ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ২৯)

সুমনা ও জাদু পালক
রানী দিতি হাতজোড় করে বলল, হে অদৃশ্য কন্ঠ, আমি জানিনা আপনি কে। তবে একথা সত্যি যে,
এভাবে বিদেশিদের রক্তে স্নান করিয়ে আমার পুত্রকে সুস্থ করার বিধান আমার পছন্দ হয়নি।
তবু একান্ত নিরুপায় হয়ে এই বিধান মেনে নিতেে হয়েছে শুধুমাত্র আমার পুত্রকে সুস্থ করেে তোলার জন্য। দিনের পরদিন ওর কান্না, অনিদ্রা ,না খেয়ে থাকা চোখের সামনে দেখতে দেখতে অসহ্য হয়ে়ে গেছে আমার কাছে।
এখন আপনারাা যদি অন্য কোন ভাবে চিকিৎসা করে আমার সন্তানকে সুস্থ করে তুলতে পারেন, তাহলে আপনারা যা চাইবেন তাই দেবো।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, তাহলে নিয়ে চলুন আমাদের অসুস্থ দৈত্য রাজপুত্রের কাছে।
দৈত্য রাজ ডিম্যান বলল, কিন্তু ….
দৈত্য রানী দিতি হাত জোড় করে বলল, আর কোনো আপত্তি করবেন না দৈত্যরাজ। আমার মন বলছে ,এই মিষ্টি মনুষ্য কন্যাটি আমার পুত্রকে সুস্থ করে তুলতে পারবে । হে সুকন্যা, তোমার নাম কি ?
সুমনা উত্তর দিলো,আমার নাম সুমনা।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল ,হে দৈত্যরানী, আপনার পুত্রের নাম কি ?
দিতি বলল, ওর এখনো নামকরণ হয়নি। ও তো তিন বছরের বাচ্চা ।আমাদের এখানে, মানে এই দৈত্য রাজ্যে পাঁচ বছর বয়স না হলে নামকরণ করা হয় না ।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল , আচ্ছা। সে যাই হোক, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন দৈত্য রানী, রাজকন্যা রত্নমালা আপনার অসুস্থ পুত্রকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলবে। দৈত্যরাজ বলল, বেশ, তাহলে যাওয়া যাক আমার পুত্রের কাছে। তবে একটা শর্ত আছে আমার।
অদৃশ্য কন্ঠ বললো, কি আপনার শর্ত?
দৈত্য রাজ বলল, আমার পুত্রের কাছে এই মনুষ্য কন্যাটি যখন যাবে তখন আপনাদের অশ্ব টি কিন্তু এখানেই থাকবে। তবে হ্যাঁ, অশ্বের জন্য প্রয়োজনীয় পানীয় এবং আহারের ব্যবস্থা আমার অনুচরেরা অবশ্যই করবে।
অদৃশ্য কণ্ঠ বলল, বেশ তাই হবে। তবে আমাদের ও একটা শর্ত আছে দৈত্যরাজ।
—–কী শর্ত ?
—— রাজকন্যা রত্নমালা যখন দৈত্য রাজপুত্রকে সুস্থ করার প্রচেষ্টা চালাবে, তখন সেখানে অন্য কেউ থাকলে চলবে না।
দৈত্য রাজ একটু সময় চিন্তা করে বললো, বেশ তাই হবে।
অদৃশ্য কণ্ঠ বলল ,আরো একটা কথা।
—- কি?
—- অশ্ব দুধরাজ আপনার এখানে খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করবে কিনা সেটা ওর মর্জি। এ ব্যাপারে ওর উপরে কোন জোরাজুরি চলবে না ——বেশ তাই হবে।
অদৃশ্য কন্ঠ বললো, সুমনা,তুমি আরেকবার চোখ বন্ধ করো। আমি তোমাকে দুধরাজের পিঠ থেকে নিচে নামতে সাহায্য করবো।
সুমনা চোখ বন্ধ করলো।ডিম্যান এবং দিতি সবিস্ময়ে দেখল, সুমনা যেন হাওয়ায় ভেসে অশ্বের পিঠ থেকে অবতরণ করল ভূমিতে।
রানী দিতির এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হল যে, এই মনুষ্য কন্যাটি তার পুত্রকে সুস্থ করে তুলতে পারবে। রানী দিতি তার পাথরের আসন থেকে নেমে এসে সুমনার হাত ধরে বলল, তুমি এসো আমার সঙ্গে । সুমনা দেখল দৈত্য রানী যে পাথরের আসনটিতে বসেছিলেন, ঠিক তার বাম পাশে গুহার দেয়ালের গায়ে লাগানো সাদা আলো ঠিকরে পড়া সাদা প্রস্তরখন্ডের গায়ে নিজের বাম হাতের অনামিকাতে পরা আংটিটি ঘষে দিতে পাথরটি দু ভাগ হয়ে সরে গেল আর ভিতরে ঢোকার জায়গা করে দিলো। রানী দিতি সুমনাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। ওদের পিছনে ঢুকলেন দৈত্যরাজ। সুমনা দেখল,এটিও একটা ছোট্ট গুহার আকৃতির ঘর। তবে এই ঘরটি যথেষ্ট আলোকোজ্জ্বল ।ঘরের ভিতরে পা দিতেই সুমনার কানে এল এক অদ্ভুত একটানা একঘেয়ে শব্দ।
রানী দিতি বলল,ঐ তো সমানে কেঁদে চলেছে আমার বাছা।
কথা শেষ করেই সুমনার হাত ছেড়ে ঘরের শেষপ্রান্তে প্রায় দৌড়ে গেল রানী দিতি। সুমনা দেখতে পেল সেখানে একটা মস্ত বড় পাথরের উপরে শুয়ে আছে একটি ছেলে। কিন্তু একে তিন বছরের বাচ্চা বলছে কেন ?এ তো বেশ লম্বা ,প্রায় সাধারণ মানুষের সমান। পরমুহুর্তেই সুমনার মনে হল ,ও দৈত্যের বাচ্চা তো তাই এত লম্বা ।বাচ্চাটির মুখটি কিন্তু খুব মিষ্টি। একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল এই যে ,বাচ্চাটির গায়ের রং ওর বাবা মায়ের মত হলুদ নয়, কেমন যেন ফ্যাকাশে সাদা ।তাহলে এটাই কি ওর রোগ? এইজন্যই কি অসুস্থ ও? কিন্তু ও কে সুমনা ভালো করবে কি করে, এটা কিছুতেই সুমনার মাথায় ঢুকছেনা।
তাছাড়া অদৃশ্য কণ্ঠ বারবার কোন এক রাজকুমারী রত্নমালার কথা বলছে, সেই রত্নমালা কোথায় ?নাকি তাকেই রত্নমালা বলছে? কিন্তু তা কি করে হয় ?সে তো সুমনা। দেখাই যাক অদৃশ্য কন্ঠ কি বলে। দৈত্য রানী দিতি দৈত্য রাজপুত্রের পাশে বসে তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সেই দৃশ্য দেখে সুমনার খুব মনে পড়ছিল তার মায়ের কথা।
দিতি বলল, এই হল আমার ছেলে। ও খুব অসুস্থ
ও কিছুই খায়না ,ঘুমায় না, শুধু কেঁদে চলেছে।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, হে দৈত্য রানী, দয়া করে এবার আপনারা অন্যত্র গেলে রাজকুমারী রত্নমালা দৈত্য রাজপুত্রের চিকিৎসার কাজ শুরু করবে। এখন থেকে ঠিক চব্বিশ ঘন্টা পরে এখানে আসবেন আপনারা। আশা করি, ততক্ষনে দৈত্য রাজপুত্র ভগবান মহাদেবের বরে
সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।
চলবে