সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ২৫)

দেবমাল্য
আস্তে করে মাথা নাড়িয়ে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে সে বলল, আমি তো জানি না।
— তার তো লালগোলা প্যাসেঞ্জারে আসার কথা ছিল। সামশের বলেছিল, চারটে নাগাদ ট্রেন ঢুকবে। ঢোকেনি?
— হ্যাঁ, ঢুকেছিল তো… পঁয়তাল্লিশ মিনিটে লেটে।
— লেট হোক। ঢুকেছিল তো? তা হলে ও কোথায় গেল!
— তা তো আমি ঠিক…
— চলো তো একবার স্টেশনে যাই। ক’টা বাজে এখন?
— ক’টা হবে! এগারোটা-সাড়ে এগারোটা।
— সা…ড়ে… এ…গা…রো…টা? বাবা, এত বেলা হয়ে গেছে! তাও চলো। ও যদি ওই ট্রেনে এসে থাকে আর এই স্টেশনে নেমে থাকে, তা হলে আমার জন্য ও স্টেশনেই অপেক্ষা করবে। চলো…
— আপনি বরং রেস্ট নিন, আমি দেখে আসছি।
— তুমি ওকে চিনবে কী করে?
— মাইকে অ্যানাউন্স করাব। লালগোলা প্যাসেঞ্জারে তানিয়া নামে যদি কেউ এসে থাকেন, তা হলে স্টেশন মাস্টারের ঘরে এসে দেখা করুন। আমি স্টেশন মাস্টারের ঘরে অপেক্ষা করব। উনি এলেই তাঁকে এখানে নিয়ে আসব। কোনও অসুবিধা হবে না।
— না না, সেটা ঠিক হবে না। আমি যাব।
— ডাক্তার বলে গেছেন আপনাকে রেস্ট নিতে। ও হোঃ, মা, ওনাকে কিছু খেতে দাও না… ডাক্তার বলেছেন কিছু খেয়ে এই ট্যাবলেটটা খেয়ে নিতে। সঙ্গে একটা অ্যান্টাসিড।
— ঠিক আছে, এসে খাবখ’ন। আগে তো স্টেশনে চলো।
এতক্ষণ ওদের কথা শুনছিলেন রণোর মা। তিনি বললেন, বাবা, তোমার বউ যদি তোমার জন্য ছ’-সাত ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করে থাকতে পারে, তা হলে আরও পাঁচ-দশ মিনিটও পারবে। তুমি বরং হাত-মুখ ধুয়ে তৈরি হও। ততক্ষণে আমি তোমাকে ক’পিস পাঁউরুটি সেঁকে দিই।
ও বুঝতে পারল, তার কথা কেউ বুঝতে চাইছে না। সে জোর করে বেরিয়ে যেতেই পারে। কিন্তু যারা তার জন্য এতটা করেছে, তাদের সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করা কি ঠিক হবে! তাই উপায় না দেখে সে বলল, ঠিক আছে, করুন।
বড় অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে করে দুধ আর একটা স্টিলের থালায় করে দশ -বারো পিস স্লাইস পাঁউরুটি দিয়ে গিয়েছিলেন রণোর মা। বেশ খিদে পেয়েছিল তার। সব ক’টাই দুধে চুবিয়ে-চুবিয়ে খেয়ে নিল সে। এর আগে কোনও দিন সে এইভাবে খায়নি। কী খাচ্ছে, বুঝতে পারছে না। মুখে কোনও স্বাদ নেই। তেতো-তেতো লাগছে। কিছুই ভাল লাগছে না তার। মাথার মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা ঘুরঘুর করছে, ওকে স্টেশনে পাব তো!
একসঙ্গে দুটো ওষুধ মুখে পুরে ঢকঢক করে জল খেয়ে নিল সে। খাওয়ার পরে খেয়াল হল, এ মা, কী জল খেল সে! এটা তো মিনারেল ওয়াটার নয়! কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। রণোর সঙ্গে বেরিয়ে সোজা গাড়িতে গিয়ে উঠল।
ও নিশ্চয়ই এখন আর কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে না। কাল যত বার ডায়াল করেছে, হয় শুনেছে নট রিচেবল, নয়তো দিস নাম্বার ইজ বিজি। কোনও সুস্থ মানুষ এতক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলতে পারে!