T3 সাহিত্য মার্গ || ১৫০ তম উদযাপন || সংখ্যায় শর্মিষ্ঠা সেন

হনুর কবলে বল্টুদা

গরমের ছুটি পড়তে না পড়তেই রন্টু নাছোড়বান্দার মতো আমার পেছনে পড়ে গেল। কি না, ওর সাথে ওর মামাবাড়ি লক্ষ্মীপুর যেতে হবে।

আমি আর রন্টু একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ি। থাকিও খুব কাছাকাছি। রন্টুরা সল্টলেকে বি কে সতেরো আর আমরা বি এল ওয়ান। কাজেই রন্টু রোজই সকাল বিকেল এসে ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছে।

এর আগে ওর মামাবাড়ি আমরা দুই পরিবার মিলে গিয়েছিলাম, শীতের সময়। বেশ মজা হয়েছিল, শুধু রাতগুলো সাংঘাতিক বড় মনে হতো। ওখানে সন্ধ্যা নামতে না নামতেই খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে সবাই যে যার মতো ঘরে ঘরে ঢুকে যায় বা লম্বা টানা বারান্দায় বসে গল্পগাছা করে। কেবল টিভি আছে বটে, তবে মামা, মামীদের কাউকেই টিভির সামনে বসতে দেখিনি। মামাবাড়িতে আমাদের বয়সী বলতে মামার মেয়ে টগরদি আর রন্টুদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় বল্টুদা। সেবার বল্টুদার চালিয়াতের মতো হাবভাব আমার মোটেও ভালো লাগেনি, আর তার ওপর এবার বাবা মা কেউ থাকবেনা। রন্টুকে না করেই দেব ঠিক করেছি।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। এবাড়িতে আমার কথা কেই বা কবে শুনেছে। রন্টু গিয়ে মা কে ধরতেই মা এককথায় ফরমান জারি করে দিল যে আমাকে রন্টুর সাথে যেতে হবে। কোনো চ্যাঁ ভ্যাঁ চলবে না। রন্টু চলে গেলে আমি একা হয়ে পড়ব এবং দিনরাত মায়ের পেছন পেছন ঘুরে নাকি-কান্না কাঁদব এটা মা মোটেও সহ্য করবে না!

ডাহা মিথ্যে! প্রথম কথা আমি আমি নাকি-কান্না কাঁদি না, দ্বিতীয়ত, মা বাড়িতে থাকেই তো না, সেই সাড়ে আটটায় বেরিয়ে সাড়ে ছটায় ফেরে। তাহলে মায়ের পেছন পেছন ঘোরার প্রশ্নই আসে না। আসলে মা বাবা এবার কোথায় যেতে পারবে না বলে রন্টুর সাথে কিছুদিন ঘুরে আসতে বলছে। এবার নাইন আমাদের। একা একা পড়তে যাই এদিক ওদিক তাই দুজনে মিলে একটু দূরে যেতে পারব ভেবে আর আপত্তি করে নি, এদিকে আমার আপত্তির কথা এরা কেউ কানেই তুলল না! অতঃপর রন্টুর কথামতো দিনক্ষণ ঠিক করা হলো।

লক্ষ্মীপুর বর্ধমান জেলার এক গ্রাম। চাষবাসই এখানকার লোকেদের প্রধান জীবিকা। শিয়ালদহ থেকে সকাল সাড়েছ’টার কাটোয়া লোকাল ধরলে দশটা নাগাদ গ্রামে। তারপর টোটো চেপে বুড়োবটতলা। সেখানে থেকে দু কিলোমিটার মতো পায়ে হেঁটে বাবুপাড়া।

আমরা টোটো থেকে নেমে দেখি বল্টুদা সাইকেল নিয়ে দাঁত বার করে হাসছে। ট্রেন থেকেই ফোন করে দিয়েছিল রন্টু। বল্টুদা আমার পিঠে একটা থাবড়া মেরে বলল, “কিরে, লটপট সিং, এখনও গায়ে গত্তি লাগাতে পারিসনি? এখানে থেকে যা এবার একমাস, তোকে গামা পালোয়ান না করে ফেরত পাঠাবো না।”

শুনেই আমার গা পিত্তি জ্বলে গেল। বোকার মতো খানিক হেসে হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে।

মামাবাড়িতে বেশ হইহই করেই আপ্যায়ন হলো। বড়মামা, মামীরা এসেই গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে একপ্রস্থ আদর করলেন। আমরা ঝপাঝপ প্রণাম সেরে হাত পা ছড়িয়ে বসলাম।

কি যে সুন্দর চারপাশ, বলে কতটা বোঝাতে পারব জানিনা। মামাদের বাড়িটা কুড়ি কাঠা জমির ওপর। শহরে এটা কল্পনাও করা যায় না। বাড়িটা দুভাগে ভাগ করা। বাইরের বাড়ি আর ভিতর বাড়ি। বাইরের বাড়িতে আছে মস্ত খোলা উঠোন, গোশালা, লক্ষীনারায়নের মন্দির আর অফিস কাম গোলাঘর। গোলাঘর হল ফসল মজুত রাখার ঘর। সেখানে মস্ত এক ধানের গোলা আছে। আর আছে অজস্র হাঁড়ি কলসি, যাতে গোটা বছরের ডাল, মশলা, মুড়ি, চিঁড়ে, গুড় রাখা থাকে বাড়ির জন্য। অফিস ঘরে রন্টুর বড়মামা বসেন। ফসল বিক্রি এবং হিসাব কিতাব ঐ ঘরেই হয়।অফিস ঘরের পেছনের দরজা খোলে ভিতর বাড়িতে। এছাড়া অবশ্য বাইরের বাড়ি থেকে ভিতর বাড়ি পাটকাঠির বেড়া দিয়ে আড়াল করা থাকে। বাইরে থেকে ভিতর বাড়ি আসতে গেলে মন্দিরের সামনে দিয়ে আসতে হয়।

ভিতর বাড়িতেও বেশ‌ বড় উঠোনের চারদিকে ঘর। চকচকে নিকোনো উঠোন। দু একটা শুকনো পাতা উড়ে বেড়ায় এদিক ওদিক। ভেতর বাড়ির পরের অংশে আছে পুকুর এবং আধুনিক শৌচালয়। আমি প্রথমবার আসবার আগে বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম, গ্রামগঞ্জ এলাকায় মাঠে ঘাটে না যেতে হয়! আমার আশংকা ভুল প্রমানিত করতেই যেন এত সুন্দর একটা মামাবাড়ি পেয়েছি রন্টুর দৌলতে। খচখচানি শুধু ঐ বল্টুদা।

দুপুরে জম্পেশ খাওয়া দাওয়ার পর বল্টুদা বললো, ‘চল তোদের ঠান্ডা হাওয়া খাইয়ে নিয়ে আসি।’

রন্টু বললো, ‘এই গরমে কোথায় নিয়ে যাবে, সকালে ট্রেনে অনেক হাওয়া খেতে খেতে এসেছি।’

কিন্তু বল্টুদা শুনলে তো! দুজনকে বগলদাবা করে চললো কোথায় যেন। আর সঙ্গে নিল গুলতি আর পকেট বোঝাই করে পোড়ামাটির নাড়ু।

আমি বললাম, ‘অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যেতে হচ্ছে, কাকে মারতে হবে?’ বল্টুদা বললো, ‘রামভক্ত দের তাড়াতে হবে।’

বুঝলাম হনুমানের কথা বলছে। গাঁয়ে হনুমান থাকেই। এর আগের বার সবেদা গাছের কচি ফলগুলো ছিঁড়ে, ফেলে, ছড়িয়ে একাকার করেছিল। কি উৎপাত! একে ওদের‌ জব্দ করা খুব কঠিন তার উপর গায়ে হাত দেওয়া যাবেনা। কেউ খবর দিলে বনদপ্তর এসে মোটা জরিমানা পর্যন্ত করে যায়!

আমরা কথা বলতে বলতে এলাম পুকুর পাড়ে। দেখি জামরুল গাছের নীচটা পরিস্কার করে দিব্যি পাটি পেতে বসার জায়গা হয়েছে এবং টগরদি ইতিমধ্যেই বসে বাটি থেকে কিছু খাচ্ছে। আমাদের দেখে বললো, আয়রে নন্টে ফন্টে, আম মাখা খেতে আয়।‌

ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি টগরদি আমাদের নাম দিয়েছে নন্টে ফন্টে! রন্টু এক লাফে গেয়ে সোজা বাটি কেড়ে বসে পড়ল। আমিও বসে হাত পাতলাম। বল্টুদা বসল না, ঘুরঘুর করতে লাগলো চারপাশ দিয়ে। সত্যিই প্রাণ জুড়ানো ঠান্ডা হাওয়া আসছিল পুকুরের ওপর দিয়ে। দু তিনজন বাচ্চা, সেই অবেলাতেও জলে দাপাদাপি করে সাঁতার কাটছিল।‌ ওদের দেখতে দেখতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পরেছিলাম, হঠাৎ বিকট এক চিৎকারে সম্বিত ফিরলো। দেখি বল্টুদা দৌড় লাগিয়েছে জমির দিকে। টগরদি উঠে দাঁড়িয়ে বলছে দ্যাখ হনুমানের পাল নেমেছে। দেখি সত্যি তাই। বড়, মেজ, সেজ, গুঁড়ি-গুটলি নানারকম সাইজের হনুমান বীরের মতো জমিতে নেমে। ওদের লক্ষ্য পটল ক্ষেত। এদিকে মানুষও কম যায় না। মুহূর্তের মধ্যেই দেখি আশেপাশের জমি থেকে আরো অনেক চাষী চিৎকার করতে করতে ধেয়ে যাচ্ছে। হাতে ছোট ছোট বাঁশের লাঠি। আর আমাদের বল্টুদা পটাপট গুলতি দিয়ে নিশানা করছে বাচ্চা হনুগুলোকে।‌ মিনিট দশেক চললো এই হইচই, হুপহাপ আওয়াজ, তারপর হনুমানের দল উপায় না দেখে গুটি গুটি পালিয়ে গেল।

বল্টুদা ফিরে এলে শুনলাম পুরো ঘটনা। ইদানীং হনুমানের উৎপাতে এলাকার লোক অতিষ্ঠ! আগেও হনুমান ছিল তবে দলবেঁধে এমনভাবে জমির ফসল নষ্ট করা এই প্রথম। পটল, তরমুজ, ফুটি তো আছেই এমন কি কুমড়োর জালি গুলো পর্যন্ত রেহাই পায়না! এদিকে সরকার বাহাদুর হনুমানের গায়ে হাত তুলতে বারণ করে দিয়েছেন। চাষীর ফসল নষ্ট হচ্ছে এতে সরকার মাথা ঘামাতে রাজী নন মোটেও। অগত্যা সবাই মিলে দুপুর পাহারার ব্যবস্থা। বলাই বাহুল্য বল্টুদাই দলের পান্ডা। গুলতি এবং গুলি দুটোই বল্টুদা সাপ্লাই করে। সকালে এসে যে এঁটেল মাটির নাড়ুগুলো দেখেছিলাম সেগুলো উনুনে পুড়ে ভয়ানক শক্ত গুলি হবে, হনুমান কেন, মানুষের মাথায় ঠিকঠাক তাক করে মারলেও তৎক্ষণাৎ আলু গজিয়ে উঠবে। যাইহোক রোদ পড়ে এলে আমরাও ভেতর বাড়িতে চলে এলাম।

সন্ধ্যায় টগরদি আর বল্টুদার টিউশনি থাকে। বাড়িতেই মাষ্টারমশাই আসেন। রন্টু আর আমি ঘুরঘুর করছি এমন সময় বড়মামা ডাকলেন। বললেন, “হ্যাঁরে দেখলি তো আজ হনুমানের তান্ডব! গত মাসদুয়েক ধরে এমনই চলছে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মামা, এরা হঠাৎ করে এমন উপদ্রব শুরু করেছে কেন?

“আসলে, লক্ষ্মীপুরের কাছেই একটা ফরেস্ট ছিল, লক্ষ্মীপুর আর পাশের গ্রাম বল্লভপুরের সীমানা হিসেবে। বড় গাছ তেমন নয়, ওই বাবলা, অশোক, কদম, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছ লাগানো হয়েছিল গ্রামে‌ বসতি শুরুর অনেক আগে, তখন দু গ্রাম মিশিয়ে পনের কুড়ি ঘর মাত্র লোক ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সে আজ থেকে প্রায় সত্তর আশি বছর আগেকার কথা। গতবছর ফরেস্ট এর মাঝ বরাবর পাকা রাস্তা তৈরীর করার জন্য প্রচুর গাছ কাটা হয়েছিল। রাস্তা তৈরীর পাশাপাশি লোভী ঠিকেদার ফরেস্ট এর ভেতরকার গাছপালাও কেটে পাচার করেছে রাতারাতি। টের পাওয়ার পর দু গ্রামের লোকেরা মিলে অবরোধ, প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু তার ফলে যেটা হলো, ফরেস্ট এর ভেতর আধা খেঁচড়া হয়ে পড়ে আছে মোরাম ফেলা রাস্তা এবং ফরেস্ট এ এতকাল শান্তিতে থাকা হনুমানের দল খাবার দাবাড় না পেয়ে মাঝে মাঝেই গ্রামে ঢুকে পড়ছে।”

রন্টু জিজ্ঞেস করল, “মামা, তারপর আর গাছ লাগানো হয়নি?”

“হ্যাঁ, বেশকিছু গামারি আর সেগুন লাগানো হয়েছে। আর হনুমানের খাবার জন্য কলা গাছ।” বড়মামা বললেন।

বড়মামার কথা শুনে আমার হনুমানদের জন্য একটু খারাপ লাগতে লাগল। সত্যিই তো আমরা শুধু উৎপাত টাই বড় করে দেখছি, কারণ এবং সমাধান খোঁজার কথা ভাবিনি।

তারপর তিন চার দিন বেশ নিরুপদ্রবেই কাটলো। এদিকে আমাদের গোটা গ্রাম চষে ফেলা হয়ে গেছে। মোবাইলে ছবি তোলা হয়েছে বিস্তর। মামীদের আদরের আতিশয্যে এই ক’দিনেই যেন পাঁচ কেজি ওজন বাড়িয়ে ফেলেছি মনে হচ্ছে! এবার ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার পালা। মা ফোন করেছিল। আমি আর রন্টু চলে যাব ঠিক করেছি। কাল সক্কাল বেলা পুকুরে জাল ফেলা হবে। টাটকা মাছের ঝোল-ভাত খেয়ে এবং মাছ ভাজা নিয়ে দুপুরের ট্রেন এ বাড়ি।

*******

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। বল্টুদা স্টেশন পর্যন্ত এসেছিল। আসার সময় নিয়ে এসেছিলাম দুটো ব্যাকপ্যাক। এখন আরো দুটো বিগশপার নিয়ে ফেরত যাচ্ছি। এই হলো মামাবাড়ির মজা। মামীমা রা বাড়ির শাক-সবজি, ফল এবং মাছ দিয়েছেন প্রচুর। সব এসেছে বল্টুদার সাইকেল চেপে, এবং মজার কথা হলো বল্টুদা স্পিকটি নট ছিল। কারণ গতকাল আবার হনুমান ঢুকেছিল গ্রামে এবং বল্টুদার সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎকার হয়েছে। সে ঘটনা মনে পড়ছে আর পেটের মধ্যে থেকে গুড়গুড়িয়ে হাসি উঠে আসছে।

গতকাল ভোরে কানাই দা এসেছিল জাল ফেলতে। এও এক নতুন অভিজ্ঞতা। আগে দেখিনি। বেশীর ভাগই পাঁচ সাতশো ওজনের রুইএর পোনা, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া। আমার কাছে অবশ্য সব মাছই একরকম দেখতে লাগছিল। মাছ ওঠার পর বল্টুদা বললো, ‘চল, মাঠ থেকে এক চক্কর দিয়ে আসি। তোদের জন্য একটু শশা, কুমড়োও নিয়ে আসি।’

রন্টু কাস্তে আর আমি নিলাম বড় চটের ব্যাগ। বল্টুদা বীরদর্পে আগে আগে চলল।

রন্টুই প্রথমে নজর করেছিল। আমার কনুই ধরে টেনে বললো, ‘অশোক, মাঠে কারা যেন নড়াচড়া করছে…হনুমান নাকি রে?’

আর একটু সামনে যেতেই দেখি সত্যিই ফুটি ক্ষেতে ছ সাতটা বড় বড় হনুমতী তাদের ছানাপোনা নিয়ে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। বল্টুদা বিকট আওয়াজে রে রে করতে করতে তেড়ে গেল ওদের দিকে। ব্যাস্, মুহূর্তের মধ্যেই মাঠ ফাঁকা। বল্টুদার মুখে হাজার ওয়াটের হাসি। রন্টু বললো, ‘দাদা, তোমার নাম তো হনুমার পালোয়ান হওয়া উচিত, যে ভাবে শুধু হুঙ্কার দিয়ে হনুমান তাড়াচ্ছ!’

শুনে বল্টুদা উত্তর দিলো, ‘আরে শোন, এর পরের বার এসে দেখবি তোদের বল্টুদা কে আশে পাশের গ্রাম থেকেও হায়ার করে নিয়ে গেছে।’

বলতে বলতে আমি আর রন্টু কুমড়ো ক্ষেত এ ঢুকলাম আর বল্টুদা গেল শশা তুলতে। গ্রামে কুমড়োর ক্ষেত যারা না দেখেছে তারা বুঝতে পারবে না এর বিশেষত্ব। এ সময়টায় পাতা কমে আসে আর ক্ষেত জুড়ে শুধুই বড় বড় পাকা কুমড়ো অলস হয়ে বসে থাকে যেন। রন্টু কাটছিল আর আমি ব্যাগ এ ভরছিলাম। অনেকক্ষণ ধরেই একটা কুঁ কুঁ আওয়াজ আসছিল, তেমন গা করিনি। আমাদের কাজ হতেই বল্টুদা কে হাঁক দেব বলে তাকিয়ে দেখি বল্টুদা ক্ষেতের মাঝে পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে, সামনে দু দুটো গোদা হনুমান! একটু দূরে আরো গুটিকয় দাঁড়িয়ে, বসে চোখ পিটপিট করে দেখছে। রন্টু টুঁ শব্দ না করে পকেট থেকে মোবাইল বার করে ভিডিও করতে লাগলো! এদিকে আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করবো! দেখতে দেখতে একটা গোদা বল্টুদাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ওর চুল নাড়াঘাটা করতে লাগলো, যেন উকুন বাছছে! আর একজন সমানে সামনে বসে দাঁত ভেঙচি দিতে লাগল! কতক্ষণ এ অবস্থা চলছিল জানিনা। একসময় হনুমানের দল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে হুপ হাপ করে বল্টুদাকে ভূমে শয্যাশায়ী করে চলে গেল।

পরের ঘটনা খুবই সামান্য। আমরা দৌড়ে গিয়ে যখন বল্টুদাকে ধরে তুললাম তখন দেখলাম বল্টুদার মুখচোখ বেগুনী হয়ে গেছে, রাগে অপমানে! আঁচড় টাচড় কিছু দেয়নি এটাই রক্ষে। বল্টুদা উঠে গম্ভীর স্বরে বললো, ‘এসব কাউকে বলার দরকার নেই, গ্রামে গঞ্জে এমন হয়েই থাকে‌।’

আমরা তো যা বোঝার বুঝেছি। বাড়ি ফিরে আসতেই সবার আগে টগরদি এসে বল্টুদার আগাপাশতলা জরিপ করে হো হো হাসিতে ফেটে পড়লো, বললো, ‘শেষপর্যন্ত হনুমানের হাতে হেনস্তা!’

রন্টু যে ভিডিও করে ইতিমধ্যেই শেয়ার করে দিয়েছে সে তো আর বল্টুদা জানেনা! সে ভ্যাবলার মতো চেয়েই থাকলো শুধু। এদিকে আমাদের আওয়াজ পেয়ে মামা, মামীরা এবং কানাইদাও ব্যাপার শুনতে চলে এসেছে। আর আমি আর রন্টু তখন কার আগে কে বলব এমন অবস্থা। ভিডিওটা সবাই মিলে আবার দেখা হলো, দ্যাখা গেল মাত্র চার মিনিট পঁচিশ সেকেন্ডের ভিডিও, আর আমরা ভাবছিলাম না জানি কতক্ষণ হনুমানের কবলে ছিল বল্টুদা। তবে ঐ চার মিনিট পঁচিশ সেকেন্ডই বল্টুদার ইমেজের ফানুস ফুটো করে একেবারে ল্যাজে গোবরে করে ফেলেছ।

বিস্তর হাসাহাসি হজম করার পর বল্টুদা বললো, ‘হাসছো এখন! আমি আগেই বলেছিলাম অবলা জীবগুলোর ওপর এত অত্যাচার কোরো না, ওদেরও তো বাঁচার অধিকার আছে, নাকি? আমি ছিলাম বলে ঝাঁপটা টা সয়ে গেলাম।’

আমরা ভীষণ অবাক হয়ে ও ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এ অবস্হাতেও দিব্যি চালিয়াতের মতো কথা বলে চলে গেল।

এই হলো ঘটনা। তবে বড় বড় কথা বললেও বল্টুদা যে চুপসে গেছে সেটা ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আজ স্টেশনে আসবার পথে একবারও আমার সাথে ঠাট্টা ইয়ার্কি করেনি। শুধু ট্রেন ছাড়ার সময় বললো, ‘আবার আসিস ভাইটি, এর পরের বার বল্লাল সেন এর ঢিপি দেখাতে নিয়ে যাবো, এলাকার ইতিহাস ঘুরে ফিরে না দেখলে হয়?’

ততক্ষণে আমাদের ট্রেন স্পীড তুলেছে সবুজ ছাড়িয়ে আধুনিকতার দিকে।।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।