শুভ্র হাঁটছে। মেঠো পথ। বড় বড় গাছের ছায়ায় পথ শীতল হয়ে আছে। এই জঙ্গলে নানা ধরণের অনেক গাছ আছে। সব গাছকে চেনে না শুভ্র। নাম জেনেছে কিছু গাছের। চিকরাশি, অর্জুন, মেহগনি, ময়না, চাঁপ, টুন, চিলৌনি। ছায়াঢাকা নির্জন শান্ত পথে শুভ্র এখন একাই হাঁটছে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে দু’কিমি পথ পেরিয়ে থামবে মনমাতিয়ায়। সেখানে একটু বিশ্রাম। ভিক্টোরিয়ার মোমো খাবে। দুটো গল্প, কথা হবে। তারপর আরো পাঁচ কিলোমিটার পথ ভেঙ্গে পৌঁছবে রাইবস্তির হরিশংকর থাপার কাছে।
শুভ্র আপনমনে হাঁটছে। পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে অনবরত। রঙ বেরঙের প্রজাপতিও দেখা যাচ্ছে অনেক। এমন শান্ত নির্জন বনপথের ছায়ায় ছায়ায় হাঁটতে বেশ লাগছে। এতটুকু ক্লান্তি নেই। শুভ্র মনের আনন্দে গুনগুন করে নিজের প্রিয় একটা গান গাইতে গাইতে চলেছে, “আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে, বিশ্ব ঘরে পেতাম না ঠাঁই…”
পথের ধারে হঠাৎ চোখে পড়ল গাছের ছায়ায় বসে আছে এক পাহাড়ি মানুষ। সুস্থ মনে হল না মানুষটাকে। চোখে মুখে রুগ্নতার ছাপ। শুভ্র কাছে গিয়ে দেখল মাঝবয়সী মানুষটা কাঁপছে। গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারল, ভালো জ্বর ওর গায়ে এখন। শুভ্র বলল, “ঘর কাঁহা?”
“সামনেই আছে বাবু।”
“তোমার তো জ্বর গায়ে। দাওয়াই কিছু নিয়েছো?”
মানুষটা মাথা নেড়ে বলল, “নেহি বাবু, কহাঁ মিলেগা?”
“আমার কাছে দাওয়াই আছে। তুমি খাবে?”
“হাঁ হাঁ দিজিয়ে না বাবু।” মানুষটা জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
শুভ্র বোতলের জল ওর মুখে ঢেলে একটা জ্বরের ট্যাবলেট খাইয়ে দিল। তারপর আরও দুটো ট্যাবলেট অসুস্থ মানুষটার হাতে দিয়ে বলল, “দুপুরকা খানা খানেকে বাদ একঠো, আউর রাতমে একঠো, সামঝা না?”
মানুষটা হাত জোড় করে বলল, “হাঁ হাঁ বাবু, সমঝ গয়া। নমস্তে বাবু।”
শুভ্র আবার হাঁটছে। একটু একটু করে নীচে নেমে চলেছে। আর সামান্য চড়াই পেরিয়ে পড়বে মনমাতিয়া।
দুটো ছোট্ট ছেলে-মেয়ে পথের ধারে খেলছিল। শুভ্রকে দেখে হঠাৎ ওরা খেলা থামিয়ে বলল, “বাবু, মিঠাই?”
শুভ্র দুটো লজেন্স ওদের হাতে দিয়ে বলল, “তোদের নাম কি রে?”
ছেলেটা বলল, “সূরয।”
মেয়েটা বলল, “তিতলি।”
সূরয ও তিতলির সাথে দু’দণ্ড সময় কাটিয়ে শুভ্র হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল মনমাতিয়ায়। ভিক্টোরিয়া দোকানেই ছিল। শুভ্রকে দেখে যেন দারুণ খুশি মনে হল ওকে। শুভ্রও খুব খুশি হয়ে বলল, “মোমো খাব। গরম গরম মোমো দাও।”
ভিক্টোরিয়া আজ যেন একটু বেশিই সেজেছে। ওর পনি টেইল করা চুলে একটা বাহারি ক্লিপ। চোখে হাল্কা কাজল। ঠোঁটে লিপস্টিক, আর রঙিন টপে বেশ লাগছে। হাসিখুশি ভিক্টোরিয়া মোমোর গরম প্লেটটা শুভ্রর হাতে দিয়ে বলল, “স্যার, ‘লোকডাউন’ ক্যায়া চিজ হ্যায়?”
শুভ্র অবাক হয়ে বলল, “কি ডাউন!”
“সব্বাই তো তাই বোলছে, ‘লোক ডাউন’।”
শুভ্র কিছুই না বুঝতে পেরে ওর কথায় আর গুরুত্ব দিল না। গরম মোমো খেতে খেতে ভিক্টোরিয়ার সাথে গল্প জুড়ে দিল, “আজ মোমো তে তুমি কি দিয়েছো? বহুত খুশবু আসছে!”
“অলাগ কুছ তো নেহি দিয়া স্যার। একহি চিজ দিয়া।”
“কিন্তু আজকে যেন বেশি ভালো লাগছে খেতে!”
ভিক্টোরিয়া লজ্জা লজ্জা মুখে চেয়ে থাকল শুভ্রর দিকে। শুভ্রও বেশ উদাসী ভাবুকের মত ডুকপা সুন্দরী ভিক্টোরিয়াকে দেখছে। দু’জনের এই নীরব চেয়ে থাকার মুহূর্তটায় দু’জনেই বেশ আনন্দ পেল।
“স্যার চা বনাই?”
“আচ্ছা সে বানাও। নিমক চা বানাও।”
“স্যার, নিমক চা আচ্ছা লাগে!”
“বহুত আচ্ছা লাগে।”
ভিক্টোরিয়া একথা শুনে খুশি হয়ে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”
ভিক্টোরিয়া চা বানাচ্ছে। শুভ্রর হঠাৎ মনে হল ওর একটা স্কেচ করবে। খাতা পেন্সিল বের করল। কিন্তু কেমন যেন সঙ্কোচ হল বিনা অনুমতিতে স্কেচটা শুরু করতে। তাই অল্প হেসে বলল, “তোমার একটা ছবি আঁকব?”
ভিক্টোরিয়া বুঝতে না পেরে বলল, “ফোটো খিঁচবে?”
“না না।” শুভ্র ওকে বুঝিয়ে দিয়ে বলে, “তোমায় দেখে দেখে একটু আঁকব। পেন্সিল স্কেচ করব।”
ভিক্টোরিয়া সামনের চেয়ারটায় বসল। আজ ভিক্টোরিয়াকে যেন বেশি সুন্দরী লাগছে। শুভ্র বেশ দরদ দিয়েই চটজলদি একটা পেন্সিল স্কেচ করে ফেলল। মনে হল, বেশ হয়েছে স্কেচটা। শুভ্র নিজেই কেমন অবাক হয়ে গেল। ভিক্টোরিয়া তো দারুণ খুশি। কতবার হাসল, হেসে থ্যাঙ্ক ইউ বলল। ঘর থেকে ওর মা বেরিয়ে এসে বললেন, “বেটা বহুত সুন্দর হুয়া!”
শুভ্র ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দিল পেন্সিল স্কেচটা। ভিক্টোরিয়া তো প্রথমে বুঝতে পারে না কি করবে! শুভ্র বলল, “এটা তুমি রেখে দাও। গিফট করলাম তোমায়! তোফা মেরে তরফ সে।”
ভিক্টোরিয়া ভীষণ খুশি হয়ে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, বহুত বড়িয়া গিফট!”
শুভ্র আবার হাঁটা শুরু করেছে। মনমাতিয়া থেকে রাইবস্তি শুধুই নামা। রোদ একটু চড়েছে। কিন্তু কোনও কষ্ট হচ্ছে না।
এই বনপথে কত রকম পাখি ডাকছে। পোকারা কত রকম শব্দে গুন গুন করছে। শুভ্র আপন খেয়ালেই হাঁটছে।
রাইবস্তিতে গিয়ে মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যাবে। কতদিন কারো সাথে কোনও কথা হয় নি। রাইবস্তি থেকে যেদিন শেষবার মায়ের সাথে কথা হল, মা শুধু বলেছিল, “সাবধানে থাকবি। কি একটা খারাপ রোগ নাকি পৃথিবীতে এসেছে। চিনে অনেক লোক মারা গেছে। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগ। আমাদের এখানেও আসতে পারে।”
শুভ্র তখন খুব হাল্কা হাল্কা জেনেছিল, একটা খারাপ ভাইরাস পৃথিবীতে এসেছে। সবাইকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। এর বেশি কিছু তখন জানতে পারে নি। আর ভাবেওনি এটা নিয়ে।
আজ আকাশ বেশ নির্মল। মেঘ নেই। বৃষ্টির ভয়ও নেই। দু’দিন আগেই খুব ভিজেছিল। সেদিন সুদেবের সাথে পাথরচাটা নদীর পাশের ভাঙ্গা শিব মন্দির দেখতে গিয়েছিল। প্রবল বৃষ্টির তোড়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা জলের ধাক্কায় এই মন্দির বহু বছর আগে ভেঙ্গে গিয়েছে। সেই ভাঙ্গা মন্দিরের কাছে পৌঁছে হঠাৎ বৃষ্টি এসে যায়। কোথাও পালিয়ে বাঁচার উপায় ছিল না। দু’জনেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজেছিল। সেই বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ শুভ্র সেদিন দারুণ উপভোগ করেছে। আর মন্দিরের ভাঙ্গা পাঁচিলের গর্তে হঠাৎ দেখা গোখরো সাপের ভয়ংকর ফণার এক ঝলক শুভ্রকে উত্তেজনায় বিহ্বল করে দিয়েছিল। উফ আজও মনে পড়লে গা কেমন শিউড়ে ওঠে!
দুপুরের রোদ এখন বেশ চড়া। শুভ্র একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আর অল্প একটু পথ বাকি। শুভ্র সেই পথটুকু হেঁটে এসে রাইবস্তিতে পৌঁছতেই হরিশংকর কেমন চোখ বড় বড় করে বলল, “ভাইয়া, এক বহুত বুরা খবর হ্যায়।”
শুভ্র ঠিক বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে বলল, “কি খবর?”
“ভাইয়া, সারা দেশে পুরা লকডাউন হয়ে গেছে। সব বন্ধ। আপনি আর কলকাতায় যেতে পারবেন না এখন।”
‘মানে!” শুভ্র ভীষণ অবাক হয়ে বলল।
হরিশংকর বারবার বলতে লাগল, “ভাইয়া, আপনাকে এই খবরটা পৌঁছে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু হাট ছিল না বলে কোনও আদমি গাঁও থেকে নামা ওঠা করছিল না। আমিও মদনপুরে গিয়ে হস্টেল থেকে ছেলে মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য বিজি হয়ে পড়েছিলাম। নিজে ছুটে গিয়ে সোনাখাঁয় আর খবরটা দিতে পারি নি। এখন তো ট্রেন, বাস, প্লেন সব বন্ধ। টোটাল লকডাউন।”
সোনাখাঁয় ওঠার পর মোবাইল আর কাজ করে নি। তাই ব্যাগের মধ্যে মোবাইলটা নিস্তেজ ও নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। এখন মোবাইলটা ব্যাগ থেকে বের করে শুভ্র অন করল। টাওয়ার নেই। কিন্তু একটু একটু করে নেটওয়ার্ক ঠিক হতেই পর পর মেসেজ ঢুকতে শুরু করল। মিসড কলগুলো গাদা গাদা শো করল।
শুভ্র প্রথমেই মাকে ফোন করল। মা তো ফোন পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুই ভালো আছিস তো? কি করে ফিরবি বল তো! আমরা তো তোকে কিছুতেই ফোনে পাচ্ছিলাম না।” সামনেই দাদা ছিল, দাদা ফোনটা নিয়ে খুব গম্ভীর ভাবে বলল, “সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে। মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গোটা ভারতবর্ষকে! সব মানুষকে একদম গৃহবন্দী থাকতে বলা হয়েছে। কোভিড নাইনটিন নামক এক ভয়ংকর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।”
শুভ্র দাদাকে একটু থামিয়ে দিয়ে বলল, “আমি যখন কলকাতা ছেড়ে ছিলাম তখনই কিন্তু এমন একটা খবর শোনা গিয়েছিল।”
“সেই খবর এখন সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে।” দাদা এরপর আরোও বলল, “চিন ও ইটালিতে বহু মানুষ মারা গেছে। আমেরিকায় দ্রুত ছড়াচ্ছে এই রোগ।”
“এ তো তবে মহামারি!” শুভ্র ভয়ে-আতঙ্কে কথাটা বলল।
“ভারতে তিরিশে জানুয়ারি প্রথম এই রোগ ধরা পড়ে কেরালায়।”
“তাই! কি ভাবে বোঝা গেল?”
“চিনের উহান থেকে এক ভারতীয় ছাত্র কেরালায় ফিরে আসে। সেই ছাত্রই প্রথম এই কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। আর আমাদের রাজ্যে গত সতেরোই মার্চ প্রথম এই রোগে আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গেছে।”
“খুবই ভয়ংকর অবস্থা তাহলে।”
“সত্যিই ভয়ংকর। একটু একটু করে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। তুই কি করবি এখন বল তো?”
শুভ্র চুপ করে থাকে। অপ্রত্যাশিত এমন এক ঘটনায় ও কেমন বিচলিত বোধ করে। তাই একটু ভেবে বলল, “আমি তোকে ফোন করে একটু পর সব জানাচ্ছি। মাকে চিন্তা করতে মানা কর।”
হরিশংকর যা বলল, তা শুনে শুভ্র অবাক ও আশ্চর্য হয়ে ভাবল, এমন অনিশ্চিত একটা সময়ের মধ্যে ও এখন কি করবে? কোথায় যাবে? কোথায় থাকবে? কবে সব কিছু স্বাভাবিক হবে ঠিক নেই। আপাতত লকডাউন ওয়ানের একুশ দিন ওকে এখানেই থাকতে হবে। এই পাহাড়ে, এই জঙ্গলে!
হরিশংকরের কাছে এখন কোনও গেস্ট নেই। ও নিজের ছেলে মেয়েকে হস্টেল থেকে নিয়ে চলে এসেছে। স্কুল, কলেজ সব অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।
পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পাইপের জলে হাত মুখ ধুয়ে শুভ্র একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল। গলা ভিজিয়ে জল খেল। হরিশংকর বাড়ির বাগানে একটা চেয়ার পেতে দিয়ে বলল, “একটু চা খাবেন?”
শুভ্র বলল, “খুব কড়া করে এক কাপ চা বানাও।”
চা খেতে খেতে শুভ্র চারপাশের পাহাড়, জঙ্গল, ক্ষেতি, বাড়ি, গুম্ফার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, বাধ্য হয়ে যদি এমন নির্জন বনবাসে এই পাহাড়-জঙ্গলে থাকতেই হয় কিছুদিন, মন্দ কি! তারপর কড়া করে বানানো ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিয়ে মনে মনে বলল, “আহ!”