ক্যাফে ধারাবাহিক গল্পে সুব্রত সরকার (পর্ব – ১)

অন্তরার শেষ কথাগুলো

“আপনাকে এবার মন শক্ত করতেই হবে।” ডাক্তার চ্যাটার্জি আমার পিঠে হাত ছোঁয়ালেন, “মেয়েটার খেয়াল রাখবেন। আপনিও সাবধানে থাকবেন।”
আমার চোখ ভিজে গেছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে আছি। বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম ডাক্তার চ্যাটার্জির দিকে। তাঁর পাশে দু’জন ফেলো ডাক্তার সুমেলি রায় ও গৌরব সিনহা। তাঁরা দু’জন ম্রিয়মান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গত তেরো মাস ধরে এঁরাই আমার আত্মীয়-বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। লড়াই থেমে যাওয়ার মুখে পরাজয়ের কষ্ট আমাদের চারজনকে কেমন কুণ্ডলী পাকিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
“আপনি অনেক চেষ্টা করেছেন। আমরাও চেষ্টা করলাম। বাট সরি, পারা গেল না। এই রোগটাই এমন…,” ডাক্তার চ্যাটার্জির কথাগুলোর মধ্যে কেমন বিষাদের গুঁড়ো।
“আর তাহলে কিছুই করা যাবে না!” বোবা কান্নার সাথে হাহাকার মিশে বেরিয়ে এল আমার কথাগুলো।
ডাক্তার চ্যাটার্জি নীরব। অদ্ভুত শান্ত নীরবতা আমাদের চারজনের মাঝখানে। হসপিটালের লম্বা করিডরটায় এখন কেউ নেই। আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক বিষণ্ণ আলোর নিচে। কেবিনে অন্তরা নিদারুণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। নার্স একটু পরেই মরফিন দিয়ে ওকে এই অসহ্য যন্ত্রণার থেকে সাময়িক মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
ফেলো ডাক্তার সুমেলি রায় বললেন, “এবারের স্ক্যান রিপোর্টটা একদম ভালো নয়। মেটাস্ট্যাটিক হওয়ায় ইমিউনো কিমোথেরাপিতেও কোনও কাজ হল না। স্প্রেড করে যাচ্ছে আরও।”
“তাহলে কি হবে?” ভেজা চোখে বিড় বিড় করে বললাম।
ডাক্তার চ্যাটার্জি খুব নিচু স্বরে বললেন, “একদম টার্মিনাল স্টেজ। আর কোনও চিকিৎসা নেই। বাড়ি নিয়ে যান। এবার বাড়িতেই রাখুন। যে ক’দিন থাকবেন, আপনাদের মধ্যেই রাখুন।”
“ডাক্তারবাবু, বাড়িতে মেয়েটা তো একা। আর ঠিক দু’দিন পর ওর এম ফিলের পরীক্ষা।”
“তাহলে আমরা প্যালিএটিভ কেয়ার ইউনিটে শিফট করে দিচ্ছি। মেয়ের পরীক্ষা শেষ হলে নিয়ে যাবেন।”
“তাই দিন ডাক্তারবাবু।”
“ওকে। আমরা যাই। সাবধানে থাকবেন।”
ডাক্তার চ্যাটার্জি তাঁর ফেলো দু’জন ডাক্তারকে নিয়ে লম্বা নিঝুম করিডরটা ধরে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছেন। আমি ঝাপসা চোখে চেয়ে আছি, খুব কান্না পাচ্ছে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। চিৎকার করে যদি একটু কাঁদতে পারতাম!…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।