ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৪)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম

রাঢ় জনপদে প্রাপ্ত প্রত্ন ইতিহাসের নিদর্শনাবলী থেকে পাওয়া যায় যে, অতীতে বাঙালি জাতির একটা সুসভ্য ধারা এখানে বসবাস করত। পরবর্তীকালে রাঢ়,পুণ্ড্র ও বঙ্গ জনপদের জনগোষ্ঠী সামগ্রিকভাবে মিলিত হয়ে বাঙালি জাতির রূপে পরিচয় লাভ করেছিল।
অতীতে নেগ্রিটো , অস্ট্রিক , প্রাক- দ্রাবিড়,অ্যালপাইন,নর্ডিক আর্য জনগোষ্ঠী এখানে বসবাস করলেও পরবর্তীকালে তাদের আলাদা গোষ্ঠী সত্তা এখানে রক্ষিত হয়নি। রাঢ়ের মানব সমাজ বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি পরিণত হয়েছে। আচার্য সুনীতিকুমারের অভিমত হল,”As a matter of fact,from time immemorial peoples of different races and languages and cultures have come to India and afrer an initial period of hostile contact in some cases ,finally settled down for a peaceful commingling and cultural as well as racial with their predecessor in thr land.”

রাঢ়ের অধিবাসীদের রক্তে আদি অস্ট্রলয়েডদের অবদান সবাই মেনে নেন,তাই সমাজে তাদের আচার অনুষ্ঠান ও নির্দ্বিধায় প্রবেশ লাভ করেছে ।সভ্যতার আদিপর্বে কোন এক সময় নিষাদ জাতির অন্তর্ভুক্ত কোল মুন্ডা শবর ,কুলিঙ্গ ,মালপাহাড়ি লোধা প্রভৃতি উপ-গোষ্ঠীর লোকেরা রাঢ়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিল।রাঢ়ে এমন অনেক অজস্র গ্রামের নাম আছে যেগুলি আদি বা অন্তপদ প্রাক দ্রাবিড় ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অনেক প্রাক-দ্রাবিড় শব্দযুক্ত গ্রাম নাম কে প্রাক দ্রাবিড় ভাষার অর্থ ধরলে সহজে ঐ সকল শব্দ বোঝা যায়।
বাংলার মধ্যে ভূমি বিন্যাস ও অধিবসতির ক্ষেত্রে রাঢ় অঞ্চল সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। সমগ্র রাঢ় অঞ্চলে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে একথা মন্তব্য করা চলে যে প্রস্তর যুগ থেকে ঐতিহাসিক কাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে বসবাসকারী মানব গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির পরিচয় মানব সভ্যতার বিবর্তনের এক ধারাবাহিক ইতিহাসের সন্ধান মেলে।
বীরভূমের মহিষ ঢাল, বাহিরি, হাট টিকরা, কোটাসুর, নানুর এবং বীরভূমের ময়ূরাক্ষী, কোপাই ,বক্রেশ্বর প্রভৃতি নদী গুলির বিস্তীর্ণ উপত্যকার নানাস্থানে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলি দেখে মনে হয়, প্রস্তর যুগ থেকেই মানব গোষ্ঠী রাঢ়ের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করত।
বীরভূম জেলায় প্রায় কুড়ি ২২ টি প্রত্নক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় নির্মিত কয় প্রকার প্রস্তরায়ুধের খোঁজ পাওয়া গেছে।
বীরভূম জেলার মহিষঢালে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর অঙ্গার চতুর্দশ(C-14) পরীক্ষা করে জানা গেছে, এই সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ১২৮৫+/- ১০৫ অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়দশ চতুর্দশ শতাব্দীর পূর্বেই ছিল।
মহিষ ঢালের প্রত্নক্ষেত্র কে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:-(১) তাম্র প্রস্তর যুগ(২) লৌহ যুগ।
প্রথম স্তরে মৃৎপাত্রের সঙ্গে বালা, আংটি, চিরুনি পাথরের ফলা,পুঁতি ইত্যাদি পাওয়া গেছে। মেঝের মধ্যে অনেক পোড়া চাল পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় স্তরে প্রথম পর্বের অনুরূপ মৃতপাত্র, এগুলির একদিক ধূসর, অপরদিক হলদে রঙের, শেষ প্রস্তর যুগের ক্ষুদ্রাস্ত্র, তীরের ফলা, বর্শার কলা,ছেনী,পেরেক ইত্যাদি পাওয়া গেছে।
C14 পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গেছে যে, এই প্রশ্নক্ষেত্রের প্রথম স্তরের ব্যাপ্তি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪৮৫ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৫ অব্দ এবং দ্বিতীয় পর্বটি খ্রিস্টপূর্ব ৭৯৫ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৫ অদ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ চিত্রশালার উদ্যোগে ও অধ্যাপক কুঞ্জ গোবিন্দ গোস্বামীর পরিচালনায় বীরভূম জেলার নানুরে চন্ডীদাসের ঢিবিতে খনন কার্য পরিচালিত হয়েছিল। উৎখননের ফলে গুপ্ত ,পাল ও মুসলমান আমলের কয়েকটি নিদর্শন পাওয়া গেছে। পুনরায় 1967 -68 খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের পরিচালনায় এখানে খনন কার্য চালানো হয়। বীরভূম জেলার অন্যান্য প্রত্ন ক্ষেত্রের ন্যায় এখানেও তাম্র প্রস্তর যুগ ও লৌহ যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এখানে লাল রংয়ের চিত্রিত অশিক্ষিত মৃৎপাত্র ,ধূসর ও কালো রঙের মৃৎপাত্র, পাথরের ক্ষুদ্রাস্ত্র, লৌহ আয়ুধ ইত্যাদি পাওয়া গেছে। প্রত্ন বস্তুর কোন অঙ্গার চতুর্দশ পরীক্ষা হয়নি।

বীরভূম জেলার পুরন্দরপুর এর কাছে হারাইপুরে ময়ূরাক্ষী নদীর নিকটে যখের ডাঙ্গা নামক একটি জায়গায় ১৯৬৭- ৬৮ খ্রিস্টাব্দে
স্মরণ কার্য পরিচালিত হয়েছিল। আমিও দুটি পর্ব লক্ষিত হয়েছিল-(১) তাম্র প্রস্তর যুগ(২) লৌহ যুগ।
এখানে লাল ,কালো, হালকা লাল ,ধূসর রংয়ের মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে।
তাছাড়া প্রলম্বিত ধরনের দশটি শিশুর মৃতদেহের কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে এখানে। মৃতদেহ গুলি উত্তর দিকে মাথা রেখে সমাহিত করা হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, পান্ডু রাজার ঢিবিতে প্রাপ্ত মৃতদেহগুলি পূর্ব দিকে মাথা রেখে শায়িত ছিল। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, অজয় নদীর দু’ধারে দুই ধরনের মৃতদেহ সমাহিত করার প্রচলন ছিল।

১৯৮১- ৮২ খ্রিস্টাব্দে বীরভূম জেলার বোলপুরের পূর্বে বাহিরি গ্রামের চন্দ্র হাজরার ডাঙ্গাতে উৎখনন কার্য পরিচালিত হয়েছিল।
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে পুরা বস্তু অন্যান্য ক্ষেত্রের মতই। কিন্তু তৃতীয় পর্বে লোহার তৈরি অস্ত্র লোহার মল, লোহা গলানোর চুল্লি টানি পাওয়া গেছে। প্রথম স্তরে প্রাপ্ত বস্তুরC14 পরীক্ষা করে জানা গেছে যে কামরা বস্তুর যুক্তি অন্ততপক্ষে খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার অব্দে বিকাশ লাভ করেছিল। প্রথম পর্বের মৃৎপাত্র গুলি লাল, লাল- কালো, কালো -হলুদ, কাল বা সাদা রঙে চিত্রিত।
ছাড়া হাড়ের হাতিয়ার, তামার দ্রব্য , লোহার হাতিয়ার ইত্যাদি পাওয়া গেছে।

বীরভূম জেলার হাতটিকরা গ্রামের প্রত্নতক্ষেত্র থেকে অন্যান্য মৃৎপাত্রসহ পাথরের পুঁতি, পোড়া মাটির টাকু, পাথরের যাঁতা, গৃহপালিত জীবজন্তুর হাড় যদি আবিষ্কৃত হয়েছিল। পরীক্ষা করে জানা গেছে, খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে এখানে তাম্র প্রস্তর যুগের সভ্যতার বিকাশ হয়েছিল। এখানে টাকু আবিষ্কৃত হওয়ায় অনুমান করা যায় যে, এখানের অধিবাসীরা কাপড় বুনতে জানত। পাথরের যাঁতা দিয়ে তারা চাল অথবা গম পেষাই করত।
বিভিন্ন প্রত্ন ক্ষেত্রে প্রাপ্ত নিদর্শন গুলির শিল্প শৈলীর মধ্যে সমতালক্ষিত হওয়ায় এটা অনুমান করা যায় যে ,প্রাচীন রাঢ়ের স্থানীয় শিল্পীগণ এই সকল শিল্পীর গ্রহণ করেছিল।
বীরভূম জেলার মহিষ ঢাল প্রত্নক্ষেত্র উৎখননের সময় আবিষ্কৃত শিশ্নমূর্তিটিকে সুপ্রাচীনকালে আরাধিত শিব পূজার প্রতীক অথবা কৃষি দেবতার কোন প্রতীক বলে চিহ্নিত করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরাতত্ত্ব অধিকার রাঢ় অঞ্চলে তাম্র প্রস্তর যুগের প্রত্ন ক্ষেত্র আবিষ্কারের ক্ষেত্রে পথিকৃৎের ভূমিকা পালন করেছে।রাঢ় অঞ্চলে এখনো পর্যন্ত ৭৬ টি তাম্র প্রস্তর যুগের প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কৃত প্রত্ন ক্ষেত্র গুলির মধ্যে বীরভূম জেলায় মোট ৩৭ টি ক্ষেত্র পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ আজকের বীরভূম জেলা একটি প্রাচীন জনপদ। এই জনপদের প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয় পুরাতত্ব , ইতিহাস ও সংস্কৃতিক ধারার ঐতিহ্য আলোচনার মাধ্যমে। পৃথকভাবে রাঢ়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কিত বিশেষ কোন গবেষণা না হলেও,অতীতে রাঢ়- বারেন্দ্র- বঙ্গ জনপদের ভৌগোলিক অস্তিত্ব থাকলেও সামগ্রিকভাবে রাঢ় সংস্কৃতি বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে গেছে এ কথা আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। প্রাচীন ঐতিহাসিক পর্বে রাঢ় ও বঙ্গ পৃথক জনপদ রূপে আখ্যা লাভ করলেও মোটামুটি ভাবে বলা যায় যে চতুর্দশ শতক থেকে গৌড়,রাঢ়, পুন্ড্র, বরেন্দ্র, সমতট বঙ্গাল ,হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি পৃথক পৃথক অঞ্চল গুলির একত্রীকরণের ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গদেশ।
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশের অধিকাংশ ভাগ প্রাচীন রাঢ়ভূমির অন্তর্ভুক্ত ছিল। আবার ভাষার ব্যাপ্তি বা রাঢ়ী উপভাষার বিস্তার লাভ ঘটেছে
সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণভাগ অর্থাৎ গঙ্গার দক্ষিণ তীর থেকে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ভাগ পর্যন্ত ভূভাগে।
ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের মতে “এক একটি প্রদেশে এক একটি ভাষা, এক একটি ভাষা অবলম্বন করিয়া এক একটি স্বতন্ত্র জাতি,
‍ সকলেই বৃহত্তর বৃত্ত স্বরূপ ভারতবর্ষের অন্তর্গত,
সকলেই প্রাদেশিক বা প্রান্তিক সত্ত্বা বা সভ্যতা প্রাচীন ভারতের সার্বভৌম ভারতীয় সত্ত্বা বা সভ্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত।”
ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক কারণে রাঢ় জনপদের সীমা প্রসারিত আবার কখনো সংকুচিত হয়েছে।
বাংলা ভাষায়’রাঢ়’ এর কোন প্রকৃত অর্থ নিহিত হয়নি।’ শব্দকল্পদ্রুমে’ ‘রাঢ়কঃ’ সোনাম খ্যাত দেশ। যথা,’ প্রাচ্যং মাগধ শোনৌ চ বারেন্দ্রী গৌড় রাঢ়কাঃ।’
‘রাঢ়’ শব্দ সংস্কৃত মূলক নয়, এটি খাঁটি দেশি শব্দ। সাঁওতালি ভাষায় ‘রাঢ়ো’ শব্দ আছে, কার অর্থ নদী গর্ভস্থ শৈল মালা বা পাথুরে জমি।
সাঁওতালি বা দেশি শব্দ হতেই সম্ভবত ‘রাঢ়’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে( বিশ্বকোষ,১৬শ খন্ড,পৃঃ ৪১৩)।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে,’Rar(h) besides Jaina Ardha Magadhi Ladha,Tamil(Tirumalai inscription,1024 AC)Iladam and few others probably seen to be due to an-r-tendency in some tracts at least in West Benga’. তিনি আরো মন্তব্য করেছেন যে,—‘The Sanskrit Radha is probably based on a vernacular form ‘r’ occuring side by side with the form in ‘L’ (attested from the Ardha-Magadhi and Tamil) in the second MIA period.’

ড. হীতেশ সান্যালের মতে রাঢ় বলতে উচ্চভূমি বা তা রূপান্তর কে বোঝায়। তাই দক্ষিণ-পশ্চিমবাংলার পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীরা নিজের বাসভূমিকে’রাঢ়’ বলে উল্লেখ করেন এবং নিজেদের পরিচয় দেন ‘রাঢ়ী’ বলে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।