ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজ জাপানের ডায়েরি || সুব্রত সরকার – ১

ভ্রমণের নেশা সব নেশাকে ছাপিয়ে যায়। এ নেশা মাতাল করে মনকে। চোখে ঘোর এনে দেয়। মন বড় বিবাগী হয়। তাই তার সীমা একটু একটু করে বাড়তে থাকে। পা দুয়ার থেকে উঠোন টপকে, পাড়া, গ্রাম, শহর, জেলা, রাজ্য, দেশ পেরিয়ে চলে যায় বহুদূরে…আর এভাবেই শুরু হয়ে যায় প্রবল ইচ্ছেটা- দেখব এবার জগৎটাকে। কিম্বা মনে হয়, বহু বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে!..
আমার নিজের দেশটা বড় সুন্দর। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী ঘুরে বেড়ানো হয়েছে। কোথাও কোথাও তো একাধিক বার গিয়েছি। তবু কিছু কিছু বাকি রয়ে গেছে আজও। নিশ্চয়ই যাব আমার স্বদেশের সেই সব অচেনায় একদিন, একবার তো বটেই।
নিজের দেশ বেড়ানো যখন অনেকটা হয়েছে, মন বলছে, চলো মন বিদেশ যাই!.. এই পৃথিবীটা মস্ত বড়। কতগুলো মহাদেশ রয়েছে। মহাসমুদ্র রয়েছে। দুশোরও বেশি দেশ নিয়ে আমাদের এই পৃথিবী। এক জীবনে কোনওদিনই সম্ভব হবে না পৃথিবীকে ঘুরে দেখা। তাই বাছাই পর্বের মধ্যে দিয়েই এগোতে হবে। এ বড় কঠিন কাজ!.. কাকে ছেড়ে কাকে রাখব। সবাই যেন ডাকছে তাঁর সুবিখ্যাত ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে অপরূপ সুন্দর হয়ে।
আমি নিজের মত করে ঝাড়াই বাছাই শুরু করলাম। একে একে শেষ করলাম কয়েকটা বিদেশ ভ্রমণ। ইতিমধ্যে আমার পাঁচটা বিদেশ ভ্রমণ হয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, মিশর ও আমেরিকা। আমেরিকায় চল্লিশ দিন ঘুরে বেড়িয়েছি। সেই ভ্রমণকথা নিয়ে লেখাও হয়েছে “আমেরিকার ডায়েরি”। আমেরিকার মত অত বড় একটা মহাদেশে মাত্র চল্লিশদিন ঘুরে বেড়িয়ে সব দেখা জানা সম্ভব হয় না। তবু যতটুকু দেখেছি, জেনেছি তাই নিয়ে লিখেছি একটা আস্ত বই – “আমেরিকার ডায়েরি।”
আমার ষষ্ঠ বিদেশ ভ্রমণ হলো জাপান। এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ এক দেশ। আজকের উন্নত পৃথিবীতে জাপান অন্যতম এক অগ্রণী দেশ। জাপান বহুদিনের স্বপ্ন ছিল আমার। সযত্নে লালন করে এসেছি এই গোপন ইচ্ছেটাকে। সব স্বপ্ন যেমন সত্যি হয় না, ঠিক তেমনই আবার জীবনে কিছু কিছু স্বপ্ন সত্যি হয়ও। আর সেই সত্যি হওয়া স্বপ্নের দেশে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দটা যে কি অনাবিল, কি আশ্চর্য সুন্দর হয়, তা মনই জানে। আর জানে আমার মুসাফির হৃদয়!
জাপান সারাবছরই যাওয়া যায়। কিন্তু খুব আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে জাপান- চেরি ফুলের সময়। জাপানে বসন্ত সমাগম হয় এই চেরি ফুলের উৎসবে- চেরি ব্লসম। সময়টা মার্চের মাঝামাঝি শুরু হয়। মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত এর রূপ রস গন্ধ উপভোগ করা যায়। আমাদের দেশেও বসন্ত আসে এই চৈত্র দিনের ঝরা পাতার গান নিয়ে। ফেব্রয়ারি – মার্চ, আমাদের ফাল্গুন – চৈত্র। শিমুল পলাশ কৃষ্ণচূড়া বনে বনে আগুন ধরায়। মন তখন গুন গুণ করে ফাগুনেরও মহুয়ায়!..
তাই আমিও সেই নেশায় মাতাল হলাম। চেরি উৎসবের জাপানকে দেখব বলে নিজেকে মাতিয়ে তুললাম। চললাম জাপান। “মেরা জুতা হায় জাপানি, ইয়ে পাতলুন ইংলিশ তানি … গুন গুন করতে করতে বুক করে ফেললাম একটা টিকিট!.. হ্যাঁ যাব দলের সঙ্গে, কিন্তু আমি একা!..এই একা একাকিত্ব নয়! এই একার আনন্দ বড় অন্যরকম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিখে নিতে হয়েছে এই একলা বাঁচার আনন্দ ও একলা চলার ছন্দ। তাই জীবন আমাকে এক নতুন জীবন দিয়েছে। এই নতুন জীবনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। করজোড়ে প্রণাম জানাই, “হে মহাজীবন তোমারে সেলাম!..”
আমার পরিচিত ট্রাভেল কোম্পানি ” TRAVEL LIVE” কেই বেছে নিলাম। ওদের ন’রাত দশ দিনের” Imperial Japan” এর সফরসূচী পছন্দ হয়ে গেল। যাত্রাশুরু ২১ মার্চ, ২০২৫। শুক্রবার। এই দশদিন জাপানের বিখ্যাত বিখ্যাত সব জায়গায় ঘুরে বেড়াব- টোকিও, কিওটো, হিরোশিমা, ওসাকা, নারা, শিজুওকা। তালিকায় বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে – ইম্পেরিয়াল প্যালেস, টোকিও টাওয়ার, মাউন্ট ফুজি, লেক আশি, কিওমিজু টেম্পল, কিনকাকু টেম্পল, নিজো ক্যাসল, হিরোশিমা অ্যাটমিক বম মিউজিয়াম, মিয়াজিমা, ইসুকুশিমা শিরিন, নারা ডিয়ার পার্ক, তোদাজি টেম্পল এবং জাপানের বিখ্যাত বুলেট ট্রেন। আর বিশেষ আকর্ষণ- Famous Sky Tree in Tokyo।
যে কোনও জায়গায় যাওয়ার আগে একটু তো জায়গাটা সম্পর্কে জানকারি হওয়া দরকার। বিশেষ করে সে যদি হয় আবার নিজের চেনা গন্ডীর বাইরে অচেনা বিদেশ। ভ্রমণে যাওয়ার আগে সেই অজানা জায়গা সম্পর্কে ভ্রমণকথা বা তার যদি কোনও ভ্রমণ সাহিত্য থাকে, তা পড়ে নিতে চাই আমি সব সময়। নিজেকে একদম আনাড়ি পর্যটক করে বেড়াতে যেতে কোনওদিনই পছন্দ করি না। ভালোও লাগে না।
কলকাতায় আমার নিকট পরিজনদের মধ্যে অনেক খুঁজেও কাউকে পেলাম না, যে জাপান ঘুরে এসেছে। পরিচিতজনের মুখে জাপানের গল্প শুনে হোমওয়ার্ক তাই করতে পারলাম না। একদিন হঠাৎ সুদূর নিউজার্সি থেকে আমার এক সময়ের কলিগ মমতাদি ফোন করে বললেন, “তুমি জাপান যাচ্ছো শুনে খুব খুশি হলাম। আমি তিনবার ঐ দেশে গেছি। ছেলের কাছে অনেকদিন করে থেকে এসেছি। যাও। খুব সুন্দর দেশ। তোমার ভালো লাগবে।” তারপর একটু থেমে বললেন,” আর শোনো, জাপান থেকে তোমার মেয়ের জন্য তিনটে জিনিস অবশ্যই আনবে। ওদের রঙিন হাতপাখা, ছোট্ট ছাতা ও কিমোনো।” মমতাদি ঝর্ণার জলের মত এখনো কথা বলতে পারেন। আমেরিকায় মেয়ের কাছে রয়ে গেছেন। বয়স মমতাদির কাছে হেরে গোল্লা পেয়ে বসে আছে!..
জাপান নিয়ে সত্যিকারের গল্প, কথা ও ইতিহাস জানার জন্য হাত বাড়ালাম বইয়ের সাম্রাজ্যে। খুঁজে পেতে নিয়ে এলাম তিনটে মূল্যবান বই, যা পড়ে জাপান সম্পর্কে নিজেকে একটু তৈরী করে নেওয়া যায়। তিনটে বইই অমূল্য সম্পদ আমাদের সাহিত্য ভান্ডারে। প্রথম বইটি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের- জাপানযাত্রী। দ্বিতীয় বইটি আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত সুবিখ্যাত বই – অন্নদাশঙ্কর রায় এর “জাপানে”। এবং তৃতীয় বইটি নারায়ণ সান্যালের ” জাপান থেকে ফিরে”। এই তিনটি বই আমাকে ভীষণ ভাবে সমৃদ্ধ করেছে। জাপানের অতীত থেকে বর্তমান- অনেকটাই ধারণা হয়ে যায় এই তিনটি বইয়ের সান্নিধ্যে। তাই প্রথমেই ঋণ স্বীকার করে রাখলাম মহৎ তিন গ্রন্থের কাছে।
এছাড়াও জাপান সফরের আগে নুন্যতম তথ্য ও জ্ঞান কিছুটা পড়াশোনা করে আহরণ করলাম। এর ফলে ভ্রমণের আনন্দ আরও একটু বেশি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম। এই ছোট ছোট তথ্যগুলো জানার আনন্দ ও বিস্ময় কম নয়।
জাপান পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত। জাপানের রাজধানী টোকিও। জাপানের মুদ্রা ইয়েন। জাপানের জনসংখ্যা ১২৬ মিলিয়ন। জনসংখ্যার বিচারে জাপান বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম রাষ্ট্র।
জাপান একটি যৌগিক আগ্নেয়গিরির দ্বীপমালা। এই দ্বীপমালাটি প্রায় ৬৮৫২ টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। জাপানে চারটি বৃহত্তম দ্বীপ রয়েছে- হোনশু, হোক্কাইডো, ক্যুশু ও শিকোকু। এই চারটি দ্বীপ জাপানের মোট ভূখণ্ডের ৯৭% এলাকা নিয়ে গঠিত।
জাপানের জলবায়ু প্রধানত নাতিশীতোষ্ণ প্রকৃতির। জাপানে গড় শীতকালীন তাপমাত্রা ৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গড় গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ২৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
জাপানের সর্বকালীন সর্ব্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৬ অগাস্ট।
বর্তমানে জাপানে রয়েছে ১৪ টি বিশ্ব ঐতিহ্য। তার মধ্যে ১১ টি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ৩ টি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।
জাপানের প্রধান দুটো ধর্ম হলো- শিন্তো ও বৌদ্ধ। এই দুই ধর্ম জাপানে বহুদিন ধরে সহাবস্থান করে রয়েছে।
জাপানিরা অনবরত বিদেশী সংস্কৃতি গ্রহণ করে এবং সেই সঙ্গে নিজস্ব সংস্কৃতির যত্ন ও চর্চা করে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছে।
জাপানের অর্থনীতি খুবই সবল ও সক্ষম। নামমাত্র জিডিপি অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের পর জাপানই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জাতীয় অর্থনীতির দাবীদার।
জাপানে জীবনযাত্রার মান ও মানব উন্নয়ন সূচক খুবই ভালো। সারা বিশ্বের মধ্যে জাপানে গড় আয়ু সর্বাধিক এবং শিশু মৃত্যুর হার তৃতীয় সর্বনিম্ন।
এই তথ্যগুলো জাপান ভ্রমণের জন্য একজন পর্যটকের কাছে খুব প্রয়োজনীয় উপাদান। যে দেশটায় যাচ্ছি, তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভূপ্রকৃতি, অর্থনীতি একটু জানা দরকার বৈকি। ভ্রমণ তো শুধুমাত্র বেড়ানো নয়, ভ্রমণ নিজেকে সমৃদ্ধ করারও একটা উপায়। তাই আমার ভ্রমণ সব সময়ই নিজেকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক প্রয়াসও বটে!
দেখতে দেখতে যাওয়ার দিন এগিয়ে আসছে !.. মনের মধ্যে চাপা উত্তেজনার আনন্দ। TRAVEL LIVE ঘোষণা করল, জাপান যাত্রীদের গেট টুগেদারের দিন। ভেনু ও ডেট জানলাম- ১৫ মার্চ, ২০২৫, শনিবার, দুপুর আড়াইটায়, হোটেল হিন্দুস্থান ইন্টারন্যাশনাল।
বিদেশ ভ্রমণে বেরনোর আগে এমন একটা জমায়েত হয় সফর সঙ্গীদের নিয়ে। সেখানেই আমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হব। কিছু নিয়মকানুন জানব। কোনও প্রশ্ন থাকলে উত্তরটা শুনে নেব। মোবাইল সিম, ফরেন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ করে নেব। এই ধরণের গেট টুগেদার হলো খানিকটা পুজোর আগে মহালয়ার আনন্দের মত!…
ক্রমশ…