ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজে শতদ্রু ঋক সেন – অন্তিম

ফেরা
ঘুম যখন ভাঙলো, তখন আকাশ কালো হয়ে আসছে। ঘড়ি বলছে ভোর ছয়টা। চাদরটা ফের মুড়ি দেব ভাবছিলাম, কিন্তু অলরেডি নিজের প্ল্যান অনুসারে ঘন্টা খানেক লেট চলছি। রবিবাসরীয় ল্যাদ ঝেড়ে ফেলে উঠে পড়ি। যা হয় হোক, ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, আমার প্ল্যান করা সোলো ট্রীপে যাবোই।অনেকদিন ধরে ভেবে রাখা, যার জন্য হাজার ইচ্ছা থাকলেও, স্কুল আ্যলুমনি আ্যসোসিয়েশনের টীচার্স ডে অনুষ্ঠান মিস করবো, সেটা বিফলে যেতে দেওয়া যায় না। স্নান পুজো সেরে বেরিয়ে পড়ি। ঘড়ি বলছে, পৌনে সাতটা।
যাদবপুর ৮বি থেকে ই১ ধরে যখন হাওড়া ঢুকলাম, তখন আটটা দশ। জম্পেশ করে এক পেয়ালা চা খেয়ে টিকিট কাটি, আটটা পঞ্চাশের মেদিনীপুর লোকাল ধরি। ব্রেকফাস্টের বালাই নেই, ট্রেনে কিছু না কিছু খেয়ে নিলেই হবে। আবহাওয়া সম্পূর্ণ মেঘলা, ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে। ফাঁকা ট্রেনে, জানালার ধারে সিট নিয়ে বাইরে তাকাতে তাকাতে যাত্রা শুরু।
দুই ঘন্টা পনেরো মিনিট পর বালিচক স্টেশনে নামি। ততক্ষণে ঝালমুড়ি, মোচার চপ, ঘুঘনি আর চা সহযোগে পেট টাও ভরা। একটি টোটোর সাথে চুক্তি সারি, আমাকে আমার গন্তব্যস্থল ঘুরিয়ে আবার ফিরিয়ে আনবে স্টেশনে। ৫০০ টাকায় চুক্তি হয়। টোটোচালক হাসিখুশি যুবক, নাম সৌরভ পন্ডা। তার সাথে এগিয়ে চলি আমার গন্তব্যস্থলের দিকে। আমার গন্তব্যস্থল, পিংলা ব্লকের অন্তর্গত, নয়াগ্রাম, যা কিনা পটচিত্র গ্রাম হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছে।
চারিদিকে সবুজ, আর তার মাঝে কালো পিচের রাস্তা বেয়ে টোটো এগিয়ে চলে। চল্লিশ মিনিট পর পৌঁছে যাই পটচিত্র গ্রামে। এই গ্রামের কথা প্রথম শুনি, শ্রদ্ধেয় অগ্রজ, সাগর দার লেখায়। তারপর আরো অনেকের লেখা পড়েছি। আজ নিজে চাক্ষুষ করতে হাজির।
গ্রামের ভেতরে ঢুকি, সৌরভ সঙ্গে চলে। এক ভদ্রলোক, হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানান। ওনার নাম বাপি চিত্রকর। ওনার বাড়িতে যাই। শীতলপাটি পেতে দেন বসতে। চোখের সামনে এক ভদ্রমহিলা কে পটে জীবন আঁকতে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। এরপর একের পর এক কাজ দেখান, চমক লাগে দেখে। কি সুন্দর। কয়েকটি টি শার্ট কিনি, ওনাদের হাতে আঁকা। নিজের জন্য কেনা যেটি, সেটি পরেও ফেলি সাথে সাথে।
বাপি বাবুর বাড়ির পাশে কয়েকটি দেওয়ালে সুন্দর পটচিত্র আঁকা। ছবি তুলি সাথে সাথে। পাশের একটি বাড়িতে যাই। এটি পুতুল চিত্রকরের বাড়ি। উনি আর ওনার স্বামী আঁকতে ব্যস্ত ছিলেন। বসি, গল্প করি। টুকটাক জিনিস ও কেনা হয়। এটি জানতে পেরে অবাক হই, ওনারা সবাই মুসলমান। নিজেরাই হেসে বলেন, দেখুন, হিন্দু দেবদেবীর চিত্র এঁকে আমরা দিন চালাই। মন ভরে যায়। এই সম্পর্ক তো আজকের নয়। এই ভাবেই তো যুগ যুগ ধরে একে অন্যের সাথে মিলে মিশে দুটি ধর্মের মানুষ বাংলায় রয়েছে। এই তো আমাদের বাংলার রূপ। খুব, খুব ভালো লাগে। মন থেকে মুছে যাত্রার ক্লান্তি। পুতুল দি গান শোনান। মাছের বিয়ের গান। সেই গান নিয়ে আঁকা পটচিত্র ও দেখান।
এদিকে আকাশে মেঘ কালো করে আসে। ওনাদের কাছে বিদায় নি। আবার আসবো জানাই। ওনারা ওনাদের কাছে পরেরবার খাবার আমন্ত্রণ জানান। অবশ্যই বলে বেরোই।ততক্ষণে বড়ো বড়ো বৃষ্টির ফোঁটা আমার মুখ মাথা ভিজিয়ে দেয়। দৌড়ে টোটোয় উঠি। বালিচক স্টেশনে এসে একটা ছোট্ট ভাতের হোটেলে খুব সাধারণ, কিন্তু উপাদেয় খাবার খাই। পরিশেষে, ওখানকার বিখ্যাত মুগের জিলিপি কিনে, ফেরার ট্রেন ধরি। এই আধা ঘন্টা হলো বাড়ি এসে ঢুকেছি।
আমার বন্ধুবৃত্তের পরিজনদের অনুরোধ, আপনারা পারলে একবার ঘুরে আসুন। ভালো লাগবে কথাটা আন্ডার স্টেটমেন্ট, মন যে ভরে যাবেই, তা আমি হলফ করে বলতে পারি।।।