ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৪২)

সুমনা ও জাদু পালক 

অদৃশ্য কন্ঠ বললো, এবার যাত্রা শুরু করা যাক নতুন দেশের পথে।
সুমনা বলল, বন্ধু অদৃশ্য কন্ঠ, একটু দাঁড়াও, অনেকদিন মাকে দেখি নি। কাছিম দাদুর দেওয়া লাল মুক্তা বের করে একবার মাকে দেখে নিই।

দুধরাজ চিঁহি চিঁহি স্বরে ডেকে ঘাড় ঝাঁকিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল, অবশ্যই, অবশ্যই রাজকুমারী রত্নমালা।
সুমনা পোষাকের ভিতর লুকিয়ে রাখা ঝিনুকের খোলটা বের করে মন্ত্র পড়ল, “নাই শত্তুর,যা শত্তুর,যা,যা চলে যা দূরে,// লাল মুক্তা হাসবে এবার সোনালী রোদ্দুরে!”
সুমনার মন্ত্র পড়া শেষ হতেই ঝিনুকের খোল খুলে গিয়ে বেরিয়ে চলল টকটকে লাল রঙের মুক্তা। সুমনা ওটা হাতে নিয়ে মায়ের কথা ভেবে মনে মনে বলল, “হে লাল মুক্তা, দয়া করে আমার মাকে দেখাও।”
সুমনের প্রার্থনা শেষ হতে না হতেই লাল মুক্তার একটা অংশ ,বাক্সের ঢাকা খোলার মত করে, উপর দিকে উঠে গেল। দেখা গেল, মুক্তার ভিতরের অংশ স্বচ্ছ কাঁচের মতো। সুমনা সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। সুমনা দেখল ,ওই স্বচ্ছ অংশে ছোট্ট কালো বিন্দুর মধ্যে একটা জিনিস ক্রমাগত ঘুরে চলেছে। মিনিট কয়েক পরেই সেটা থেমে গেল। স্বচ্ছ অংশে ভেসে উঠলো সুমনার মায়ের প্রতিবিম্ব। সরকার বাবুদের রাধামাধব মন্দিরের ভোগ ঘরে বসে মা
কুটনো কুটছে। অনেক অনেক দিন পরে মায়ের মুখটা দেখতে পেয়ে খুব আনন্দ হল সুমনার। আবার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারল না বলে দুঃখ হলো খুব। সুমনার দু চোখ ছল ছল করে উঠলো।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল,” মাকে দেখা তো হল। লাল মুক্তার ক্ষমতাও প্রত্যক্ষ করা হলো। এবার ওটা আবার লুকিয়ে রেখে যাত্রা করা যাক নতুন পথে”।
সুমনা বলল,” হ্যাঁ বন্ধু। লাল মুক্তা এবার আগের মত লুকিয়ে রাখি ঝিনুক খোলে!
সুমনার থা শেষ হতে না হতেই লাল মুক্তার ঢাকা বন্ধ হয়ে সেটা আবার আগের মত হয়ে গেল।
সুমনা ওটা ঝিনুকের খোলের ভিতর রেখে মন্ত্র পড়তে লাগলো,” জন্ম ঘরে আছি আমি বন্ধু স্মৃতি নিয়ে,// সুরক্ষিত থাকব হেথায় শত্রুকে ছাই দিয়ে।”
ঝিনুকের খোলের দুটো অংশ শব্দ করে জুড়ে গেল। সুমনা এবার ওটা পোশাকের ভিতর লুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল, এবার চলো বন্ধু দুধরাজ।

দুধরাজ পিঠের দুপাশ থেকে ধবধবে সাদা দুটো ডানা বের করে উড়তে শুরু করলো উত্তর মুখে।
কাছিম দাদু তো উত্তর মুখেই যেতে বলেছিল। সুমনা ভাবে। অবশ্য এসব নিয়ে সুমনার কোন চিন্তা নেই। বন্ধু অদৃশ্য কন্ঠ তো আছেই। কিছু ভুল হলে, সেই যা বলার বলবে।
সুমনা দুধরাজের তুষার ধবল কেশর দুই হাতে আঁকড়ে ধরে অন্য চিন্তায় ডুবে গেল।
ঘুমন্ত রাজপুরী থেকে বেরিয়ে একে একে হলুদ দৈত্যের রাজ্যে ,সবুজ পাখির দ্বীপে অদ্ভুত অদ্ভুত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে সে। আর সেই সমস্যা থেকে উদ্ধার পেতে অদৃশ্য কন্ঠের নির্দেশ, পরামর্শ আর সর্বোপরি ঘুমন্ত পুরী থেকে নিয়ে আসা বাবা ভোলানাথের আশীর্বাদী বিল্বপত্রের অলৌকিক ক্ষমতা কাজে লেগেছে।
বিভিন্ন রং এর পরীদের পালক বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে তাকে।

সামনে আবার কি সমস্যা আসবে কে জানে ? কাছিম দাদু তো বলে গেল, বৃহল্লাঙ্গুল বানরেরা নাকি খুব একগুঁয়ে। তবে এটাও তো বলেছে যে,‌ ওদের সঙ্গে ভাব করতে পারলে ওরা নাকি মাথায় তুলে রেখে দেয়। তার অর্থ হলো এই যে, ওদের সঙ্গে ভাব জমাতে পারলে ওরা খুব খাতির করবে। কিন্তু ওদের সঙ্গে ভাবটা জমাবে কি করে?
তাছাড়া কোনো কারণে যদি ওরা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে,তখন ওদের সামলাবে কি করে?
বৃহল্লাঙ্গুল আসমানী বানরের দেশে নতুন কি সমস্যা আসতে পারে সেটা ভাবতেই সুমনার মনে হল, এবারে কি তাহলে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে আসমানী পরীর পালককে স্মরণ করতে হবে?
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, তুমি ঠিক ভেবেছ রাজকুমারী রত্নমালা। তোমাকে একে একে লাল পরীর পালক, কমলা পরীর পালক, হলুদ পরীর পালক ও সবুজ পরীর পালক সাহায্য করেছে। সেই হিসেবে এবার আসমানী পরীর পালকের আসার কথা।
—- আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না তোমার কথা।
—— একটু ভাবলেই বুঝতে পারবে।
মনে করে দেখো তো সেই দুধ নদীর পাড়ে সাত পরী সাত রংয়ের সাতটা পালক তোমাকে দিয়ে কি বলেছিল?
—কী?
—– যেকোন বিপদে পড়লে ওদের দেওয়া সাত রংয়ের পালক তোমার কাজে লাগবে।
—– হ্যাঁ,বলেছিল।
——- চার রঙের চারটে পালক তোমাকে পরপর সাহায্য করেছে। তাহলে এবার তো পাঁচ নম্বর রং মানে আসমানী রঙের পালকের আসার কথা। আর দেখো, আমরা তো যাচ্ছি আসমানী রং এর বানরদের দেশে।
——- এতো দেখি পরপর রামধনুর সাত রঙ আসছে।
—— হবেই তো। শুনলে না জাদুকর হূডু যখন পরীদের রানী কে ভুল বুঝিয়ে, মিথ্যা কথা বলে,ওর নিজের দেশে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন পরীদের রানী সাত রংয়ের সাতজন পরীকে সৃষ্টি করেছিল।
—– হ্যাঁ ।
—— সূর্যের সাদা আলো ভেঙে যেমন সাত-রঙা রামধনু তৈরি হয়,, ঠিক তেমনি পরীদের রানী তার সাদা পালক থেকে সাত রংয়ের সাত পরী কে তৈরি করেছে।
কথা বলতে বলতে সুমনা দেখতে পেল, সামনে একটা বিশাল জঙ্গল। আর তার পিছনে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের চূড়া। এটাই কি সেই বৃহল্লাঙ্গুল আসমানী বানরদের দেশ? কাছিম দাদু কি তাহলে এই দেশের কথাই বলেছিল? জঙ্গলের গাছগুলো খুব লম্বা আর ঝাঁকড়া। সেগুলোর সঙ্গে যাতে ধাক্কা না লাগে, দুধরাজ হুস করে অনেকটা উপরে উঠে গেল।
জঙ্গলের অনেকটা উপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে দুধরাজ। সামনে দূরে পাহাড়ের চূড়া গুলো দেখা যাচ্ছে।
বেশ খানিকটা যাওয়ার পর হঠাৎ দেখা গেল, অনেকগুলো লোমশ লেজ একটার সঙ্গে আরেকটা জড়াজড়ি করে চলার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। দুধরাজ ওই বাধা অতিক্রম করার জন্য আরো উপরে উঠতে চাইল। ব্যাপারটায় বেশ মজা পাচ্ছিল সুমনা।
কিন্তু একি ! দুধরাজ আর এগোতে পারছে না কেন?
সুমনা দেখতে পেল, চার চারটা লম্বা লোমশ লেজ এসে জড়িয়ে ধরেছে দুধ রাজের চারটে পা। দুধরাজ প্রবল শক্তি প্রয়োগ করে সেই বাধা অতিক্রম করতে চাইছে, কিন্তু বোধহয় পারছে না। তাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছে দুধরাজ।
কিন্তু এভাবে তো ও বেশিক্ষণ থাকতে পারবেনা। লম্বা লেজ গুলোর মালিকরা তো ওকে টেনে নামাতে চাইবে।
হ্যাঁ সুমনার আশঙ্কাই সত্যি হলো। দুধরাজ ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করলো। যদিও তখনও দুধরাজ প্রবল চেষ্টা করে যাচ্ছে বাধা কাটাতে। দুই বিপরীত শক্তির টানাটানিতে দুধরাজ থর থর করে কাঁপছে । সেই কাঁপুনি দুধরাজ এর পিঠে বসে সুমনাও অনুভব করতে পারছে ।
এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোন উপায় না দেখে সুমনা মনে মনে আসমানী পরীর পালক কে স্মরণ করল।
মুহুর্তের মধ্যে হাজির হলো আসমানী পরীর পালক। সে এসে প্রথমেই নিজের শরীর থেকে চারটে পালক তৈরি করল। সেই পালকগলো দুধরাজ এর পায়ে জড়ানো লেজ চারটাকে স্পর্শ করতেই সেগুলো আস্তে আস্তে দুধ রাজের পা থেকে খুলে ক্রমশ ছোট হতে থাকলো। পালক গুলো তবুও লেজের উপর থেকে সরে গেল না।
আর ঠিক তখনই দেখা গেল ,সামনে একটা বড় ঝাঁকড়া গাছে চারটা বানর বসে আছে । ওদের সবার চারটা করে মাথা । ওদের চারপাশের গাছগুলোতে হাজার হাজার বানর চিৎকার করছে, দাঁত ভেংচি কেটে ভয় দেখাচ্ছে।
চারমাথা ওয়ালা বানর চারটা ওদের ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো ।
তারপর ওদের একজন হাতজোড় করে বলল, “তোমরা যেই হও না কেন, আমাদের লেজের উপর থেকে পালক সরিয়ে নাও। সারা শরীরে খুব জ্বালা হচ্ছে আমাদের !”
অদৃশ্য কন্ঠে বলল, তাহলে তোমাদের কয়েকটা শর্ত মানতে হবে ।
—– কি শর্ত?
—– দুধরাজ কে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিতে হবে আর আমাদের চলার পথে লেজের সাহায্যে যে বাধার সৃষ্টি করেছ, তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।