সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ১২)

কেমিক্যাল বিভ্রাট
এই সম্ভাবনাটা উনি তাঁর ডায়েরিতে নোট করে রেখেছিলেন।
তার পর আরও একদিন। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া তাঁদের পাড়ারই এক বুড়ো বহু দিন পরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই একটা কেমিক্যালের ফ্লাস্কে অন্য একটা কেমিক্যাল ড্রপারে তুলে এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে মোট পাঁচ ফোঁটা ফেলতে গিয়ে ভুল করে ছ’ফোঁটা ফেলে দিতেই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো সারা ঘর আলোর ঝলকানিতে দপ করে জ্বলে উঠেছিল। আর সেটা দেখে ঔপমানব ‘যাঃ’ বলতেই বুড়োটা বলেছিলেন, নাঃ বাবা, আমি থাকলেই তুমি কথা বলবে। আর কথা বলতে বলতে কাজ করতে গেলেই ভুল হবে। তাতে কাজের চেয়ে অকাজই বেশি হবে। নাঃ, আমি বরং আজ উঠি। অন্য দিন আসবখ’ন। কেমন? বলেই, না, যে ভাবে এসেছিলেন সেই ভাবে ঝুঁকে নয়, একজন তরতাজা যুবকের মতোই শিরদাঁড়া টান টান করে লম্বা-লম্বা পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
বুড়োর হাঁটা দেখে চমকে উঠেছিলেন ঔপমানব। তা হলে কি এটাও পাঁচ ফোঁটার জায়গায় ছ’ফোঁটা কেমিক্যাল মেশানোর ফল?
উনি তখনই ডায়েরিতে নোট রেখেছিলেন সেটা।
এর ক’দিন পরে আরও একটা ঘটনা তিনি লিখে রেখেছিলেন। শুধু লেখেনইনি, লাল কালি দিয়ে আন্ডারলাইনও করে রেখেছিলেন।
তিনি শুনেছিলেন, তাঁর এক ছাত্র ভয়ানক মারণ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। বড় বড় ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন। তবু হাল ছাড়তে চাইছেন না তার বাবা-মা। যে যেখানে যেতে বলছে, সেখানেই ছুটে যাচ্ছেন। এই মসজিদের পীরবাবাকে দিয়ে ঝাড়ফুঁক করাচ্ছেন। ওই মন্দির থেকে চরণামৃত এনে খাওয়াচ্ছেন। সেই থানে গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকছেন। একের পর এক মানত করে যাচ্ছেন।
হাতে তো আর বেশি দিন সময় নেই। স্যারও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত। উনি যখন আসতে পারছেন না, আমি তো এখনও বিছানায় পড়ে যাইনি। যথেষ্ট হাঁটাচলা করতে পারি। যাই, আমিই গিয়ে বরং দেখা করে আসি। এটা ভেবে যে দিন সেই ছাত্রটা তাঁর কাছে এল, সে দিনই আবার একটা ভুল করে বসলেন ঔপমানব।
যে-কাচের ফ্লাস্কটায় একশো ডিগ্রি উত্তাপ দেওয়ার কথা, পাশাপাশি ওই একই মাপের, একই রকম দেখতে অন্য একটা ফ্লাস্কে একই রঙের প্রায় সম-পরিমাণ কেমিক্যাল থাকার ফলে, সম্ভবত অন্যমনস্কতার জন্য সেটাতেই উত্তাপ দিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। যখন ভুল ভাঙল, তার আগেই ঘটে গেল একটি ছোট্ট ঘটনা। উত্তাপ পেয়েই ওই ফ্লাস্ক থেকে হলুদ রঙের একটা ধোঁয়া হুহু করে বেরিয়ে কুণ্ডলী পাকাতে পাকাতে ছড়িয়ে পড়ল আশপাশে।
না, তাঁর ঘরে ছাত্রের সঙ্গে ছাত্রের বাবা-মা থাকলেও অন্য কেউ না। শুধুমাত্র ওই ছাত্রটাই কাশতে কাশতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পর দিন তার নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার করার কথা ছিল। সেগুলি করেওছিল। কিন্তু সেই রিপোর্ট দেখে ডাক্তারেরা তো একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। মুখ ফসকে একজন তো বলেই ফেললেন, একেই বলে মিরাক্যাল। না, মারণ রোগ তো নয়ই। তার শরীরে সামান্য কোনও সর্দি-কাশিও নেই।
এই খবর শুনে থমকে গিয়েছিলেন ঔপমানব। তা হলে কি ভুল করে ওই কেমিক্যালে উত্তাপ দেওয়ার জন্যই এটা ঘটল! ওই কেমিক্যালে উত্তাপ দেওয়ার ফলে হয়তো সামান্য একটু ঝাঁজ বেরিয়েছিল। কিন্তু অন্য কেউ তো কাশেনি। তা হলে কি যার শরীরে মারণ রোগ বাসা বেঁধেছিল, ওই ঝাঁঝের গুণে শুধু সেই কাশতে কাশতে ওই রোগটাকে ঝেড়ে ফেলে দিল!