কবিতায় স্বর্ণযুগে শ্রী সদ্যোজাত (গুচ্ছ কবিতা)

1. স্বরচিত পথে

বাড়ির চাতালটা ধরে সারাক্ষণ শুধু হৈহৈ আর হৈহৈ
ঘরের আলোটা এবার নিভিয়ে দাও,
একটু সনির্বন্ধ হয়ে কাছে এসো,
দুটো মুখ মুখোমুখি হই,
সাজ ঘরের পান্থশালার মাটির প্রদীপটা,
কবে থেকে খালি,
মাঝের নীলরাত্রি ব্যবধানটুকু দিয়েই সামনের দীপাবলিটা পালন করব ভাবছি…..
যদি রাঙা রাঙা গোধূলি ভারে তুমি অনুমতি দাও…
বড় সাধ এবার কালীপুজোর রাতে এলো পায়ে,
হেঁটে হেঁটে গঙ্গার এপার থেকে ওপার হবো….
যদি খালি খালি দুটি হাতে তুমি এসে সঙ্গত দাও…

একলা ক্লান্ত পথিক রমণী তুমি,
এই শারদ সরোদ কাদামাটি পথে
মনে না পড়লেও এসো কিন্তু,
আগমনী নদীর সাঁঝভোর কলরব মেখে এসো
তবু এসো
তবু এসো
আবার কথা হবে কোথাও না হোক… কোথাও ,
এখানেই কোনো এক অথৈ বিভাস পথে

তুমি যে সকল পূর্ণিমা রাতে,
কোজাগরীঅমাবস্যা

 

2. এক সধবার বৈষ্ণবী হয়ে ওঠা

এতগুলো বছর কেটে গেলো রাঙা পায়ে,
বড় ঘর ছোট ঘর ঘষা মাজা উঠোন পেরিয়ে সেই রান্নাঘর,
আধোয়া দু’টো পা পুড়ে গেছে সংসারী চিলেকোঠা দু’হাতে টেনে,
সেভাবে কেউ এলো না যাঁরা এসেছিল গন্ডি কাটতে তাঁরা ফিরে গেছিল কিছু না বলে’ই,
সঞ্চয় বলতে যা ছিল তাও প্রায় শেষের আশ্বিন মুখী,
যেন কালো মাটির নবদুর্গা…

গুঁড়ো গুঁড়ো কিছু সংলাপহীন বসন্ত গভীরতায় পুড়ছে মহীরুহ ভালোবাসার তর্পণে,
অকাজগুলো সজলা একাদশীতে গুটিয়ে রেখে ছেঁড়াখোঁড়া মাদুর বিছিয়ে আমিও তখন ঘুমিয়ে পড়ি,
তেলচিটে পিতলের সিংহাসনে টিমটিম করে জ্বলছে আধভাঙা মাটির প্রদীপ,
“সারা জীবনের আস্তানা গেড়েছে ব্যাটা
ও নিভে গেলে’ই সন্ধেটা রাত হয়ে যায় “,

মৃত্যু মুখে মৃত্যুর এই গভীর রেখাপাত মাঝ সমুদ্র জুড়ে নীল দহনের বৃত্ত রচনা করে চলেছে,
চমৎকার সেই দৃশ্য আমি একা’ই করছি উপভোগ মোটা লাল সিঁথি জুড়ে..
গুরুভার এই শিথিল বুকে’তে একটি বড় গন্ধরাজ গাঢ় নিশুতির প্রতি মুখে দাউ দাউ করে জ্বলে,
হয়তো এভাবে’ই নরম রাতগুলো কলমের কালি’তে মরমী পাষাণের পূজিত ইতিহাস লিখে চলে,
যোজন কোটি বিভাজনে নিজের সাথে নিজের মৌপিয়ালী রফা..
তছনছের এই মোহন সুরের আলাপন কোনদিন’ই শেষ হবে না…

ঠোঁটের সাথে দু’টি চোখের, দু’টি গালের সাথে হৃদয়ের , যোগাযোগের এই একটি’ই পথ এখনো আলগা হয়ে পড়ে আছে…
চৌ’মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা অনামুখ প্রিয়দর্শন বাউল’টা খালি গলায় একনাগাড়ে গেয়ে’ই চলেছে “এবার আমি যাবো চলে
তোর সকল উঠোন ফাঁকি দিয়ে
একলা হলে বুঝবি রে মন
যাতনার মরণ বিলায় কোন সে পথের ধারে
শিউলি ফুলে গাঁথা মালা সেকি সঙ্গে লয়ে যাবে
যাতনার মরণ বিলায় কোন সে পথের ধারে”..

গেলো চৈত্রে সাধের একতারাটার হয়েছিল গঙ্গায় স্নান,
এবারে চৈত্র শেষে হবে তার পঞ্চসুরভী আরতি..
আগামী মহালয়াতে আকাশ কালো রোদ ঝলমল বৃষ্টি সুখে শায়িত থাকবে তাঁর অষ্টরাগ দেহখানি..

মহাপ্রস্থানের পুষ্পশ্রাবণী অকালে সকাল হয়ে এভাবে’ই ঝরে পড়ুক অনন্ত কোণে কোণে ,
আয়োজনহীন এই শেষকৃত্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকুক রাঙাপোড়া হয়ে…
আশেপাশের রাখালিয়া খেয়া ঘাটগুলো রোমে রোমে রোমাঞ্চিত হোক….

দলছুট সধবার বেশে বিধবা যাঁরা ,
সহাস্য মুখে যাঁরা পদে পদে পথহীনা পদাতিক
ওরা নিজেকে ক্ষরণ করে খনন করে সহনে গহনে,
ওরা সারাদিনমান মৌন অববাহিকার বেনামী জলছবি এঁকে নতুন নামের গঙ্গোত্রী খুঁজে চলে,
বাকি শোধনটুকু সেরে নিতে হবে
ওরা একে ওপরের মুক্ত সহচরী সুপ্ত জলনিধি
ওরা সরল প্রেমের কাঙালিনী
দৃপ্ত তপ্ত মহাকাল মহাশান্তির প্রেরণা পায় ওদের স্পর্শটুকু পেয়ে,
নিস্তব্ধ সুখী গৃহকোণে কপালে রক্ত জবা রেখে সাদা থান গায়ে ওরা পড়ে থাকে একা নীল নীল নির্জনে…ওরা দলছুট…ওরা কেউ আততায়ী নয়..

কুল গোত্র বিসর্জন দিয়ে হাসিমুখে ওরা তাঁদের একজন… তাঁদের’ই একজন,
প্রথম ফোটা টগর যে ভাবে আধোয়া সকালটাকে ছোঁয়
অস্ফুটের অন্তর ভরা সে যে বিবাগী হৃদয়,

শুরু থেকে শেষ যে নামে পরিচয় সেই নামে’ই ঘটুক বিবিধ পথ ও পথে অজ্ঞাত পরিচয়..

 

3. শৈলশশী ত্রিযামা ………..

অসাধ্য কিছু দেখা বাকিই থাকুক,
অবাধ্য কিছু কথা স্মৃতির পটে নাইবা ধরা দিলো,
দুটি পথ এভাবেই যদি আলাদা থাকে চিরটাকাল..,
থাকুক না সন্তর্পণে !!
হেমন্তের বৃষ্টির মতন তুমি ও তো বিভাবরী উচ্ছ্বাস
আন্দোলনের সাদা পৃষ্ঠাগুলো যদি পরপর উল্টোতে থাকি… তুমি ঠিকই বুঝতে পারবে….!!
হেমন্তের বিকেল বৃষ্টি ছুঁয়ে কতখানি ডুবেছি কতটুকুই বা ভেসে আছি অন্তরালটুকু মেখে

আমি তবে বৃথা আঁকবো কেন তোমার অরূপ শীতল জলছবি স্রোত!!
কেন বুঝি না… কেন বুঝতে চাই না ??
নষ্ট ঘরেতে অলীক সুখেরা বেঁধেছে বাসা….

বিসর্জনের ঘাটগুলোতে শুধু কি বিসর্জনই ঘটে ??
বছর শেষে আমি তবে শুনতে পাই কেন রাঙা আলতা পায়ে আবাহনের নীলাদ্রি বিসমিল্লা…..
এভাবেই তো প্রতি পূর্ণিমা রাতে রাখালিয়া অন্ধকার নামে গো দরদীনি
মহা নির্মাণের শৈলশশী ত্রিযামাটা প্রথম ভোরের মৌন শিশির হয়ে নিশ্চুপে জ্বলে,

তোমার শহর জুড়ে বৃষ্টি আর বৃষ্টির নামান্তর
খন্ড খন্ড শিলাপাথর গুলো অলক্ষ্যে মেঘ রোদ্দুর খ্যালে নরম শীতলপাটি এঁকে
তুমি কখনো জানতেও পারোনি
তুমি কেন মেঘে এলে না
তুমি কেন বর্ষা হলে না….

 

4. চলতি পথের গল্প …..

তোমার শিশির ভেজা আগমনী পড়ন্ত বেলার অসীমতা’কে স্পর্শ করেছে
নিয়ন আলোয় চলতি পথের নদী হওয়া তো একেই বলে…

সমস্যা থাকবেই
মধ্যবিত্ত সংসারী আকাশে সমস্যা হলো মরা জোছনায় ভরা আবেগি পূর্ণ চাঁদ।
মাঝ বয়সী উলঙ্গতা কে বুকে জড়িয়ে রাখার নামই গঙ্গাকাব্য যাপন,
আজকাল এসব কথা কেউ শুনতেও চায় না

ঘর কখনো নিজের হয়না !
সে থাকে কটা মাত্র সময় ,
দিবা স্বপ্নের মতন ভালোবেসে অথৈ উৎকণ্ঠায় প্রিয়ংবদা ও প্রিয়তমায়,
ওসব শুধু কথা ভোলানোর জলসা আর তরজা ।

সকাল বেলার প্রথম আলোয় যখন তোমার অস্ফুট মুখটা দেখি ,
তখন ভুলে যাই আমি কী তোমার কেউ ?
নিজেকে নিজে জড়াতে পারিনা বলেই তোমার সাদা শিউলি দোর ধরে থাকি ।
তুমি দিনমান জুড়ে ফাঁকি ফাঁকি আর ফাঁকি
বিনা কলমে লিখে রাখি বেণীমাধবের গল্প পথের চলতি ।

খোলা চোখে গৃহহীন ভালোবাসা’টা হয়তো অশালীন অমূলক অচেতন ,
বেলা যত ফুরিয়ে আসে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ি,
দু’চোখের পাতা অজান্তে নেমে আসে নরম আঁচল মাটিতে,
তখন দেখি সেই অবিশ্বাসী প্রেমটাই আকাশ
নদী রোজদিন ।

দূরে থেকে যা কিছু স্পষ্ট কাছে আসলেই যদি নিমগ্নতা হারায়
তাই তো এতো আয়োজন তোমার স্বরচিত লক্ষ্যে লক্ষ কোটির প্রারম্ভে

দু’টো গালে ঠাস ঠাস করে চড় মারি
কখনো আমাকে কখনওবা তাঁকে
সময়কে বন্দি করে রাখার অদম্য প্রয়াস
কখনো সত্য নয়
কখনোই উত্তীর্ণ মহার্ঘ্য নয়

হাঁটু মুড়ে আমার সামনে এসে বসো
দু’জন দু’জনকে শুধু দেখব অপূর্ব নীরবতা দিয়ে,
কেউ কিছু বলবে না
কেউ কিচ্ছুটি জানবে না ….

5. মৌর্যগুপ্ত অনুভব

যে ঘর ভুলেছে তাঁকে ঘরে ডাকতে নেই,
যে গেছে হারিয়ে শত সহস্র যোজন পদাতিকে,
সে যে ফিরবে না কোনোদিন,
অভিমান রেখো না অদেখার ওই অনুস্রোতে,
কত জীবন এভাবেই হয় রোজের কবীর সুখী পলাতক,
তুমি বাড়ি ফিরে যাও সন্ধ্যার আলপথ ধরে, আমি যাই শ্মশান রাতের গভীর সূর্যোদয় দেখতে,
বিষাক্ত অমসৃণ মৌর্যগুপ্ত অনুভব বিষে বিষে আজ শতদিকের বিশ্বজিৎ…

বিবিধ প্রলয়টুকু থাকুক প্রলয় ক্লান্ত অভিসারে মিশে,
নিজের সাথে নিজের খন্ড যুদ্ধ করতে গিয়ে দেখি,
অবাককান্ড আপাদমস্তক জুড়ে সর্বনাশের ঐকান্তিক সাপলুডো খেলা,
বিবাগী নহবতের ধুন একবার মনে ধরলে, দিনমান বিষণ্ণতাটা মধুর কৃষ্ণ রাগিনী হয়ে ওঠে…

যে ঘর ভুলেছে তাঁকে ঘরে ডাকতে নেই,
যে গেছে হারিয়ে শত সহস্র যোজন পদাতিকে,
সে যে ফিরবে না …ফিরবে না …. কোনোদিন,

একাকিত্ব যখন অখণ্ড উৎসব হয়ে ওঠে আয়োজন তখন অপ্রয়োজন এক বিশেষণ,
তোমার বাড়ি যাব তোমার কাছে যাব….এটুকুই যা

ফিরে যেতেই তো এসেছিলাম তোমার কাছে সামান্য জল মুড়ি বাতাসা দিয়ো
এবার আমি আসি
গন্তব্য যে এখনো অনেক অনেক দূর খালি পায়ে পৌঁছতে হবেই
সে যে নিরুপায় এক বিবাহিত সন্ন্যাসী ….
অবিরাম পথচারী
সীমাহীন আলোকময় আনন্দ দৃষ্টি

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।