ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ২০)

তীর্থভূমি বীরভূম ,ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম
মন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে রাঢ়ের প্রতিভাবান শিল্পীরা ষোড়শ শতকে যে পরীক্ষা- নিরীক্ষা শুরু করেছিল, সপ্তদশ শতকে তা বিকাশ লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে টেরাকোটা ভাস্কর্যতেও এসেছিল পরিবর্তন।
বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় টেরাকোটা শিল্পের প্রভূত উন্নতি হয়েছিল। বিষ্ণুপুর ও তৎ সন্নিহিত এলাকার শিল্পী ও স্থপতিদের নব নব উন্মেষশালিনী প্রতিভার ফলে মৃৎশিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল। মল্ল রাজাদের নির্মিত প্রথম ধর্মীয় স্থাপত্য বিষ্ণুপুরের রাস মঞ্চ(১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ)
আকৃতি ও স্থাপত্য শৈলীতে অভিনবত্বের স্বাক্ষর বহন করে। ঠিক তেমনি মন্দির গাত্রে অলংকরণে এক নতুন শিল্পশৈলীর প্রচলন হয়েছিল। রাসমঞ্চের বাইরের খিলান গুলির গায়ে পোড়ামাটির পদ্ম এবং পূর্বদিকের দেয়ালে গায়ক ও বাদ্যকারগণের টেরাকোটির মূর্তিগুলি অপূর্ব। মন্দিরের চূড়ার মূল বরাবর প্রতি দিকে চারটি করে দোচালা ও প্রত্যেক কোণে চার চালা কুটিরের আদলে প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছিলও অলংকরণের জন্য।
বিষ্ণুপুর শহরে মল্ল রাজাদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম দেবায়তন হল মল্লেশ্বর শিব মন্দির। এই মন্দিরটি পাথরের তৈরি এবং এখানে কোন টেরাকোটা অলংকরণ নেই। কিন্তু এই মন্দিরের প্রবেশ পথের উপরে কুলুঙ্গিতে সবুজ ক্লোরাইট পাথরের ভাস্কর্যের নিদর্শন হাতির মূর্তি আছে ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় ,বিষ্ণুপুরের অধিকাংশ মন্দির পাথরের তৈরি।ওৎফহ্য
টেরাকোটা অলংকরণের প্রাচুর্য ও গুণগত মানের উৎকর্ষতায় মদনমোহন মন্দির পশ্চিমবাংলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন গুলির মধ্যে অন্যতম।
সপ্তদশ শতকে বিষ্ণুপুর ছাড়াও রাঢ় অঞ্চলের কয়েকটি মন্দিরে টেরাকোটা ভাস্কর্যের অলংকরণ লক্ষ্য করা যায়। বিষ্ণুপুরের অনতিদূরে বাসুদেবপুরে বাসুদেব বিগ্রহের জন্য ১৬২৬ খ্রিস্টাব্দে যে মন্দির নির্মিত হয়েছিল তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু ধ্বংসাবশেষের
মধ্যে ফুলকাটা, লতাপাতার নকশা এবং টেরাকোটা অলংকরণের হদিশ পাওয়া গেছে।
সপ্তদশ শতকে বীরভূম জেলার ঘুড়িষা গ্রামে( জয়দেব কেন্দুলীর কাছে একটি প্রাচীন গ্রাম) রঘুনাথ জিউর(১৬৩৩) চারচালারীতির মন্দির তৈরি হয়েছিল। মন্দিরের পূর্ব দিকে দরজার উপরে বৃষারূঢ় শিব , কালী, ছিন্নমস্তা প্রভৃতি দশমহাবিদ্যা রূপে বর্ণিতা দেবীদের উপস্থিতি মন্দির ফলকে লক্ষ্য করা যায়। উত্তর দিকের প্রবেশপথের উপরে রাম রাবণের যুদ্ধের দৃশ্যাবলী দৃষ্ট হয়। এই মন্দিরের মৃৎফলক গুলির আকার একটু বড়। পূর্ব দিকে রাবণ, রাম, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কুর্ম ,বরাহ, নৃসিংহ, পরশুরাম, বলরাম ,মনসা ,ষাঁড়ের উপর হর পার্বতী, মহালক্ষী, মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা এবং উত্তরে বস্ত্রহরণ, নবনারীকুঞ্জ ,রাসমন্ডল ,গজেন্দ্রমোক্ষ, অনন্ত শয়নে বিষ্ণু, দুর্গা ,বলরাম কালীয় দমনরত শ্রীকৃষ্ণ, গোচারণে কৃষ্ণ প্রভৃতি প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ আছে।
এরকম উল্লেখযোগ্য টেরাকোটার বহুল নিদর্শন পাওয়া যায় হাওড়া , নদিয়া, হুগলি জেলার বিভিন্ন মন্দিরে।
হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়াতে বিখ্যাত হংসেশ্বরী মন্দিরের পশ্চিম ভাগের ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামেশ্বর দত্ত কর্তৃক অনন্ত বাসুদেব মন্দির নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরটির গায়ে যে সমস্ত মৃৎফলকগুলি আছে , সেগুলির
নিখুঁত পরিস্ফুটন নৈপুণ্য, সুচারু রেখার বৈশিষ্ট্য ও বাস্তববোধ খোদিত চিত্রগুলি এতটাই জীবন্ত যে, শোনা যায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্দেশে
শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু এক মাস বাঁশবেড়িয়া তে অবস্থান করে প্রতিটা টেরাকোটা ফলকের চিত্র
অংকন করেছিলেন।
১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে উলা বীরনগর এর জমিদার রামেশ্বর মিত্র মুস্তাফি রাধা কৃষ্ণের সেবাপূজার জন্য একটু জোড়বাংলা মন্দির নির্মাণ করান। উৎকৃষ্ট টেরাকোটা সযরৎ্যরজ্জায় এই মন্দিরটি অলংকৃত।
সপ্তদশ শতকে টেরাকোটা শিল্পের সর্বাধিক উৎকর্ষ সাধন হয়। ওই সময়ে বিষ্ণুপুরের রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীগণ মন্দির ভাস্কর্যে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ওই ধারা অনুসরণ করে শুধু বাঁকুড়া জেলায় নয় ,বর্ধমান, বীরভূম ,হুগলি হা এর উন্নতি ওড়া, নদিয়া ,মুর্শিদাবাদ ও মেদিনীপুর অঞ্চলে
অষ্টাদশ শতকে বিভিন্ন শৈলীর মন্দির স্থাপত্যের
উল্লেখযোগ্য উৎকর্ষ সাধিত হয়। ওই সঙ্গে গুণগত মান ও বহুল প্রচলন এর ফলে টেরাকোটা বা মৃ্ৎ ভাস্কর্য শিল্পের ও উন্নতি হয়।
তবে রাম রাবণের লঙ্কা যুদ্ধ, বানর ও রাক্ষসদের পরস্পর আক্রমণ ও লড়াইয়ের দৃশ্য প্রায় সব মন্দিরের প্রবেশপথে এবং ত্রিখিলানের উপরে প্রথম দর্শনেই নজরে আসে। বানর ও রাক্ষসদের লড়াইয়ের দৃশ্যের উল্লেখযোগ্য রূপায়ণ দেখা যায় বীরভূম জেলার জয়দেব কেঁদুলির এবং হুগলি জেলার আঁটপুরে রাধাগোবিন্দ মন্দিরে। লঙ্কা যুদ্ধ দৃশ্যের মধ্যেই দেখা যায়, সীতাহরণ জটায়ুবধ অশোক বনে সীতার সমীপে হনুমানের আগমন।
চলবে