গল্পে সর্বাণী রিঙ্কু গোস্বামী

ক্ষমা
তিনি সামনের ঝলমলে আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন চুপচাপ , ওগুলো লোকালয়ের আলো । মানুষজন বসবাস করে ওখানে , তারা এবার কাজকর্ম শেষ করে বাড়ি ফিরছে একে একে । শীতের কুয়াশা আস্তে আস্তে পাতলা চাদরের মতো ঢেকে দিচ্ছে উপত্যকা , রাত বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা বাড়বে আরো । তিনি গায়ের মোটা সুতির চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিলেন সর্বাঙ্গে , মাথায় ঘোমটার মতো করে কাপড়টা দিয়ে চাপা দিলেন কানদুটোও ।
বয়েস হয়েছে তাঁর , শীতটা একটু বেশিই লাগে আজকাল । বহু বহুযুগ আগে একদিন ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে খুব গোপনে বহু পথ পার হয়ে সেই বালির দেশ থেকে এসেছিলেন এখানে । যে মানুষ রা পাথর ছুঁড়ে একদিন তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল , দাবি তুলেছিল একজন চোর আর ডাকাতের ঠিক মাঝখানে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার …. তাদের তিনি ক্ষমা করেছিলেন । চেয়েছিলেন তাদের ভালো করতে , এমন এক শান্তির আশ্রয়ের সন্ধান দিতে যেখানে পৌঁছতে পারলে প্রাণের শান্তি মনের আরাম । প্রতিদিনের তুচ্ছ স্বার্থপরতা থেকে ওপরে উঠতে শিখবে মানুষ , পরস্পরকে ভালোবাসবে ।
সেই সত্যের সন্ধানে ছিল তাঁর একক পদযাত্রা , পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে । এখানে এসে তিনি অনেককিছুই জেনেছেন শিখেছেন । জেনেছেন বহু হাজার বছরের বিস্মৃতপ্রায় অলৌকিক জ্ঞানের কিছু সে সব খালি তাঁর ব্যক্তিগত উন্নতি ঘটিয়েছে , সমগ্র মানবসমাজের কোনো উন্নতি হয়নি তাতে । একদিন তিনি উপলব্ধি করলেন মানুষ আসলে নিজের অবস্থাতেই খুশি , সে আত্মিক উন্নতি সম্পর্কে উদাসীন । কয়েকটা ছোট ছোট স্বার্থপূরণ হলেই সে নিজেকে তৃপ্ত মনে করে , এই উপলব্ধি হওয়ার পর তিনিও খানিকটা উদাসীন হয়ে গেছেন ।
রাত নামছে দ্রুত , তাঁর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকা মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি নরম গলায় বললেন , “চল মা ,এবারে ভেতরে যাই আমরা । ” মাত্র একমাস আগে মেয়েটি এসে পৌঁছেছে এখানে , ওর ক্ষতবিক্ষত অবস্থা দেখে তিনি আঁতকে উঠেছিলেন । মানুষ এমনটা পারে , এ দেখে তো পশুও লজ্জা পাবে ! মেয়েটা একটাও কথা বলেনি এখনও, কেবল শ্রান্ত আর রক্তাক্ত দুটো চোখ মেলে কিসের অপেক্ষায় যেন তাকিয়ে থাকে ঐ জনপদের দিকে ।
ধীরে ধীরে মেয়েটাকে তুলে ধরলেন তিনি , ন্যাকড়ার পুতুলের মতো এক একটা অঙ্গ ঝুলছে ওর । কষ্ট হয় , বড় কষ্ট হয় তাঁর । জল এসে পড়ে চোখে , অব্যক্ত যন্ত্রণা কন্ঠরোধ করে তাঁর । মেয়েটা তাঁর করুণাঘন চোখ দুটোর দিকে তাকায় , তারপর ছিঁড়ে ঝুলে পড়া রক্তাক্ত ঠোঁট দুটো বহুকষ্টে নাড়িয়ে প্রশ্ন করে , “আমি কবে ওদের ক্ষমা করতে পারব ?”