অণুগল্পে সন্দীপ সাহু

গঙ্গার হাওয়ায় পদ্মার দীর্ঘশ্বাস
“হিয়া হিয়া খান রাজস্থান আক্রমণ কইরলো। ভারতে সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে পাকি সেনার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে লইড়ছে। পশ্চিম পাকিস্তানকে সাহায্য করার জন্য আমেরিকার নৌবহর এলো। ইন্দিরার আবেদনে রাশিয়ার নৌবহর এলো। আমেরিকা পালালো। পাকি সেনাও সারেণ্ডার কইরলো। জয় বাংলা। জয় বাংলা।” পাগল বুড়ো কথাগুলো বলে চলেছে। রেলিং ঘেরা দু’পাশে দুটি গেটযুক্ত গঙ্গাপাড়ে দাঁড়ি গোঁফ ঝাঁকড়া চুল নোংরা জামা কাপড় পরা মাথা ঝাকিয়ে হাত আকাশে ছুড়ে ছুড়ে বলতে বলতে এ মাথা থেকে ওমাথা পায়চারি করে চলেছে। হাসছেও। আমি এ পাড়ায় নূতন। ভালো করে লক্ষ করলাম বুড়োকে। একনিষ্ঠ কান খাড়া রেখে শুনছি কথাগুলো। পুরো একটা ইতিহাসের বইকে যেন দু’চার কথায় বলছে। খুব আগ্রহ হলো। কৌতূহল হলো। গঙ্গাপাড়ে অনেকে। ঘাটের চাতালে বসে আমি। আমার পাশে দু’ তিনজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি। বুড়োকে নিয়ে কারুর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বুঝলাম এরা এই বিষয়ে অভ্যস্থ। আমি একটু কৌতূহল নিয়ে পাশের বয়স্ক মানুষের দিকে তাকালাম। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে পাশের ভদ্রলোক বললেন,” উনি বীরেন ভট্টাচার্য। একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ওপার থেকে এপারে চলে আসেন। অনেকে বলে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসে।আসলেও বাংলাদেশকেই নিজের দেশ ভাবতেন। এখানে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে হাইস্কুলে চাকরি পান। বিবাহ করেন উদ্বাস্তু পরিবারের মেয়েকেই। দু’জনেই জল ছাড়া মাছ। বাংলাদেশ ছিল ওদের রক্ত মজ্জায়। স্কুলে সহকর্মী, অবিভাবক, পাড়াপ্রতিবেশি সবাই ওদের ভিন্ন চোখে দেখতো। বাঙ্গাল বলতো। এই উদ্বাস্তুর জন্য পশ্চিমবঙ্গের বেকাররা চাকরি পাচ্ছে না। আরো নানা কথা শুনতে হয়। মানসিক ভাবে ওনার স্ত্রী উমাবৌদি বিপন্ন হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রচুর জ্বর হয়। তিন দিনের জ্বরে মারা যায়। ছেলেপুলে হয়নি। তারপর থেকে বীরেনদা…” ভদ্রলোক থামলেন। আমি তাকালাম বীরেনবাবুর দিকে। এবার আর ফিরলেন না। গেট দিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছেন। একটা ভাঙা প্রেম, ভাঙা জাতীয়তাবাদ, ভাঙা দেশ, ভাঙা ইতিহাস, ভাঙা সভ্যতাকে বেড়িয়ে যেতে দেখলাম। গঙ্গার হাওয়ায় পদ্মার দীর্ঘশ্বাস-শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম।