|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় সমীরণ সরকার

স্বপ্নের খোঁজে

একাঙ্ক নাটক

চরিত্র:-
ভবানী মন্ডল:- বয়স ত্রিশ বছর। দৈর্ঘ্য মাঝারি। উজ্জল শ্যামবর্ণ। স্বাস্থ্য ভাল। মুখের আদল সুন্দর। পরনে সাধারণ ছাপা শাড়ি ও জামা। দুই হাতে শাঁখা ও ফ্যাকাসে লাল পলা। কানে কমদামি নকল সোনার দুল। গলায় রূপার
চেইন।

শংকর সূত্রধর:- বয়স চল্লিশ বছর। লম্বা, ঢ্যাঙা। পুরু কালো গোঁফ। কোঁকড়া কোঁকড়া এক মাথা কালো চুল।পরনে খাকি রঙের ফুল প্যান্ট, সাদার উপর বিবর্ণ নীল রঙা
চেকের ফুল হাতা জামা। জামার একটা হাতা গোটানো,থদদ অন্যটা খোলা।

সুদর্শন ওঝা:- বয়স বাহান্ন বছর। মাঝারি দৈর্ঘ্য। স্বাস্থ্য ভালো। পরনে টকটকে লাল রংয়ের আলখাল্লা টাইপের জামা ও ঈষৎ হলদেটে ধুতি। গাত্রবর্ণ ঘোর কালো। ইয়া মোটা পাকানো কাঁচাপাকা গোঁফ। টাক মাথা ,ঝাঁকড়া কাঁচাপাকা চুল। ঘাড়ের উপরে।গলায় নানা রঙের পাথর দিয়ে তৈরি বিচিত্র মালা। ডান হাতে মোটা তামার বালা। দুই হাতের আঙ্গুলে অনেকগুলো পাথর বসানো আংটি। চোখ রক্তিম বর্ণ। ডান গালে ইঞ্চি দেড়েক লম্বা পুরনো কাটা দাগের চিহ্ন।

                   প্রথম দৃশ্য
              -----------------------------

( পর্দা উঠতে দেখা যায় এক বিশাল ড্যাম। যার দুপাশে জঙ্গলে ঢাকা উঁচু পাহাড়। জলাশয়ের এক মাথায় স্বল্প প্রশস্ত লম্বা ব্রিজ।
ব্রিজের গায় প্রযুক্তিগত কৌশলে ঝোলানো লোহার কপাট। যার সাহায্যে আটকানো আছে জল ,আবার প্রয়োজনে বের করে দেওয়া যায় অতিরিক্ত জল। একটা চওড়া পিচের রাস্তা ড্যামের একপাশ দিয়ে চলে গেছে দূরের শহরের দিকে। রাস্তার গায়ে নাতি উচ্চ পাহাড় শ্রেণী। ব্রিজের এক প্রান্ত পাকা পিচ রাস্তার দিকে, অপরপ্রান্ত পাহাড়ের দিকে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা লালমাটির পথের দিকে।
ড্যামের জলের দিকে মুখ করে ব্রীজের উপরে বসে আছে ভবানী। ওর পাশে নামানো একটা ছোট্ট পুঁটুলি। ভবানী গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। শংকর ধীর পায়ে এসে দাঁড়ায় ওর থেকে একটু দূরে)
শংকর।। কি ব্যাপার, কোতায় যাওয়া হবে গো? হিথা একলা বসে ক্যানে?
( ভবানী ঘাড় ঘুরিয়ে শংকর কে দেখে। একটু ভীত হয়। শঙ্করের কথার কোন জবাব দেয় না)
শংকর।। এই যে, ও মেয়ে, তোমারে শুদোচ্চি
গো!
ভবানী।। বুজেচি বুজেচি, এত চিল্লাবার কি ‌ আচে?
শংকর।। বুঝেচো যদি তো জবাব দিছো না ক্যানে?
ভবানী।। তোমারে চিনি না, জানিনা –তোমার কতার জবাব দেবো ক্যানে?
শংকর।। অ,এই কতা! তা এই নির্জন জায়গা,
সন্ধ্যে হয়ে আসচে, আকাশে মেঘও করেচে বিস্তর; তুমি একলা মেয়ে মানুষ বসে আচো বলেই না শুদানো।
মানুষই তো মানুষের খোঁজ খবর নেয়,–নাকি? ইয়াতে দোষের কি আচে?তা
তুমিই বল ক্যানে!
আচ্চা,তুমি কোতা যাবা বল দেকি?
ভবানী।। কোত্তাও না!
শংকর।।মানে?
ভবানী।।কিসের মানে? তুমি কি জানতে চাও কও দেকি?
শংকর।। না, মানে কতাটা হলো এই যে, তুমি
কোতাও যাবা না বলচো অথচ ই‌খানে
একলা চুপ করে বসে আচো– ইটোর মানে কি?
ভবানী।।মানে ফানে কুচু নাইকো!
শংকর।। ঠিক আচে, তুমি যখন কুচু বলবাই না,ফাঁড়িতেই খপর দিই একটো!
ভবানী।। ফাঁড়ি!
শংকর।। হঁ, পুলিশ ফাঁড়ি।উই যেথা বাসের
ইস্টপেজ, ঠিক তার পেছুতে। — দ্যাকোনি নাকি?
ভবানী।। তা তুমি পুলিশ ফাঁড়িতে যাবা ‌ ক্যানে!আমি চুর না ডাক্ষঠড
শংকর।। উঃ!দাঁইড়ে দাঁইড়ে মাজাটো ধরে গ্যাইচে,খানিক বসি।

( ভবানীর থেকে একটু দুরত্ব রেখে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পরলো শংকর। শংকর পকেট থেকে দেশলাই আর বিড়ির প্যাকেট বের করে।
একটা বিড়ি হাতে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে ঠোঁটে লাগায়। ফস করে দেশলাই ধরায়। ভবানী শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে। শংকর বেশ আয়েশ করে বিড়িতে টান মারে।)

শংকর।। হ্যাঁ, ইবারে বলতো কি মতনবে ইখানে বসে আচো?
ভবানী।। মতলব! মতলবটো আবার কি
দেইকলে শুনি!
শংকর।। ও বাবা, আবার চোপাও করচো! বেশ,তুমি যকন সত্যি কথাটো বলবানা বলে ঠিক করে লিয়েচো , ত্যাকোন ফাঁড়িতেই যাই!
ভবানী।। তা হ্যাঁগো ও মানুষটো, আমি তোমার কি ক্ষেতি করেছি গো? আমার সাতেএমন ব্যাভার ক্যানে করচো?
শংকর।। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!

( শঙ্করের হাসির রেশ শেষ হতে না হতেই আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ, একটু পরেই ভীষণ জোরে বজ্রপাতের শব্দে কেঁপে উঠল চারিদিক। দমকা ঝড়ো হাওয়া এল)
শংকর।। এখন ওঠো দেখি, বৃষ্টি এলো বলে।
ভবানী।।কোতায় যাবো?
শংকর।।দেকি,কোতায় আশ্রয় মেলে। ‌ চল,জলদি
ওঠো। ভয় করোনা, এসো আমার
সাথে।
ভবানী।।কোতায় যাবে? এখানে কি তোমার ‍ চেনা কেউ আচে নাকি?
শংকর।। ও মেয়ে, বিশ্বাস করো, তোমার কোন
ক্ষেতি করব না! জোর বৃষ্টি আসচে,
একানে একলা মেয়েমানুষ বসে আচো।কত রকম বিপদ আসতি পারে।সেসব
ভেবেই আমার সাতে যেতে বলচি।
আমার মায়ের দিব্যি করচি, আমারে বিশ্বাস করতে পারো তুমি।
( ভবানী শংকরের মুখের দিকে তাকায়। আপাদমস্তক দেখে। কি যেন ভাবে সে।)

শংকর।।কি গো, বাক্যি হরে গেল যি গো তুমার।
অমন করে আমার মুখের পানে ভালচো ক্যানে?কি দেকচো বলো দেকি? চলো চলো, ,তাড়াতাড়ি চল।
ভবানী।।লাও চলো,কোতা যাবে চলো।
শংকর।। চলো চলো, আর দেরি করো না।
( শংকর দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করে। ওর পিছনে পিছনে ভবানী পুঁটুলি হাতে হাঁটে)

ভবানী।। অমন ঘোড়ার পারা ছুটছো ক্যানে গো?
হুঁচোট খেয়ে পড়ে গ্যালে কি হবে?
শংকর।।( দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে) অনেকটা যেতে হবে গো। ছুটে না গেলে
বৃষ্টি এসে যাবে,ভিজে যাবো।
ভবানী।। কোতায় যাবা বল দেকি?
শংকর।।উই বাস ইস্টপেজের কাচে।
ভবানী।। বুজলাম। তা উখানে কোতায় যাবা?
শংকর।। উখানে একটো প্রিতিক্ষালয় আচে,
সিখানে যাবো।

( বিদ্যুৎ চমকে উঠে। বজ্রপাতের শব্দ। ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যায়।)

                  (দ্বিতীয় দৃশ্য)

( পর্দা উঠতেই দেখা গেল একটা টিনের শেড। বাস যাত্রীদের জন্য নির্মিত প্রতীক্ষালয়। তিনদিক ইঁটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ভিতরের দেওয়াল সংলগ্ন একটা বসার জায়গা। বেঞ্চের আদলে গড়া। তলটা ফাঁকা। একটা কুকুর বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। পরিতক্ত খবরের কাগজের ঠোঙা, তোবড়ানো পরিতক্ত জলের বোতল, সিগারেটের খালি প্যাকেট, পরিতক্ত চায়ের কাপ, খালি পলিথিন প্যাকেট ইত্যাদি ইতস্ততঃ ছড়ানো বেঞ্চের নিচে। শংকর বেঞ্চের উপর পা তুলে বসে আছে। ভবানী পুটুলি হাতে শেডের মুখে দাঁড়িয়ে চারিধার লক্ষ্য করছে।)

শংকর।। কি ব্যাপার গো, হোথা দাঁড়িয়ে ক্যানে?
ভবানী।। আমি ভালো আছি ইখানে।
শংকর।। এখুনো ভয় কাটেনি বুজি? ওগো,আমি বাঘ ভালুখ লই যি তুমারে খাবো! হাঃ হাঃ হাঃ!
ভবানী।। এতো হাসচো ক্যানে গো?
শংকর।। ও কিছু লয়,ছাড়ান দাও!
কিন্তু হোথা দাঁইড়ে থাইকল্যে
বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাবা যি গো। ঠান্ডা লেগে যাবে তো!
ভবানী।। আমার অত ঠান্ডা লাগার ধাত নাই।

( ভবনী শঙ্করের থেকে একটু দুরত্ব রেখে বেঞ্চে বসে)
শংকর।।একটা কতা শুদোবো?
ভবানী।।কি?
শংকর।। কুছু মনে কইরবা না তো?
ভবানী।। না।
শংকর।। এখানে মইরতে এসেছিলে ক্যানে? কি
হয়েছে তুমার?বলি,তুমার জ্বালাটো কি?
ভবানী।।না, মানে ঠিক তা লয়,তবে—
শংকর।। তবে কি?হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!—
ভবানী।। হাসচো ক্যানে?
শংকর।। তোমার মুখ দেইক্যে।
ভবানী।।মানে?
শংকর।।আরে তুমার মুখ দেখেই তো সব
বুজলাম!
ভবানী।। কি বুজলে?
শংকর।। অ্যানেক দূর থিকে তুমারে লজর
করছিলাম যি গো।দেইখলম তুমি
একটা পুটুলি হাতে বাস থিকে নেমে ব্রীজের উ মাথা থিকে হেঁটে
এসে পুটুলি মাটিতে রেখে তার উপর
চেপে বইসে ড্যামের জলের দিকে
ভালছিলে। প্রথমে ভেবেছিলাম পাহাড়ের উধারে কোন গাঁয়ে যাবা বুজি। কিন্তু তার বাদে তুমার হাব ভাব দিখে সন্দেহ হল।
তার বাদে তুমার কাছে গেলম,তুমার সাতে কতা কইলাম আর—–
-ভবানী।।আর?
শংকর।। শুইনবে সে কথা?
ভবানী।।হ্যাঁ।
শংকর ।।হাইসবে না তো?
ভবানী।।না,হাইসবো ক্যানে?বল,কি বইলবে?
শংকর ।।না,মানে তোমার চোখ দুটো দেইখ্যে মনে হল—–!
ভবানী।। কি ,কি মনে হলো?
শংকর।। মনে হল অনেক ব্যথা, অনেক দুঃখ
মেঘের পারা জমে আছে তুমার চোখে।
ভবানী।। ধুত! কি যে বলো তুমি তার ঠিক নাই।
শংকর।। সত্যি বলচি গো। আর শ্যাষে — হাঃ হাঃ হাঃ!
ভবানী।। আবার হাসচো‌ কেনে?শ্যাষে কি?
শংকর।। শ্যাষে—-হাঃ হাঃ হাঃ—হোঃ হোঃ হোঃ!
ভবানী।।কতা কইতে কইতে এত হাসচো কেনে,?
যা বলার সিধে বলে দাও ক্যানে।
শংকর।। বলচি বলচি! আসলে তুমারে ত্যাকোন পুলিশের কথা বলতেই তুমি ভয় পেয়ে মুখটো কেমন পারা কইরেছিলে সিটো
ভেবেই হাসি লাগচে।
ভবানী।।তা পুলিশের কথা শুনলে সবাই ভয় পায়, আমিও পেয়েচি।
শংকর।। ঠিক কথা। আর তোমার ওই ভয়
পাওয়া দেকেই বোজলাম যে কেসটো গড়বড় আচে।
ভবানী।।মানে?
শংকর।। কথায় বলে না ‘রতনে রতন চেনে’। তাই আমিও চিনে নিলাম তুমারে।
ভবানী।। মানে? কি বলছো কুছুই তো বুঝতে
লারছি।
শংকর।। এই সোজা কথাটা বুঝলে না? আরে
আমিও উই একই কাজের লেগে হিথাএসেছিলম গো!
ভবানী।।মানে?
শংকর।। আরে কী মানে মানে করছো বলো
দেকি? বলি, ঘটে কিছু নাই নাকি?
এই সোজা কথাটা বুজলে না!
ভবানী।। না ,বুজিনি। তোমার মত বুদ্ধি আমার নাই।
শংকর।।আহা,রাগ করো ক্যানে? শোনো ‌‌ ‌ তাইলে…..সত্যি কথাটো।—আমিও ইখানে তুমার
মতই ড্যামের জলে ডুবে মইরতে
এসেছিলম গো—- কিন্তু—-!
ভবানী।। কিন্তু—- কিন্তু কি?
শংকর।।ইখানে এসে অনেক ভাবনাচিন্তার পরে ঠিক কইরলম — না,দোব না। আমার জেবনটা কি কতই সস্তা নাকি যে,তুই
মেয়ে মানুষ হয়ে লাজ লজ্জা ভুলে ভেন্ন ধম্মের পর পুরুষের হাত ধরে ঘর ছাড়লি বলে আমার জেবনটো শ্যাষ
কইরে দোবো!—- না, দোবো না।ক্যানে
দোবো? ছুতোরের ব্যাটা আমি,ভালো কাজ জানি। কত নামিদামি লোক আমার কাজের সুখ্যাত করেচে।তাইলে? সিসব ভুল্যে যাব আমি?না,কখনোই না। দরকার পড়লে গাঁ ছেড়ে শহরে যাবো।সিখানে কাজ খুঁজে লোবো। আবার লোতুন জেবন শুরু কইরবো!
( ভবানী অবাক হয়ে শঙ্করের কথা শুনছিল। সে দিকে চোখ পড়তেই শংকর বলল)

শংকর।।বাঃ বাঃ! বেশ চালাক মেয়ে তো তুমি।
ভবানী।। আমি আবার কি চালাক করলাম?
শংকর।। নিজের কথা এখুনো কিছু কইলে না
আর ফোকটে আমার কথা জেনে লিছো!
ভবানী।। বইলবো গো সব বইলব;এগুতে তুমার কতাগুলান শুনি ,তার বাদে।
( ভবানী শাড়ির আঁচল দিয়ে বেশ ভালো করে ঢেকে নেয় শরীর)
শংকর।। কিগো, শীত করছে নাকি? তা,কইরতে
পারে। একে মন ভালো লয়, সকাল থেকে মনে লাগে, দানাপানি পড়েনি পেটে। কি ঠিক বলছি তো?
( ভবানী শঙ্করের মুখের দিকে তাকায়, কোনো উত্তর দেয় না।)
শংকর।। জবাব না দিলে তো কি? আমি তোমার
মুখ দেখেই বুঝেছি যে তোমার খিদে
লেগেচে। ই অবেলায় ইখানে খাবার পাওয়া মুশকিল। চা টা পাওয়া যেতে পারে।
ভবানী।।ই পাহাড়-জঙ্গলে তুমি চা পাবা কোতা?
শংকর।।উইই ফাঁড়ির পাশে একটো ছোট পারা
চায়ের গুমঠি আছে।দেখিগা এই বৃষ্টি বাদলার দিনে দোকান খুললো কিনা?
এইযে শোনো, একটো কথা বলি,মন
দিয়ে শোনো।
ভবানী।। অত চিল্লাবার কি আছে? আমি আমি তো তোমার পাশেই আছি।
শংকর।।পাশে—-আমার পাশে—হাঃ হাঃ হাঃ!
ভবানী।। এতে আবার হাসির কি হোলো?
শংকর।। হাসছি কি আর সাধে! ওই যে তুমি
বললে না পাশেই আচো,তাই ।তুমি তো বেঞ্চির উ মাথায় আর আমি তো এই
মাথায়।—-সেই একটো গান‌ আচে না–” ওপারে তুমি রাধা,এপারে আমি”—–হাঃ হাঃ হাঃ!
ভবানী।।আবার হাসচো?
শংকর।। বেশ বেশ, রাগ ক ইরো না গো,এই বন্ধ করলম হাসি। হ্যাঁ,যেটো বলচি একন, মন দিয়ে শোনো। আমি চা আনতে যেচি।যাব আর আসব।তুমি কোতাও
যেওনা কিন্তু। দিনকাল ভাল লয়,কি
থেকে‌ কি হয় ঠিক নাই। কেউ কুছু এসে শুদোলে মিচে কোরে বোইলো যি সাতে
ঘরের লোক আচে,মানে সোয়ামী আর কি।
ভবানী।।কি বইললে?
শংকর।। আরে বাবা মিচে করে বইলতে বলচি!তা না হলে সন্দেহ করতে পারে, থানায়
খপর দিতি পারে।ত্যাকন আবার মেলাই ঝামেলা।বুজেচো?
ভবানী।।বুজলম।

( শঙ্করের প্রস্থান)
ভবানী(স্বগত)।।লোকটোর কথাবাত্তা শুনে তো ভালই লাগচে। বদমাশ লোক হলে ওর চোখ দেখে ঠিক বুজতে পারতম, মেয়েরা উটো ঠিক বোঝে।
তাছাড়া লোকটার ব্যাভার ভালো।মনে মায়া দয়া আছে মনে হছে। কিন্তু লোকটা
যে কোন মেয়েমানুষের ঘর ছাড়ার কথা বলছিল, সে লোকটার কে?ওর বৌ? সে
ঘর ছাড়লো ক্যানে?
কিন্তু এসব কেনে ভাবছি আমি? উই লোকটো তো আমার সব কথা জানেনা।
সব কথা জাইনলে উ হয়তো ঘেন্না করবে আমাকে।—– কিন্তু এসব কেনে ভাবছি
আমি?উ কে বটে আমার?
( দুই হাতে দুটো মাটির ভাঁড়ে গরম চা নিয়ে শঙ্করের প্রবেশ)
শংকর।।লাও লাও, তাড়াতাড়ি ধরো।শ্লা!যা
গরম।আমার হাতটো পুড়েই গেলো
বোধহয়!
ভবানী( এক ভাঁড় চা হাতে নিয়ে)।।ভাঁড়টা
খানিক বড় নিলেই পারতে গো।
শংকর।।বড় ভাঁড় ছিল না যি গো।

,( শংকর বেঞ্চির উপর আরেক ভাঁড় চা নামিয়ে
রাখে। প্যান্টের পকেট থেকে একটা ঠোঙা বের করে ভবানীর দিকে এগিয়ে ধরে)
শংকর।।লাও ধরো।
ভবানী।।ওটো কি বটে?
শংকর।। গরম বেগুনি ভাজছিল,নিয়ে এলাম।
ভবানী।। বেগুনি?
শংকর।। হ্যা,খিদে তো ভালই লেগেছে মনে
হচ্ছে।ঠোঙার নীচে চাট্টি মুড়িও আছে।

(ভবানী ঠোঙা থেকে বেগুনি বের করে কামড় দেয়।)
ভবানী।। আমি গরম বেগুনি ভালোবাসি ‌ তুমি বুজলে কি কইরে?
শংকর।। ভাবলাম তোমার খিদে নেগেছে তাই নিয়ে এলাম।
( ভবানী কোন উত্তর দেয় না। চুপচাপ খেয়ে যায়। শংকর চা খাওয়া শেষ করে ভাঁড়টা ছুঁড়ে ফেলে দেয়)
শংকর।।লাও,ইবারে তুমার কাহিনীটো শোনাও
দিকিন।
ভবানী।।আগে তুমারটো শেষ হোক।
শংকর।।বাঃ বাঃ! বেশ চালাক তো তুমি।এগুতে আমার কাহিনীটো শুনে লেবে,শ্যাষে
আমার বেলায় ঢুঁ ঢুঁ!
ভবানী।।নাগো না, তুমার কথাটো শুনে লিয়েই
বইলবো। তবে আমার কথা শুনতে ভালো লাগবেনা। সে টো শুদু দুখের কাহিনী।
শংকর।।আমারটোও সুখের লয়।
ভবানী।। যে মেয়ে মানুষের কথা বলছিলে, সে কি তোমার বউ?কি করেছিলো সে?
শংকর।। এক বিধম্মী ছোকরার হাত ধরে ঘর
ছেড়ে চলে গ্যাছে।
ভবানী।।ক্যানে?কি করেছিলে তুমি? ঝগড়া না
মারপিট?
শংকর।। বিশ্বাস করো, কিচ্চু করিনি আমি।
ভবানী।।তবে ঘর ছাড়লো ক্যানে?
শংকর।।সে খুব নজ্জার কতা গো।
ভবানী।।মানে?
শংকর।। আমি ছুতোরের ছেলে।আমাদের গাঁটো খুব বড়।ওই গাঁয়ে আমার একটো কারখানা ছিল।কাঠের কারখানা।ওই
কারখানায় কাজ করত ওই ছোকরা। দূরের গ্রাম থেকে আসতো খুব সকালে।
দুপুরবেলায় আমার বাড়িতে ভাত খেতে যেত।
ভবানী।।তোমার সাথে?
শংকর।। হ্যাঁ —-মানে, না। প্রথম প্রথম দু চারদিন আমার যেতো।পরে যেত হয়
আমার আগে নয়তো পরে। তারপর একদিন ওই ছোকরার হাত ধরে ঘর
ছেড়ে পালালো আমার বৌ।
ভবানী।।কি বলচো গো।ছি ছি! কি ঘেন্নার কথা!
তোমার মতো এমন ভালো মানুষ স্বামী থাকতে কিনা——ছি ছি ছি ! সেই নজ্জাতেই বুঝি তুমি……..?
শংকর।। ইবারে আমার কথা বাদ দিয়ে নিজের কথা কও দেখি!
ভবানী।। আমার কথা না শোনাই ভালো।
শংকর।।ক্যানে?
ভবানী।।তাহলে এই যে আমার লেগে ভাবছো,
আমার সাতে কথা কইচো—সিসব
বন্দ কইরে দেবা।
শংকর।। তার মানে কি?
ভবানী।।আমার কথা শুইনলে জেবনে হয়তো
আমার মুখ দেখবা না।

শংকর।।আমি কিছু বুজতে লারছি।খুলে বল
ক্যানে।
ভবানী।।খুব খারাপ একটো অসুখ হয়েছিল
আমার।

( মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যায়)

                  ( তৃতীয় দৃশ্য)

শংকর।। চুপ করে আছো কেনে? কি অসুখ
হয়েছে বললে না তো।
ভবানী।। কুষ্ঠ।
শংকর।। কুষ্ঠ! কি বলচো তুমি?
ভবানী।। কি,এবারে ঘেন্না হচ্ছে তো?
শংকর।। কেনে, ঘেন্না হবে কেনে? কুষ্ঠ রোগ তো চিকিচ্চে করালে ভালো হয়ে যায়। টিভিতে দ্যাকোনি নাকি?
ভবানী ।।দেখেছি তো। আমার বাপের বাড়িতে
টিভি ছেল, শ্বশুরবাড়িতেও।
শংকর।। চিকিচ্চে করিয়েছিলে?
ভবানী।। হ্যাঁ তো। প্রথমে শ্বশুরবাড়ির গাঁয়ের
ডাক্তারের কাছে, পরে শ্বশুর বাড়ির
লোক বাঁকড়োর এক কুষ্ঠ চিকিচ্ছের
হাসপাতালে ভর্তি কইরে দিলে।

( ভবানীর কথা শেষ হতে না হতেই ছুটতে ছুটতে সুদর্শন ওঝার প্রবেশ। শেডের মুখে এসে দাঁড়ায়। ওর জামা ধুতি সব ভিজে। হাতে একটা ভাঙা ছাতা।
ছাতাটা উল্টে গেছে ঝড়ে। সুদর্শন সেটা সোজা করার চেষ্টা করছে। লোকটা ভবানীর দিকে তাকায়। ভবানী শাড়ির আঁচলটা ভালো করে টেনে গায়ে ঢাকে।)
শংকর।। ওখানে হবে না দাদা,ভিতর দিয়ে আসুন কেনে।
সুদর্শন।। হবে না মানে, ওর বাপ হবে!
শংকর।। উখানে খুব হাওয়া দিছে তো তাই বলছিলাম আর কি।
সুদর্শন।।তুমি কে বট হে?
শংকর।।আমি—- মানে আ- আমি ‌ ভোলানাথ।
আপুনি?
সুদর্শন।। আমি সুদর্শন ওঝা। আমি যাব ওই
পশ্চিমের পাহাড়টো পেরিঞে
লালপাহাড়ি গাঁয়ে। আমার শিষ্যের বাড়িতে ।তা তোমরা কোথায়
যাবে?
শংকর।। এজ্ঞে…..!
সুদর্শন।। তোমার সাথে ওটা কে– তোমার পরিবার?
শংকর।।এজ্ঞে না,মানে– হ্যাঁ হ্যাঁ-ওই আর কি।
সুদর্শন।। ওই আর কি মানেটা কি হলো? ওটো
তোমার সত্তিকারের পরিবার তো নাকি কারুর বউকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছো?
শংকর।। ছি ছি ,কী যে বলেন। পরের বউকে
ভাগিয়ে আনব ক্যানে?আ–আমাকে
দেখে কি আপনার সেরকম মনে হয়?
সুদর্শন।। তোমার পরিবার ই যদি হবে তো অত দূরে বসে আছে কেনে?
শংকর।। এজ্ঞে, ঝগড়া। ওর সাতে আমার
ঝগড়া হয়েচে।
সুদর্শন।।হুম। তা তোমরা যাবে কোথায়?
শংকর।। কোথাও না।
সুদর্শন।।মানে?
শংকর।। আমরা ইখানে বেড়াতে এয়েছিলম।
সুদর্শন।।অ,বুজেচি। তার বাদে ইখানে এসে
ঝড়-বৃষ্টিতে আটক পড়ে গেলে।
শংকর।।এজ্ঞে হ্যাঁ, একেবারে ঠিক ধরেছেন।
সুদর্শন।। তোমাদের বাড়ি কোথায়?
শংকর।।মধুপুর।
সুদর্শন।। বাগিলা -মধুপুর?
শংকর।। না, চন্ডী- মধুপুর। উই যেথা রেল
ইস্টিশন আছে।
সুদর্শন।। সি তো মেলাই দূর। এই ঝড় বৃষ্টিতে
সেথা যাবে কি করে? –একটো কাজ
কর ক্যানে।
শংকর।।কি?
সুদর্শন।। আমার সাথে লালপাহাড়ী আমার শিষ্যের বাড়িতে চলো। রাতটো
সিখানে থেকে কাল সকালে না হয়—
শংকর।।আজ্ঞে সেটা হবার লয়কো।
সুদর্শন।।ক্যানে?
শংকর।।এজ্ঞে, ঘরে আমার অসুস্থ মা পড়ে আছে। যেমন করে হোক লাস্ট ট্রিপ এর বাসটো ধরে আমাকে মধুপুর যেতে হবে।
সুদর্শন।।অ।তা তুমি মায়ের ক্যামনধারা বেটা
বটো? অসুস্থ মাকে ঘরে ফেলে বউকে নিয়ে বেড়াতে এয়েছো।ণ্ড
বাঃ! বৃষ্টিটা ধরেছে মনে হচ্ছে।আমি
এগোলাম‌ হে।
শংকর। । আচ্ছা।

( সুদর্শন এর প্রস্থান)
শংকর।। উফ বাঁচা গেল।
ভবানী।।মানে?
শংকর।। শুনলে না ওঝার বাচ্চা কি কইলো?
ভবানী।।কি?
শংকর।।ওর শিষ্যের বাড়ি যেতে বলছিল।
ভবানী।।গেলেই পারতে।
শংকর।। তোমাকে একলা ফেলে কি করে
যেতাম?তাছাড়া উর আসল নজর তো ছেলো তুমার পানে।
ভবানী।।যাঃ! কি যে বলোনা তুমি।
শংকর।। এদের আমি ভালভাবে চিনি। সুন্দরী
যুবতী পরনারী দেখলেই এদের নাল গড়ায়!ছাড় উসব। তোমার কথাটো শেষ করো।
বাঁকড়োর হাসপাতলে চিকিচ্ছে হয়েছিল?
ভবানী।। দু’বছর হাসপাতালে ছিলাম।ভালো
হবার পর সাট্টিফিকেট দিয়ে আমারে ছেড়ে দিলে ডাক্তার বাবু। সাট্টিফিকেটটো দেখবা?
শংকর।। না না, থাক। আমি ওসব দেখে কি
বুঝবো? এবারে বলতো হাসপাতাল
থিকে ছাড়া পাবার পরে কি হোলো?কে লিয়ে গেল তোমারে হাসপাতাল থেকে?
ভবানী।। কেউ আসেনি গো।
শংকর।।মানে,?
ভবানী।। বড় ডাক্তার বাবু চিঠি লিখে খবর
দিয়েছিলেন আমার শ্বশুর বাড়িতে, কিন্তু কেউ আমাকে লিতে আসেনি। শেষে বড়ডাক্তারবাবু হাসপাতালের একটো
ইস্টাপকে দিয়ে আমাকে শশুর বাড়ি
পাঠিয়ে দিলেন।
শংকর।। তারপর?
ভবানী।। শ্বশুরবাড়িতে আমাকে দেখে সবাই যেনো ভূত দেখার পারা চইমকে উটলো।
তেখনি আমাকে বাপের বাড়ি চলে যেতে বললে। পরিষ্কার করে বললে যে,কুষ্ঠ
রোগীর ঠাঁই হবে না বাড়িতে।
শংকর।। সার্টিফিকেটটা দেখালে না কেনে?
ভবানী।। দেখতে চাইল না।বললে,ওটো নাকি
জাল সাট্টিফিকেট।
শংকর।। পাড়াপড়শি কেউ ছিলনা?
ভবানী।। তারা তো উয়োদের সুরে সুর মিলিঞে বললে যে,আমি পাপী বলেই নাকি
আমার কুষ্ঠ হয়েচে।আমি গাঁয়ে থাকলে সারা গাঁয়ে ছড়িয়ে যাবে রোগ।
শংকর।। যত সব বাজে কথা।তা তুমি পঞ্চায়েতেগেলে না কেনে?
ভবানী।। গেলে কি আর হতো বলো?
পঞ্চায়েতের কথায় থাকতে দিলেও
সব সময় ঘেন্না করত।
শংকর।। কি করলে তখন?

ভবানী।। যাবার তো আর কোন জায়গা ছিল না।তাই পাশের গাঁয়ে বাপের বাড়ি গেলম।
বাপ মারা গেইচে। দাদা বৌদির সংসার।
মায়ের কতায় রাত টুকুন থাকতে দিলে বৌদি। আর স্পষ্ট করে বলে দিলে সকাল হলেই ্ ঘর ছেড়ে চলে যেতে। কোথায় যাব শুদোতেই জলে ডুবে মরতে বইললে
শংকর।। আর তাই তুমি হিথা ড্যামের জলে
মইরতে চলে এলে? জায়গাটো চিনলে কি করে?
ভবানী।। বিয়ের পরে শশুর বাড়ির লোকের সাতে একবার এখানে এসেছিলাম পিকনিক করতে। তা তুমি বা এখানে মরতে এলে কেনে?
শংকর।। বছর দুয়েক আগে এখানে সরকারি
বাবুদের কোয়ার্টারে কাজ করতে এসেছিলাম। এই জায়গাটা চিনতাম।
তাই বউটো পালিয়ে যেতে খুব দুঃখ লাগলো মনে, লজ্জা হল, তিতিক্ষা
হল। মনে মনে ঠিক করে নিলাম যে,
এই মুখ আর কাউরে দেখাবো না। তারপর ইখানে এসে মন পাল্টালম।তাছাড়া
ভবানী।।কি?
শংকর।।হেথা না এলে তো তুমার সাতে দেখা
হতনা।
ভবানী।।ধ্যাৎ! আমি আবার একটা মানুষ,
তার সাথে আবার দেখা। হাসালে তুমি!
শংকর।। নিজেরে অমন কীটের পারা ভেবোনা গো। তোমার বুকের ভেতরে ও তো তিনিই
বসে আচেন। নিজেকে ছোট ভাবলে তেনাকে ছোট করা হয়।
ভবানী।। তোমার লেগে তো মরাও হলো না।
শংকর।। কাল বিয়ানে একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো!
ভবনী।। কি বললে তুমি? তুমিও আমারে
মরতে বললে?
( ভবানীর কন্ঠ অশ্রুরুদ্ধ হয়। ও চোখে আঁচল চাপা দেয়।)

শংকর।। আহা কাঁদছো কেন গো? আমিতো
মজা করছিলাম।
ভবানী।।মজা! আমার সাথে মজা? আমি একে মেয়ে মানুষ,তায় নিরাশ্রয়।—
আমারে লিয়ে তুমি মজা করছ!
শংকর।। কে বললে তুমি নিরাশ্রয়? এত সুখ দুখের কথা হলো তোমার সাথে–
আমারে আর কিছু না ভাবো,
বন্ধু বলে তো ভাবতে পারো।
ভবানী।। বন্ধু!
শংকর।। হ্যাঁ ,বন্ধু। আরে বাবা, তোমার আমার দুজনারই তো একই কেস– হেরে যাবার কেস। আর তার লেগেই তো
মরতে এসেছিলাম আমরা। কিন্তু মরা তো হল না, তাইলে আমরা কি ভাববো?
ভবানী।।কি?
শংকর।। লোতুন করে বাঁচার কথা।
ভবানী।। মানে?
শংকর।। গাঁয়ে আমার বাড়ি আছে একটা। সিথা তো থাকা যাবে– না কি?
ভবানী।। কি পরিচয় দেবে আমার?
শংকর।। জানিনা, কি পরিচয় দেবো তোমার।
তুমি বলে দাও কেনে ,কি পরিচয় দোবো?
ভবানী।।জানিনা।
শংকর।। আচ্ছা সেসব পরে হবে। এখন ওঠো।
ভবনী।।কেনে
শংকর।। বাস ইস্টপেজে যাব।
ভবানী।। কেনে?
শংকর।। চলো,যেতে যেতে বলছি।

( মঞ্চ অন্ধকার হলো)

           ( চতুর্থ দৃশ্য)

( মঞ্চ আলোকিত হতে দেখা গেল পাকা রাস্তা ধরে হাঁটছে ভবানী ও শংকর। পাশাপাশি। বড় বড় গাছের সারি। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মাঝে মাঝে বজ্রপাতের হালকা শব্দ।)
ভবানী।। কোথায় যেছি আমরা?
শংকর।। লাস্ট বাসটো আসার টাইম হয়ে গেল।
তাই বাস স্টপেজে যাচ্ছি।
ভবানী।। কোথায় যাব আমরা?
শংকর।। শহরে– মধুপুর রেল ইস্টিশনে। রাত
খানা ইস্টিশনে থাকবো।
ভবানী।।মানে।
শংকর।। মধুপুর ইস্টিশনের ইস্টিশন মাস্টার
আমাদের গাঁয়ের লোক। আমারে খুব
ভালোবাসে। রাত খানা ইস্টিশনে কাটিয়ে সকাল হলেই গাঁয়ে যাব।
ভবানী।। তোমাদের গাঁয়ের লোক যদি আমারেথাকতে না দেয় তো?
শংকর।। ওদের সব কথা খুলে বলবো,বোজাবো
ভবানী।। তাও যদি মানতে না চায়?
শংকর।। বাড়ি জমি সব বিক্রি করে শহরে চলে যাব। বললাম না, আমি ভালো ছুতোর মিস্ত্রির কাজ জানি। শহরে ঠিক কাজ খুঁজে পাবো। কোন অসুবিধা হবে না,দেখো। একটা কথা শুদোবো?
ভবানী।। কি?
শংকর।। তোমার নামটাই তো জানা হলো না।
ভবানী।। আমার নাম ভবানী।
শংকর।।হাঃ হাঃ!
ভবানী।। হাসছো কেনে?
শংকর।। তোমার নামটা শুনে।
ভবানী।। কেনে?
শংকর।। আমি শংকর আর তুমি ভবানী।
ভবানী।। তোমার নাম শংকর?
শংকর ।।হ্যাঁ।
ভবানী।। তবে যে তখন ওই ওঝাকে বললে যে, তোমার নাম ভোলানাথ।
শংকর।। হ্যাঁ।
ভবানী।। মিছে করে বলেছিলে?
শংকর।।মিছে কেনে?
( শংকর মেঠো সুরে গান ধরে)
‘আমি সি ভোলানাথ নই গো
সি ভোলানাথ নই
আমি শংকর ভোলা,
ছুতোরের পোলা,
দূর গেরামে রই গো
দূর গেরামে রই।’
বলি ও কন্যে, ভোলানাথ আর শংকর কি আলাদা নাকি গো? যিনি ভোলানাথ,
তিনি শংকর, তিনিই আশুতোষ, তিনি দেবাদিদেব মহেশ্বর।
ওই দেখো পাহাড়ের মাথায় আলো পড়ছে,বাস আসছে। তাড়াতাড়ি পা চালাও।
( হঠাৎ করে বাজ পরলো দূরে কোথাও। আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঝলসে উঠল অশনি রেখা। ভবানী চমকে আকাশের দিকে তাকালো।)
ভবানী।। আবার বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে যি গো।
শংকর।।আসুক না।
ভবানী।।ভিজে যাব যি গো।
শংকর।। তা কি হবে— ভিজবো দুজনাতেই!
আয় বৃষ্টি ঝেঁপে/ধান দেব মেপে…………..

(যবনিকা)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।