ক্যাফে ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজে সুব্রত সরকার (পর্ব – ৪)

লামডিং থেকে শিলচর- বন্য পথে ভেসে যাওয়ার আনন্দ 

 

লামডিং স্টেশনে কাঞ্চনজঙ্ঘা একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। ঘড়িতে সকাল ৭টা ১০। গত চব্বিশ ঘন্টা ধরে সে ছুটে এসেছে। পথের হিসেবে ১১৬১ কিমি। এই সুযোগে আমি একটু নেমে পড়লাম লামডিং স্টেশনে। এই একটু নেমে দাঁড়ানোর মজাটার কোনও দাম হয় না!..

লামডিং থেকেই শুরু হবে স্বপ্নের সেই বরাক উপত্যকার পথ! যার জন্যই বেছে নিয়েছি এই দীর্ঘ ট্রেন সফর। কলকাতা থেকে শিলচর প্রায় ৩৩ ঘন্টা জার্নি। ১৩৫৯ কিমি রেলপথ।

কাঞ্চনজঙ্ঘা বিশ্রাম শেষে নতুন করে যাত্রা শুরু করল। এবার ডাবল ইন্জিন। পাহাড়ে উঠবে গাড়ি। সামনের থেকে একটা ইন্জিন টেনে নিয়ে যাবে, পেছন থেকে ঠেলবে একটা ইঞ্জিন।

ঘড়িতে আটটা ছয়। আমিও তৈরী হয়ে নিলাম জানালার ধারে। এসির কাচ ঢাকা পর্দা দিলাম দু’পাশে সরিয়ে। চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে ধরা দিল বুনো পথের আনন্দ!..

বরাক উপত্যকা পাহাড়, নদী, জঙ্গল, চা বাগান দিয়ে সাজানো এক বিস্তৃত সবুজ বনাঞ্চল। মন চঞ্চল হবেই এই সবুজের মাঝে এসে পড়লে। আয়তনে ৬৯২২ বর্গকিলোমিটার। এর প্রধান নদী বরাক। বরাকের উৎস মণিপুর থেকে। বয়ে গেছে মিজোরাম ও আসামের মধ্যে দিয়ে। ৫৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বরাক নদী। বরাক আবার দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে করিমগঞ্জ জেলার হরিতিকরের কাছে। সেখানে এসে সুরমা ও কুশিয়ারা এই দুই নদীতে ভাগ হয়েছে।  বরাকের উপনদীরা হল কাটাখাল, জিরি, চিরি, মধুরা, লঙ্গাই, সোনাই, রুকনি এবং সিংলা। এই বিখ্যাত নদীর নাম থেকেই নামকরণ হয়েছে বরাক উপত্যকা। বরাক উপত্যকার প্রধান তিনটে জেলা হলো- কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। বরাকের প্রধান শহর শিলচর।

আমি আজ সেই বরাক ভ্যালির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাব তার প্রধান শহর শিলচরে।

রেল ভ্রমণে লামডিং থেকে শিলচর –

এই পথটা প্রকৃতই প্রকৃতি প্রেমিকদের স্বর্গরাজ্য। চোখ মন জুড়িয়ে যায়। কাব্যিক মেজাজে গুন গুণ করে উঠবে মন, “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি, সে যে আমার জন্মভূমি!..”

লামডিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দৌড় শুরু করল একটু ধীরে সুস্থে। এপথে দুরন্ত গতিতে ছোটা সম্ভব নয়। প্রথম স্টেশন এল মান্দারডিসা। আহা! কি অপূর্ব নির্জন নিরিবিলি মাখা এক স্টেশন! মনে হয় যেন একটু নেমে পড়ে চুপ করে বসে থাকি কিছুটা সময়!..

এরপর ট্রেন যত এগোচ্ছে বরাক ভ্যালির রূপ- অরূপের মায়ায় মন জড়িয়ে যেতে থাকে। একে একে চলে যায় কি সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট নির্জন স্টেশন হাতিখালি, ডিবোলং, ডিজোব্রা, লাং টিং, ডিহাখো, মুপা, কালাচাঁদ, মাইবং, ওর্ডেংডিসা,, দেওতুহাজ। জানালার ধারে বসে কবির চোখে এসব দেখতে দেখতে আমার স্বপ্নের রেলযাত্রা সার্থক হয়ে ওঠে। বহুদিনের স্বপ্ন ছিল এই বরাক উপত্যকায় রেলপথে আসার। সব স্বপ্ন তো সত্যি হয় না জীবনে! কিছু কিছু হয়। তাই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার আনন্দ, উচ্ছ্বাস তখন হয় একটু বেশি। আমি কেবলই সেই আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছি।

একসময় ট্রেন যখন এসে থামল নিউ হাফলং, আর না নেমে পারলাম না। বাইরে তখন মিষ্টি রোদদুর। পাহাড়ে পাহাড়ে রোদের আলো। “অমলকান্তি রোদদুর হতে চেয়েছিল!” নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বিখ্যাত কবিতার পংক্তিটা মনে পড়ে গেল।

নিউ হাফলং স্টেশনটা কি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। আদিবাসী, জনজাতি মানুষজনদের চোখে পড়ল। স্টেশনের চাতালে টাটকা ফল ১০ টাকা ভাগায় বিক্রি করছে পাহাড়ি জনজাতি মহিলারা। পাকা পেঁপে, কলা, শসা। ভেজানো ছোলা পেঁয়াজ কাঁচালংকা দিয়ে তাও ১০ টাকা। ওদের সাথে একটু আলাপ, কথা বলার ছলে ছোলা ও পাকা পেঁপে কিনে খেলাম। পথের এই সংযোগ, এই এক পলকের একটু দেখা, একটু কথা বলার আনন্দ ভ্রমণের সেরা মাধুর্য। তাই আমার একলা ভ্রমণ সব সময়ই একপ্রকার মুসাফিরের  মাধুকরী!..

আমার ট্রেন কম্পার্টমেন্টের অ্যাটেনডেন্ট ছিলেন একজন প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ। বর্ধমানে তাঁর বাড়ি। কাজের সূত্রে তিনি এই পথে বহুবার আসা যাওয়া করেন। নাম তাঁর প্রভাত মুখোপাধ্যায়। তিনি আমাকে বরাক ভ্যালিকে দেখতে সাহায্য করেছেন বারবার। চিনিয়ে দিয়েছেন এই উপত্যকার অচেনা অনেক কিছুকে। সুন্দর সুন্দর গল্পও বলেছেন বরাক ভ্যালির। তাই আমার এই রেলজার্ণি আরও সার্থক সুন্দর হয়েছে।

নিউ হাফলং থেকে প্রথমেই পেলাম জাটিঙ্গা। জাটিঙ্গা বিখ্যাত এক টুরিস্ট ভিলেজ। এই উপত্যকায় প্রতিবছরই অনেক পাখিরা পতঙের মত আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করে। এটা একটা প্রচলিত গল্প। আবার অনেকে মনে করেন, না। পাখিদের ফাঁদে ফেলে এই আগুনে নিয়ে আসা হয়। সে অর্থে এটা একটা চোরাশিকার।!

এরপর রেলপথের একটা আশ্চর্য বাঁক দেখতে পেলাম। একদম বৃত্তাকারে ট্রেন ঝিক ঝিক ঝক ঝক করতে করতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠছে। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। মুগ্ধ হয়ে দেখলাম শুধু দেখলাম। একটা ছোট্ট ভিডিও করলাম। এই পর্বটা সারাজীবনের সুখস্মৃতি।

বরাক উপত্যকায় এত যে চা বাগান আছে জানতাম না। নিউহারাণগাজো, বান্দরখাল থেকে একের পর এক সুন্দর চা বাগান দেখতে দেখতে চললাম। আর তার চারপাশে সরু সরু বাঁশবন, কলাগাছ। এবং ঘোলা জলের  এক চওড়া নদী। নাম জানলাম নদীটার জাটিঙ্গা নদী। নিশ্চয়ই এটা স্থানীয় মানুষের দেওয়া নাম।এই নদীর নিসর্গ বড় অপরুপ। চিত্রকরের চোখে দেখলে মন অজস্র রং করা ক্যানভাসের জন্ম দিয়ে যাবে।

এসব দৃশ্যসুখ আর বন্য আনন্দ এই বরাক উপত্যকা ভ্রমণে মনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। তাই ট্রেন যখন বদরপুর জংশন থেকে আবার নতুন করে শিলচর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে একে একে আরও নদী, খাল, বিল পেরিয়ে এগিয়ে এসে অরুণাচল জংশনে দাঁড়াল, আমি তখন এক মুগ্ধ মুসাফির।

শিলচরের আগের স্টেশন অরুণাচল জংশন। এখান থেকে অরুণাচল চলে যাওয়া যায় রেলপথে।

আমার স্বপ্নের রেলভ্রমণে বরাক উপত্যকাকে এভাবে দেখতে দেখতে আসার এই বন্য আনন্দ অভিজ্ঞতা এক অন্যতম অপরূপ ভ্রমণ হয়ে রয়ে গেল আজীবন। এই স্মৃতিসুখই মুসাফির মনকে উজ্জীবিত করে। চঞ্চল করে পরবর্তী পথ চলাকে। তাই আমি কখনো ক্লান্ত হই না ভ্রমণ করে। ভ্রমণ আমাকে বলে, “হে মুসাফির, গান গেয়ে গেয়ে পথ চলো- আমার পথ চলাতেই আনন্দ!..”

কিভাবে যাবেন – শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে শিলচর যাওয়ার পথে পড়বে এই বরাক ভ্যালি। এছাড়া গৌহাটি থেকেও দিনে দিনে সফর করার ট্রেন আছে। এই রেল সফর দিনের আলোয় আলোয় করতে হবে।

 সমাপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।