রবিবার, সকাল আটটা বাজে। ঘুম ভেঙে গেলো হঠাৎ করেই। জানালা খুলে দেখি, ঝকঝকে শারদীয় আকাশ হাতছানি দিয়ে ডাক পাঠাচ্ছে। ঝটিতি ডিসিশন নিলাম, আজ বেরোবো,কোথাও ঘুরে আসবো একা, নিজেকে নিয়ে, নিজের সাথে। স্নান, পুজো সেরে ব্রেকফাস্ট খেয়ে তৈরী হতে হতে নয়টা বাজলো।কোথায় যাবো ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো একটা গ্রুপে পড়েছিলাম, বরতির বিল এর কথা। ব্যস আর কি, আমার বাহনের পিঠ চাপড়ে বেরিয়ে পড়লাম। ফাঁকা বাইপাস, মসৃণ গতি নিল আমার অ্যাভেঞ্জার। লেকটাউন পৌঁছে গেলাম বেশ তাড়াতাড়ি। আরে এটা সেই জায়গা না? আমার আর আমার তৎকালীন প্রেমিকার ( পরবর্তীতে স্ত্রী) রাঁদেভু পয়েন্ট ছিলো। ওখানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি, এমন সময় এক পশলা বৃষ্টি এলো। আমার অগোছালো চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেয়ে টুপ টুপ করে জল ঝড়লো। আমাকে এক ঝলক ভিজিয়ে দিয়ে, বৃষ্টি কোথায় আবার চলেও গেলো। শরতের ঝলমলে রোদ শরীরে মাখতে মাখতে এগিয়ে চললাম। বারাসাত ব্যারাকপুর রোডে নীলগঞ্জ যখন পৌঁছে গেলাম তখন প্রায় সাড়ে দশটা। আর ছয় কি মি মাত্র। আরে ওটা কি? বাইক দাঁড় করিয়ে নেমে পড়ি। এ বছরের অধরা কাশফুল আমার সামনে। এক নিমেষে মন ভরে উঠলো। কাছের এক ফিরি ওয়ালার থেকে পেয়ারা মাখা কিনে খেলাম। তার নির্দেশিত পথ ধরে অল্প পরেই এসে দাঁড়ালাম বরতির বিল এর পাশে। আকাশ তখন অল্প মেঘলা, রোদের তেজ কমে গেছে অনেকক্ষণ। মৃদু মন্দ হাওয়া দিচ্ছে। যতদূর চোখ যায়, নীল সবুজের দাম্পত্য। খালি মাঝে মাঝে কয়টি ধানের মড়াই। একটি বাচ্ছা ছেলে আদুল গায়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। দাদাভাই, নৌকা চড়ে বিলের মাঝে ঘুরতে যাবে? তুই নিয়ে যাবি? নাম কি রে তোর? আমার নাম প্রনব বিশ্বাস। ক্লাস এইটে পড়ি। কত নিবি? দেড়শো দুশো যা মনে করবে দিয়ো। দুশো টাকার একটি নোট বার করে দিই। সেটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে প্রনব বললো চলো। একটি ছোটো কাঠের শালতি। আরাম করে বসি। প্রনব গল্প বলতে বলতে নৌকা বায়। শাপলা ফুটে আছে দিকে দিকে। সাদা বক, নাম না জানা কত পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক টানে মাস্ক খুলে ফেলি। আর বিশুদ্ধ বাতাস আমার ফুসফুস ভরে তোলে। আঃ কি শান্তি চারিদিকে। ছবি তুলি এন্তার, প্রনব আমার একটা ভিডিও শুট করে দেয়। ভিডিও কলে বাড়ি, বন্ধু বান্ধবী দের ধরি। আমার চোখ দিয়ে তাদের ও দেখাই অপরুপ সব দৃশ্য। বড়ো ভালো লাগে।
প্রনব জানায়, এই বিল খালি বর্ষার সময় জল ভরে থাকে। বাকি সময় চাষ হয়। শীতে পেঁয়াজ, তারপর পাট। জমা জলের মধ্যে ছোট্ট ছোট্ট মাছ, কয়েকজন ধরছে দেখতে পাই। তারা হাত নাড়েন,আমিও নাড়ি। বেলা বয়ে চলে। আরো কয়েকজন টুরিস্ট এসেছেন দেখি। প্রনব যত্ন করে সব দেখায়। প্রায় ঘন্টা দুয়েক ওর সাথে কাটাই। ও মাঝে মাঝে শাপলা তোলে। কেন জিগ্যেস করায় কিছু বলে না। শুধু হাসে।
একসময় ঘাটে ভেড়ে আমাদের নৌকা। দাদাভাই, আবার কবে আসবে? পুজোর সময় আসবে তো? কথা দিই, আসবো, এবার তো আর ঠাকুর দেখা নেই। নাহয় প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত রেখে মাকে মনে মনে পুজো করবো। দাদাভাই এই নাও। দেখি সেই শাপলা গুলো, আর একটা মোচা। দাদাভাই কে ছোট্ট মাঝি ভাই এর উপহার। মন ভরে যায়। কিন্তু ওকে আমি কি দিই? ব্যাগ হাতড়ে একটা ডেয়ারি মিল্ক বেরোয়। কি খুশি হয় প্রনব। ওর সাথে ছবি নিই। আবার আসবো শিগগিরই, বলে বাইক স্টার্ট করি।
পিছনে পড়ে থাকে ছোট্ট মাঝি ভাই, পড়ে থাকে বিল তার অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে। আমি এগোই, এক বুক টাটকা বাতাসে মন ভরে।
এই ছোট্ট ভ্রমণ টি, গত মাসের, অক্টোবর ৪ তারিখের।পরবর্তীতে বরতির বিলে আরো একবার গেছিলাম, পুজোর ঠিক আগে আগেই। প্রণব কে আগে থেকেই ফোন করে নিয়েছিলাম, মাঝি ভাই তার দাদাভাই আর তার বন্ধুকে খুব ভালো করেই ঘুরিয়ে ছিল। আপাতত বিলের জল শুকিয়ে সেখানে পেঁয়াজ চাষ চলছে, অপেক্ষা করে আছি, বর্ষাকালে, আবার ফিরে যাবার।