ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১৭)

তীর্থ ভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম
বীরভূম তথা পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন এলাকায় যে সমস্ত পুরনো মন্দির দেখা যায়, যেগুলির স্থাপত্য রীতি নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে, সেগুলি তৈরি হয়েছে সাধারণভাবে প্রাচীন ঐতিহ্য কে অনুসরণ করে।
বাংলার গ্রামাঞ্চলে মাটির কুটির এর চালের কাঠামো বাঁশ কাঠ খড় ইত্যাদি দিয়ে তৈরি। চালগুলো অনেকটা ধনুকের মত বাঁকানো। তাই চালা রীতির মন্দিরের ক্ষেত্রে মন্দিরের মাথায় তৈরি আচ্ছাদনটির প্রান্ত গুলি বাঁকানো হতো। এই রীতির মন্দির গুলির ভূমি নকশা মাটির কুটিরের মতই চতুষ্কোণাকার হত।
খ্রিস্টীয় ১৫ শতকের আগে যে সমস্ত মন্দিরগুলি তৈরি হয়েছে, সেগুলি গাঁথনির উপকরণের সাহায্যে ইটের উপরে ইট বা পাথরের উপর পাথর চাপান দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। দরজার উপরিভাগের ফাঁকা অংশটুকু মাপ মত তৈরি পাথরের সরদল দিয়ে বন্ধ করা হত।
পরবর্তী সময়ে খ্রিস্টীয় তের শতকে তুর্কি-আফগানদের কাছ থেকে খিলান, গম্বুজ ইত্যাদি তৈরির কৌশল শিখে তার সঙ্গে অভিজ্ঞতা মিশিয়ে বাঙালি স্থপতিরা এক নতুন মিশ্র রীতির স্থাপত্য চালু করেছিলেন ।তার ব্যাপক প্রচলন হয় খ্রিস্টীয় ১৫ শতকের পরে। এই সময়ে মন্দিরের ছাদ তৈরীর সময় পুরনো লহরা পদ্ধতি
বদলে খিলান গঠনের কৌশল অনুসৃত হয়। চালাকুটির এর মতো বাঁকানো চালের আদলে নির্মিত মন্দিরের ছাদ গম্বুজ গঠন প্রণালী অনুসারে তৈরি হতো। গম্বুজটির অবস্থান দৃঢ় করতে আর দেওয়ালের প্রত্যেক কোণে ইটের কোণাকার অংশ ক্রমে ক্রমে স্থাপন করে লহরা তৈরি করা হতো যা গম্বুজটির ভার বহনকারী ঠেকনা হিসেবে কাজ করতো। সমগ্র ছাদ জুড়ে গম্বুজ নির্মাণের এই কৌশলটি প্রয়োগ করতে প্রচুর সময় ব্যয় হতো এবং যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য ছিল। পুরো ছাদ জুড়ে এভাবে গম্বুজ নির্মাণের পদ্ধতিতে খরচ বেশি হতো বলে অনেক মন্দিরের আচ্ছাদনের গঠনে গোটা ছাদ জুড়ে গোলাকার গম্বুজ তৈরি করার বদলে মন্দিরের গর্ভবৃহের এক পাশ দুই বা কোথাও চারপাশে পাশ খিলান তৈরি করে তার উপরে ছোট ধরনের গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে।
অধিকাংশ মন্দিরের সামনের প্রবেশপথটি ত্রিখিলান যুক্ত।
মন্দির গড়ার কারিগরেরা অনেকে একসঙ্গে এক একটি গ্রামে বাস করতেন এবং সেই ভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী স্থপতিদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা অনুসারে এক একটি ঘরানার সৃষ্টি হয়েছিল। স্থানীয় ভুস্বামী জমিদার বা রাজকর্মচারীরা তাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
ভাস্কর্য অলংকরণ পদ্ধতি:– মধ্যযুগে সারা ভারতবর্ষে মন্দির শিল্পে যে বিবর্তন হয়েছিল তার ছোঁয়াতে বাংলার মন্দিরের স্থাপত্য, ভাস্কর্য উভয়েই উৎকর্ষতা লাভ করেছিল। কিন্তু তার মধ্যে কিছু কিছু মন্দিরের গায়ের ভাস্কর্য নয়নাভিরাম হওয়ায় দর্শকদের কাছে যেমন আকর্ষণীয় হয়েছিল তেমনি শিল্প সমালোচকগণের কাছেও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়েছিল।
যদিও বাংলার প্রাচীন পর্বের মন্দির গুলি অধিকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় সেগুলির অলংকরণ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। পুরনো আমলের পাথরের তৈরি মন্দিরের মধ্যে বরাকরের সিদ্ধেশ্বর মন্দির, পুরুলিয়ার তেলকূপির জলে নিমজ্জিত মন্দির, পাকবিড়ার
জৈন মন্দির অলংকরণের দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য।
মধ্যযুগের দ্বিতীয় পর্বে মন্দির স্থাপত্যের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মন্দির গাত্রে অলংকরণে শিল্পীগণ নতুন কলাকৌশল ব্যবহার করেছিলেন। শিল্প রসিক বা শিল্প সমালোচকগণ তাকে পোড়ামাটির ভাস্কর্য বা ‘টেরাকোটা ভাস্কর্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও ব্যাপারটি একেবারেই যে নতুন এমন নয়। পুরনো আমল থেকে শুরু করে অন্তত একাদশ দ্বাদশ শতক পর্যন্ত টেরাকোটা ভাস্কর্যের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। বঙ্গে তুর্কি আক্রমণের পর মন্দির নির্মাণের কাজ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত ছাড়া টেরাকোটা অলংকরণ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
বীরভূমের অনেক মন্দিরে টেরাকোটার অলংকরণের বদলে নরম ফুল পাথরের ভাস্কর্য ফলক মন্দিরের গায়ে লাগানো আছে। বর্ধমান জেলার উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে হলুদ রঙের পাথরের উপরে খোদাই করা ভাস্কর্য ফলক মন্দিরের গায়ে দেখা যায়। কোথাও চুন-সুরকির পলেস্তারা ও পাথরের মন্দিরে পঙ্খের কাজ দেখা যায়।
টেরাকোটা শব্দটির উদ্ভব ইতালীয় ভাষা থেকে হলেও ইংরেজিতে এর অর্থ পোড়ানো মাটি, যা মন্দির অলংকরণ শিল্পে ব্যবহৃত হত।
গভীর মনোনিবেশ সহকারে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির অলংকরণের ক্ষেত্রে দুটি আলাদা আলাদা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। প্রথমটি হল টেরাকোটা ফলকের উপর ভাস্কর্যের খোদাই, যার উদাহরণ খ্রিষ্টীয় স্বাদ থেকে নয় শতকে নির্মিত দেবালয়ের অলংকরণে পরিলক্ষিত হয়। অন্য ধারাটি হল খ্রিস্টীয় ১১-১২ শতকে নির্মিত মন্দিরে পোড়ামাটির ফলক লাগানোর বদলে গাঁথনির ইটের উপরে পরিকল্পিতভাবে খোদাই করা কাজ। একে বহু গবেষকরা’cut brick’ বলে অভিহিত করেছেন।
চলবে