ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১৫)

সুমনা ও জাদু পালক

পালক টা তো লুকিয়ে রাখতে হবে ।নইলে তো দেখে ফেলবে মা। তখন হাজারো জিজ্ঞাসা ।কোথায় পেলি ওটা ?ঘরে এনেছিস কেন ?
কি করবি ওটা দিয়ে? এমনি আরও কত কি ।সুমনা যদি সত্যি কথাটা বলেও দেয় ,তাহলেও কি বিশ্বাস করবে মা ?
পাখিটা যে তার সঙ্গে মানুষের ভাষায় কথা বলেছে।পাখিটা যে বলেছে , তার দেওয়া পালকটা ম্যাজিক দেখাবে। এসব কথা সে মাকে বলবে কি করে ?পাখিটা তো বারণ করে দিয়েছে । তাছাড়া তার কথা তো মা বিশ্বাসই করতে চাইবে না।বলবে, ধুর ,কি আজগুবি কথা বলছিস শুনি! পাখি কখনো মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে নাকি? তুই রাত্রিবেলা স্বপ্ন দেখেছিলি নাকি?
তখন কি আর মায়ের মুখে মুখে তর্ক করতে পারবে সুমনা? সুমনা কি বলতে পারবে যে ,মা তুমি তো একদিন বলেছিলে ,আমাদের বাড়ির পিছনের বাগানে লঙ্কা গাছের গোড়া থেকে নাকি বাবা একটা আহত টিয়া পাখি পেয়েছিল? সে পাখিটা নাকি সুস্থ হওয়ার পরে রোজ সকালে ‘হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ’ বলতো!
না ,পারবেনা । তার চেয়ে পালকটাকে কাউকে না দেখিয়ে চুপি চুপি লুকিয়ে রাখতে হবে কোথাও। কিন্তু কোথায় রাখবে সুমনা? সরকার বাবুদের বাড়ির রাধামাধব মন্দিরে কাজ নেওয়ার পর থেকে মা তো ইদানিং কম যায় রান্নাঘরে। আর এখন তো অসুস্থ।
তাকিয়ে দেখে ,মা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। এই ফাঁকে চুপি চুপি রান্নাঘরে লুকিয়ে রাখতে হবে পালক টা ।মায়ের হাতটা গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দেয় সুমনা। রান্নাঘরে ঢুকে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে, কোথায় রাখবে পালক টা ।ঔঔঔৌভাবতেই হঠাৎ ঘুঁটের বস্তার পিছনে অনেকদিন থেকে পড়ে থাকা একটা পেট মোটা পুতুলের দিকে নজর যায় ওর।ওটার পেটের ভিতর তো সুন্দর লুকিয়ে রাখা যাবে পালকটা। যেই ভাবা সেই কাজ ।তাড়াতাড়ি পালক টা ওখানে রেখে দেয় সুমনা। আর মনে মনে বলে একটা ম্যাজিক দেখাও পালক
চার
রাতে বিছানায় শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসছিল না সুমনার ।ছটফট করছিল ।মা দুবার জিজ্ঞেস করল, কিরে, ঘুমোচ্ছিস না কেন? তোর কি শরীর খারাপ লাগছে ?
——না মা, কিছু হয়নি আমার। তুমি ঘুমাও ।
—–আয়, তোর মাথায় একটু ইলি বিলি কেটে দিই ছোটবেলার মতো। দেখবি , ঠিক ঘুম চলে আসবে ।
—–না না, কিছু করতে হবে না মা। তোমার নিজেরই তো শরীর খারাপ ।এইতো সবে দুপুরবেলা জ্বর ছাড়লো। তুমি আবার যদি রাত জাগো ,তাহলে শরীর খারাপ হতে পারে ।যদি োআবার জ্বর আসে !
—আর জ্বর আসবে না মা।
—- তুমি কি করে জানলে?
—– আমার শরীর, আমি জানব না !
——–কিচ্ছু জানোনা তুমি। এত যদি জানো, তাহলে শরীর খারাপ হল কেন?
—- মাঝে মাঝে একটু জ্বর-টর হওয়া ভালো।
— ছাই ভালো! তোমার শরীর খারাপ হলে আমার খুব চিন্তা হয় গো মা। বাবা আমাকে ছেড়ে কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে। আবার যদি তোমার শরীর খারাপ হয় হয় তাহলে…! …কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলে সুমনা ।সুনয়নী মেয়েকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে, কিচ্ছু হবে না মা ,আমার সোনার কিচ্ছু হবে না ।তোকে ফেলে রেখে আমি কোত্থাও যাবো না ।নে, আর কথা বলতে হবে না। এখন ঘুমো দেখি ।

সুমনা মায়ের বুকে মুখ গুঁজে চোখটা বন্ধ করে ঠিকই, কিন্তু ঘুম আসতে চায় না তার।মনে মনে ভাবে, কখন ম্যাজিক দেখাবে পালক টা? কত রাতে? ও যদি ঘুমিয়ে পড়ে তো কি হবে? এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একসময় সত্যি ঘুমিয়ে পড়ে সুমনা ।

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায় সুমনার। শুনতে পায় কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে। ভালো করে কান খাড়া করে সে ।ডাকটা তো রান্নাঘরের দিক থেকে আসছে ।ওই রান্নাঘরেই তো সে পাখির পালক টাকে রেখেছে। তবে কি —-তবে কি ?আবারো কান খাড়া করে ভালো করে শোনার চেষ্টা করে সুমনা।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।