ক্যাফে গল্পে সঙ্কলন সরকার

সলমন রুশদী সুস্থ হয়ে বেঁচে ফিরবেন কিনা আমার জানা নেই। আমি কখনো প্রার্থনা করতে শিখিনি। তাই ওঁর জন্য প্রার্থনা করতে পারলাম না বলে দুঃখিত। চেতনান্ধ লোকজনকে নিয়ে লেখা পরের অনুচ্ছেদ গুলোয় চোখ না বুলিয়ে বাকিটুকু ইগনোর করতে পারেন। আগাম ধন্যবাদ।
ছ’ বছর পার হয়ে গেছে… ফেসবুক খুঁজে খারাপ জিনিসও তুলে নিয়ে আসতে হয়। ছ’বছর আগের একটা দিন মনে পড়ে গেল… ৭ই এপ্রিল ২০১৬, সাধারণত কোনো একটা ঘটনা ঘটার দিনে আমি কিছুই লিখে উঠতে পারি না, কিন্তু সেদিন কেমন একটা রাগ বিরক্তি ঘেন্না কষ্টের ঘোর ভর করেছিলো…
নাজিমুদ্দিন সামাদ…
~~~~~~~~~~~~~
আমার ছেলের থেকে বয়েসে একটু বড়, মেয়ের সমবয়েসি অথবা ওর থেকে সামান্য একটু ছোটোই হবে হয়ত। ঠিক জানি না। আমি নাজিবের ব্লগের সাবস্ক্রাইবার ছিলাম। টুকটাক কথা হত আমাদের, মন্তব্য প্রতিমন্তব্যে, সেই থেকে একটা পরিচয় গড়ে উঠেছিলো।
ধর্মান্ধ ধর্মের কারবারি, ধর্মপ্রাণ ধার্মিক আমার নজরে একটি অপদার্থ কমপ্লেনিং সত্ত্বা। যারা সারাদিন ঈশ্বরের কাছে নিজেরা ভালো থাকার প্রার্থনা করে চলে, নিজেদের পরকাল সুরক্ষিত করে ফেলছে বলে ভাবে, সারাদিন চোখবুজে এটা ওটা চেয়ে মরে, বিদ্যা দাও বুদ্ধি দাও রূপ দাও অর্থ দাও যশ দাও ক্ষমতা দাও সুখ দাও শান্তি দাও… দাও দাও দাও! নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষ আবার অন্যের ভালোও চায়! যেমন ধরা যাক রোগাক্রান্ত অসহায়, চরম দরিদ্র অথবা ভয়াবহ ভাবে ফাঁপরে পড়া মানুষদের উদ্দেশ্যে নির্মল হৃদয়ে অনুনয় করে বলে, ঈশ্বর ওদের ভালো করে দাও…! অথচ, মানুষের অবাক কান্ড হ’ল, প্রার্থনা করেই অনেক কিছু করে ফেলা গেছে বলে ভেবে নেয়। নিজেরা গায়েগতরে কোনো মানুষের জন্যে এক ইঞ্চি রাস্তাও এগিয়ে যায় না, এমনকি নিজের জন্যেও নয়..! ভাবটা এমন, এই তো এত করে মন থেকে চাইলাম এইবার ঈশ্বর নিশ্চই ভালো করবেন ওঁদের! বোঝো…!!!! আরে যে ঈশ্বর তোর ভালো করতে পারে না, সে কিনা করবে ওর ভালো? কেন? কেন করবে? তুই চেয়েছিস বলে? কে তুই?!! এইরকম সব ধর্মের রীতিনীতি মানা আকাটদের দেওয়া যে কোনো গালাগাল সেই গালিতে উদ্দিষ্ট প্রানী বা বস্তুর চরম অপমান। ধার্মিকদের একটা বড় অংশ আবার নিরীহ নয়, তারা হিংস্র, ঈর্ষাকাতর… তারা ধর্মীয় গন্ডির ঘেরাটোপে, চাঁদোয়া শিবির সঙ্ঘে বসে সমমানসিকতার মানুষ খোঁজে, কারণ আমার ধর্ম আর তোমার ঈশ্বর আলাদা। এরা চায় গোটা পৃথিবীর মানুষকে ওদের মতন হতে হবে… মামাবাড়ি!
আজকাল বড় বেশিবেশি করে কেমন যেন একটা গা ঘিনঘিনে নোংরা বমি পাওয়া ঘেন্নার অনুভূতি হয়। ধর্মের কথা কপচানো পণ্ডিতি শুনলে আর যে কোন ধরণের যে কোনো স্তরের ধার্মিকদের আচারবিচার দেখলে।
যে সব দেশের রাজনীতি ধর্মকে কেন্দ্রে রেখে পাক খায়… সে দেশ কোনোদিনও সেরে উঠবে না।
আজকাল আর কোনো কিছুই এসে যায় না… এই ধরো ধর্মের নামে তোমার আমার ঘাড়ে যদি কোপ পড়ে, যদি পেটে তলোয়ার ঢোকে, গণপিটুনি খাই, যদি আগুনে পুড়ে মরি অথবা বোমে ছিন্নভিন্ন হই, আমাদেরও কিছুই এসে যাবে না… কিন্তু যখন এই ধরনের কোনো ঘটনা আমাদের কোনো প্রিয়জনের সঙ্গে ঘটে, অথচ আমাদের শারীরিক ভাবে কিছু হয় না… তখন আমরা যারা আস্তো থাকি, তাদের অনেক কিছু এসে যায়। যদিও আমাদের যে যে প্রিয়জন ধর্মের জিগিরে অকালে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, তাদেরও আর কিছুই এসে যায় না। যারা চলে যায়, তাদের বড় অল্পদিন মনে রাখি আমরা।
কিছুদিন একটু অস্থির লাগে বটে, তবে বেঁচে থাকা বড় অনায়াস নয়। নিত্যিদিন হাটবাজার করে বেঁচে থেকে আরো একটু ভালো থাকার চেষ্টা করে চলার যুদ্ধ কম চাপের নয়! কোনো যুক্তিবাদী মনে ‘সবই তাঁর ইচ্ছে’ বা ‘ঈশ্বর এমনটাই চেয়েছেন’ ভাবার মতন মানসিক স্থিতি বা অন্য কোনো ইন্ধন নেই… বিভিন্ন অসুবিধায় পড়ে গেলে, নির্দ্বিধায় যে কোনো বন্ধুর কাছে হাত পেতে সুরাহার খোঁজ করতে পারি। যে কোনো মানুষের অসুবিধার সুরাহায় বিনা আমন্ত্রণে কাঁধে হাত রাখার জন্যে এগিয়ে যেতে পারি। আমার মতন এলেবেলে বোকাদের জীবনে ঈশ্বর অবস্থান করেন শুধুমাত্র উৎসবের জন্য।
দিব্যি বেঁচেবর্তে আছি, তাই দুম করে মরে গেলে আদৌ কোনো চাপ হয় কিনা সেটা জানা নেই, জানার কথাও না, এখনো মারা যাওয়ার অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়নি যে…!
নাজিমুদ্দিন সামাদ… আমার সন্তানের বয়সি একটি মুক্তমনা তরুণ প্রাণ বাংলাদেশের ধার্মিকদের হাতে খুন হল। আজ ৭ই এপ্রিল, ২০১৬… সশস্ত্র ধার্মিকরা ঘিরে ধরে প্রকাশ্য দিবালোকে উন্মুক্ত রাজপথে, ধর্মের নাম নিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মারল ওকে।
শুনুন, ধর্মের শরণ নেওয়া সমস্ত রাজনীতিক আর শয়তানদের মুখে পেচ্ছাপ করতে চাই। জানি পারবো না… উগ্রধার্মিকরা ধরে হয়ত মেরে ফেলবে। মরেটরে যাবো… তবু একটা আর্জি জানিয়ে রাখলাম। ধর্মের শরণ নেওয়া প্রায়শ্চিত্তকামী কোনো রাজনীতিক শয়তান যদি মনকষ্টে ভুগছেন মনে করে শান্তি পাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে স্বেচ্ছায় হাঁ মুখ করে এগিয়ে আসেন… কথা দিচ্ছি, আপনার মুখে পেচ্ছাপ করে দিয়ে আপনার ইহজীবনের খানিকটা মনঃকষ্ট লাঘব করে দেবো। আমি যা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আপনিও বিশ্বাস করে দেখুন… গোরুর মুত্র আর উটের মুত্র পবিত্র হলে, আপাদমস্তক বোকা মানুষের মুত্র আরো পবিত্র।
ধার্মিকদের অভিধান মেনে সমস্ত রকম পাপ করে স্বেচ্ছায় ধার্মিকদের কষ্টকল্পিত নরকে যেতে চাই। টুপিওয়ালা মোল্লা বা গেরুয়াধারী টিকিওয়ালা টাকলা সবার জন্য এক পেট জল খেয়ে বসে আছি… যদি কখনো কষ্ট লাঘবের জন্য দয়া করে যোগাযোগ করেন, তাহলে একটা যত্নে লালিত ইচ্ছেপুরণ সম্ভব হয়। না, মানুষ মারতে পারি না। মানুষ মারতে চাই না। আমি অক্ষম নিরুপায় এক বিরক্ত সত্ত্বার অধিকারী… আপনারা দয়াকরে হাঁটু গেড়ে বসে একটু বড় করে হাঁ করবেন? তাহলে করে আপনাদের মুখে পেচ্ছাপ করে দিতে আমার একটু সুবিধে হবে। যদি বিশ্বাস রাখতে পারেন একজন বোকা মানুষের মুত্র, স্বর্গের আঙুর বা কমলালেবুর থেকেও সুস্বাদু, তাহলে আমার পেচ্ছাপের স্বাদ আপনাদের অতি সুস্বাদু ও অতুলনীয় মনে হবে।
এ’সব আমাদের দু’ দিনের শোক রাগ দুঃখ অভিমান… আবার সবকিছু আগের মতই ঠিক ভুলে যাবো, দেখে নেবেন… আবার শুনবো “আমরা হিন্দু, আমরা বঞ্চিত, আসুন আমরা এক ছাতার তলায় জড়ো হই।” অথবা, “আমরা মুসলমান, আমরা বঞ্চিত, আসুন আমরা এক ছাতার তলায় জড়ো হই।” আবার আমরা যতই বলি না কেন, এ অবস্থা অসহনীয়, বিবমিষা উদ্রেককারী, এভাবে দিনের পর দিন চলতে পারে না, ইত্যাদি… তা নয়, এ সমস্তটাই সহনীয়, আমাদের সয়ে গেছে। আদতে আমরা ওতপ্রোতভাবে এ সমস্ত কিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত।
ধর্মেও ওরা আমরার রাজনীতি বজায় থাকুক। ওরা করেছে তাহলে আমরা কেন করব না? ওরা করলে কিছু বললেন না, আমরা করলেই দোষ? আমরা গর্বিত মুসলমান। আমরা গর্বিত হিন্দু। আমরা অমুক। আমরা তমুক। আমরা নাস্তিক। আমরা নিরপেক্ষ। আমরা নিঃস্পৃহ। এদিকে আমরা সবাই নাকি মানুষের কথা ভাবছি! নিপাত যাক সমস্ত ছদ্ম ভালো মানুষের দল। সবাইকে মেরে কেটে তোরা সবাই বরং ফর্সা হয়ে যা বাপ। দুনিয়ার বোঝা হালকা কর। অজুহাত অভিযোগ আর তুলনামূলক ভালোমানুষি দেখানোর নামে হোয়াটঅ্যাবাউটারির পেঁয়াজি মেরে নিজ উদ্দেশ্য জাস্টিফাই করে বেড়ানো আপদগুলোর ঘরে ঘরে সবার আগে আগুন লাগুক। তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত নোংরা ধান্দাবাজ চামচা অপদার্থ প্যারাসাইট গুলোকে মুখ নাড়িয়ে বাকতাল্লা মারতে দেখে দেখে এ মানবজনমে ঘেন্না ধরে, স্রেফ ঘেন্না…
এই ২০২২ এ দাঁড়িয়েও যখন সুশীল মানুষ এখনো জোর গলায় চিৎকার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে! ওরা বলে, অমুক ধর্মের অমুক মানুষ, তমুক ধর্মের পরিবারের তমুক শিশুটির জন্য রক্তদান করে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। অমুক ধর্মের অমুক দরিদ্র ট্যাক্সিওয়ালা তমুক ধর্মের তমুক কন্যার বিবাহের জন্য রাখা লক্ষ লক্ষ টাকা ও গয়না ভর্তি ফেলে আসা ব্যাগ, ঠিকানা খুঁজে বাড়িতে গিয়ে ফেরত দিয়ে এসেছেন। অমুক ধর্মের মানুষ তমুক ধর্মের মানুষের সঙ্গে ঈদে/বিজয়াদশমীতে/ক্রিসমাসে কোলাকুলি করে খানাপিনা করে এসেছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি…
উগ্র মৌলবাদীদের মতন আপাত নিরীহ সুশীল মানুষজনও যখন মানুষের প্রথম পরিচয় যে মানুষ, তা ভুলে গিয়ে মানুষের গৌণ ধর্মপরিচয়কে মাথায় তুলে নাচেন। তখন সত্যিই আর মাথার ভেতর ভাবার মতন আর কিছুই বেঁচে থাকে না। তখন আবার মুখে পেচ্ছাপ করে দিতে ইচ্ছে করে।
শেষ অবধি ভদ্রতা বজায় রাখতে না পারার জন্য আমায় মার্জনা করবেন না।