|| মানচিত্র আর কাঁটাতার, হৃদয় মাঝে একাকার || বিশেষ সংখ্যায় শম্পা সাহা

সত্যি স্বাধীনতা

আসিফ আমাকে মুখে বলেনি কোনোদিন। কোনোদিন আমাকে দিতে চায়নি স্ত্রীর মর্যাদা ও। কিন্তু ভালোবেসেছে, খুব ভালোবেসেছে। যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, মনে আছে একবার পক্সে প্রায় মরে যাচ্ছিলাম ও সারারাত বাবার সঙ্গে জেগে থাকতো।ছোট থেকেই আমার মা নেই, শুনেছি আমার তিন মাস বয়সেই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছিলেন। তাই বাবা ই আমার বাবা, মা ও, আর ছিল আসিফ। সে কোন ছোট্ট বেলা থেকেই আমরা বন্ধু। তাইতো, আমাদের টিফিন ভাগ করে খেতে কোনো অসুবিধে হয় নি, মারামারি করে মাথা ফুলিয়ে দিতেও বাধেনি কোনোদিন, আর একসাথে রাত জেগে পড়াশোনা করতেও অসুবিধা হয়নি। মা মরা মেয়ে তাই সব কিছুতেই বাবার ছিল স্নেহ মিশ্রিত প্রশয়।হিন্দুর মেয়ে হয়ে তাই মুসলমানের বন্ধু হতে আমার কোন সমস্যা হয়নি, কিন্তু অন্য সকলের ই ছিল সমস্যা, ভীষণ সমস্যা! তাইতো বাবাকে শুনতে হতো অনেক বাঁকা কথা।আমার মোটা, রূপজৌলুসহীন সাধারণ চেহারা, যা নিয়ে লোকেদের ছিল যত চিন্তা। তারা আমাকে নিয়ে অনেক গবেষণা করে সাব্যস্ত করলো যে যেহেতু আমার চেহারা ভাল নয়, তাই কেউ আমাকে পাত্রী হিসেবে পছন্দ করে না, এ ভাবার অবশ্য কারণ ছিল, পাড়ার লোক গায়ে পড়ে উপকারের উদ্দেশ্যে আমার বেশ কয়েকটা সম্বন্ধ এনেছিলো, কিন্তু সেগুলো বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় নি। তাই তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আর কাউকে না পেয়ে শেষে আমি আসিফের ঘাড়ে চেপেছি।
আবার কেউ কেউ এও বলে, “এ সব ই ধিঙি মেয়ের ধিঙি পনা। ” আসলে বোধহয় আমাদের নিখাদ বন্ধুত্ব লোকের কথাতেই খোলস ছেড়ে জানান দিলো, ‘এটা শুধু বন্ধুত্ব নয়। ” তো যাই হোক, আসিফ চাকরি পাবার পর ওর বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে লাগলো, কিন্তু ও কিছুতেই রাজি হয় না, কারণ ওর নাকি কাউকেই পছন্দ হয় না, আর আমাকে হয় না কারোর!
আমি নিজেও আসিফ কে কতবার বিয়ের জন্য বলেছি, ও রাজি হয়নি, রাজি হয়নি বিয়ে করতে আমাকেও। আমি ওকে ভালোবাসি কিনা জানিনা, কিন্তু এটুকু বুঝি, ভালো কিছু রান্না করলে ওর কথা মনে পড়ে, একটা ভালো শাড়ি পড়লে মনে হয়, ও যদি একটু দেখতো! ভালো রং এর কোনো শার্ট দেখলে মনে হয়, ওকে বেশ মানাবে! একে যদি তোমরা ভালোবাসা বল, তাহলে বাসি, ওকে ভীষণ , ভীষণ ভালোবাসি।
তাইতো আজ স্বাধীনতা দিবসে আমরা স্বাধীন হবো, সত্যি করে স্বাধীন! ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে স্বাধীন হবো, মেয়েদের চেহারা ভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে স্বাধীন হবো,ব্যক্তিগত বিষয়ে সামাজিক হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীন হবো, লোকে কি বলবে, এই ভীতির থেকে স্বাধীন হবো, আসিফের কোরাণ আর আমার গীতা, তাই আমাদের লড়তে হবে একে অপরের বিরুদ্ধে, এই বিভেদ নীতি থেকে স্বাধীন হবো। তাই যখন সারা দেশে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা পালিত হবে, আমরা একবার মন্দিরে সিঁদুর, তারপর মৌলবির কাছে নিকাহ করে স্বাধীন হবো।
আপনারা আমাদের আশীর্বাদ করবেন তো?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।