ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৩৮)

সুমনা ও জাদু পালক

সবুজ পাখির দ্বীপের রানী চোখের জলে বিদায় দিল সুমনাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, রাজকুমারী রত্নমালা ,সাত বছর পরে তোমার দয়ায় মা হওয়ার সুযোগ পেয়েছি । তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই । দুষ্টু জাদুকর হূডুকে পরাজিত করে ফেরার পথে দয়া করে আমাদের এই সবুজ পাখির দ্বীপে একবার এসো। আমি তোমাকে তো এখন কিছুই দিতে পারলাম না । তুমি আরেকবার আমাদের এখানে এসে একটা সুন্দর উপহার তোমাকে দেওয়ার সুযোগ করে দিও আমাকে।
সুমনা বলল, হে সবুজ পাখির দ্বীপের রানী, আমি নই, তোমাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন স্বয়ং ভগবান আশুতোষ। তোমরা সেই ভগবান পশুপতি কে প্রণাম জানাও।
তোমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করো, ওই দুষ্টু জাদুকর হূডুকে হারিয়ে আমি যেন হাসিখুশি দ্বীপের কনক নগর রাজ্যকে ভয়ংকর অভিশাপ থেকে মুক্ত করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পারি। দুষ্টু জাদুকরের কবল থেকে আমি যেন মুক্ত করতে পারি পরীর দেশের রানী কে।
সবুজ পাখির দ্বীপের রাজা বলল, রাজকুমারী রত্নমালা, আমি বিশ্বাস করি যে, দুষ্টু জাদুকর হূডুকে হারিয়ে অবশ্যই জয়লাভ করবে তুমি।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, হে সবুজ পাখির দ্বীপের রাজা ও রানী ,এবার আমাদের নতুন পথে যাত্রা করার অনুমতি দিন।
সবুজ পাখির দ্বীপের রাজা বলল, সেনাপতি সোনালী ঈগল, রাজকুমারী রত্নমালা কে আমাদের রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এস ।
সেনাপতি সোনালী ঈগল ঘাড় কাত করে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য হে রাজন।

সবুজ পাখির দ্বীপের এলাকা পার হয়ে আবার উড়তে শুরু করল দুধরাজ। অনেকটা পথ যাওয়ার পরে একটা ছোট্ট নদীর পাড়ে এসে
দাঁড়াল দুধরাজ। সময়টা গোধূলি বেলা।নদীর পাড়ে বিস্তৃত বালিয়াড়ি। আর সেই বালিতে খেলা করছে ছোট ছোট লাল রঙের অসংখ্য কাঁকড়া।
কাঁকড়া গুলো বালির উপরে ছোটাছুটি করছে। সামান্য শব্দ পেলেই ঢুকে যাচ্ছে গর্তের ভিতর। সারা বালিয়াড়ি জুড়ে টুকটুকে লাল রংয়ের কাঁকড়া গুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন একমুঠো লাল ফুল কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে এখানে।
সুমনা কখনো লাল রঙের কাঁকড়া দেখেনি ।তাই একসঙ্গে এতগুলো লাল রঙের কাঁকড়া দেখে খুব আনন্দ হল ওর। সে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো। আর কী আশ্চর্য। সুমনা হাততালি দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নদীর বুকের ভেতর থেকে গুরগুর আওয়াজ উঠতে শুরু করল। নদীর বুকে উঠলো প্রচন্ড ঢেউ। ফুলে-ফেঁপে উঠতে শুরু করল নদীর জল। নদীর জলের স্রোত এসে আছড়ে পড়তে শুরু করল বালিয়াড়িতে।
কিছুক্ষণ পরে সুমনা দেখতে পেল, নদীর বুকে ঢেউয়ের মাথায় বসে বিশাল বড় কিছু একটা ভেসে আসছে।কী ওটা?
বিশাল বড় শুকনো গাছের টুকরো নাকি কোন অজানা জীব?
দুধরাজ ও দেখছিল ওটা। সেও সতর্ক হয়ে গেছিল, যাতে বিপদ বুঝলেই উড়তে পারে আকাশে।
আরেকটু কাছে আসতেই ওটাকে চিনতে পারল সুমনা। আরে, ওটা তো একটা কচ্ছপ। কিন্তু এত বড়!
এত বড় কচ্ছপ চোখে দেখা তো দূরে থাক, এত বড় কচ্ছপের কথা কখনো শোনেইনি সুমনা।
ওটা আবার কি মতলবে আসছে কে জানে!
জলের ঢেউয়ে নদীর পাড়ে এসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কচ্ছপটা গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দুধরাজের কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেল।

অত বড় কচ্ছপ টাকে দেখে দুধরাজ একটু সরে দাঁড়ালো। কচ্ছপটা খোলের ভিতর থেকে লম্বা গলা বের করে ঘাড় সোজা করে বলল, একি! তুমি কি আমাকে দেখে ভয় পেলে নাকি পক্ষীরাজ? দুধরাজ গম্ভীর স্বরে বলল, মোটেই না, আমি ভয় পাইনি। আর একটা কথা, আমি পক্ষীরাজ নই, আমি দুধরাজ।
কচ্ছপ টা খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল,
ওই একই হলো। ডানাওয়ালা ঘোড়াকে আমি পক্ষীরাজ বলেই জানি। ছোটবেলা থেকে ঠাকুরমা,দিদিমার মুখে রূপকথার গল্পে আমি তো তাই শুনেছি। যাক ওসব কথা, এখন বলো তো একটু আগে কে হাততালি দিয়েছিল, তোমার পিঠে যে কিশোরী বসে আছে সে না অন্য কেউ?
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, হ্যাঁ, বালিয়ারির বুকে লাল কাঁকড়াদের খেলা দেখতে দেখতে আনন্দে হাততালি দিয়েছিল রাজকুমারী রত্নমালা। কিন্তু তাতে কি?
বিশাল কচ্ছপ টা এবার এক মজার কান্ড করলো। সে লম্বা গলা টা বের করে ঈষৎ ঝুঁকিয়ে বলল, রাজকুমারী রত্নমালা কে নমস্কার জানাই। রাজকুমারীর জন্যই অনেকদিন বাদে আমি নদীর জল থেকে উঠে ডাঙায় আসতে পারলাম, মুক্তি পেলাম জাদুকর হূডুর অভিশাপ থেকে।
জাদুকর হূডুর নাম শুনে সুমনা বিস্ময়ে
প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো, তোমাকেও বন্দি করে রেখেছিল জাদুকর হূডু?–কোথায় কিভাবে?
কচ্ছপ টা বলল, তাহলে বলি আমার কথা।

(চলবে)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।