• Uncategorized
  • 0

T3 || আমি ও রবীন্দ্রনাথ || বিশেষ সংখ্যায় সুব্রত সরকার

তুমি না থাকলে

কোদাল বস্তির বনবাংলোর ঝুল বারান্দায় বসে আছি আমরা তিনজন। জগন্নাথদা,অভ্র ও আমি।
আকাশে চিনির বাতাসার মত ধবধবে সাদা বিরাট একটা চাঁদ। সুন্দরী মহিলার কপালের মস্ত টিপের মত উজ্বল বলা যায়!…
চিলাপাতার এই জঙ্গলে আমাদের প্রথম আসা। একটু পরেই রেঞ্জার আসবেন আমাদের সাথে দেখা করতে। আমরা ওঁরই অতিথি। জগন্নাথদার লেখালেখির দৌলতেই এই সব সরকারি কর্তাদের সাথে আলাপ-পরিচয় ও কোর এরিয়ায় থেকে বনভ্রমণের মজা উপভোগ করা।
” ভালোবেসে যদি সুখ নাহি / তবে কেন–/ তবে কেন মিছে ভালোবাসা… ” অভ্র গুণ গুণ শুরু করে দিয়েছে। জগন্নাথ দার এই একটাই আবদার, বনে এসে রবীন্দ্রনাথের গান শোনা চাইই চাই। আর অভ্রর কন্ঠে রবিঠাকুরের গান সত্যিই বড় সুন্দর হয়ে প্রকাশ পায়। ওর গায়কীতে গানগুলো যেন মরমে এসে বিঁধে যায়!
“এই গানটা শুনলে আমার অরুপের কথা খুব মনে পড়ে!” জগন্নাথ দা বিড় বিড় করে ভাসিয়ে দিলেন কথাটা।
” কে অরুপ?” জানার আগ্রহে আমি চঞ্চল হয়ে উঠলাম।
” আমার কলেজ জীবনের খুব কাছের বন্ধু ছিল। ও প্রেমের আগুনে পুড়তে পুড়তে এ গানটা প্রায়ই গাইত আর দুচোখ ভিজে যেত। আমি সান্ত্বনা দিয়েও সামলাতে পারতাম না ওর চোখের জল!
অভ্র গান থামিয়ে এবার বলল,” প্রেমে পুড়ে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে রবীন্দ্রনাথ, আবার প্রেমে পড়ে, হাবুডুবু খেয়েও রবীন্দ্রনাথ…” এত ভালোবাসি, এত যারে চাই, মনে হয় না তো সে যে কাছে নাই!…”
” আমার খালি মনে হয়…” জগন্নাথ দা চাঁদের উজ্জ্বল আলোর দিকে চেয়ে ভাবুক মায়াবী স্বরে কথা শুরু করলেন,” আমাদের রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, নজরুল আছেন। নেতাজী, বিবেকানন্দ আছেন। কিন্তু যদি রবীন্দ্রনাথ না থাকতেন, কেমন হতো আমাদের জীবন টা?”
অভ্র, আমি দু’জনেই চুপ। কথাটা ভাবার মত, তাই ভাবছি। জগন্নাথ দার দিকে চেয়ে আছি। জগন্নাথ দা আবার কথা শুরু করলেন, ” রবীন্দ্রনাথ আমাদের সত্তার সাংস্কৃতিক মননটাকে তৈরী করে দিয়ে গেছেন। এই যে আমরা ফুল দেখি, পাখি দেখি, পাহাড়, নদী, জঙ্গল দেখি… ভালোবেসে ব্যথা পাই। হাসি, কাঁদি, গান গাই — সব রবীন্দ্রনাথের জন্যই! ঘরে ফুলদানিটা কোথায় রাখব, সেটাও যেন শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ!.. “
জঙ্গলের নির্জন রাস্তায় হঠাৎ গাড়ির সার্চ লাইট। দুরন্ত গতিতে একটা জিপ এগিয়ে আসছে। গাড়িটা যে রেঞ্জারের তা বুঝতে অসুবিধা হল না। গাড়ি দেখে দৌড়ে গেল বাংলোর চৌকিদার। গেট খুলে দিতেই গাড়িটা ঢুকে পড়ল বাংলোর হাতায়। জিপ থেকে প্রায় লাফ দিয়ে নামলেন রেঞ্জার সাহেব নরেন বসুমাতা। মেচ সম্প্রদায়ের এক ডাকাবুকো রেন্জার। নেমেই হাসতে হাসতে বললেন,” কি জগন্নাথ বাবু, আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই যাব বনে হবে নাকি!”…
চাঁদের আলোয় রেঞ্জারের জিপে চড়ে নাইট সাফারিতে চলেছি। বন্যপ্রাণী কি দেখতে পাব, জানি না। না দেখতে পেলেও কোনও আফসোস হবে না! এমন সুন্দর জ্যোৎস্না রাতে সবান্ধবে বনভ্রমণের মজাই অন্যরকম। অভ্র আবার গুণগুণ শুরু করে দিল,” পূর্ণ চাঁদের মায়ায় আজি ভাবনা আমার পথ ভোলে / যেন সিন্ধুপারের পাখি তারা যা য় যায় যায় চলে।”…
” সব বাঙ্গালিরই জন্মদিন টা হোক পঁচিশে বৈশাখ”। জগন্নাথ দা হঠাৎ অদ্ভুত এই কথাটা জঙ্গলে ছুড়ে দিলেন!…

।। সমাপ্ত।।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।