|| কালির আঁচড় পাতা ভরে কালী মেয়ে এলো ঘরে || T3 বিশেষ সংখ্যায় শম্পা সাহা

শীতঘুম

কাজরী খুব সুন্দরী।কালো কষ্টিপাথরে কোঁদা শরীর, নিটোল বাঁধুনী,চোখ ঘোরানো যায় না ওর দিকে তাকালে।নাক যদিও থ‍্যাবড়া, গোদা বাংলায় যাকে বলে বোঁচা।কপালও ঠাকুর দিদিমার কথায় ভিটকপালী।সাদা চোখে সুন্দরী নয় মোটেও।তাহলে সুন্দরী কেন?ওর চোখ দুটো!এ যেন এক রহস‍্যময় ঘূর্ণাবর্ত।দিঘীর জল টলটল কিন্তু স্থির।এ চোখ গভীর, বিরাট কিন্তু চঞ্চল সব সময় যেন কিছু খুঁজছে,স্পষ্ট চোরা স্রোত বোঝা যায়।ওর দিকে তাকানো বিপজ্জনক।ডুবে যাবার বড় ভয়।

ওদের এই উঠাইগিড়া যাযাবর বস্তি।রুক্ষ চুল,আঁটসাঁট সস্তা ছিটের চুড়িদার, বাঁ কাঁধ থেকে ঝোলানো উড়না ডান দিকে কষে বাঁধা! একেবারে পেটানো চেহারা, ছটফটে দৃপ্ত চলন।সবথেকে বড় কথা নির্ভিক চাউনি, আর বেপরোয়া হাবভাব।এটা ওকে যেমন পুরুষ মানুষ কে আগুন ফাঁদের মত টানে যেন ডানাওয়ালা পিঁপড়ে।পুরুষেরা ডুবে মরতে চায় সহজেই কিন্তু কাজরী ওর নামের মত গাঁয়ের রং নিয়েই দাপিয়ে বেড়াতো সাবলীল ভঙ্গিমায়।

সনাতন বাঘেলকে একদিন হঠাৎই পাওয়া গেল জঙ্গলের ধার ঘেঁষে যেখানে একটা পুরানো কালীমন্দির তার পেছনে,মৃত,শক্ত কাঠ হয়ে।এ মন্দিরটা নাকি ডাকাতরা তৈরি করেছিল তাদের উপাস্য দেবী ডাকাত কালীর উপাসনার জ‍ন‍্য।জায়গাটা ঘন শাল আর কেন্দুপাতার জঙ্গল।এখন অবশ‍্য ডাকত ফাকাত নেই তাই দেবীও পুজিতা নন।পরিত‍্যক্ত ই বলা চলে।শোনা যায় এখান থেকেই নাকি নানা রকম বেআইনি গাছকাটা টাটা হয়।

এই জঙ্গলের ধার ঘেঁষেই কাজরীদের গ্ৰাম।অল্প কয়েক মদেশিয় পরিবার কবে যেন এসে ডেরা বেঁধেছিল।তারপর এখানেই রয়ে গেছে জঙ্গলের গা ঘেঁষে।তাদের রুটিরুজি বলতে জঙ্গল থেকে পাতা কুড়ানো আর জ্বালানি।তাই বেচেই সংসার।

তবে সরকার থেকে জয়েন্ট ফরেস্ট ম‍্যানেজমেন্ট চালু হবার পর এই প্রান্তবাসী পরিবারগুলো কিছু সাহায্য পেয়েছ।ওই আর কি,জঙ্গল পাহারা দেবার বিনিময়ে কিছু অর্থ আর জঙ্গল থেকে পাতা ,কাঠকুটো কুড়ানোর অনুমতি।

কিন্তু এখানে কিছু বদমাইশ লোক যাদের কাজই হলো মদেশিয় সুন্দরী মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা।হয়তো কোনো তরুণী জঙ্গলে জ্বালানি কুড়োতে গেল কিন্তু আর ফিরে এলো না।যখন খোঁজ পড়লো ততক্ষণে হয়তো চালান হয়ে গেছে পাচারকারীর জিপে করে ,ক্লোরোফর্মের নেশায় বুঁদ পিছমোড়া অবস্থায় কোনো বড় রাস্তা ধরে মুম্বাই অথবা ওই রকমই কোনো বড় শহরে।

সনাতন বাঘেলের পর মন্টু পয়ড়‍্যা।তার ও ওই এক অবস্থা।মরেছে কখন জানা যায়নি, কিন্তু বডি পেতে পেতে রিগর মরটিস সেট ইন করেছে।পর পর দুটো মৃত্যু ওই ছোটো এলাকায় আবার একই ভাবে।যা ছোট্ট গ্ৰামটাকে এবং সেখানকার প্রশাসনকেও নাড়িয়ে দিল।

সনাতন বাঘেল বা মন্টু পয়ড়‍্যা দুজনেই যথেষ্ট প্রভাবশালী।যদিও লোকে চেনে জঙ্গলের ইজারাদার হিসেবে তবে ওদের আসল কাজ যে মেয়ে পাচার তা এক গোপন প্রকাশিত সত‍্য।সেই জবরদস্ত শক্তপোক্ত চেহারার মানুষের এই অদ্ভূত মৃত্যু, সবাইকে বেশ চমকে দেয়। পোষ্ট মর্টেম রিপোর্টে জানা যায় কোনো কারণে দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে ,ঘাড়ের হাড় আর শিরদাঁড়া ভাঙা।যেন কেউ আচ্ছা করে বিরাট বড় শিল বা ভারী পাথর চেপে মেরে ফেলেছে।কিন্তু এতো অমানুষিক কান্ড।চোখ ঠেলে বেড়িয়ে আসছে,চোখেমুখে যন্ত্রনার ছাপ স্পষ্ট।কিন্তু কোনো আঘাত বা ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই।

ওদের দলের ছোটেলাল হল সবচেয় নোংরা আর বদমাইশ টাইপের লোক।যেমন বিরাট চেহারা, তেমনি শকুনের মত দৃষ্টি।ভুরুর নীচ দিয়ে এমন ভাবে তাকায় যেন মাংস ফুঁড়ে সোজা হৃদপিণ্ড দেখতে পাচ্ছে।

ওর ভয় ডরও কম।ঝোলা গোঁফে তা দিয়ে মাঝে মাঝেই বলে
-ডরনেকি কোনো বাত নেহি
দু দুটো মৃত্যু যখন ওদের দলের সবাইকে একটু থমকে দিয়েছে তখনো ছোটেলাল দমবার মানুষ নয়।
-আরে লড়কি সাপ্লাই না হলে পেট চলবে কিসে??

সেদিন অমাবস্যা।কালী পুজো হলেও ওই কালী মন্দিরে পুজোটুজো হয়না।ছোটেলাল তাই ওখানেই প্রায় দিন আসর বসায়।এদিনও তার ব‍্যতিক্রম না।সবে গোটা কয়েক পেঁয়াজি ,ফুলুরি নিয়ে এসেছে।রতুয়া গেছে কয়েক বোতল পচুই আনতে।হঠাৎই ছোটেলালের চোখে পড়ে কাজরী ধীর পায়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসছে।হাতে কটা জবা ফুল আর সঙ্গে কিছু জংলী ফুলও আছে।ওকে আসতে দেখে কৌতুহলী ছোটেলাল একটু আড়ালে যায়।

কাজরী ধীর পায়ে এসে ভাঙ্গাচোড়া বেদীর ওপর ফুলগুলো রেখে মাথা নোয়ায়।আঁটোসাঁটো শাড়ির ফাঁক থেকে ওর উদোম কোমর,কা‍ঁধ শরীরী বিভঙ্গে ছোটেলালের ভেতরকার পশুটা জেগে ওঠে।ও এগিয়ে গিয়ে হাত রাখে কাজরীর খোলা কোমরে।চমকে ওঠে কাজরী
-কৌন?
-হামি রে কাজরী, ছোটেলাল
-তু এখানে কেন?
-বারে তু আসতে পারিস হামি পারে না?
-সর,যেতে দে
ছোটেলালের বাড়ানো হাত ছিটকে এগোতে চায় কাজরী।ছোটেলাল খপ্ করে কাজরীর হাতখানা ধরে বুকের মধ্যে টেনে নেয়।এরপর ওর ঠোঁট যখন কাজরীর ঠোঁটের ওপর নেমে আসতে চায়,কাজরী অদ্ভুত শান্ত হয়ে যায়।হঠাৎই ওর গা একেবারে বরফের মত ঠান্ডা ।ছোটেলাল চমকে ওকে ছেড়ে কয়েক পা পিছিয়ে দেখে সন্ধ‍্যে নামার আলোআঁধারীতে ওর সামনে দাঁড়িয়ে কাজরী কই?একটা কুচকুচে কালো ময়াল সাপ,অদ্ভূত ভাবে লেজে ভর দিয়ে প্রায় পাঁচ ফুট ,সাপের চোখদুটো বড় সুন্দর, মায়াবী কিন্তু স্থির নয়,রহস‍্যময় সম্মোহনী তাতে।

ছোটেলাল যেন মন্ত্রবশীভূত।নড়তে পারে না,শেষে ধীরে ধীরে ময়ালটা এগিয়ে এসে পেঁচিয়ে ধরে ছোটেলালকে।গাল বেয়ে,পা বেয়ে,সারা শরীর বেয়ে ময়ালটার ঠান্ডা শীতল মৃত্যুর স্পর্শ।দম আটকে আসছে,বুকে বড্ড চাপ লাগছে,ব‍্যথায় কঁকিয়ে ওঠে ছোটেলাল কিন্তু শব্দ বের হয় না কোনো।ধীরে ধীরে মট মট করে পাঁজর ভাঙার শব্দ।শেষে জিভ বেড়িয়ে, ঘাড়ের হাড় ভেঙে ঘাড়টা ঝুলে পড়ে ধর থেকে।ময়ালটা বাঁধন আলগা করলে ধপ্ করে ছোটেলালের প্রাণহীন দেহটা পড়ে যায় মাটিতে।

ময়ালটা ভারী শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় দেবীর ভাঙ্গাচোরা বেদীর নীচে ,কিছুক্ষণের শীতঘুমের জন‍্য।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।