T3 সাহিত্য মার্গ || ১৫০ তম উদযাপন || সংখ্যায় স্বর্ভানু সান্যাল

আমার ঈশ্বর

প্রশংসা পেলে আমি ঈশ্বর হয়ে যাই। প্রশংসা পেলে আমরা ঈশ্বর হয়ে যাই। তখন আমাদের মাথার পেছন জ্বলতে থাকে ঈশ্বরীয় হ্যালো। মুখে ফুটে ওঠে স্মিত হাসি। হাতে বরাভয় মুদ্রা আসে আপনাআপনি। প্রশংসাকারীর প্রতি এক অনুচ্চারিত কৃতজ্ঞতা অনুরণিত হতে থাকে শিরায় উপশিরায়। সে অনুভূতি বড় মনোমুগ্ধকর। সে অনুভূতি বড় soothing. আসলে আমি, আপনি, আমরা সকলে প্রথম প্রেমে পড়েছি সেই ছয় মাস বয়সে। বাবা কি মায়ের নিশ্চিন্ত কোলে চেপে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। সেই তখনই হয়ে গেছে আমাদের শুভ দৃষ্টি, চার চোখের মিলন। বিবাহ মানে তো বিশেষরূপে বহন করা। আমরা প্রত্যেকে নিজের সাথেই বিয়ে করেছি সেই কোন বিস্মৃত শৈশবকালে। মাথার চুল থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আমাদের শরীরের প্রত্যেকটা অংশ আমাদের হার্ট, কিডনি, যকৃত, অগ্ন্যাশয়-এর প্রতি আমাদের একাগ্র প্রেম। আমাদের সামাজিক অবস্থান, ভাবমূর্তির প্রতি এক নিমজ্জিত মোহ। আমাদের ব্যক্তিস্বত্তার প্রতি এই অপরিসীম ভালবাসাই বোধ হয় যোগ্যতমের উদ্বর্তনের ইতিহাসে অন্য সব প্রাণীর থেকে আমাদের শ্রেষ্ঠতর করে তুলেছে। আর তাই আত্মপ্রশংসা শুনলে আমরা দেবতার মত দয়াময় হয়ে উঠি। তাকে দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে নিজের সবটুকু। শুধু তুমি আমাকে একটু বাহবা দাও, আমাকে একটু হাততালি দাও, আমি তোমার কেনা গোলাম হয়ে থাকব -এই কথাই নিরন্তর বলে চলেছি আমরা এক অনুচ্চারিত ভাষায়। মানুষের এই অন্যের চোখে শ্রেয় হওয়ার অনিবার ইচ্ছে থেকেই এসেছে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট। মানুষের এই ইচ্ছের বিধেন করতে করতেই তাদের ব্যাবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে। প্রত্যেকে সুযোগ পায় নিজের কথা বলার, নিজের সুখ সার্থকতা প্রদর্শন করার। আর এক ধরণের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সকলে বলে ওঠে “বাহ বাহ, বেশ বেশ।” সকলেই সকলের স্তাবক। এক অনন্য ইকো সিস্টেম।

কোন অদৃশ্য, অ-ভৌতিক সৃজনী শক্তি প্রাণীজগৎ, মানুষের জন্ম দিয়েছে কিনা সে প্রশ্নের উত্তর আজও মানুষ খুঁজে চলেছে কিন্তু মানুষ যে নিজের আদলে নিজের দেবতার জন্ম দিয়েছে সেটা অনস্বীকার্য। তাই পবিত্র গ্রন্থগুলোতে লেখা হয় ঈশ্বরের স্মরণ নাও। তাঁকে স্তুতি কর, তাঁর স্তব কর। তাতে তিনি তোমার সমস্ত জাগতিক ইচ্ছে পূরণ করবেন। দেবতার প্রোটোটাইপ আদতে আমারই প্রোটোটাইপ। কিন্তু সত্যিই যদি তেমন কোন কল্যাণময় স্বত্বা থাকেন তিনি কি আমারই মত স্তুতিতে তুষ্ট, প্রশস্তিতে প্রসন্ন আর নিন্দাতে ক্রুদ্ধ? তবে তিনি মুক্ত কেমনে? তবে তো তিনিও আত্মপ্রেমের মোহে বদ্ধ হলেন। ভক্তের জাগতিক ইচ্ছা পূর্ণ করি তো আমিও। আমায় একটু মাস্কা লাগালেই, আমায় জড়িয়ে ধর্ম্যা একটু আদর করলেই দুর্বল হয়ে আমার কন্যাসন্তানকে আমি দিয়ে ফেলি ললিপপ। আমি তো প্রশংসার দাস। কিন্তু যে আমায় স্বীকার করে না? আমার মতবাদ, আমার ভাবধারা স্বীকার করে না? যে আমায় সহমত নয় সমালোচনা দিয়েছে? আমার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন তারও প্রতি সদয় হতে হলে আমায় ভক্তি অভক্তির ঊর্ধে উঠতে হয়, শত্রুতা মিত্রতার ঘাট ছাড়িয়ে ওই যে দুরে নৌকাটাকে ওইখানে নোঙর করতে হয় যেখানে স্তুতি নিন্দে সব একরকম লাগে। যেখানে দুঃখ সুখের বিভেদ ঘুঁচেছে। যেখানে আত্ম পরের সীমারেখা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে, smudge করে গেছে। যেখানে যার পানেই তাকাই আমি মনে হয়। যেখানে আমার ধর্মকে ওর ধর্ম মনে হয়, ওর ধর্মকে আমার মনে হয়। যেখানে অপর ধর্মাবলম্বীকে তাড়া করে মারতে যেতে ইচ্ছে করে না। যেখানে বাড়ির মেঝেতে গুটিয়ে শুয়ে থাকা একটা কেন্নোকে অনধিকার প্রবেশের অপরাধে জুতোর তলায় পিষে দিতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় “আহা ঈশ্বরের জীব। থাক না? বেচে বর্তে থাক।” কাগজে করে যত্নে তুলে সেই পিচ্ছিল শরীর বাইরে ফেলে আসতে ইচ্ছে হয়। যদি সত্যিই এই প্রাণের বহুতা কোন অপুরুষ, অ-নারী চেতনার থেকে উৎপত্তি হয়, তবে তিনি প্রত্যাখ্যান নয়, গ্রহণ করতে ভালবাসেন। শাস্ত্রে তাই দেবতার সাথে ঈশ্বরের তফাত করা হয়েছে। দেবতারা আমাদেরই মত প্রতিহিংসাপ্রিয়, আত্মহিতলোভী। আর ঈশ্বর এ সমস্ত মানবিক বোধের অতীত। তিনি না মানুষের ইচ্ছেপুরণ করেন, না নিজের। আসলে তাঁর কোন ইচ্ছেই হয় না। তার শুধু এই বোধ আছে “আমি আছি” – “অহম সৎ”। এই একটি আত্মবোধ। আমি আছি। আর কোন বোধ নেই। নেই আর কোন আকাঙ্ক্ষা। না প্রশংসাতে উৎফুল্ল হন, না নিন্দেতে উদ্বেল। অবিচ্ছিন্ন তৈলধারার মত শুধু একটাই ইচ্ছে মাথায় জাগছে। আমি আছি। আমি আছি। নিজের অস্তিত্বের প্রমাণটুকুই তাঁর আনন্দের একমাত্র গোমুখ। থাকার আনন্দেই তিনি নিমগ্ন। অনন্ত মধুক্ষরা মৌচাকের মত এই রসসূত্র। তাই তিনি সচ্চিদানন্দ, সৎ, চিৎ, আনন্দ – সৎ অর্থে বিদ্যমান, চিৎ অর্থে সেই বোধ যে আমি বিদ্যমান অর্থাৎ “আমি আছি” আর আনন্দ অর্থে তজ্জনিত আনন্দ। অর্থাৎ “আমি আছি” শুধু এই বোধটুকু থেকেই যিনি সমস্ত আনন্দ আহরণ করেন তিনিই সচ্চিদানন্দ। আমাদের সকলের মধ্যেই অল্প বিস্তর এই তিন গুণ আছে। সৎ আসলে আমাদের পুরুষ স্বত্বা। এর মানে আক্ষরিক অর্থে “পুরুষ” ধরবেন না। সকল পুরুষের মধ্যেই একটা নারী থাকে আর সকল নারীর মধ্যেই একটা পুরুষ। পুরুষ স্বত্বা বলতে এখানে নিষ্ক্রিয় উদাসীন ভাব। নারীস্বত্তা বলতে চিৎ – আমি আছি এই বোধটা। এই বোধটাই চৈতন্য। প্রাণের সাথে জড়ের তফাত। আর এই “আমি আছি” বোধজনিত যে আনন্দ টা এই পুরুষ স্বত্তা, নারী স্বত্তার উর্ধে। সেইটে হলেই সব হয়। তখন আর পুরুষ নারীর বিরোধ থাকে না। আত্ম পর বোধ থাকে না। এইটি আমার ঈশ্বর। প্রশংসা করলে আমি দেবতা হয়ে যাই। নিন্দা করলে আমি অসুর। কিন্তু যখন এই দুয়েতেই অবিচল থাকি, সমান ভাবে গ্রহণ করি সহমত আর বিরুদ্ধমত মানুষকে তখন আমি ঈশ্বর হয়ে উঠি। যখন পরম আস্তিক আমি নাস্তিকেরও point of view টা বুঝতে পারি তখন আমি ঈশ্বরের উপস্থিতি বোধ করি নিজের মধ্যে। তখন আমি আরও আস্তিক হয়ে উঠি। কারণ যা ধারণ করে তা ধর্ম, যা গ্রহণ করে তা ঐশ্বরিক আর যা দূরে ঠেলে দেয়, যা চোখ রাঙায় তা ধর্মের নামে ব্যাবসা। এই প্রসঙ্গে বিভুতিভূষণের আরণ্যক থেকে কয়েকটা লাইন উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

আমার মনে যে দেবতার স্বপ্ন জাগিত তিনি যে শুধু প্রবীণ বিচারক, ন্যায় ও দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, বিজ্ঞ ও বহুদর্শী কিম্বা অব্যয় অক্ষয় ইত্যাদি দুরূহ দার্শনিকতার আবরণে আবৃত ব্যাপার তাহা নয় – নাড়া বইহার কি আজমাবাদের মুক্ত প্রান্তরে কতো গোধূলি বেলায় রক্তমেঘস্তুপের কতো দিগন্তহারা জনহীন জ্যোৎস্নালোকিত প্রান্তরের দিকে তাকাইয়া মনে হইতো তিনি প্রেম ও রোমান্স, কবিতা ও সৌন্দর্য, শিল্প ও ভাবুকতা – তিনি প্রাণ দিয়া ভালবাসেন, সুকুমার কলাবৃত্তি দিয়ে সৃষ্টি করেন..আবার বিরাট বৈজ্ঞানিকের শক্তি ও দৃষ্টি দিয়া গ্রহ-নক্ষত্র-নীহারিকার সৃষ্টি করেন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।