T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় সঞ্জীব সিনহা

পুজোর শাড়ি

 

দাদা, আজ মেমসাহেবকে বলেছি দুর্গা পুজোর কথা। ম্যাম জিজ্ঞেস কচ্ছিল, তোমাদের পুজোর ফেস্টিভ্যালে কি হয়। আমি সব বললাম, আর বললাম সবাই নতুন জামা কাপড় জুতো পরে ঠাকুর দেখতে যায়, পুজোর চারদিন বাড়িতে রান্না হয় না বাইরে কোন ভাল হোটেল রেস্তোরাঁয় ভালোমন্দ খায়, বাইরে বেড়াতে যায়। মেমসাহেব বলেছে আমাকে জামা কাপড় জুতো কেনার টাকা দেবে। আমাকে জিজ্ঞেস করছিল আমার জামা কাপড় জুতো কিনতে কত টাকা লাগবে। আমি বলেছি আমি দোকানে খোঁজ নিয়ে বলব।

– ঠিক বলেছিস, আমার বোনের মতন উপযুক্ত কথাই বলেছিস। শোন, তুই মেমসাহেবকে বলবি শাড়ির দাম চার হাজার টাকার মতন আর জামা এক হাজার, চটি দুহাজার, সাত হাজার টাকায় তোর শাড়ি জামা আর চটি হয়ে যাবে।

– অত দামি শাড়ি জামা চটি আমি কখন পরব, আমি তো অত দামি জামাকাপড় কোন দিন পরিইনি। আর আমাকে অত টাকা দেবেই বা কেন?

– আরে একবার বলেই দেখ না।

 

ইতালিয়ান ইঞ্জিনিয়ার এ্যান্তনিয় আলফানো চার মাসের একটা প্রোজেক্ট নিয়ে কোম্পানির কাজে সস্ত্রীক এখানে এসেছে। কোম্পানির টাউনশিপেই একটা বাংলোয় স্ত্রী সোফিয়া আর তাদের বেবিকে নিয়ে আলফানো সাহেব থাকে। আগস্টে এসেছে আর ডিসেম্বরে বড়দিনের আগেই ওদের ইতালি ফিরে যাবার কথা। এখানে শ্রমিক মহলে ইতালিয়ান সাহেব বলেই ওরা পরিচিত। আলফানো স্থানীয় কর্মীদের সাথে ঈশারা ইঙ্গিতে আর ভাঙা ভাঙা ইংরাজীতে কথা বলে। আলফানো সাহেবের প্রোজেক্টেরই পাম্প অপারেটর সমর তার স্বামী-পরিত্ত্যক্তা বোন চাঁপাকে ইতালিয়ান সাহেবের বাড়িতে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। চাঁপা একটা মিশনারী স্কুলে পড়াশোনা করেছে, তাই সাহেবের বাড়িতে কাজ চলানোর মতন কথা বলতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। স্নান নাস্তা সেরে সকাল সাতটার মধ্যে চাঁপা সাহেবের বাড়ি চলে যায়। ইতালিয়ান খাবার ওর মুখে রোচে না, তাই সে বাড়ি থেকেই দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে যায়। সারা দিন সাহেবের বাড়ি থেকে সন্ধ্যা সাতটায় বাড়ি ফেরে। বাংলোয় ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ডিশওয়াসার, ওয়াশিং মেসিন সবই আছে, ওই মেসিনগুলো দিয়ে কিভাবে কাজ করতে হয় সোফিয়া ম্যাম ওকে শিখিয়ে দিয়েছে। ঘরের কাজ বেশি নেই বেবিকে ধরাই তার প্রধান কাজ। প্রথম প্রথম চাঁপাকে দেখলেই বেবি কেঁদে উঠত, এখন চাঁপার সাথে ওর বেশ ভাব হয়ে গেছে। মেমসাহেব খুব ভালো মানুষ, চাঁপাকে প্রায় দিনই কেক, শুকনো ফল ইত্যাদি দেয়, চাঁপা সেগুলো বাড়ি নিয়ে যায়।

 

সোফিয়া পুজোর দিন পাঁচেক আগে টিভিতে পূজাপ্যাণ্ডেল আর প্রতিমার ছবি দেখছিল আর চাঁপার কাছে দুর্গা পূজার কথা শুনছিল। মেমসাহেব এবার চাঁপাকে বলল, – “চম্পা, আজ যাবার সময় তোমার পূজার জামা কাপড়ের টাকা নিয়ে যাবে, কত টাকা লাগবে বল।“ চাঁপা তার দাদার শেখনো কথা অনুযায়ী বলল, – “বেশি লাগবে না ম্যাম, শাড়ির দাম ফোর থাওজ্যাণ্ড রুপিজ, জামা ওয়ান থাওজ্যাণ্ড রুপিজ আর স্লিপার টু থাওজ্যাণ্ড, সেভেন থাওজ্যাণ্ড রুপিজে আমার শাড়ি জামা আর স্লিপার হয়ে যাবে।‘’ সন্ধ্যায় চাঁপা বাড়ি যাবার সময় সোফিয়া ওকে সাত হাজার টাকা দিয়ে বলল, – চম্পা, তোমার নতুন জামা কাপড় জুতো কেমন হল আমাকে দেখিয়ো।

– হ্যাঁ ম্যাম, নিশ্চয়ই আপনাকে দেখাব।“

 

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে চাঁপা তার দাদাকে বলল, – দাদা, তোর কথা মতন আমি মেমসাহেবকে বলেছিলাম, আজ বাড়ি আসার সময় মেমসাহেব আমাকে সাত হাজার টাকা দিয়েছে। আর বলেছে জামা কাপড় জুতো পরে যেন মেমসাহেবকে একবার দেখাই।

সমর একটু হেসে বলল, – ঠিক আছে।

 

চাঁপা ফেরার পর সবাইমিলে একসাথে চা মুড়ি খেয়ে চাঁপার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে সমর পুজোর বাজার করতে বেরল। রাত দশটা নাগাদ সমর বাড়ি ফিরে বোনের হাতে শাড়ি জামা আর জুতোর প্যাকেটগুলো দিয়ে বলল, – দেখ কেমন হয়েছে।

চাঁপা প্যাকেটগুলো খুলে দেখেই আনন্দে বলে উঠল, – বাঃ কী সুন্দর সিল্কের শাড়ি, জামাটাও খুব সুন্দর হয়েছে। চটি দেখে মনে হচ্ছে খুব ভালো, কত নরম। এগুলো পরে আমাকে খুব মানাবে তাই না দাদা?

সমর একটু হেসে বলল, – তুই ওগুলো দেখে আবার প্যাকেটে ঢুকিয়ে রেখে দে। কাল নয়, পরশু ইটালিয়ান সাহেবের বাড়ি কাজে যাবার সময় প্যাকেটগুলো নিয়ে গিয়ে মেমসাহেবকে দেখিয়ে আনবি।

– কিন্তু মেমসাহেব যে বলেছিল, নতুন জামাকাপড় পরে মেমসাহেবকে দেখাতে।

– মেমসাহেবকে বলবি, পুজোর দিন আমাদের নতুন জামা কাপড় পরতে হয়, আগে পরতে নেই। পুজোর সময় এগুলো পরে ঠাকুরতলায় যাবো।

 

একদিন পরে ডিউটি যাবার সময় চাঁপা পুজোর নতুন শাড়ি জামা জুতোর প্যাকেটগুলো নিয়ে গিয়ে তার মেমসাহেবকে দেখাল। মেমসাহেব খুশি হয়ে বলল, – তুমি এগুলো পরে দাঁড়াও, আমি একটা ফটো তুলে তোমার সাহেবকে দেখাব।

– না ম্যাম, পুজর আগে পরতে নেই, পুজোর দিন নতুন জামা কাপড় পরে ঠাকুরতলায় যাব, ঠাকুরকে পুজো দেবো।

– দেন ও কে।

ডিউটি থেকে বাড়ি ফিরে চাঁপা তার নতুন জামা কাপড়গুলো গুছিয়ে তুলে রাখছিল, পুজোর দিন বার করে ওগুলো পরে সে ঠাকুরতলায় যাবে। সমর বোনকে বলল, – ওগুলো প্যাকেটে ভরে আমাকে দে, পরশু দোকানে বলে এসেছিলাম পছন্দ না হলে ফেরত দিয়ে বদলে নেবো।

– দাদা, আমার তো এগুলো খুব পছন্দ হয়েছে, ফেরত দিতে হবে না।

– তখন তো পুরো টাকাটা দিইনি, এগুলো দেখিয়ে কোনটার কত দাম হিসাব করে বাকি টাকাটা দিয়ে আসবো।

সমর প্যাকেট তিনটে নিয়ে বেরিয়ে গেল, ঘণ্টা দেড়েক পর অনেককটা প্যাকেট নিয়ে সে বাড়ির সামনে রিক্সা থেকে নেমে ঘরে গিয়ে প্যাকেটগুলো বিছানায় রেখে বউকে বলল, – নাও আমাদের সবাইকার এবারের পুজোর বাজার।

চাঁপা বলে উঠলো, – দাদা, আমার শাড়ি জামা জুতোর প্যাকেটগুলো কই? দেখছি নাতো?

– তুই সিল্কের শাড়ি পরবি আর তোর বউদি, বাবুন, আর আমি কী পুরনো জামা কাপড় পরে ঠাকুর দেখতে যাব? ঐ সাত হাজার টাকায় আমাদের সবাইকার জামা কাপড় জুতো হয়ে গেছে। এর মধ্যে তোরও আছে।

কই গো এগুলো গুছিয়ে রেখে দাও।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।