ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১৩)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম

নবরত্ন:
বাংলার মন্দির স্থাপত্যের মধ্যে নবরত্ন রীতির মন্দির স্থাপত্য উল্লেখযোগ্য। এই রীতির মন্দিরে নটি চূড়া থাকার দরুন মন্দির স্থপতিরা
এই মন্দিরকে নবরত্ন মন্দির বলে চিহ্নিত করেছেন।
খ্রিস্টীয় ১৭ শতকে মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনায় গিরিধারী লাল জিউ মন্দিরের উৎসর্গ লিপিতে মন্দিরটিকে নবরত্নশৈলীর মন্দির বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কলকাতার টালিগঞ্জ রোডে ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হরিহর ধাম মন্দির গুচ্ছের শিলালিপিতে বলা হয়েছে–‘রাশী সংখ্যা কাশীপতি সানন্দে বেষ্টিত/ মধ্যে নবরত্নে শ্রীগোপাল বিরাজিত।’
এই লিপিতে নবরত্নের উল্লেখ করা হয়েছে, আবার জানবাজারের রানী রাসমনির ইচ্ছাপত্রে উল্লেখিত দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালী মন্দির কে ‘নবরত্ন’ নামেই উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চরত্নের মতোই নয়টি রত্ন বা চূড়া শোভিত নবরত্ন মন্দির সারা পশ্চিমবঙ্গে অনেক আছে। মন্দিরের ছাদের প্রথমতলের চালের উপরে চারটি রত্ন স্থাপন করে তার উপরে একটি ক্ষুদ্র কক্ষের চালের উপর আরো চারটি চূড়া নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয় তলের মাথায় অপেক্ষাকৃত বৃহদাকার কেন্দ্রীয় চূড়া স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ নটি চূড়া সমন্বিত চালাকৃতির দ্বিতল মন্দির নবরত্ন নামে পরিচিত হয়েছে। এই রীতির মন্দির যেহেতু বিতল হয়, তাই উচ্চতা বৃদ্ধি হয়। চাল গুলির বাঁকানো কার্নিশ ও চূড়ার গঠনের উপর নবরত্ন মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়।
এই ধরনের মন্দিরের দ্বিতল কক্ষটিতে পৌঁছাবার জন্য মন্দিরের গর্ভগৃহে দক্ষ যুক্ত সিঁড়ির ব্যবস্থাও থাকে।
বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে শ্রীধর মন্দির(আঃ১৯ শতক), বর্ধমান জেলার কাঞ্চন নগরের কঙ্কালী মন্দির(আঃ ১৮ শতক), সিঙ্গি গ্রামের( থানা কাটোয়া,) বুড়ো শিব মন্দির(১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দ) উল্লেখযোগ্য নবরত্ন মন্দির।
তবে নবরত্ন রীতির মন্দিরের বাঁকানো কার্নিশের বদলে কোথায় কোথাও সরল কার্নিশ যুক্ত সমতল ছাদে নিবদ্ধ নটি চূড়া যুক্ত মন্দির তৈরি হয়েছে । বর্ধমান জেলার বৈদ্যপুরের( থানা- কালনা) বৃন্দাবন চন্দ্র মন্দির (১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দ), বীরভূম জেলার ঘুড়িষায়( থানা-ইলামবাজার) ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে ক্ষেত্রনাথ দত্ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গোপাল- লক্ষ্মী- জনার্দন মন্দির প্রভৃতি এই জাতীয় মন্দির এর উদাহরণ।
আবার কোথাও কোথাও এমনও দেখা গেছে যে, নয়টি চূড়াকে একই তলে সন্নিবিষ্ট করে এক নতুন রীতির নবরত্ন মন্দির স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছে। এই শ্রেণীর মন্দিরের নিদর্শন হলো বীরভূম জেলার হাট সেরান্দি গ্রামে( থানা,– নানুর) জনৈক হরিপ্রসাদ মন্ডল কর্তৃক ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত নারায়ণ মন্দির), দুবরাজপুরের( থানা -:: দুবরাজপুর) নামোপাড়ায় জনৈক রামচন্দ্র নায়েক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শিব মন্দির (১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) ।

ত্রয়োদশরত্ন:
‌ নবরত্ন মন্দির শৈলীর পরিবর্তন ঘটিয়ে ত্রয়োদশরত্ন বা ‘ তেরচূড়া’ মন্দির তৈরি করেছিলেন স্থপতিরা। মন্দিরের গঠন শৈলী অনুযায়ী এটি ত্রিতল উচ্চতা বিশিষ্ট এবং প্রত্যেকটি তলের চার কোণে চারটি করে মোট ১২ টি চূড়া স্থাপিত হওয়ার কথা। তৃতীয় দলের শীর্ষে আরেকটি চূড়া স্থাপন করে মোট ১৩ টি চূড়া তৈরি হয়। ত্রয়োদশরত্ন মন্দিরের শেষ বা শীর্ষ চূড়াটি আকারে অন্য চূড়ার থেকে বড় হলে
মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়।
এই ধরনের চূড়ার নিদর্শন পাওয়া যায় মেদিনীপুর জেলার রামগড়ের কালাচাঁদ মন্দিরে।
কিন্তু বীরভূম জেলার দুবরাজপুরে বাজারপাড়ায় জনৈক সর্বেশ্বর দাস কর্তৃক ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত শিব মন্দির, মুদিপাড়ায় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জনৈক রামজয় রুজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত তিনটি শিব মন্দিরের মাঝেরটি ত্রয়োদশরত্ন হলেও ত্রিতল নয়। প্রথম তলের প্রতিকণে দুটি করে চূড়া, অর্থাৎ মোট আটটি চূড়া এবং উপরে শীর্ষ চূড়া সহ মোট পাঁচটি চূড়া মিলে চূড়ার সংখ্যা ১৩ টি করা হয়েছে।

সপ্তদশ রত্ন:
এই শ্রেণীর মন্দিরে দলের সংখ্যা না বাড়িয়ে দুটি তলে আটটি করে চূড়া ও কেন্দ্রীয় চূড়া স্থাপন করে সপ্তদশরত্ন করা হয়েছে। মেদিনীপুর জেলার চন্দ্র কোনায় পার্বতীনাথ শিব মন্দির(১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দ) এই জাতীয় মন্দিরের নিদর্শন।

পঞ্চবিংশতি রত্ন:
এই জাতীয় মন্দিরে চূড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সে অনুপাতে মন্দিরের উচ্চতা বৃদ্ধি হয়নি। স্থাপত্য শৈলীর নিয়ম অনুসারে এটি ছয় তলা বিশিষ্ট হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে ত্রিতল উচ্চতায় পঁচিশটি চূড়া সংযোজিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথম তলের উপর চার কোণে তিনটি করে মোট বারোটি চূড়া, দ্বিতীয় চলে চার কোণে দুটি করে আটটি চূড়া, তৃতীয় তলে চারটি চূড়া এবং শীর্ষে একটি বৃহৎ চূড়া স্থাপন করে মোট ২৫ টি চূড়া করা হয়েছে।
বর্ধমান জেলার কালনায় লাল জি, কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল জিউর মন্দির এবং হুগলি জেলার সুখাড়িয়ায় আনন্দ ভৈরবী মন্দির ত্রিতল বিশিষ্ট পঞ্চবিংশতি রত্ন মন্দিরের নিদর্শন। বাঁকুড়া জেলায় সোনামুখীর শ্রীধর মন্দিরের চূড়ার সংখ্যা ২৫ হলেও এটি দ্বিতল মন্দির।

(৫)দালান মন্দির স্থাপত্য:
(ক) একতলা দালান:- শিখর, চালা ও রত্নরীতি ছাড়া বাংলার মন্দির স্থাপত্যের ক্ষেত্রে আরো যে রীতিটি পশ্চিমবাংলায় খ্রিস্টীয় উনিশ শতকে প্রচলিত হয়েছিল, সেটি হল দালানরীতির মন্দির। এই ধরনের মন্দির যে একেবারে অর্বাচীন এমনটা নয়। ঠিক এরকম দেখতে সামনে থাম ও অলিন্দ সমেত সমতল ছাদ যুক্ত বর্গাকার বা আয়তাকার মন্দির গুপ্ত যুগেও প্রচলিত ছিল।সাঁচিতে ( খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক )এর নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে গুপ্ত আমলে যে সকল দালাল রীতির মন্দির তৈরি হয়েছিল, সেগুলি ছিল পাথরের দেউল এবং লম্বা পাথর বিন্যস্ত করে ছাদ তৈরি হতো । কিন্তু কড়িবরগা ব্যবহার না হলে ইঁটের তৈরি দালান রীতির মন্দির গঠন করা অত্যন্ত অসুবিধা জনক । বড় বড় হলঘর নির্মাণে কড়ি বরগার ব্যবহার দেখে অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে দালান রীতির মন্দির তৈরি শুরু হয়। দালান মন্দিরের গর্ভগৃহ বেশি চওড়া এবং ইউরোপীয় স্থাপত্যের অনুকরণে সামনের দিকে উঁচু ও গোল থামযুক্ত বারান্দা গুলি মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে । দালানের সামনের দিকে খোলা জায়গায় দেওয়াল বিহীন থাম বিশিষ্ট ছাদের অংশ চাঁদনি বলে আখ্যা পেয়েছে। আবার কোন কোন দালানে সমতল ছাদের পরিবর্তে মন্দিরের ছাদ বাঁকানো কার্নিশ যুক্ত দেখা যায়।

এই রীতির মন্দিরের মধ্যে দুই রকম শৈলী লক্ষ্য করা যায়। তার মধ্যে একটি হল ‘প্রথাগত সাবেকি স্তম্ভসহ টেরাকোটা অলংকরণ এবং অন্যটি হল পঙ্খের অলংকরণ সহ গুচ্ছ বদ্ধ সরু সর স্তম্ভ যুক্ত মন্দির।’
আমরা আগেই বলেছি যে, দালানের সামনের দিকে খোলা জায়গায় দেওয়াল বিহীন ছাদের অংশকে চাঁদনি বলে উল্লেখ করা হয়। কখনো কখনো স্নান করার ঘাটে চারিদিক খোলা শুধুমাত্র থামের উপরে স্থাপিত সমতল ছাদ যুক্ত
স্থাপত্যকে ও চাঁদনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসলে চাঁদোয়া বা মন্ডপ অর্থেই চাঁদনি কথাটির ব্যবহার হয়েছে বলে মনে হয়। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে বর্ণিত হয়েছে, ‘দেখেন চক চাঁদিনি সুন্দর’।
এই বৈশিষ্ট্যযুক্ত নাট মন্দিরগুলি যে চাঁদনি মন্ডপ নামে আখ্যাত হয়েছে তার উদাহরণ দেখা যায়,
হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে গঙ্গার ঘাটে নির্মিত এই ধরনের সৌধে নিবন্ধ উৎসর্গ লিপিতে সেটিকে চাঁদনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমবাংলার প্রায় সর্বত্রই এই রীতির মন্দিরের বহিরঙ্গ সজ্জা সমতল ছাদের দেখা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ছাদ তৈরি হয়েছে ‘অর্ধগোলাকৃতি খিলেন বা পাশ-খিলেনের উপর গম্বুজ নির্মাণ করে। পরে উনিশ শতকের বেশ কিছু মন্দিরে অবশ্য কড়ি-বরগার প্রয়োগ দেখা যায়।’
পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সাজানো প্রথাগত স্তম্ভ যুক্ত দালান মন্দিরের উদাহরণ হল ,বর্ধমান জেলার কালনার ‘ রূপেশ্বর মন্দির(১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ), বাহাদুরপুর গ্রামের( থানা আউসগ্রাম) রঘুনাথ মন্দির(আঃ১৮ শতক) প্রভৃতি।
সাধারণ গুচ্ছবদ্ধ স্তম্ভযুক্ত মন্দিরের মধ্যে বাঁকুড়া জেলার হাড়মাসরা গ্রামের (থানা তালডাংরা) লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির(আঃ১৯ শতক), মেদিনীপুর জেলার রাধা কৃষ্ণ পুর পল্লীতে( থানা চন্দ্রকোনা) রামচন্দ্র মন্দির(১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দ) প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যায়।

(খ) দোতলা দালান:
একতলা দালান রীতির মন্দির ছাড়া বেশ কয়েকটি দোতলা দালান রীতির মন্দিরও তৈরি হয়েছে। একতলায় পার্শ্ব ভাগে সিঁড়ি তৈরি করে
উভয়তলের সংযোগ তৈরি করা হয়। আবার বন্যা প্রবণ এলাকায় স্তম্ভের উপর চার দেয়ালের উপর একতল ‍ দালানেও সিঁড়ির ব্যবহার দেখা যায়। এগুলো দোতলা দেখালেও আসলে এগুলো একতল বিশিষ্ট দেবায়তন।

বীরভূম জেলার গোপালপুর গ্রামের( খয়রাশোল থানা) উদ্ধব দাশগুপ্ত প্রতিষ্ঠিত সুদর্শন চাঁদ জিউ মন্দির(আঃ ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে বা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে), পেরুয়া গ্রামের রাধা বিনোদ মন্দির( কবিরাজ রাধিকা চরণ দাশগুপ্তের অনুরোধে রাজনগরের পাঠান ফৌজদার আলিলকি খান কর্তৃক ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত) দালান রীতির মন্দিরের উদাহরণ।

পশ্চিমবাংলার কোথায় কোথাও দালানের উপর চার চালা বিশিষ্ট কক্ষ যুক্ত মন্দিরের নিদর্শন আছে। কোথাও দালানের উপর রত্ন বা শিখর সদৃশ চূড়া আপনের নিদর্শন দেখা যায়।‌

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।