গল্পে শতদ্রু ঋক সেন

তবুও জীবন

পিংং…. একমনে অফিসের কাজ সামলাচ্ছিলো অনীক, আজ কাজের প্রচুর চাপ। মাস শেষের মুখে, একগাদা নতুন মালের অর্ডার, সারা ল্যাব জুড়ে তুমুল ব্যস্ততা। এর মাঝে আবার কে মেসেজ করলো? পকেট থেকে ফোন টা বার করে অনীক, একটা মেল এসেছে, জিমেইলের টীম থেকে। আপনার মেইল ৯৯ শতাংশ ফুল, হয় আপনি মেইলবক্স খালি করুন, নয় আপগ্রেড করুন। তার নীচে একগাদা প্ল্যান দেওয়া।
হুম, এটা একটা বড়ো সমস্যা। অফিসিয়াল মেল আইডি বাদ দিলে এটা অনীকের প্রধান মেল আইডি, অনেক জরুরি মেইল আসে এখানে। নাহ্, হাতের কাজ সেরে কিছুটা মেইলবক্স খালি করতেই হবে, ঠিক করে অনীক। আধাঘণ্টা পর, হাতের কাজ কিছুটা গুছিয়ে, ল্যাবের ছোটো ঘরটায় ঢোকে অনীক, এক পেয়ালা কফি নিয়ে আয়েস করে বসে। এবার মেইলবক্স খালি করার পালা। হাজার একটা অকাজের মেইল ঢুকে বসে আছে, আজ ঘেঁটি ধরে সব কটাকে ডিলিট করবে।
স্প্যাম, জাঙ্ক যা মেইল ছিলো, এক ধারসে সব ডিলিট করে দেয় অনীক। ভুলভাল অনেক কোম্পানির প্রমো মেইল এসে বসেছিল, একে একে শেষ করে সেগুলোও। আর কি ডিলিট করা যায়? ভাবতে ভাবতে হাত যায় সেন্ট আইটেম্স ফোল্ডারে, এবার এটার পালা, মোটামুটি বছর দুই আগে পাঠানো মেইল গুলো দিয়ে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। এক এক করে ওড়াতে ওড়াতে হঠাৎই চোখ পড়ে একটি মেইলের ওপর, প্রায় ১২ বছর আগে পাঠানো, সাবজেক্ট লেখা আছে জি টকের মোড়ে.. রাত দুটো। আরে এটা আবার কি, এ কি মেইল করেছিলাম আমি? ভাবতে ভাবতে মেইলটি ওপেন করে অনীক, আর খুলেই স্তম্ভিত হয়ে যায়। এ যে সেই চ্যাট টা, জি টক থেকে কপি করে একজনকে পাঠানো, তাকে সারা জীবন কাছে রাখার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে। চুপ করে বসে অনীক, তার মনের মেইলবক্সে তখন ঝড় উঠেছে।
২০০৯ সাল, তখন ফেসবুক কচি শিশু, অর্কুটের রমরমা বাজার। এই অর্কুটেই এক কমন বান্ধবীর মাধ্যমে, অনীকের আলাপ অনীতার সাথে, দুই সপ্তাহ চ্যাট করার পর, অনীক নিজেই প্রথম নিজের মনের কথা বলেছিল, অনীতা সানন্দে রাজি ছিলো, সেই চ্যাট টিকেই কপি করে অনীতাকে পাঠিয়ে ছিলো অনীক, দুজনেই ভেবে রেখেছিল বুড়ো বয়সে পড়বে এক সাথে বসে, রোমন্থন করবে কাছাকাছি আসার সেই দিনটিকে। এত বছরে দুজনেই সেটা ভুলে গেছিলো।
অনীক চোখ তোলে, বুঝতে পারে জল গড়াচ্ছে চোখ দিয়ে। এই জীবনে হয়তো আর দেখা হবে না অনীতার সাথে, গতকাল কোর্টে তাদের সম্পর্ক চ্ছেদ হয়ে গেছে পাকাপাকি ভাবেই। আর কি অদ্ভুত পরিস্থিতি, আজ ই কিনা শুরুর দিন টা সামনে এলো।
ডিলিট করতে গিয়েও মেইল টা রেখে দেয় অনীক। থাক না মনের এক কোণে পরে, স্বাক্ষী থাকুক ঝড়ের মাঝে ভালো সময়ের।
এ শহরে রোজ কতো এরকম দম্পতি নিজেদের সংসার শেষ করে ফেলে। কেউ ভালো থাকে, আবার কেউ থাকে না। আসুন এদের সবার জন্য একটি গান বাজাই আমরা, কামনা করি যেন নতুনভাবে নতুন করে বেঁচে উঠুক তারা।
তাদের জন্য রয়েছে, অনুপ ঘোষালের কন্ঠে এই গানটি…. তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগী…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।