সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ১৫)

দেবমাল্য
— কী হল?
— ওই তো আমার বউ।
— আপনার বউ? আপনি যে বললেন, সে ট্রেনে করে আসছে।
— হ্যাঁ তাই তো আসার কথা। তা হলে কি ট্রেনটা আগে ঢুকে পড়েছে!
— আগে? দেবমাল্যর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটা বলল, আজ পর্যন্ত কোনও দিন হয়নি… গেলেই জানতে পারবেন, কত ঘণ্টা লেটে চলছে…
ড্রাইভার কথা বলে যাচ্ছে। সেদিকে ওর কান নেই। ও শুধু তাকিয়ে আছে ওই জিপটার দিকে। জিপটা একদম সামনে। তানিয়া নিশ্চয়ই তাকে দেখতে পায়নি। তাই বাঁদিকে ঝুঁকে জানালা দিয়ে শরীরের প্রায় অর্ধেকটা বের করে হাত নাড়াতে লাগল ও। চিৎকার করতে লাগল তানিয়া তানিয়া করে। কিন্তু তানিয়ার কোনও হেলদোল নেই। সম্মোহিতের মতো বসে আছে। যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে। ওর কথা সে শুনতে পেল বলে ওর মনে হল না। জিপটা ওপাশ দিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেল।
দেবমাল্য বলল, ঘোরাও ঘোরাও ঘোরাও। ওই যে জিপটা, ওই যে, ওই যে, ওই যে… ওর পিছু নাও। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি…
রাস্তাঘাটে খুব একটা গাড়িটারি নেই। ওর গাড়ির ড্রাইভার ঝট করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিল। ইউ টার্ন নিয়েই রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল। কিন্তু এ কী! জিপটা কোথায়! ডানদিকে বাঁদিকে তো কোনও রাস্তা দূরের কথা, কোনও গলিঘুঁজিও দেখছি না! তা হলে! হ্যালুসিনেশন নয় তো! মনের ভুল! ও ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, আমরা যখন যাচ্ছিলাম তুমি দেখেছ তো? আমাদের সামনে দিয়ে একটা জিপ ঝড়ের বেগে সাঁ… করে বেরিয়ে গেল। তুমি বাঁদিকে না চাপলে আমাদের গাড়িটাকে ঘষে দিয়ে বেরিয়ে যেত। পেছনের সিটে একজন মহিলা বসে ছিল। দেখেছ না?
— হ্যাঁ, দেখলাম তো। তিন জন বসা।
— তিন জন!
— হ্যাঁ, পেছনের সিটে তিন জনকেই দেখলাম তো। দু’পাশে কালো বোরখা পরা মোটা মতো দু’জন মহিলা আর মাঝখানে একটা বউ। কেমন যেন থমথমে মুখ। শাড়ি পরা।
শাড়ি পরা, ঠিক আছে। থমথমে মুখ, তাও ঠিক আছে। কিন্তু দু’পাশে দু’জন মহিলা! দু’জন! সে ভুল দেখতে পারে। কিন্তু ফোটোগ্রাফার আর গাড়িচালকদের চোখ বড় মারাত্মক হয়। সহজে তাদের ভুল হয় না। একবার যে রাস্তা দিয়ে যায়, দশ বছর পরেও সেই রাস্তায় গেলে, ঠিক বুঝতে পারে, আগে এই রাস্তায় এসেছিল। ও নিশ্চয়ই ভুল বলছে না। বরং ঠিকমতো না দেখে থাকলে, দোষটা তারই। তাই সে ঠিক কী দেখেছিল, মনে মনে সেটা ফের মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। একটা জিপ। জিপটা চালাচ্ছে এক শিখ ড্রাইভার। মাথায় পাগড়ি বাঁধা। তার পাশে কেউ নেই। পেছনের সিটে তানিয়া। হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ… ওই এক ঝলকেই ও যা দেখেছে, তাতেই ওর মনে হয়েছে, তার চোখ-মুখ বলছে প্রচণ্ড একটা শক পেয়েছে সে। একেবারে বিধ্বস্ত। প্রচুর কান্নাকাটি করেছে বোধহয়। থমথমে মুখ। সামনে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু কিছুই যেন সে দেখছে না। কোনও কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না। প্রাণহীন একটা পুতুলের মতো বসে আছে। তার দু’পাশে কালো জোব্বা পরা দু’জন। জোব্বা নয়, বোরখা। মুখের ঢাকনাটা কপালের ওপর দিয়ে পেছনে ফেলা। দু’জনই মধ্যবয়স্ক মহিলা।
দৃশ্যটা মনে পড়তেই চমকে উঠল সে। এদের দু’জনকে এর আগে সে যেন কোথায় দেখেছে! কিন্তু কোথায়! কোথায়! কোথায়! হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কাল রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে সে যখন খাটে শুয়ে টিভি দেখছিল, তখন পর পর কয়েকটা গুলির আওয়াজ শোনার পরে, কী হয়েছে দেখার জন্য পেছনের জানালা খুলে বাইরে তাকিয়েছিল সে। আর তখনই ল্যাম্পপোস্টের নীচে স্ট্রিট লাইটের আলো-ছায়ায় এই দু’জনকেই তার জানালার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখেছিল সে। তখন মনে হয়েছিল, জোব্বা মতো কী একটা পরা। এখন বুঝতে পারছে, জোব্বা নয়, ওটা ছিল বোরখা। ওরা কারা? তার থেকেও বড় কথা, ওদের সঙ্গে তানিয়া কোথায় যাচ্ছে!
রুদ্ধশ্বাসে গাড়ি ছুটিয়ে বেশ কিছুটা গিয়েও ওই জিপটাকে আর দেখা গেল না। যেতে যেতে ড্রাইভার নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, গাড়িটা কি ভ্যানিশ হয়ে গেল নাকি! অদ্ভুত ব্যাপার তো!
দেবমাল্য তখন এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কোনও গলি-ঘুঁজিতে জিপটা ঢুকে পড়ল কি না… ওকে ও রকম করতে দেখে ড্রাইভার বলল, অত ঘাবড়াবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি কোন হোটেলে উঠেছেন, উনি জানেন তো?