সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ৩৭)

দেবমাল্য
রূপা জানে, তাঁর স্বামী একবার গল্প নিয়ে বসলে সহজে উঠবে না। তাই ওদের কথার মধ্যে ঢুকে পড়ল রূপা। রাজীবকে বলল, এ কী? যাও। চুলটুল আঁচড়ে একেবারে এসে বসো। তুমিও চা খাবে তো?
রাজীব বলল, দাও…
দেবমাল্যর কাছ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ সব শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকাল রাজীব। বলল, আপনার কথার মধ্যে কোনও সামঞ্জস্য পাচ্ছি না। আপনার বউকে কাল রাতে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে তুলে দিয়েছে একজন। আজ সকালে তাঁর বহরমপুরে পৌঁছনোর কথা। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, তিনি পৌঁছননি। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। এটা মিসিং কেস। তার পরেই আবার বলছেন, বহরমপুরে ট্রেন ঢোকার অনেক আগেই আপনি আপনার বউকে দু’জন বোরখা পরা ভদ্রমহিলার সঙ্গে একটা জিপে করে স্টেশনের দিক থেকে শহরে ঢুকতে দেখেছেন। এটা আর একটা ঘটনা। এরই পাশাপাশি বলছেন, বউকে খুঁজতে একটু বেলার দিকে আবার যখন স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁকে দেখেছেন একটা সাইকেল রিকশা করে যেতে। তাঁর সঙ্গে কে? না, যে কাল রাতে আপনার বউকে ট্রেনে তুলে দিয়েছিল, অথচ নিজে ট্রেনে ওঠেনি সে। এই তিনটে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে আমি কিছুতেই একটা সূত্রে বাঁধতে পারছি না। আরও অবাক লাগছে, উনি যদি সত্যিই বহরমপুরে এসে থাকেন, তা হলে তো আপনাকে খুঁজবেন। আপনাকে ফোন করবেন। অথচ আপনি বলছেন, জিপে করে উনি যখন আসছিলেন, গাড়ির জানালা থেকে অর্ধেক শরীর বের করে আপনি তাঁকে হাত নেড়েছেন। ‘এই, আমি এ দিকে, এ দিকে। দাঁড়াও দাঁড়াও’, বলে চিৎকারও করেছেন। তবুও তিনি পাথরের মতো চুপচাপ বসেছিলেন। পরে আবার যখন তাঁকে ওই ছেলেটার সঙ্গে সাইকেল রিকশা করে যেতে দেখেছেন, তখনও তাঁকে চিৎকার করে বারবার ডেকেছেন। তিনি শুনতে পাননি। আপনি কোন হোটেলে উঠেছেন, সেটা ভুলে গিয়ে উনি যদি আপনাকেই খুঁজতে সাইকেল রিকশা নিয়ে শহরে বেরিয়ে থাকেন, তা হলে তো উনি যেতে যেতে বারবার এদিকে ওদিকে তাকিয়ে আপনাকেই খুঁজবেন। কান খাড়া রাখবেন। তাই না? এটাই তো স্বাভাবিক। আমি কি ভুল বলছি, বলুন? হতে পারে, প্রথম একটা-দুটো ডাক গাড়িটারির আওয়াজে উনি না-ই শুনতে পারেন, কিন্তু আপনি বলছেন অনেকবার ডেকেছেন। তা হলে অত বার চিৎকার করে ডাকার পরেও একটা ডাকও কি তাঁর কানে গিয়ে পৌঁছবে না? এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তার পর আপনি বলছেন, ওনার ফোন দীর্ঘক্ষণ নট রিচেবল ছিল। আমি তো কলকাতায় গেলে লালগোলা প্যাসেঞ্জারেই ফিরি। কোথায়, আমার তো কখনও এ রকম কিছু ঘটেনি। তার পরে আপনি যা বলছেন… যত বার ফোন করেছেন, তাঁর ফোন নাকি তত বারই বিজি ছিল। কতক্ষণ? আচ্ছা, আপনার বউয়ের নাম্বারটা দিন তো, আমি একবার ফোন করে দেখি…
— নম্বর?
দেবমাল্যকে অন্যমনস্ক হয়ে যেতে দেখে রাজীব বলল, কেন, কোনও অসুবিধা আছে নাকি?
— না, আসলে হয়েছে কি, আমার মোবাইলটা আজ হারিয়ে গেছে। ওর নম্বরটা তো আমার মোবাইলে সেভ করা ছিল। ওখান থেকেই ফোন করতাম। ফলে ওর নম্বরটা লিখে রাখা বা মনে রাখার কথা আমার কখনও মাথাতেই আসেনি। নম্বরটা মনে নেই দেখে তো ওকে ফোনও করতে পারছি না।
— আপনার বাড়ির নম্বর?
— সেটা তো ডেড হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় গুন্ডারা বারবার হুমকি দিচ্ছিল দেখে রিসিভারটা নামিয়ে রেখেছিলাম। কবে যে ওটা ডেট হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। যখন টের পেলাম, তখন সময়ের অভাবে কমপ্লেনও করা হয়নি। সামশেরকে বলেছিলাম কি না তাও মনে নেই। বললেও, ও কমপ্লেন করার সময় পেয়েছে কি না, আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এত দূরে বি এস এন এলের অফিসটা… ফলে ওটায় পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয় না।
— যে ছেলেটা আপনার বউকে তুলে দিতে এসেছিল, তার নাম্বার?
— বললাম না… মোবাইলটা হারিয়ে গেছে। সব নম্বর তো ওটাতেই ছিল।
— কারখানার নম্বর মনে আছে?
— হ্যাঁ, তা আছে।
— বলুন।
দেবমাল্য নম্বরটা বলতেই কম্পিউটারের কি-বোর্ডের ড্রয়ারটা টেনে নিজের মোবাইলটা বের করে টপাটপ বোতাম টিপল রাজীব— হ্যালো… বলেই, দেবমাল্যর দিকে তাকাল সে। বলল, ওই ছেলেটার নাম যেন কী?
কার কথা জিজ্ঞেস করছে বুঝতে না পারে দেবমাল্য বলল, কোন ছেলেটা?
— যে আপনার বউকে কাল ট্রেনে তুলে দিয়েছিল…
— ও, ওর নাম সামশের।
নামটা শুনেই ফোনের ও প্রান্তের লোকটাকে রাজীব বলল, সামশের আছে নাকি?