সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ১৯)

কেমিক্যাল বিভ্রাট

তাই জবালা যখনই আসেন, বারবার করে বাবাকে বলে যান, দিন হোক বা রাত হোক, যতই কলিং বেল টিপুক, দরজা ধাক্কাক, নাম ধরে চিৎকার করে ডাকুক, চেনা স্বর হলেও দরজা খোলার আগে অন্তত একবার ঘুলঘুলি দিয়ে দেখে নেবে, সে কে। তার পর খুলবে।

আর এই ভরসন্ধের মুখে উনি কিনা হাট করে দরজা খুলে রেখেছেন! তাও সামনের ঘরে এমন একজনকে বসিয়ে রেখে গেছেন, যাকে তাঁর মেয়েও চেনে না, তার ওপর উনি আবার বড় মুখ করে বলছেন, আমি চোর। সত্যিই… বাবাকে নিয়ে আর পারা যায় না।— বাবা কোথায়?

ছেলেটার কোনও হেলদোল নেই। সে বলল, ও, উনি? উনি তো আমার জন্য ব্যান্ড ডেট কিনতে গেছেন…

— ব্যান্ড এইড? বাবা? মানে?

জবালা আকাশ থেকে পড়লেন। যে বাবাকে ও বাড়ির বাইরে বেরোতে বারণ করে গেছে। যা লাগে, দু’-একদিন পর পর স্কুল থেকে ফেরার পথে ও নিজে এসে কিনে দিয়ে যায়, যাতে বাবার কোনও কষ্ট না-হয়, সে-ই বাবা কিনা একটা বাইরের লোকের জন্য ওষুধের দোকানে গেছে! বাবার ওপরে বিরক্ত হলেও ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি তো অদ্ভুত লোক। দেখছেন একজন বৃদ্ধ মানুষ। কোথায় তাঁর জন্য আপনি ওষুধ কিনতে যাবেন, তা নয়, উলটে তাঁকেই পাঠিয়েছেন ওষুধ কিনতে? ব্যাপারটা কি?
— ব্যাপারটা কিছুই না। আমার হাঁটু আর কনুইয়ের কাছটা ছড়ে গেছে তো… সেটা দেখে উনি আর ঠিক থাকতে পারলেন না…

ও এ কথা বলতেই জবালার চোখ চলে গেল ছেলেটার কনুইয়ের দিকে। হ্যাঁ, একটু ছড়ে গেছে বইকী। রক্তও বেরোচ্ছে। হাঁটুটা দেখা যাচ্ছে না। টি-টেবিলে ঢাকা পড়ে আছে। হ্যাঁ, ও যখন বলছে, হাঁটুর কাছটাও ছড়ে থাকতে পারে। তা বলে কি একটু হাঁটা যায় না! ওষুধের দোকান তো আর সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে নয়। কিন্তু এ যখন বলছে, বাবা গেছে। তার মানে বাবা নিজে থেকেই গেছে। কিন্তু কেন?

এই ‘কেন’টাই বলল সে। সে নাকি অনেক দিন এ পাড়ায় আসেনি। তাই এখানকার লোকেরা একটু গা ছাড়া দিয়ে আছে। এই-ই সুযোগ। গত কাল সন্ধে গড়িয়ে যাওয়ার পরেই ও চুপিচুপি এ পাড়ায় ঢুকে পড়েছিল। পাড়ার ভেতরে যে রথতলাটা আছে, সেখানে একটা রথ থাকলেও, বেশ কয়েক বছর ধরে সেটা বেরোচ্ছে না। বর্ষার সময় উপর থেকে জল পড়ে পড়ে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। রংটং তো উঠেইছে। কাঠও পচতে শুরু করেছে। এখন ভেঙে ভেঙে পড়ছে। ফলে ওর সামনে দিয়ে পাড়ার লোকেরা যাতায়াত করলেও কারও নজর সেখানে খুব একটা পড়ে না। তাই ও চার পাশটা ভাল করে দেখে নিয়ে তার মধ্যে ঘাপটি মেরে লুকিয়েছিল।

রাত যখন অনেক, তখন ও বেরিয়েছিল চুরি করতে। কিন্তু কে জানত, সামনের বাড়ির দোতলার লোকটা অনিদ্রা রোগে ভোগে। লাইট-টাইট নিবিয়ে সারা রাত ঝুলবারান্দায় বসে বসে তারা গোনে। অন্ধকার থেকে কী ভাবে একটু একটু করে আলো ফোটে, সেটা দেখে।

তা দেখুক, কিন্তু তাকে দেখল কেন! আর যদি দেখেও থাকে, হঠাৎ অত জোরে চোর চোর বলে চিৎকার করে উঠল কেন! আর উনি চিৎকার করলেও এ বাড়িতে ও বাড়িতে পটাপট আলো জ্বলে উঠল কেন! আলো জ্বললেও হুটহাট লোকজন বাইরে বেরিয়ে এল কেন! লোকজন বেরোলেও তাকে তারা দেখতে পেল কেন! দেখতে পেলেও ও ভাবে তাড়া করল কেন!

তাড়া খেয়ে সে যখন পাঁচিল টপকে এ বাড়িতে ঢুকল, আলতো করে ঠেলে দেখল, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। তাই পাশের সরু প্যাসেজটায় ঢুকে জানালার গ্রিল দিয়ে উঁকি মেরে রাত-বাতির হালকা আলোয় দেখল, উনি অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। পেছনে তখন ওরা। যে কোনও মুহূর্তে এখানে চলে আসতে পারে। ওর মনে হল, বাড়ি সারানোর জন্য বহু দিন আগে নিশ্চয়ই ইট-বালি-সিমেন্ট কিনেছিলেন উনি। কয়েক বস্তা বালি হয়তো বেচে গিয়েছিল, সেগুলি আর ফেরত দেওয়া হয়নি। ওখানেই রেখে দিয়েছিলেন। ভাগ্যিস রেখেছিলেন। তাই ওই বস্তাগুলির পাশে, আর একটা বস্তার মতোই ‘দ’ হয়ে ঘাপটি মেরে রইল সে।

কিন্তু ওরা ছাড়বার পাত্র নয়। পিছু পিছু এসে আশপাশের বাড়িগুলিতে নক করতে লাগল, অপরিচিত কেউ ঢুকেছে কি না। ও দেখল, এ বাড়িতেও দু’-তিনটে ছেলে এসে কলিং বেল টিপল। কলিং বেলের আওয়াজ পাওয়া মাত্রই ঘরের ভেতরে লাইট জ্বলে উঠল। জ্বলল সদর দরজার মাথায় লাগানো লাইটটাও। সেই আলো ওর গায়ে পড়লেও পড়তে পারে ভেবে, টান টান হয়ে ও শুয়ে পড়ল বস্তাগুলির আড়ালে।

ছেলেগুলো ওনাকে বলে গেল, বাড়িতে কেউ ঢোকেনি তো… এ দিকে একটা চোর এসেছে। একটু সজাগ থাকবেন। বলেই, অন্য বাড়ির দিকে ওরা চলে গেল। ওরা চলে যেতেই উনি বস্তাগুলির দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, এই যে বাছা, ভেতরে এসো। কতক্ষণ আর ওখানে শুয়ে থাকবে! ওরা দেখতে পেলে আর আস্ত রাখবে না।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।