ক্যাফে ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজে সুব্রত সরকার (পর্ব – ৮)

নীল নদে নৌকো ভ্রমণে – নুবিয়ান ভিলেজ

বিকেলের রোদ্দুর চিক চিক করছে নীল নদে।

আসওয়ান শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নীল নদ। নীল নীল ঘন নীল নীল নদ! দৃষ্টিসুখের আনন্দে মন কানায় কানায় পূর্ণ। স্বপ্ন ছোঁয়ার উল্লাসে হদয় পরিপূর্ণ।

লুক্সার থেকে নীল নদে বিলাসী ক্রুজে ভাসতে ভাসতে আসওয়ানে চলে এসেছি। মিশরের বড় সুন্দর এক শহর আসওয়ান। এই শহরে দু’রাত্রি যাপন আমাদের।

আমাদের ক্রুজের নাম হ্যাপি ফাইভ ওয়ালটন। ডাঙায় নোঙর করা বিলাসী ক্রুজ থেকে নেমে এলাম পারে, শহরে। নদীর গা ঘেঁষেই এই শহর বড় সুন্দর। আসওয়ান খুব সাজানো গোছানো শহর। পাশেই রেল স্টেশন। টাঙায় করে এক চক্কর ঘুরে নিলাম শহরের কিছুটা। বাজারেও গেলাম একবার। দেখলাম অনেক পরিচিত সব্জি এবং বড় বড় তেলাপিয়া মাছ। আর দেখলাম রাস্তার ধারে অনেক পাউরুটির বেকারী। শহরটা দেখে নিয়ে আমরা চললাম নীল নদে নৌকো ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে।

আসওয়ান থেকে এক অফবিট ভ্রমণে চলেছি নুবিয়ান ভিলেজ দেখতে। এই নদী তীরবর্তী গ্রামের কথা অনেক শুনেছিলাম। গ্রামের ইতিহাসও কিছুটা জেনেছি। ” নুবিয়া” শব্দের অর্থ নাকি কালোত্ব। যা আফ্রিকার সমার্থক হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ মিশর ও উত্তর সুদানে বিস্তৃত একটা অঞ্চলকে বোঝায়। যেখানে কালো চামড়ার নুবিয়ানরা বসবাস করে। তাই সেই নুবিয়ান ভিলেজে পা দেওয়ার জন্য চরণ আমার চরৈবেতি চরৈবেতি!..

মন তো আমার আগেই উড়ে গিয়েছিল। তাই ক্রুজ থেকে নেমে যখন আমরা কয়েকজন বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নৌকোয় চেপে বসলাম, আনন্দ আর ধরে না। সূর্য তখন টাল খাচ্ছে পশ্চিমে। আহা সেই টাল খাওয়া সূর্যের রক্তিম আভায় নীল নদের নীল জল কি মায়াবী, কি মনোরম। আমাদের গাইড আহমেদ ইমদ আলাপ করিয়ে দিলেন নৌকোর মাঝির সাথে। মাঝিও একজন নুবিয়ান। জোব্বার মত এক ধরণের পোশাক গ্যালাবি পড়া মাঝির নাম আইয়ুব। নৌকো জলে ভাসতেই গাইড বললেন, “এ মাঝি গান জানে। আপনারা কি গান শুনবেন?”

নীল নদে নৌকোয় বসে নুবিয়ান মাঝির ডাফলি বাজিয়ে গান শোনার অপূর্ব অভিজ্ঞতা এই ভ্রমণে বড় প্রাপ্তি। মাঝি ডাফলি বাজিয়ে এক আফ্রিকান লোকগান আমাদের শোনালেন,” ও আ লে রে, ও আ লে রে, ও মুস্তাফা লে রে, ও লা লা লা, ওলা ওলা ওলা ওলারে…

নৌকো নীল নদে ভাসছে। আমরা গান শুনছি। নৌকো ভেসে চলেছে। নদীর দু’পারের সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখছি। গ্রাম, জনপদ, বোটানিক্যাল গার্ডেন, কাশফুল, উট, বালুচর, মাছ ধরার ডিঙি নৌকো, রাজহাঁস, পাল তোলা ফেলুকা- এই সবই দারুণ দারুন সব চিত্রকল্প উপহার দিয়ে যাচ্ছে। তাই আসওয়ান থেকে নুবিয়ান এই নৌকো যাত্রার পথটাই এক অলীক আশ্চর্য সুন্দর ভ্রমণ!

নীল নদের এই দু’পারের দৃশ্য যেন এক বড় ক্যানভাস। কোনও এক অচিন চিত্রকর তাঁর রং তুলিতে মনের মত করে এঁকে রেখেছেন! আমরা ভাগ্যবান পর্যটক তাই এই সব চিত্রকলা দেখার আনন্দ উপভোগ করতে করতে যাচ্ছি!..

সন্ধে নামার একটু আগে এভাবে ভাসতে ভাসতে আমরা এসে নামলাম ঘাটে। পাশেই ছড়ানো নুবিয়ান ভিলেজ। এই ভিলেজের এক গ্রামবাসীর অতিথি আমরা। গাইড নিয়ে চললেন সেই বাড়িতে। ঘাট থেকে সামান্য পায়ে হাঁটা পথ। বাড়িতে ঢুকতেই বিস্ময় আর মুগ্ধতা আমাদের মাতিয়ে দিল। কি সুন্দর করে সাজানো, ছড়ানো এক শিল্পবাড়ি। এ বাড়ি দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। বাড়ির মালিক লাজুক হেসে এগিয়ে এলেন। আলাপ পরিচয় হল। নাম তার কাসেম আবদুন। ইংরেজি জানে। তাই কিছু কথা আদান-প্রদান করা সম্ভব হল। ওর পরিবার, মা, বাবা, ভাই নিয়ে এই বসতভিটে। বসতভিটেটাকে কি যত্নে কি সুন্দর করে পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছেন। তাই প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হতেই হবে।

ওর বাড়িতে বড় বড় দুটো রাজহাঁস দেখতে পেলাম। আর যা দেখে ভয়ংকর রকম চমকে গেলাম, তাহল বাড়ির উঠোনের চৌবাচ্চাতে দুই জ্যান্ত কুমির! জাল দিয়ে ঢাকা সেই চৌবাচ্চায় মুখ নীচু করে দেখলাম দুটো কুমীর কেমন উদাসীনতায় ঘুমোচ্ছে! কুমীর মিশরের শুভচিহ্ন। তাই কুমিরকে বাড়িতে প্রিয়জনের মতই যত্ন করে ওরা রাখে। হয়তো পুজোও করে!

এই সুন্দর সন্ধ্যায় নুবিয়ান বাড়ির অতিথি আমরা। তাই আমাদের জন্য একটু আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল। বড় বড় পরোটা, ঘরে তৈরী গুড়, ও আচার দিয়ে সাজানো প্লেট আমাদের সামনে রাখা হল। সবাই বেশ আনন্দ করেই খেলাম। গুড়টা বেশ ভালো লাগল। তারপর এল সুগন্ধী মশলা চা। সেও বড় সুন্দর।

চা- জলখাবার খেয়ে আমরা গ্রাম ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়লাম। পায়ে পায়ে হাঁটছি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাড়িগুলো আলোয় আলোয় সাজানো। সব বাড়িই বেশ বাহারি রং দিয়ে রংচঙয়ে। গ্রামের পাশেই পাকা সড়ক। এখানে বসেছে হরেক মালের জমজমাট বাজার। এ বাজার পর্যটক আকর্ষণের জন্যই সাজানো। আমরাও তাই বাজারের ভিড়ে কিছুটা সময়ের জন্য হারিয়ে গেলাম।

নুবিয়ান ভিলেজে আসার মুখ্য আকর্ষণগুলো হল বোট রাইড, মিন্ট টি, বেবি ক্রোকোডাইল, হেনা ট্যাটুস, রংচংয়ে বাড়ি, নীল নদ, উট, বালুচর ও বাজার।

নুবিয়ান এই বাজারে অনেক মশলাপাতির দোকান দেখলাম। কত ধরণের মশলা। সব মশলার নাম জানি না। জানার উপায়ও বড় কম। কারণ ভাষার প্রতিবন্ধকতা। ওরা আরবী ছাড়া কিছু বোঝে না! দু’একজন সামান্য দু’চারটে ইংরেজি শব্দ জানে। তাই শুধুই চোখের দেখায় দেখলাম।

এছাড়া মিশরীয় নানান উপহার সামগ্রী ও পোশাক রয়েছে। আমি একটা রংচংয়ে উলের টুপি পছন্দ করে কিনে ফেললাম। দাম পড়ল ১৩০ ইজিপশিয়ান পাউন্ড। এখানে ৩০ পাউন্ড মানে এক ডলার।অর্থ্যাৎ সাড়ে চার ডলার দিয়ে একটা উলের টুপি কিনলাম! কিন্তু চেয়েছিল ৩০০ পাউন্ড। সুতরাং দরাদরিতে দক্ষ না হলে পকেট থেকে পিছলে যেতে পারে পাউন্ড ও ডলার!..

ছোট্ট ভ্রমণে বেশি সময় আমরা থাকতে পারি নি নুবিয়ান ভিলেজে। দিনের আলোয় অনেকটা সময় নিয়ে এলে বা একটা দিনরাত্রি নুবিয়ান ভিলেজে কাটাতে পারলে নিঃসন্দেহে সে হবে এক অবিস্মরণীয় ভ্রমণ।

বাজার সফর সেরে পায়ে পায়ে ফিরে এলাম ঘাটে। নৌকোর ভিড়ে ঘাট জমজমাট। আমাদের মত অনেক পর্যটকরাই ঘুরে বেড়িয়ে ফিরে যাচ্ছেন আসওয়ান শহরে।

ফেরার পথে মিশরের আকাশে পূর্ণ চাঁদের আলোয় আমাদের নৌকো কেমন মায়াবী হয়ে উঠেছিল। নীল নদের জল সেও চোখে মায়া কাজল পরিয়ে দিয়েছিল। নৌকোর ভেতরে গিয়ে বসতে মন চাইল না। বাইরে জলজ বাতাস। কুয়াশার মোড়কে ঢাকা অন্ধকার। ঠান্ডার শিরশিরানি আছে। ঠান্ডা লেগে সর্দি কাশি হতেই পারে! তবু মুসাফির মন আমার এমন হিসেবী ভ্রমণে ভাসতে চাইল না। সে বড় অবাধ্য অবুঝ হয় কখনো সখনো। চলে গেলাম নৌকোর ছাদে। খোলা ছাদে বেতের মোড়া দিয়ে সাজানো বসার আয়োজন। সেই বেতের মোড়ায় বসে নীল নদের নীর্জনতার মধ্যে একলা হওয়ার অপূর্ব আনন্দ উপভোগ করলাম।

মিশরের নীল আকাশের পূর্ণ চাঁদের আলোয় জোছনাভেজা আনন্দ নিয়ে আসওয়ানের দিকে ভেসে যেতে যেতে মাঝির সেই আফ্রিকান লোক গানটা মনে করে আপন মনে গাইবার চেষ্টা করলাম,”ও আ লে রে, ও আ লে রে, ও মুস্তাফা লে রে…

নৌকো ভাসছে নীল নদে!.. আমি গাইছি গুণ গুণ করে…”ও মুস্তাফা লে রে…ও মুস্তাফা লে রে..

কিভাবে যাবেন- মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে আকাশপথে লুক্সার। তারপর জলপথে বা স্থলপথে আসওয়ান চলে আসতে হবে। আসওয়ান থেকে ছোটো নৌকোয় চেপে নীল নদে ভেসে পৌঁছে যাওয়া যায় নুবিয়ান ভিলেজে।

সমাপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।