ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৬০)

সুমনা ও জাদু পালক

রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা বামন লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে?- কী করছেন এখানে?
লোকটি চিনচিনে গলায় বলল, “আমার পরিচয় পরে শুনো। তার আগে বলতো তোমরা কে বাপু?
তোমরা দুটি কিশোরী কেন এসেছ এই ভয়ঙ্কর জায়গায়? তোমাদের কি প্রাণের মায়া নেই?”
সুমনা বলল, “আপনি এরকম বলছেন কেন? আমরা তো এখানে একটা বিশেষ কাজের জন্য স্বেচ্ছায় এসেছি এখানে।”
—– বিশেষ কাজ !এখানে কী তোমাদের কাজ? তোমরা কি জানো যে এখানে ভয়ংকর জাদুকর হূডু থাকে?
—- জানি তো। আমরা তো তার খোঁজেই এখানে এসেছি।
—–হূডুর খোঁজে এসেছো মানে? হূডু সম্পর্কে কোন ধারণা আছে তোমাদের?
চন্দ্রকান্তা উত্তর দিল, আছে, ওই ভয়ংকর নৃশংস
জাদুকর হূডুর জন্য আমাদের রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেছে, গাছ রূপে বন্দী হয়ে আছে আমার বাবা ও মা।
—– আশ্চর্য! কে তুমি?– তোমার পরিচয় কি?
সুমনা বলল, ও চন্দ্রকান্তা, ‘সবুজের দেশের’ রাজকন্যা।
—- ও, তাই! সবুজের দেশের রাজা বসন্তসেন আমার বিশেষ পরিচিত। আমি জানি, ওই শয়তান জাদুকর ‘সবুজের দেশ’কে মরুভূমিতে পরিণত করেছে।
চন্দ্রকান্তা বললো, আপনি চেনেন আমার বাবাকে?
—— অবশ্যই। তাঁকে আমার বন্ধু ও বলতে পারো। চন্দ্রকান্তা, তুমি আমার বন্ধুর কন্যা বলেই তোমাকে একটা সুপরামর্শ দিচ্ছি। এই শয়তান জাদুকরের কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় তত ভালো। তোমার সঙ্গে ও কে?- তোমার বন্ধু বুঝি?
—– হ্যাঁ, বন্ধু তো বটেই। তবে ওর একটি আলাদা পরিচয় আছে।
—-কী?
—— ও হাসিখুশি দ্বীপের কনকনগর রাজ্যের রাজার মেয়ে রত্নমালা। বৃহল্লাঙ্গুল আসমানী বানরের রাজ্যে এসে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ও বেরিয়েছে হূডুর সন্ধানে। যেহেতু আমাদের দুজনের উদ্দেশ্য এক, তাই চলেছি একসাথে।
—— দাঁড়াও দাঁড়াও, একটু ভাবতে দাও। হাসিখুশি দ্বীপের কনকনগর রাজ্যের রাজার মেয়ে– তার মানে বীরবাহুর মেয়ে?
——- আপনি কনকনগর রাজ্যের রাজাকেও চেনেন?
বিস্মিত চন্দ্রকান্তা জিজ্ঞাসা করে।
লোকটি উত্তর দেয়,চিনবো না কেন? বীরবাহু আমার সতীর্থ। বাল্যকালে আমরা উভয়ই গুরু বিশ্বামিত্রের আশ্রমে যোগ শিক্ষা করেছি। তার মানে তোমরা দুজনেই আমার দুই বন্ধুর মেয়ে, খুবই আপনার জন।
সুমনা বলে, আপনার পরিচয় তো পেলাম না এখনো।
বামন লোকটি এবার হাতের চেটো দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে উত্তর দিল, আমি রুদ্র মহিপাল, পুষ্পনগরের রাজা।
—— পুষ্প নগর! সেটা আবার কোথায়?
——- তোমরা এখন যে টুকরো টুকরো প্রস্তর ও কঙ্করময় ভূমির উপর দাঁড়িয়ে আছো, তা একসময় ছিল অসংখ্য রংবেরঙের পুষ্পে শোভিত এক স্বপ্নের দেশ। সারাদিন রঙিন পুষ্পের উপর ঘুরে বেড়াত হাজার হাজার রংবেরঙের প্রজাপতি আর মধুমক্ষিকা । অসংখ্য সবুজ বৃক্ষে সজ্জিত ছিল রাজ্য। গাছের ডালে ডালে সারাদিন খেলে বেড়াতো ছোট বড় অসংখ্য পাখি। একদিন জাদুকর হূডু ওর পোষা উট পাখির পিঠে চেপে ঢুকে পড়েছিল আমাদের রাজ্যের সীমানায়। আমার রাজ্যের সৈন্যবাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল নভবাহিনী। তারা বন্দী করেছিল হূডুকে। আমার রাজসভায় হূডু কে নিয়ে এসেছিল তারা। হূডু তখন প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিল। আমার নভবাহিনীর সেনাপতি ওর জাদুদণ্ড কেড়ে নিয়েছিল বলে ও কিছু করতে পারছিল না তখন। যাই হোক, আমাদের রাজ্যের আইন অনুযায়ী বিচারে হূডুর তিনদিন কারাবাস হয়। কিন্তু আমাদের একজন কারারক্ষীকে প্রভূত উৎকোচ দিয়ে সে কারা অভ্যন্তরের মধ্যেই তার জাদু দণ্ডটি হস্তগত করে। তারপর ওই জাদু দণ্ডের সাহায্যে মুক্ত হয়ে আমার রাজ্য দখল করে এবং সম্পূর্ণ রাজ্যকে আজকের এই অবস্থায় পৌঁছে দেয়। আমাকে এবং রাজ্যের রানী মায়াবতী কে বিকৃত দেহ করে দেয়।
— আর আপনার রাজপুরীর বাকি লোক জন, তাদের কি হলো?
—— তাদের সবাইকে বিভিন্ন ধরনের পুতুল বানিয়ে দিয়ে একটা বিশাল কক্ষে রেখে দিয়েছে। ওই পুতুলগুলোকে দিয়ে জাদুকর হূডু বিভিন্ন ধরনের কাজ করায়।
—— পুতুলগুলো কাজ করে কি করে?
——হূডুর জাদু মন্ত্রের সাহায্যে।
সুমনা বলে, একটু আগে আকাশ পথে দেখছিলাম একটা পুতুল মনে হল যেন একটা উট পাখির পিঠে চেপে আকাশ পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
——- হ্যাঁ, ওই পুতুলের সাহায্যে আকাশ পথ পাহারা এবং সারা রাজ্যে নজরদারির ব্যবস্থা করে হূডু।
—— আমি তো জানি যে, উটপাখি উঠতে পারে না। তাহলে হূডুর উটপাখি ওড়ে কি করে?
—– হূডুর যাদু বলে।
——- এই যে দেখছো না, সকাল থেকে হূডুর পোষা উট পাখিদের জন্য এক বিশেষ ধরনের ঘাস সংগ্রহ করতে হয় এই ফলের বাগান থেকে। এই বাগান থেকে হূডুর জন্য সুমিষ্ট আপেল ও অন্যান্য ফল সংগ্রহ করতে হয়।
চন্দ্রকান্তা জিজ্ঞাসা করে, রানী মায়াবতী এখন কোথায়?
——- রাজপুরীর রন্ধনশালায় রানী এখন হূডুর জন্য আহার্য প্রস্তুত এর কাজে ব্যস্ত। পুতুল দাসদাসীরা সাহায্য করে তাকে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।