্মী। ট্রেনটাও ছোট্ট। পাঁচ ছটা কামড়া ও দুটো ইন্জিন। এখানকার টিকিটে কোনও সিট নাম্বার থাকে না। যে যেমন পারো বসো। আজ নায়াগ্রা যাওয়ার যাত্রী ছিল অনেক। তাই আমরা একসাথে তিনজন বসার সিট পেলাম না। ছড়িয়ে পড়তে হল। এই রেল ভ্রমণে টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ৬২ ডলার!..
ট্রেন একদম ঘড়ি ধরে ছাড়ল ১.২০।
বেশ হাঁফিয়ে পড়েছি লাগেজগুলো সামলে নিজের সিট যোগাড় করে বসতে। জানলার ধারে সিট পেলাম না! মন খারাপ। জানলার সিট দখল করে বসে বই পড়ছেন এক সিনিয়র সাহেব। সে বই পড়ছে মগ্ন হয়ে আর মাঝে মাঝে প্যাকেট থেকে বার্গার বের করে খাচ্ছেন। কেমন গম্ভীর মুখো সাদা সাহেব। বাইরের দিকে ভুলেও তাকাচ্ছেন না!.. আমি তো ছটফট করছি কি সুন্দর হাডসন নদীর দৃশ্যগুলো হু হু করে চলে যাচ্ছে। মনে হল একবার সাহেবকে বলি, ” উড ইউ মাইন্ড, গিভিং মি দ্যা উনডো সিট?” কিন্তু না বলতে পারলাম না। ডুলুং চোখ পাকিয়ে আছে দূর থেকে। “এখানে এসব চলবে না!..”
নিউইয়র্ক থেকে নায়াগ্রা ওয়াটার ফলস মোট ৬ ঘন্টার সফর। পথে পড়বে ১৬ টা স্টেশন। Yonkers, Croton Harmon, Poughkeepsie, Rhine cliff, Hudson, Albany Rensselear, Schenectady, Amsterdam, Utica, Rome, Syracuse, Rochester, Buffalo- Depen, Buffalo – Ex,St, Niagara Water Falls,
আমরা নামব ১২ নাম্বার স্টেশন- Syracuse এ।
ট্রেন খুব পরিচ্ছন্ন। বসার সিটও চমৎকার। অনেক যাত্রীকেই দেখলাম মন দিয়ে বই পড়ছেন। সেদিন নিউ ইয়র্কের মেট্রোরেলেও দেখেছি মানুষজনরা বই পড়ছেন। এটা খুব ভালো লাগল দেখে। পথে ট্রেনে এখানে মানুষজনরা যে এখনো বই পড়েন!
প্রথম দুটো স্টেশন পার করে তৃতীয় স্টেশন Poughkeepsie আসতেই পেছনে একটা উইন্ডো সিট ফাঁকা হয়ে গেল। ডুলুং দৌড়ে গিয়ে দখল নিয়ে আমাকে সিটটা উপহার দিল। এবার আমার মনে শান্তি ফিরে এল!.. আহা দুচোখ ভরে দেখতে দেখতে যাব এই পাহাড় নদী জঙ্গল সবুজ মেডো ও ফসল ভরা জমিগুলোকে। সত্যিই এই রেল ভ্রমণটা দারুণ উপভোগ করেছি। একজন মহিলা চেকার এখানকার কালো আমেরিকান খুব হাসি খুশি, সে স্টেশনগুলো আসার আগেই চমৎকার ঘোষণা করছেন এবং এসে এসে আমাদের বলেও যাচ্ছেন।
প্রতিটা স্টেশনে দু-চারজন করে নামছেন, আবার উঠছেনও দু’চারজন। ট্রেন কখনোই ভিড়ে জমজমাট হচ্ছে না। পরিবেশ বেশ শান্ত সুন্দর থাকছে। এখানকার ট্রেনে কোনও হকার নেই। চা কফি বার্গার পিৎজা খেতে মন চাইলে গিয়ে নিয়ে এসো ওদের ক্যাফে থেকে। ডুলুং একবার গিয়ে আমার জন্য কফি নিয়ে এল। বেশ লম্বা এক গ্লাস কফি সাথে ঢাকনা দেওয়া। ফলে আমিও সাহেবদের মত বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে চুমুক দিয়ে কফি খাচ্ছি।
হাডসন নদীর শোভা এই রেলপথের সেরা আকর্ষন। এই পথে দু’বার হরিণও দেখেছি। একটা স্টেশনের নামও হাডসন। রেলপথে Utica নামের একটা অপূর্ব সুন্দর স্টেশন পড়ল। পাহাড়ি রেল স্টেশন। মনে হচ্ছিল নেমে গিয়ে একটু দাঁড়াই। বুক ভরে বাতাস নিই। চারদিকে সাজানো সবুজ পাহাড়। অপরূপ নিস্তব্ধতা। ছবির চেয়েও সুন্দর নিসর্গ। মন আমার হারিয়ে গেল। শুধু একটু নেমে না দাঁড়াতে পারার আফসোস রয়ে গেল!..
Amsterdam, Rome এমন নামের স্টেশনগুলোও মনকে খুব আচ্ছন্ন করেছে। ভেবে অবাক হয়েছি কত শত বছর আগে ইউরোপীয় মানুষজনরা এসে এসব জায়গায় বসতি বানিয়ে নিজেদের পছন্দ মত নাম দিয়ে শহর গড়ে তুলেছিলেন। তাই আমেরিকার রাস্তাঘাটে এমন ইউরোপীয় নাম ও সংস্কৃতির ছোঁয়া পাওয়া যায়।
ছ’ ঘন্টার নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে এসে পৌঁছলাম সিরাকিউজ। ঘড়ি তখন আটটা ছুঁইছুঁই। কিন্তু বাইরে কি সুন্দর আলো। আকাশও দারুণ সুন্দর। জানলাম এখানে নাকি সন্ধ্যা হয় প্রায় নটায়।
সিরাকিউজ স্টেশনটা প্রথম দেখায় মন কেড়ে নেয়। বেশ সাহেবিয়ানা রয়েছে। ডুলুং প্রথমেই আমাকে একটা AMTRAK রেলওয়ের গাইড বই এনে দিল প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে। জানলাম এটা ফ্রিতে পাওয়া যায়। যেহেতু আমি আমেরিকার ডায়েরি ধারাবাহিক লিখছি, তাই ডুলুং – সোহম দুজনেই আমাকে নানাভাবে তথ্য দিয়ে, স্টাডি মেটেরিয়াল দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছে সবসময়।
সিরাকিউজ স্টেশন থেকে সোহমের নতুন অ্যাপার্টমেন্ট জেফার্সন টাওয়ার্স কম বেশি ৬/ ৭ মাইল। উবের বুক করে আমরা চলে এলাম ডাউনটাউন এর জেফার্সন টাওয়ার্সে। ২৫ তলার এই হাইরাইজ। সোহম থাকে ১১ তলায়।
একদম নতুন এ্যাপার্টমেন্ট। ওর একজন রুমমেট রয়েছে। সে কলকাতার ছেলে। কসবায় বাড়ি। ওর নামও সোহম। জুনিয়র। পি এইচ ডির সাবজেক্ট দুজনের আলাদা। আমরা ওকে ‘ছোটো সোহম’ বলে ডাকছি। ও নিউরো সায়েন্স নিয়ে পি এইচ ডি করছে।
সিরাকিউজ এ প্রথমদিনের প্রথম রাত আজ কাটবে। সবাই বেশ ক্লান্ত। রাত ১১ টা প্রায় বাজে। মোটামুটি সব গুছিয়ে নিয়ে ডিনার করে নিলাম। আজকের ডিনার ছোট সোহমই রান্না করে রেখেছিল- চিকেন ও ভাত। সঙ্গে ছিল শোন পাপড়ি। সবাই মিলে বেশ হৈ হৈ আনন্দে একসাথে বসে ডিনার করলাম। আমার কলেজ জীবনের সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দের স্বাদ হঠাৎ যেন ফিরে পেলাম!..
জীবন বড় অদ্ভুত কত কিছু কেড়ে নেয়, যন্ত্রণা দেয়, কষ্ট পেতে হয় কত! আবার জীবন দেয়ও অনেক কিছু। কুড়িয়ে নিতে পারলে, যত্ন করে আগলে রাখতে পারলে, দগ্ধ জীবনটাও আবার নতুন করে সুন্দর হয়ে ওঠে। তখন সেই জীবনটাকে উপভোগ করা শিখতে হবে। বহন করা শিখতে হবে। যাপনের আনন্দে এগিয়ে চলো! কুর্নিশ করো ভাগ্যকে। আমি সেই বর্ণময় জীবনপথের এক পথিক। হেরে গিয়েও হারতে শিখি নি!.. অনেক হারিয়ে ফেলেও কুড়িয়ে নিয়েছি আবার অনেক কিছু। তাই জীবন বড় মধুর!.. এই জীবনকে আমি প্রণাম জানাই!..
মেয়ে জামাই জামাইয়ের রুম মেট- ওরাই আমার আজকে রাতের দূর প্রবাসের নতুন বন্ধু!..
শুভরাত্রি!..
।। ১০ অগাস্ট। দ্বিতীয় দিন – সিরাকিউজ।।
আমেরিকায় এসে টাইম জোনের হেরফেরে খাওয়া ঘুম সব পাল্টে গেছে। পাল্টায়নি শুধু একটা জিনিস – তা হল ভোরের ঘুম ভাঙা। এখানে বাড়ির মত ঠিক প্রতিদিন সকালে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে।
সিরাকিউজ এর প্রথম সকাল আজ দেখলাম। বড় শান্ত, সুন্দর এক পাহাড়ি শহর সিরাকিউজ। চারপাশে পাহাড়ের রেখা। বড় পাহাড় নয়। এই শহরে মানুষজন আশ্চর্যরকম কম। কত বড় বড় সব বাড়ি, স্থাপত্য, সুন্দর সুন্দর রাস্তাঘাট, অফিস, মেডিকেল কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ক্যাফে আছে। কিন্তু পথে মানুষ নেই বললেই চলে। শুধু বড় বড় গাড়ি ছুটছে। পায়ে হেঁটে যে দু’চারজনকে দেখা যায়, তারা অধিকাংশই ছাত্র ছাত্রী। এই শহরের ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসেছে। আর দেখা যায় হঠাৎ হঠাৎ দু’একজন ভবঘুরে হোমলেস ড্রাগ অ্যাডিক্ট লোককে! আমেরিকার প্রতিটা শহরে এই গৃহহীনদের দেখা যায়। বড় অদ্ভুত লাগে!..
আজ সকালটা আমরা একটু আয়েস করে কাটাব ঠিক হয়েছে। তাড়াহুড়ো করব না। রেস্ট নেব। নিজেরা রান্না করব। তারপর লাঞ্চ করে সোহমের ইউনিভার্সিটি ও Thornden Park দেখতে যাব। এই দুটো জায়গায় পায়ে হেঁটে ঘুরব, দেখব। ফেরার পথে একটা উবের নিয়ে চলে আসব।
সিরাকিউজ এর Walmart থেকে বাজার চলে এল সকাল নটায়। ডুলুং কাল রাতেই অনলাইনে বুক করে রেখেছিল। বেশ টাটকা সব্জিগুলো দেখে খুব ভালো লাগল। আলু, বেগুন, টমেটো, বাঁধাকপি, ধনেপাতা এত তরতাজা যে দেখে আনন্দ হল। দাম জানলাম বড় বেগুনটা তিন ডলার। বাঁধাকপি দেড় ডলার। বেশ মজা লাগে শুনতে ডলার ভাঙিয়ে বাজার!.
নিজেরাই আজ রান্না করলাম। একদম ভাত, ডাল, আলু চোখা, বেগুন ভাজা! উফ্ কি আনন্দ করে যে খেলাম। কতদিন পর আজ একটু ডাল ভাত খেয়ে তৃপ্তি পেলাম। আমেরিকার ফাস্ট ফুডগুলো খুবই টেস্টি। সুন্দর করে বানানো। কিন্তু আমি এসব খাবারে নিজের দেশেও খুব অভ্যস্ত নই, আর আমেরিকায় এসেও অভ্যস্ত হতে সময় লাগছে। জানি, এসব খাবারে অভ্যস্ত হতেই হবে আমেরিকায় যে ৪২ দিন থাকব।
সোহমের ইউনিভার্সিটি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কি অপূর্ব, কি সুন্দর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এত নির্মল, এত পবিত্র মনে হচ্ছিল। বড় আনন্দ পেয়েছি বিশাল এই ইউনিভার্সিটিটা ঘুরে বেড়িয়ে দেখে। সোহম এখন থার্ড ইয়ারের পি এইচ ডির স্টুডেন্ট। ওর বিষয়- Victorian Literature and Post Colonialism.
ওর ডিপার্টমেন্টে নিয়ে গেল। কি সুন্দর সব ক্লাসরুম, কনফারেন্স রুম। ওর নিজেরও একটা রুম আছে। সেখানে শেক্সপিয়ার এর একটা আবক্ষ মূর্তি রয়েছে।
সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটিতে কত সুন্দর সুন্দর ফুল দেখলাম। বাগান দেখলাম। অনেক বড় বড় ঝাউ, পাইন ও ম্যাপল গাছ রয়েছে। পরিবেশ একদম দূষণ বিহীন। আকাশ ঝকঝকে নীল।
ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে পায়ে পায়ে পৌঁছে গেলাম পাশের Thornden Park এ। পার্কে যাওয়ার পথে অনেক সুন্দর সুন্দর ম্যাপল ট্রি দেখলাম। সোহম ডুলুং বারবার বলছিল, এই সবুজ ম্যাপল পাতাগুলো অক্টোবর মাসে লালচে হয়ে ঝরে ঝরে পড়বে। রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে। হাওয়ায় হাওয়ায় উড়বে। সে সময়টাকে আমেরিকায় বলে- ফল। ইউরোপিয়ানরা বলে -অটম। তখন নাকি এখানকার প্রকৃতি অপরূপ হয়ে ওঠে। এই ‘ফল’কে সবাই খুব ভালোবাসে।উৎসবের মেজাজে সবাই মেতে ওঠে। ডুলুং আবদার করে বলল, “তুমি অক্টোবরে একবার আসবে! আমেরিকান ফল সেলিব্রেট করে যেও!..”
আমি মনে মনে তখন বলি, “আবার!..এখানে এলে ডলার বড় শাসন করে যে! আমার তো পেনশনের টাকা!.. মানেই তো টেনশনের জীবন!..”
আজ Thornden Park এ নাট্য উৎসব ছিল। একদিনের নাট্যমেলা। এই মেলার নাম- Shakespeare In The Park. এটা হঠাৎ পাওয়া চোদ্দআনা আনন্দ। দারুণ এক প্রাকৃতিক পরিবেশে ওপেন থিয়েটার মঞ্চস্থ হচ্ছিল। চারপাশে বড় বড় ঝাউ, পাইন ও ম্যাপল গাছের সারি ঘেরা ছায়াঘন সুন্দর একটা আবহ।খোলা মঞ্চটা বেশ বড়। একদম বিনিপয়সার নাট্যমালা। কোনও টিকিট নেই। দর্শকরা সবাই নিজের নিজের বসার জায়গা নিয়ে এসে বসেছেন যে যার পছন্দমত জায়গায়। তখন অভিনয় হচ্ছিল- ” Two Gentlemen of Verona ” শেক্সপিয়রের এই নাটক কিছুটা সময় দেখলাম। বেশ অভিজাত চেহারার কুশিলব। দূর থেকে কুশিলবদের সাজঘরও দেখলাম এক ঝলক।
এমন দূরদেশে এসে হঠাৎ এমন খোলা মঞ্চে বিনিপয়সায় শেক্সপিয়রের নাটক দেখার মজা ভালোই উপভোগ করলাম।
Thornden Park এর সবুজ বুগিয়ালের মধ্যে একটা সুইমিংপুল চোখে পড়ল। বছরের এই কয়েকটা মাস সিরাকিউজ রোদ ঝলমলে থাকে। তাই দেখলাম সিরাকিউজবাসীরা নীল জলে খুব লাফিয়ে ঝাপিয়ে আনন্দ করছে। নভেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত এই পার্কের সবুজ ঘাস বরফে ঢেকে যাবে। সিরাকিউজ এর পথে ঘাটে, ইউনিভার্সিটির খোলা জায়গা বরফময় হয়ে যায়।
বিকেলটা এভাবে ঘুরে বেড়িয়ে ফেরার পথে একটা উবের বুক করে ফিরে এলাম। আজকের সন্ধ্যাটা আবার সবাই মিলে রান্না করার মজা উপভোগ করলাম। রাতে ডিমের ঝোল, ভাত আর Yogurt, দই এর মত মিষ্টি মিষ্টি খেতে এই Yogurt।
সিরাকিউজ এ দ্বিতীয় দিনটা একটু বিশ্রাম, একটু বেড়ানো, একটু রান্না, একটু নতুন ঘর গোছানো করে বেশ কেটে গেল।
আগামীকাল সিরাকিউজ এর নতুন দুটো সুন্দর জায়গায় বেড়ানো হবে, এটা জেনে সেই আনন্দে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম। ঘড়িতে তখন রাত ১১.১৬।
কলকাতায় এখন দিন। সবাই কাজে ব্যস্ত।
আমি দূর প্রবাসে ঘুমিয়ে পড়লাম।
শুভরাত্রি।
।। ১১ অগাস্ট, রবিবার। সিরাকিউজ – তৃতীয় দিন।।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে নিয়ে ডুলুং বলল, “আজ দুপুরের পর থেকে বৃষ্টি হবে। রেডি হয়ে নাও। ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়ব। লাঞ্চ করব বাইরে। তিনটের মধ্যে ফিরে আসতে হবে।”
আজ আমরা যাব সিরাকিউজ এর সেরা দুটো জায়গায়। প্রথমে যাব- Green Lakes State Park, তারপর যাব Beak and Skiff Apple Orchard দেখতে।
আজ সন্ধেবেলায় সোহমের দুই বন্ধু আসবে। আমরা একসাথে ডিনার করব। ওরা দুজনেই বাঙালি। অভিপ্সা ও সৃজন। ওরাও পি এইচ ডির স্টুডেন্ট। অভিপ্সার বাড়ি কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরে। সৃজন হাওড়া কদমতলার ছেলে। ওরা সিরাকিউজ আপস্টেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে নিউরো মেডিসিন নিয়ে গবেষণা করছে। আজ রাতে আলাপ হবে ওদের সাথে। এবং পিকনিক হবে আমাদের। যেহেতু বৃষ্টি হবেই বিকেলে তাই আজকের মেনু খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, বাঁধাকপির তরকারি। আর শেষ পাতে Yogurt।
উবের ডেকে নিল সোহম। এখানে উবের সার্ভিস একদম দশে এগারো! ডাকতে না ডাকতেই চলে আসবে। সোহমের জেফার্সন টাওয়ার থেকে গ্রিন লেকস কম বেশি আট-দশ মাইল হবে। এই দশ মাইল বড় সুন্দর। সবুজ সরোবরে যাচ্ছি সবুজ রাজপথ ধরে। সিরাকিউজ এর পথ ঘাট বাড়ি, বাগান, গাছপালা সব এত পরিচ্ছন্ন, এত নিট অ্যান্ড ক্লিন যে দেখলে চোখের আরাম হবেই হবে। আর প্রাণবায়ু যেন শান্তি খুঁজে পায়।
আজ রবিবার। Green Lakes একদম জমজমাট। পার্কিং এ অসংখ্য গাড়ি। সব গাড়িই বেশ বড়, এবং দামী। আমেরিকানরা গাড়ি ব্যবহারে মাস্টার। গাড়িগুলো যেমন কেতাদুরস্ত, তেমন দামী ও বড়।
গ্রিন লেকস প্রথম দেখাতেই মন কেড়ে নিল। কি অপূর্ব, কি অসাধারণ এর চারপাশ। আর কি মনোরম, মায়াবী সুন্দর। মনে হল যেন কোনও গুণী শিল্পীর আঁকা ছবির মত সরোবরে চলে এসেছি। আহা কি দারুণ এক সুন্দর জায়গা এই গ্রিন লেকস।
ছুটির দিন বলে আজ বেশ ভিড় গ্রিন লেকে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে এসেছে অনেকেই। সঙ্গে আদরের কুকুর সোনারা আছে।অনেক দাদু দিদাদেরও দেখলাম নাতি নাতনিদের নিয়ে এসেছেন। গত কয়েকদিনে আমেরিকান বহু পরিবারকে দেখলাম তাঁরা ফ্যামিলি টুর করছেন বাচ্চা কাচ্চা, নাতি নাতনি সহ। এবং ওদের পরিবারে প্রায় সবারই দুই বা তিন সন্তান। আমি চার সন্তান সহ পরিবারও দেখেছি। জানি না ওদের এই পরিবার মনস্কতা খুব নতুন সংস্কৃতি কিনা। আর দেখলাম ওরা কিন্তু বেশ কেয়ারিং সন্তানদের নিয়ে।
গ্রিন লেকে এসে মনে হয়েছিল আমরা একটু ওভার ড্রেসড হয়ে এসেছি। চারপাশে স্বল্পবাস পুরুষ ও স্বল্পবাসনা নারীরা। ওরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমেরিকার পথে ঘাটে পুরুষদের পোষাকে খুব বৈচিত্র্য চোখে পড়ল না। কিন্তু মহিলাদের পোষাকে বৈচিত্র্য আছে। যদিও মহিলাদের পোষাক খুব খোলামেলা। সাহসী এবং স্বাধীন ধরণের। রুমালের মত এক টুকরো কাপড়েই ওদের অনেকের পোষাক হয়ে যায়! তাই আমাদের চোখে একটু যেন কেমন লাগে। পরে দেখতে দেখতে চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
গ্রিন লেকের নীল জলে ছোটদের সুইমিং পুল আছে। বোটিং করার ছোট ছোট রঙিন নৌকো আছে। কি মজা করে পুচকেগুলো জলখেলা করছে। বোটিং করছে। ওদের মা বাবারা শুয়ে বসে সান বাথ নিচ্ছে। দাদু দিদারা গাছের ছায়ায় বসে গল্প করছেন। আর অনেক ইয়ং কাপল পুরো লেকটা পায়ে হেঁটে গল্প করতে করতে প্রদক্ষিণ করছে। আমরাও গল্প করতে করতে হাঁটলাম। পুরো লেকটা হাঁটতে কমবেশি দু’ঘন্টা লাগল। বেশ সুন্দর এক হাল্কা ট্রেকিং।
গ্রিন লেকস সিরাকিউজ এর স্টেট পার্ক। তাই খুব যত্ন করে সাজিয়ে রাখা রয়েছে। এই পার্কে এলে ভালো লাগবেই। আজ বাইরে লাঞ্চ করব আগেই কথা হয়েছিল। তাই ঠিক হল গ্রিন লেকস এর রেস্টুরেন্টে আমরা লাঞ্চ করে নেব। চিকেন টেন্ডার্স, চিজ পিজা ও কফি খেলাম। তিনজনের খরচ হল তিরিশ ডলার।
Green Lakes থেকে এবার আমরা চললাম Beak and Skiff Apple Orchard দেখতে। উবের ডেকে নেওয়া হয়েছে। এই পথটা কম বেশি ২৫ মাইল। বড় অপূর্ব এই পথটুকু। এ এক অসাধারণ কান্ট্রিসাইড।
এই গ্রামীণ পথের সৌন্দর্য এখনো চোখ জুড়ে রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নিসর্গের এমন মেলবন্ধন সচরাচর হয় না। ঝড়ের গতিতে মসৃণ সুন্দর নির্জন এই পথ দিয়ে হুশ করে চলে এলাম আপেল উপত্যকায়। এসে মনে হল, এসব জায়গাকেই তো স্বর্গ বলা যায়!..
চোখের সামনে তিনশো ষাট ডিগ্রি ছড়ানো এক অপরূপ সুন্দর উপত্যকা। দূরে বহুদূরে পাহাড়ের সবুজ রেখা। আকাশের নীলও কি উজ্জ্বল সুন্দর। মিষ্টি বাতাস বয়েই চলেছে। এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে মন হারিয়ে যায়। ভালো লাগার আবেশে চোখ জুড়িয়ে আসে।
আপেল বাগানে ঘুরে বেড়ানোয় কোনও মানা নেই। তাই মনের আনন্দে বাগানে বেড়ালাম। সবুজ আপেল, লাল আপেল দেখলাম। ছবি তুললাম।
আপেল জুস টেস্ট করে ভীষণ ভালো লাগল। ছ’রকম জুস (cider) টেস্ট করেছি। খুব মিষ্টি ভালো খেতে এই জুসগুলো। যদিও ডলার গুণে এই জুসগুলো খেতে হয়েছে! এদেশ হলো ফেলো কড়ি, মাখো তেল!..
দুপুর গড়িয়ে যেতেই দেখতে পেলাম আকাশ জুড়ে কালো মেঘ ভেসে আসছে। ওরা সব জলভরা কালো মেঘ। বৃষ্টি হবেই। তাই আর দেরী করা ঠিক হবে না। আবার ডাকা হল উবের।
দারুণ সুন্দর এই Beak and Skiff থেকে ফিরে আসতে মন কেমন করছিল। কিন্তু ফিরে আসতে তো হবেই। নাড়া বাঁধতে নেই মুসাফিরকে! চলো চলো এগিয়ে চলো!
সোহমের জেফার্সন টাওয়ারে ফেরার পরে পরেই ওয়েদার ফোরকাস্টকে সত্য প্রমাণিত করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ১১ তলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ে, কাছের শহরে বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছি। এক অচেনা মহাদেশ, অচেনা শহরে চেনা প্রিয়জনের মাঝে আমার এই ভ্রমণ বড় সুন্দর হয়ে উঠছে একটু একটু করে। আমেরিকাকে বেশ লাগছে।
আগামীকাল সকালে যাব পৃথিবীর এক বিখ্যাত ওয়াটার ফলস দেখতে- নায়াগ্রা। সিরাকিউজ থেকে নায়াগ্রা কমবেশি ১৭০ মাইল। এবার একটা গাড়ি বুক করা হয়েছে আগামী সাত দিনের জন্য। সোহম নিজে ড্রাইভ করবে। আমরা একে একে ঘুরব নায়াগ্রা, বস্টন, বল্টিমোর, ওশান সিটি( মেরিল্যান্ড), ওয়াশিংটন ডিসি।
শুরু হবে নতুন ভ্রমণ।
সে ভ্রমণের গল্প আজ নয়!..
শুভ সন্ধ্যা।
খুব ভাল