ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজ আমেরিকার ডায়েরি || সুব্রত সরকার পর্ব – ১

আমেরিকার ডায়েরি – ১
(৬ অগাস্ট, মঙ্গলবার, ২০২৪)
কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে কাতার এয়ারলাইন্স এর মস্ত বড় বিমানটা। বোয়িং ৭৮৭- ৮। টেক অফ করবে ভোর রাতে ৩.৫০। দিন পাল্টে হয়ে যাবে ৭ অগাস্ট, বুধবার।
এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছি একটু আগেই। ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। বন্ধু সুশান্ত- পারমিতা, প্রিয়জন দেবাশীষদা- সুপ্তিদি, পূর্ণদা এসেছিলেন সি অফ করতে। তাঁদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে নিয়ম মেনে চার ঘন্টা আগে ইন্টারন্যাশনাল লাউঞ্জে ঢুকে পড়েছি। তারপর কতগুলো কাজ যন্ত্রের মত করে গেলাম। পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন, লাগেজ চেক ইন, বোর্ডিং পাস নেওয়া, ইমিগ্রেশান চেক, সিকিউরিটি চেক করে একটু শান্ত হয়ে বসার সুযোগ হলো। এগুলো বড্ড বিরক্তিকর কেজো কাজ। কিন্তু মাথা ঠান্ডা রেখে নীরবে করে ফেলতেই হবে। তবেই তুমি ঐ পাখির ডানায় গিয়ে চড়বে। আকাশের বুকে উড়বে। মেঘের দেশে ভাসবে!..
সব কাজ মিটিয়ে বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লাউঞ্জে বসে আছি। চা খেতে খুব ইচ্ছে করছে, কিন্তু এয়ারপোর্টে এক কাপ চায়ের এমন দাম করে রেখেছে, দূর থেকে দেখে ফিরে আসতে হয়। বুঝতে পারি না এক কাপ চা এয়ারপোর্টে এত বেশি দাম কেন হবে? চা তো আর লাক্সারি আইটেম নয় । মানুষের একটা বেসিক নেশার জিনিস!.. যাই হোক যাচ্ছি আমেরিকায় তখন এক কাপ চায়ের দাম নিয়ে পাগল হয়ে লাভ নেই। ওদেশে তো আবার ডলার ভাঙিয়ে চা খেতে হবে!..
ঘড়িতে এখন রাত একটা বেজে দশ মিনিট। আর মাত্র আড়াই ঘন্টার অপেক্ষা। উড়ে যাব আকাশে! ভারতবর্ষ থেকে আমেরিকা আকাশপথের দূরত্ব কমবেশি চোদ্দ হাজার কিলোমিটার (৮,৬৯৯ মাইল)। এক লম্বা সফর। একটু পরে দাঁড়িয়ে থাকা কাতার এয়ারওয়েজের বিমানে প্রবেশ করব। এই উড়ানে উড়ে পাঁচ ঘন্টার সফরে পৌঁছে যাব দোহা। কাতারের রাজধানী দোহা। সেখানে দু’ঘন্টা লেওভার। তারপর টাইম জোন পাল্টে যাবে। ঘড়ির কাঁটায় হবে সকাল ৬.৩৫।
কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লেওভারের দু’ঘন্টা কাটিয়ে সকাল ৮.০৫ এ আবার কাতার এয়ারওয়েজ এরই অন্য বিমানে উঠে একটানা ষোল ঘন্টা জার্নি শেষ করে (আমেরিকান টাইম জোন হবে বুধবার বিকেল,৭ অগাস্ট, কিন্তু ভারতীয় সময়ে তা হবে বৃহস্পতিবার, ৮ অগাস্ট সকালে) পৌঁছে যাব জে এফ কে বিমানবন্দরে। যার পুরো নাম জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি এয়ারপোর্ট। আমোরিকার ৩৫ তম রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন কেনেডি। তাঁর রাজত্বের সময়কালটা ছিল ১৯৬২- ১৯৬৩। তিনি ছিলেন আমেরিকার সর্বকনিষ্ট রাষ্ট্রপ্রধান। একদিন হঠাৎই আততায়ীর গুলিতে কেনেডি প্রাণ হারান। বন্দুকবাজ হিসেবে আমেরিকানদের একটা বাজার চলতি দুর্নাম রয়েছে। এই তো কিছুদিন আগেই আরেক বন্দুকবাজ বালক প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কান ফুটো করে গুলি চালিয়ে দিয়ে নিজে সিকিউরিটির গুলিতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে।
আমার এই আমেরিকা সফর কোনও ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে নয়, আবার ঠিক একার ভ্রমণও নয়। এবার চলেছি কন্যা ( ডুলুং) ও জামাতার (সোহম) সঙ্গে। ওরা ওদেশের ছাত্র-ছাত্রী। দুজনে দুটো আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পি এইচ ডি করছে। শহরও দুজনের আলাদা। মেয়ে সাউথ ক্যারোলাইনার কলম্বিয়ায়। জামাই আপস্টেট নিউইয়র্কের সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটিতে। ওদের তৃতীয় বছরের ক্লাস শুরু হবে। তিন মাস স্বদেশে ছুটি কাটিয়ে দুজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। তাই আমারও একটা সুযোগ এসে গেল ওদের সাথে একটু চলে যাওয়ার! কয়েকটা দিন আমেরিকাকে দেখা ও বেড়ানোর। সব মিলিয়ে বিয়াল্লিশ দিনের এই আমেরিকার ভ্রমণ পর্ব। নিউইয়র্ক- ম্যানহ্যাটন থেকে শুরু করে একে একে ঘুরব, দেখব সিরাকিউজ, নায়াগ্রা, বস্টন, ওয়াশিংটন ডি সি, বল্টিমোর, সাউথ ক্যারোলাইনা, ইন্ডিয়ানা, শিকাগো, নিউ অরলিন্স, মায়ামি, সাভানা, চার্লসটন হয়ে আবার সাউথ ক্যারোলাইনার কলম্বিয়া ছুঁয়ে নিউ ইয়র্ক হয়ে ফিরে আসা আমার স্বদেশে, আমার প্রিয় শহরে।
আমেরিকা একটা স্বপ্নের নাম। সারা পৃথিবীর মানুষ আমেরিকায় থাকে। আমেরিকা উদার গণতন্ত্রের দেশ। মস্ত বড় এক মহাদেশ। এই মহাদেশের ইতিহাসও বেশ রঙিন। এবং ঘটনাবহুল। সেই কবে ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। যদিও কলম্বাস আবিষ্কার করার বহু বছর আগে থেকে, তা প্রায় ১৬০০০ ( ষোল হাজার বছর) আগে এশিয়া ও সাইবেরিয়া থেকে আসা মানুষেরা এখানে বসবাস করত। সম্মিলিতভাবে বসবাসকরা এই সব মানুষদের বলা হত – ক্লোভিস ম্যান। তারপর কয়েকশো বছর পেরিয়ে গেছে। আজ পৃথিবীর বৃহত্তম ধনীর দেশ আমেরিকা। মহাশক্তিধর, প্রবল প্রতাপ নিয়ে বিশ্ব শাসন করার দেশ আমেরিকা। এই আমেরিকার একটা পুরানো নাম রয়েছে- “টার্টল আইল্যান্ড”।
আধুনিক আমেরিকার নামকরণ করা হয়েছে ইতালীয় অভিযাত্রী আমেরিগো ভেসপুচির নাম থেকে। ১৫০৭ সালে জার্মান মানচিত্রকর মার্টিন ওয়াল্ডসিম্যুলার সারা পৃথিবীর একটি মানচিত্র তৈরী করেন। সেই মানচিত্রে তিনি ইতালীয় আবিষ্কারক ও বিখ্যাত মানচিত্রকর আমেরিগো ভেসপুচির নামানুসারে পশ্চিম গোলার্ধের নামকরণ করেন “আমেরিকা”।
আমেরিকা নামের অর্থ হল- চির শক্তিশালী বাতাসের দেশ। A Country of perpetually Strong Wind or The Land Of the Wind.
আমেরিকার জাতীয় পতাকাও খুব বর্ণময়। লাল সাদা ডোরাকাটা রয়েছে তেরোটা। আর কোণায় রয়েছে নীল তারা পঞ্চাশটি। তারাগুলো ছ’টা করে পাঁচ সারি, আর পাঁচটা করে চার সারি। খুব সুন্দর করে সাজানো এই পঞ্চাশটি নীল তারা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্য। আর ঐ তেরোটি লাল সাদা ডোরাকাটা হল একসময়ে বৃটিনের অধীনে থাকা স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া তেরো রাষ্ট্র।
আমাদের ছেলেবেলায় আমেরিকাকে নিয়ে অনেক কল্পনার গল্প থাকত। মনে হত আমেরিকা বুঝি সব পেয়েছির দেশ। সে এক ওয়ান্ডারল্যান্ড। বিশাল ধনী মানুষেরা সেখানে বসবাস করে। ওখানে শুধুই আনন্দ। কারো কোনও দুঃখ নেই। খাবারের অভাব নেই। অর্থের অভাব নেই। আমরা তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশ। সব কিছুতেই যেন থার্ড ক্লাস ছিলাম! তাই পরিচিতদের কেউ আমেরিকায় গেছে বা থাকে শুনলে একটু চোখ বড় বড় করে দেখতাম তাঁদের। দূর থেকে সমীহ করতাম।
তারপর যখন একটু লায়েক হলাম, উঁচু ক্লাসে উঠলাম, উঁচু ক্লাসের দাদাদের সাথে গল্প করার সুযোগ হল। ছাত্র রাজনীতির পাঠ নিলাম। পল রোবসনের গান গাইতে শিখলাম। তখন আবার জানলাম, না, আমেরিকা তত ভালো নয়! ওরা ভিয়েতনামের সাথে যুদ্ধ করেছে। ওরা অন্যায়কারী। ওরা যুদ্ধবাজ একটা দেশ। অস্ত্র ব্যবসা করে পুঁজি বাড়ায়। পৃথিবীর সেরাদের টাকা দিয়ে কিনে নেয়। ( “ছেলে খারাপ হলে সমাজ দুষবে, ভালো হলে আমেরিকা নিয়ে নেবে!..”) তখন আবার আমেরিকাকে একটু বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করলাম। “তোমার নাম, আমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম …” খুব শুনছি। আর আমেরিকাকে দুষছি দু’বেলা!
আমেরিকার বহুজাতিক সংস্থাগুলো আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের পিছিয়ে থাকা দেশের শিল্প বাণিজ্যে দখলদারী নিয়ে নিচ্ছে। ওরা সাম্রাজ্যবাদী। ওরা আগ্রাসী। তখন এসব জেনে, বুঝে ধীরে ধীরে আমেরিকার থেকে দূরে সরে গেলাম!..
দেশ ভ্রমণ করতে করতে নিজের সুন্দর এই দেশের প্রায় অনেকটা দেখা ঘোরার পর যখন বিশ্বভ্রমণের সাধ জাগল মনে, তখন প্রথম যে চার পাঁচটা বিশ্বভ্রমণের কথা ভেবেছিলাম তার মধ্যে আমেরিকা নেই! অনেক পরে যদি সুযোগ পাই তো ল্যাটিন আমেরিকায় যাব। এই ছিল গোপন বাসনা। কারণ ল্যাটিন আমেরিকার একটা চোরা টান, একটা অদ্ভুত আকর্ষন আমাদের রয়েছে। কি সুন্দর সুন্দর সব দেশ – পেরু, চিলি, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, অ্যামাজনের জঙ্গল, ভেনিজুয়েলা সাও পাওলো, মাচু পিচ্চু এই সব জায়গার আকর্ষন আজও বড় ভয়ংকর রকমের মাতাল করা! আমি তো চিরকালের ভ্রমণসুধা পান করা এক মাতাল মহারাজ!..
আমি ইতিমধ্যে তিনটে বিদেশ ভ্রমণ করেছি। বাংলাদেশ, মিশর ও নেপাল। আমেরিকা আমার চতুর্থ বিদেশ ভ্রমণ। কন্যা- জামাতার জন্যই যাওয়া এই সফর। আমেরিকা নিশ্চয়ই হবে খুব ঝা চকচকে, ঝলমলে, উন্নত এক মহাদেশ। আমার তৃতীয় বিশ্বের চোখ না জানি কতবার ছানাবড়া হয়ে দেখবে সব কিছু। এই প্রথম দেখার বিস্ময় মুগ্ধতা পেরিয়ে অন্যদৃষ্টিতে দেখার একটা চোখ ও মন যত তাড়াতাড়ি তৈরী করে নিতে পারব, এই ৪২ দিনের আমেরিকা ভ্রমণের গল্পকথা লেখাও তত সহজ ও সুন্দর হবে।
বিমানে ওঠার জন্য আরও কিছুটা সময় বসে থাকতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল লাউন্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আমাদের মত আরও অনেক যাত্রী। তাঁরা কেউ যাবেন ব্যাঙ্কক, কেউ বা হ্যানয়, কেউ সিঙ্গাপুর, কেউ কুয়ালালামপুর। দোহার যাত্রীরাও রয়েছে। পায়ে পায়ে লাউঞ্জে একটু হেঁটে ঘুরে নিলাম। বিশ্ববাংলার একটা স্টল চোখে পড়ল। বাংলার হস্তশিল্পের সম্ভার। বেশ সুন্দর করে সাজানো স্টলের সজ্জা। অনেক বিদেশীদের দেখলাম স্টলে।
একটু পরেই টেক অফ করবে বিমান। মাটি ছুঁয়ে উড়ে যাব আকাশে। মেঘের দেশে ভাসব। ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যাব দোহা। তারপর আরও পথ পেরোতে পেরোতে ১৬ ঘন্টা আকাশের বুকে ঘুমিয়ে-জেগে, ভেসে ভেসে পৌঁছে যাব জে এফ কেনেডি বিমান বন্দরে। নিউইয়র্ক দিয়ে শুরু হবে আমার সফর।
লেখা হবে আমার আমেরিকা ভ্রমণের প্রথম কথাকাহিনি!..আমেরিকার ডায়েরি..
গুডবাই আমার মাতৃভূমি। আমার ভারতবর্ষ।গুডবাই আমার প্রিয় শহর কলকাতা।
ভালো থেকো সবাই।
শুভরাত্রি।