দাদা বৌদি ভাইপো ভাইঝির সংসারে আমি হলাম ধম্মের ষাঁড়!মানে এই সারাদিন কলম পিষি,নিজেকে বেশ কেউকেটা লেখক ভাবি,বৌদির রান্না রসিয়েবশিয়ে খাই আর গরম কালে গায়ে বগলে পাউডার মেখে পাঞ্জাবি গলিয়ে আর শীতে জহর কোট শাল চাপিয়ে বেশ কেৎ মেরে কবি সম্মেলনে যাই।আবার পারফেক্ট কবি হবার জন্য চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, এলোমেলো ঝাঁকড়া চুল আর উদাস দৃষ্টিও প্র্যাকটিস করেছি।
না না একেবারে যে ফালতু খরচ এমন নয় ,লিখেটিখে বেশ টুপাইস আসে আর তার অর্ধেক গুনেগেঁথে আমার বৌদির হাতে তুলে দিই।না না তারা যে রক্তচোষা জোঁক,অর্থপিশাচ বা সিনেমার সিরিয়ালের দাদাবৌদির মত সব সময় দেওরকে খাওয়ার খোঁটাটোটা দেয় এমন নয়।বরং দাদা টাকা নিতে প্রথম প্রথম রাজী হয়নি আর বৌদিও পুত্র স্নেহে নাহোক বন্ধু বাৎসল্যে ওটাকা নেব না নেব না করছিল।কিন্তু আমি ঢ্যাটা মানুষ।যখন মনে করেছি দেব তো দেব!যখন একেবারে চড়েবরে খেয়েছি তখন তো খেয়েইছি।এখন তো রোজগার করি তবে দেব না কেন?
নাঃ!বিয়ে থাওয়া আমার দ্বারা হয়নি।তাবলে ভাববেন না আমি কবি ,সে কপি ও বলতে পারেন!আমি কবি মানুষ বলে হাজার প্রেমের মধ্যে বেছে নিতে পারিনি।বরং উল্টোটা!
সেই কবে বাংলা অনার্স পড়ার সময় এক কাজল নয়না হরিণীর প্রেমে পড়েছিলাম।দাদা বৌদির ও বেশ সমর্থন ছিল।কিন্তু ওই হরিণীর গোঁয়ার বাঙাল বাবা আমাদের প্রেম সেই কুঁড়ি অবস্থাতেই একেবারে ভিলেনের মত পিষে ফেলে।
“নচ্ছার, হতচ্ছাড়া পোলা,অকম্মার ঢেঁহি,কামকাজ কিস্যু নাই ,হালি ম্যায়াগো পিছন পিছন ঘোরোন”,
এইসব মারাত্বক বোম বার্সটিং ভাষায় গালিগালাজ করে আমার সেই কাজল নয়না কে তুলে নিয়ে হরিশগড় না চাঁদের হাট কোথায় যেন একটা বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল।
আমরা বেশি দূর এগোতেও পারিনি, সবে দুদিন ভিক্টোরিয়া আর একদিন বাবুঘাট।তাও কিচ্ছু করিনি, একদিন শুধু ওর ওড়নার ঝাপট আমার মুখে লেগেছিল।আহা মনে হয়েছিল পৃথিবী থমকে গেছে।
শেষদিনের ওর মুখটা আমার এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে।সেই বড় বড় চোখে জল।কিচ্ছু বলেনি,শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে থেকেছে আর ফোঁটা ফোঁটা জল পড়েছে ওর হাতে ধরে রাখা কাঁধব্যাগে।আমি ভাবি এরকম ফুলের মত মেয়ের অমন সজারুর কাঁটার মত বাবা হয় কি করে?কি জানি ডাস্টবিন কেস বা কুম্ভ কি মেলা কিনা?কিন্তু ওই চোখ আর ভুলতে পারিনি।নিজেকে অপরাধী ভেবে একাই কাটিয়ে দিলাম।না,সে নিয়ে আমার কোনো আফশোস নেই বরং ভালোই আছি!
এখন আমি প্রায় পঁয়তাল্লিশ, দাদা আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়।আজকাল বৌদিকে দেখি প্রায়ই পা ছড়িয়ে বসে পান খায় আর আমার দিকে উদাস চোখে চায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,”তোর দাদা আর আমাকে ভালোবাসে না!”
বৌদি পাড়ারই মেয়ে।দাদাবৌদির প্রেমের বিয়ে।তাই আমি সেই ছোট থেকেই তুইতোকারিতে।এমনকি বিয়ের পরও বাড়ির লোকেরা বলে বলে আমাদের কাউকেই তুমি করাতে পারেনি।তার উপরে আবার আমরা আবার এক কেলাসেই পড়তাম।
এই বৌদি ছিল ছিপছিপে, তন্বী, শিখরদশনা, সুন্দরী যাকে বলে।মক্ষিকার মত সদ্য ডানাগজানো প্রেমিকেরা ভনভন করতো।কিন্তু আমি তো জানি ও আমার দাদার জন্য বুকড ।তাই যেমন প্রটেকশন ও দিয়েছি আবার প্রেমদূত হয়ে চিঠিচালাচালিও করেছি।
এখন গাবলু ,গার্গী বড় হয়েছে।নিজের নিজের জীবন হয়েছে।দুজনেই কলেজ।বৌদি আগে সারাদিন মা ,বাবা,ছেলেমেয়েরা দাদা সামলাতেই পাগল।আমাকে চাট্টি খেতে দিলেই হত।
সন্ধ্যা বেলা বৃষ্টি পড়লে,বৃষ্টি থামার পরপর দাদাবৌদির ছাদের ধারে দাঁড়ানো চাই ই চাই।সকালের চাটা আবার বৌদির দাদার হাতে না হলে হয় না!এ নিয়ে বাড়িতে কম কথা শুনেছে মায়ের কাছে?কিন্তু দাদা বদলায়নি।বৌদি একা হাতে খুন্তি নাড়ছে আর দাদা সব কেটে ধুয়ে রেডি করে দিচ্ছে বৌদির হাতেহাতে।আর ছুটির বেশিরভাগ দুপুরগুলোতেই দাদা বৌদি বেরিয়ে যেত ।সিনেমাই হোক বা দক্ষিণেশ্বর।গার্গী ,গাবলু ঠাকুমার কাছে।
মা বলতো ভেরুয়া,পাড়ার লোক ও।কিন্তু তাতে এদের দুজনের কোনো হেলদোল ছিল না।আমি ভাবতাম,ভাগ্যিস বিয়ে করিনি, কারণ কাজল নয়না ছাড়া কাউকে এভাবে ভালোবাসা আমার দ্বারা সম্ভব হতো না।আর আমার বৌ, দাদা বৌদির এই প্রেম দেখে কমপ্লেক্স খেয়ে আমায় কুটতো।
দাদা অফিস থেকে ফিরে আসার আগেই বৌদি গা হাত পা ধুয়ে, চুলটুল বেঁধে ফিটফাট।তারপর সবাই কে চা দিয়ে নিজেদের চা নিয়ে বসতো ব্যালকনিতে।এই, তাই,ওই, অফিস বা সংসারের খুঁটিনাটি বর্ণনা দিয়ে যেত দুজন দুজনকে।আমি মাঝেমাঝে লেখালেখির ফাঁকে শুনতাম এই সরল ,সম্পৃক্ত দাম্পাত্যালাপ।
কিন্তু ধীরে ধীরে সব বদলে গেল।বৌদি মুটোতে লাগলো,দাদার চুল ও পাতলা।আজকাল কপাল আর ঢাকা পড়ে না।বৌদি সারাদিন কাজ সেরে টিভির সামনে হাবিজাবি সিরিয়ালে আর দাদা তাসের আড্ডায় বা নান্টুর চায়ের দোকানে।
এখন রান্নার লোক ,কাজের লোক রাখায় বৌদির করার ও তেমন কিছু নেই।খবরদারি করার জন্য ও ছেলেমেয়েরা বেশ বড়।বৌদি আর চুল বাঁধে না,দুজনে চা নিয়ে ব্যালকনিতে বসে না।সিনেমা দেখা ,ঘোরা তো দুর,একসাথে বিয়েবাড়ি পর্যন্ত যায় না।গেলেও দূরে দূরে।বৌদির চোখের কোণে কালি।কেন যেন সব বদলে গেল।হঠাৎ করে নয় তবে ধীরে ধীরে!
দাদাও মাঝেমাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড় হলে কি হয় আমরা বন্ধুই।দাদা মাঝে মাঝে অভিযোগ করতো,”শান্তর আমার জন্য আর সময়ই নেই!সারাদিনই সংসার আর সংসার।দুমিনিট বসলে কি হয়?”বোঝাতাম,”সব একা হাতে সামলে সময় পায় না”!
কিন্তু বুঝতে পারিনি যে এই সামান্য সময় বা মনযোগের অভাব ওদের মাঝখানে এত বড় একটা দূরত্ব তৈরি করে দেবে অনভ্যাসের।বুঝি দাদা আজকাল পাশের বাড়ির মধুমিতা বৌদির সঙ্গে বেশ হেসে কথা বলে ,রমলা বৌদি ছাদে আসলে দাদা ব্যালকনিতে দাঁড়ায়।না এতে আমি বিপদ দেখিনা।কারণ আমার দাদাকে আমি চিনি।ওকে নিয়ে ভয়ের কিছু নেই।
বৌদিও দাদার অফিস কলিগ সাত্যকিদার খুব প্রশংসা করে।দাদার সূত্রেই পরিচয়।সাত্যকিদা ডিভোর্সি মানুষ।মাঝেমাঝে ফোনটোন করে।বৌদিও ফোন ধরে বেশ ঝলমলে মুখে।না এখানেও আমার ভয়ের কিছুই নেই।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাকে ভীষন নাড়া দেয়,এই মাঝবয়সে এসে ভালোবাসার চাহিদাটা তো দুজনেরই আছে,ভালো লাগাও।তাহলে সেটা নিজের স্বামী স্ত্রীর জন্য নয় কেন?আচ্ছা ঘর বাড়ির রেনোভেশন হয়,চাইলে কি সম্পর্কের হতে পারে না?