সাপ্তাহিক অণু উপন্যাসে সুব্রত সরকার (পর্ব – ৩)

বনবাসের বর্ণমালা

তিন

পাহাড়ের উঁচু ধাপে গড়ে ওঠা রাইবস্তিতে হরিশংকর থাপার কয়েক পুরুষের বসবাস। বাপ-ঠাকুর্দার আমলে বানানো বাড়িটা তাই সাবেকি ধরণের কাঠের দোতলা বাড়ি। কিন্তু হরিশংকর নতুন করে একটা বাঁকানো সিঁড়ি বানিয়ে দোতলার দুটো ঘরকে সুন্দর সাজিয়ে গুছিয়ে হোম স্টে করে তুলেছে। নিজে পরিবার নিয়ে থাকে নীচের দুটো ঘরে। দোতলার ঘর বারান্দা থেকে চারপাশের পাহাড়-জঙ্গলকে দারুণ উপভোগ করা যায়। চোখের সামনে ছড়িয়ে আছে এক সবুজ উপত্যকা। ছোট্ট এক বুগিয়াল। এই পাহাড়ে বেড়াতে এসে হরিশংকর থাপার অতিথি হয়ে দুটো দিন বড় আনন্দেই কাটানো যায়। হোম স্টের নামটাও সুন্দর রেখেছে হরি, ‘গ্রিন ভ্যালি হোম স্টে’।
আপাতত একুশ দিন এই গ্রিন ভ্যালিতেই থাকতে হবে বলে মনে করছে শুভ্র। নিজের মালপত্র, রাকস্যাক নিয়ে দোতলার ঘরে উঠে এসেছে। হরি দু’বোতল জল দিতে এসে বলে গেল, “আধা ঘণ্টা লাগবে লাঞ্চ রেডি করতে। একটু রেস্ট করুন। খানা রেডি হলেই আমি ডাকব।”
ঘরে মালপত্র, টুপি, সানগ্লাস, ক্যামেরা রেখে মোবাইলটা নিয়ে বারান্দায় এসে বসল শুভ্র। টাওয়ার আছে। নেট অন করতেই একে একে সব খুলে গেল। হোয়াটসঅ্যাপে জমে আছে অনেক ভিডিও, ছবি ও মেসেজ। শুভ্র একটা একটা করে সব দেখল। অনেকেই লকডাউনের নানান খবর পাঠিয়েছে। বরুণের পাঠানো এক ভিডিওতে লকডাউনের অনেকগুলো ছবি দেখে শুভ্র অবাক হল, সারা ভারতের বড় বড় শহরের পথঘাট একদম শুনশান। নির্জন। একটাও গাড়ি নেই, মানুষ নেই পথেঘাটে।
মণিকুন্তলাও পাঠিয়েছে দুটো ভিডিও। একটাতে করোনার জরুরী অনেক তথ্য। অন্যটাতে ইটালিতে কি ভয়াবহ অবস্থা তার ছবি ও খবর। গণকবরের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হচ্ছে সেখানকার সরকার। রাশিয়া, আমেরিকাতেও সরকার কোভিড-১৯ এ কাবু হয়ে পড়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের খবর এখনও তেমন খারাপ নয়। ভারতের মধ্যে মহারাষ্ট্রে ও ব্যাঙ্গালোরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে। আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে।
বারান্দায় বসে এইসব ভিডিও ও খবরগুলো দেখতে দেখতে কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতা সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যায়। কতখানি সতর্ক থাকতে হবে এখন তাও বুঝতে পারে। মাস্ক পড়ে থাকতে হবে। দূরত্ব রেখে চলতে হবে। হাত ধুতে হবে সবসময়। এই সব ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ভীষণভাবে মেনে চলার জন্য সরকার থেকে আবেদন করা হচ্ছে বারবার। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী থেকে সবাই মাস্ক পড়ে কাজ করছেন।
হরি নীচের থেকে হাঁক দিয়ে বলল, “দাদা, খানা লাগাব?”
শুভ্র বলল, “লাগাও।”
“দাদা উপরমে খানা ভেজেঙ্গে না আপ নিচ মে আয়েঙ্গে?”
শুভ্র একমুহুর্ত ভেবে নিয়ে ঠিক করল, এখন নীচে গিয়ে ডাইনিং রুমে খাওয়াই ভালো। রাতের খাওয়া নয় উপরে বারান্দায় বসে খাওয়া যেতে পারে। হরির সাথে চারটে কথা বলা দরকার। আগামী একুশ দিন কিভাবে এখানে থাকবে তার একটা প্ল্যান করা প্রয়োজন।
বাড়ি থেকে প্রায় আটশো কিলোমিটার দূরে এমন সবুজ পাহাড়, গভীর জঙ্গলের বনভূমিতে নির্বান্ধব বনবাস কতখানি ভালো হল বা খারাপ হল, তা যেন এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না শুভ্র। মায়ের জন্য হঠাৎ খুব মন খারাপ হচ্ছে। দাদা সারাদিন ব্যস্ত থাকে নিজের ব্যবসা নিয়ে। মা বাড়িতে একাই থাকে। শুভ্র থাকলে মায়ের এই একাকীত্ব খানিকটা দূর হয়। মা বেশ হাসিখুশি থাকে সে সময়।
হরি স্যালাডের প্লেটটা সাজিয়ে দিয়ে বলল, “হাট বাজার সব বন্ধ থাকলে সবজি উবজি আউর মিলবে না। স্যালাড আর দিতে পারব না।”
হরির স্যালাডের প্লেটে আছে শসা, পেঁয়াজ কুচি আর দুটো হরি মির্চ। সঙ্গে ঘরে বানানো আচার। খেতে দিয়েছে ভাত, ডাল, আলু ভাজা ও ডিম কারি। ক্যাসারলে ঢাকা খাবারগুলো বেশ গরম আর সুস্বাদু। শুভ্র খেতে খেতে কথা বলা শুরু করল, “হরি ভাইয়া, কি করব তুমি বলো?”
হরি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে শুভ্রর সামনে মুখোমুখি বসল। ওর বউ টিনা ভাবী রান্নার বাসন গুলোয় সাবান ঘষছে। কিন্তু সেও ওদের কথায় জড়িয়ে আছে। ভাবী বলল, “আউর কুছ লাগবে তো বলবে। রাতে তুমি ভাত খাবে না রোটি খাবে?”
হরি বলল, “দাদা, সরকার তো বলেছে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত পুরা লকডাউন চলবে। আজ তো ২৫ মার্চ। কিতনা দিন সব বন্ধ থাকবে!”
শুভ্র আলু ভাজা মুখে নিয়ে বলল, “আপাতত ২১ দিন এই লকডাউন চলবে। বন্ধ রাখতেই হবে সব কিছু। তারপর সরকার পরিস্থিতি বুঝে জানাবে, লকডাউন উঠে যাবে না আরও চলবে!”
“২১ দিন!” টিনা ভাবী অবাক হয়ে বলল, “কি হোবে তা’লে? বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ সব বন্ধ থাকবে?”
শুভ্র বলল, “সারা দেশে সব বন্ধ হয়ে গেছে। আমার মোবাইলে অনেক ছবি ও ভিডিও এসেছে, তোমাদের দেখাব।”
“এ কি বিমারি এল ভাইয়া!” হরির চোখে মুখে আতঙ্ক, “কভি নাম শুনা নেহি!”
টিনা ভাবীও চেয়ে আছে শুভ্রর দিকে। শুভ্র খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে এসে বলল, “খুব খারাপ একটা রোগ। এর নাম করোনা ভাইরাস। চিন দেশের উহান নামক একটা শহর থেকে প্রথম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানেও অনেক মানুষ মারা যায়। তারপর এই ভাইরাস সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ইটালি বলে একটা খুব সুন্দর দেশ আছে, সেখানে অনেক লোক মারা গেছে। সিনিয়র সিটিজেন আউর বাচ্চালোকদের এই রোগ অ্যাটাক করছে বেশি। এই বিমারির কোনও মেডিসিন নেই!”
“দওয়াই নেই কোনও!” হরি ও টিনা ভাবী একসাথে বিস্ময় প্রকাশ করল।
“না কোনও দওয়াই এখনও তৈরি হয় নি। দওয়াই একটাই, ডিস্টেন্স ও অ্যাওয়ারনেস।”
হরি ঠিক বুঝতে না পেরে বলল, “কি বললে দাদা?”
শুভ্র ধীরে ধীরে বলল, “আমাদের এখন থেকে আর কাছাকাছি বসে কথা বলা যাবে না। দো’গজ দূর থেকে সব করতে হবে।”
“কেন দাদা এসব বলছো?”
“এই ভাইরাস খুব খতরনাক আছে। তাই মুখে রুমাল বেঁধে কথা বলতে হবে। শহরে তো সবাই মাস্ক পড়ছে। সাবান জলে হাত ধুতে হবে সব সময়। কাশি, সর্দি, জ্বর হলে আলাদা ঘরে একা একা থাকতে হবে চোদ্দ দিন। দম নিতে কষ্ট হলে হসপিটালে ভর্তি হতে হবে।”
“আরে বাব্বা! এ তো বহুত আজব বিমারি আছে!”
“হ্যাঁ। এই রোগ খুব ছোঁয়াচে। একজনের থেকে দশ জনের হতে পারে।”
“ভাইয়া, ইয়ে বিমারি কেন হলো?” টিনা ভাবী বাসন ধুয়ে এসে শুভ্রর সামনে দাঁড়াল।
শুভ্র খুব কুণ্ঠা নিয়ে বলল, “ভাবী, থোরা দূর সে বাত কিজিয়ে।”
ভাবী শুভ্রর কথা শুনে একটু সরে গিয়ে দূরে দাঁড়াল। শুভ্র আবার বলতে শুরু করল, “কেউ কাউকে টাচ করবে না। নো বডি কন্ট্যাক্ট। এই বিমারিকে বলে মহামারি। প্যানডেমিক। অনেক মানুষ মারা যায়। পৃথিবীটা পাল্টে যায়।”
হরি বলল, “আমাদের ইতনা সুন্দর গাঁওমে ইয়ে বিমারি আসতে পারে ভাইয়া?”
শুভ্র অল্প হেসে বলল, “এখন তো শহরেই বেশি হচ্ছে। সেখানে একসাথে অনেক মানুষ রয়েছে। তোমাদের এই পাহাড়ে তো অত মানুষ নেই, তাই ভয় একটু কম। কিন্তু সাবধান থাকতে হবে। সবাইকে বলতে হবে, বোঝাতে হবে।”
হরি ও টিনা দুজনেই চুপ করে গেল। শুভ্র গ্লাসের জলটা শেষ করে কিছু বলতে যাবে, সে সময় বাইরে থেকে ভেসে এল, “টিনা ম্যায় আ গয়ি!” সামনে এসে দাঁড়াল যে ছটফটে মেয়েটি, তাকে দেখে ওরা তিনজনেই অবাক। মেয়েটির মুখে মাস্ক, দু’হাতে গ্লাভস ও কাঁধে একটা ট্র্যাভেল ব্যাগ। টিনা ভাবী অবাক ও খুশি হয়ে বলল, “আরে আরাধনা, তু ক্যায়সে আই?”
আরাধনা মুখোশের আড়াল থেকেই বলল, “বহুত পরিশানি হুয়ি। লেকিন লকডাউনের খবর জানতে পেরেই আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। স্কুল তো জনতা কার্ফুর দিন থেকেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা টিচাররা একটা গাড়ি বুক করে চলে এলাম। লেকিন গাড়ি তো পুলিশ আটকে দিল মদনপুর চেক পোস্টে। আমি ওখান থেকেই পয়দল এলাম।”
“তেরেকো মাস্ক, গ্লাভস কাঁহা সে মিলা?” হরি জানতে চাইল।
আরাধনা বলল, “মদনপুর চেক পোস্টের এক পুলিশ অফিসার আমাকে দিল। বলল, এখন থেকে এসব পড়তে হবে আমাদের।”
শুভ্রর সাথে খুব সহজেই আলাপ হয়ে গেল আরাধনার। আরাধনা কালিম্পং শহরে বড় হয়েছে। ওখানে পড়াশোনা করেছে। রাইবস্তির এই পাহাড়ি কন্যা এখন একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের টিচার। সে স্কুলও এক পাহাড়ি গ্রামে। রাইবস্তি থেকে প্রায় ৯০ কিমি দূরে চিয়াভঞ্জন নামক এক ছোট্ট জনপদে।
আরাধনা কথায় গল্পে খুব সাবলীল। হেসে হেসেই কথা বলে। ওর হাসিটা যে কত সুন্দর, শুভ্র তা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। নিজেরাই দু’জনে বেশ কথা বিনিময় করে একদম সহজ হয়ে গেল। প্রথম আলাপ মনেই হল না!
লকডাউনে আরাধনা বাড়ি ফিরে এসেছে। হরির প্রতিবেশী এই মেয়েটি গ্রামের গর্ব। রাইবস্তির একমাত্র গ্রাজুয়েট আরাধনা রাই। ওর মা, বাবা ও এক ভাইকে নিয়ে ওদের বাড়ি পাহাড়ের উঁচু ধাপে। হরির বাড়ির পাশ দিয়েই পথটা সোজা চলে গেছে পাহাড়ের মাথার দিকে। এই পথ দিয়েই ওরা নামা-ওঠা করে। টিনা ভাবীর সাথে আরাধনার বন্ধুত্বের সম্পর্ক। টিনা-আরাধনা এক স্কুলে পড়ত। কিন্তু টিনা দশ ক্লাসের পর আর পড়ে নি। হরির প্রেমে পাগল হয়ে ঘর থেকে পালিয়ে দু’জনে লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলে। এখন ওরা দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ে দিব্যি হোম স্টে চালাচ্ছে। আরাধনা এখনও বিয়ে করে নি। এই গাঁও থেকে দূরে এক স্কুলের দিদিমণি হয়ে সেখানেই থাকে। ছুটিতে বাড়ি আসে। কিন্তু এবার ওকে পালিয়ে আসতে হল লকডাউনের খবর শোনা মাত্রই।
শুভ্র যে এখন আর কলকাতায় ফিরে যেতে পারবে না, এটা শুনে আরাধনা প্রথমে অবাক হল, দুঃখ প্রকাশ করল। তারপর মুহূর্তেই কেমন পাল্টে গিয়ে হেসে বলল, “ঠিক আছে, মেহমান হয়েই থাকুন আমাদের সাথে এই পাহাড়ে। এনজয় সাম গ্রিন ডেইজ ইন আওয়ার গ্রিন ভ্যালি। অভি তো থ্রি উইকস, টুয়েন্টি ওয়ান ডেইজ রহেনা পরেগা। আমিও থাকব। অভি ঘর যানা পরেগা। পাপা মাইয়া টেনশন কর রহে হ্যায়। সি ইউ এগেইন!”
আরাধনা পাহাড়ের চড়াই ধরে ছটফট করতে করতে কি সুন্দর চলে গেল। মনে হল যেন একটা প্রজাপতি উড়ে গেল!
এমন এক দুর্গম নির্জন পাহাড়ে মাস্ক, গ্লাভস পড়া চঞ্চলা হরিণীর মত দিদিমণির হঠাৎ দেখা পেয়ে যাবে শুভ্র তা যেন ভাবতেই পারছে না। সে দিদিমণি আবার বেশ হাসি খুশি। সহজ আলাপে কেমন বন্ধুর মত!
দোতলায় উঠে এসে বারান্দার চেয়ারে শুভ্র বসল। বেলা ছোট হয়ে গেছে। ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে এখন। চোখের সামনের সবুজ ঢেউ খেলানো উপত্যকার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবছে, এমন নির্বাসনের প্রথম দিনটা তো মন্দ কাটছে না। এই সুন্দর বনবাস পর্ব নিয়ে একটা ডাইরি লেখা শুরু করলে হয়। একটু আধটু লেখালেখি তো কলেজ জীবনে করেছি। এখন আবার শুরু করলে ভালোই হবে। তাই বেশ আনন্দে গুন গুন করে গেয়ে উঠল, “এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না, যাক না…”

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।