।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

দেবী ১৪২৭

কাশফুলের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে অবাক দুটো চোখ,কাদায় পা ডুবে গেলেও ল্যাম্প-পোষ্টে কান রেখে শুনছে দূর থেকে আসা ধোয়া ওঠা হুইশেলের আওয়াজ ।
“ভাই বলে ওঠে – দিদি….
দিদি উত্তর দেয় – বোস,খা না…
ভাই অবাক দৃষ্টিতে শুধোয়,”কোথায় এলাম রে,ওগুলো কি রে…!!!”
দিদির ঠোঁট উল্টে জবাব সে জানে না …”
আর তারপরেই এক ছুট অজানা “ওগুলোকে” দেখতে …
ওই অপু দূর্গার প্রথম ট্রেন দেখা ।
আর আমার বড়ো হয়ে ওঠার প্রথম দূর্গার বাস্তব রুপ ।।
মহীষাসুরমর্দিনী কল্প-রাজ্যে প্রথম হলেও,দশভূজার থেকে অনেক বেশী আপন আমার ওই শ্যামবর্ণা ভাসা-ভাসা চোখের শত ছিদ্র শাড়ি পড়া ডানপিটে দামাল দূর্গা ।অভিমানীও বটে।
বেশ ছিলো স্রেফ সাদা-কালো জীবন ।।
তখন পুজো মানে নতুন জামা,নতুন জুতো আর পুজোসংখ্যার ঘ্রাণ ।
কিন্ত এখন বয়সের সাথে সাথে রঙ লেগেছে জীবনে,
তীব্র রঙের ছটায় একটু যেনো আবছা লাগে ঠিক -বেঠিক !!
কিন্তু মা,”মহামায়া” তো স্বচ্ছ ।।
তাই ভাবলাম,আমার মতন করে কলম নাহয় একটু থিম-দূর্গা করুক আমার ক্যনভাসে ।।
শুরু হোক দেবী পরিক্রমা :-
১। আমি পার্বতী ।সোনার প্রতিমা নই,আমি মাটির পুতুল,তাই আপন আপন লাগে।আমার সুখের ঘরকন্না,বর আর ছেলে।বেশ সুখী,বর ভীষণ ভালোবাসে তার ঘরোয়া-রুচিসম্পন্ন পার্বতীকে । ওফিস পার্টি হোক কিম্বা ছেলের স্কুল,যেকোনো জায়গায় “বিলকুল-ফিট” আমি।রাতের আদরে আবার স্বেচ্ছায় নিবেদিত আমার মাধবীলতা সুডৌল শরীর । শিক্ষিত,স্মার্ট এবং লক্ষীমন্ত । ছেলের বয়স এখন পাঁচ,আমার ইচ্ছে হয় আমি আবার,বিয়ের আগের মতন,চাকরী করবো।
কিন্তু তাহলে ঘর সামলাবে কে? বিকেলের পার্টিতে মসৃণ চামড়া ক্লান্ত লাগবে না তো? বৃহস্পতি তো তুঙ্গে,তাহলে আবার বেরনোর দরকার কি? “পারমিশন” দিতে চায় ভালোবাসা কিন্ত আদরে অসম্মতির সোহাগ।বেশ তবে নাম রাখলাম সর্বনাশের খাতায়,”আমি পারমিশন চাইনি,ইচ্ছে জানিয়েছিলাম”,সংসার ভাসিয়ে দিয়ে নয়,দুজনে আগলে রেখে..যা দেবী সর্বভূতেষু বুদ্ধিরুপেণ সংস্থিতা !!
২। আমার পরিচয় আমি হাই-ক্লাস এসকর্ট । আমাদের আসল নাম বলতে নেই ।মধুকন্যা আমি,তোমার বিষাক্ত হৃদয়ের ঘুলঘুলিতে বাস করা সময়।বিষাক্ত কার্বন শহরে ইটের পাঁজরে জমে থাকা তৃষ্ণা-নিবারণ আমার দেহ।কামনার জঙ্গলে,কালো হাত ছুয়ে যাচ্ছে নীথর শরীর ।
নিশি কালো রজনীর পৈশাচিক চুম্বন,কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে এই রক্ত মাংসের প্রাণহীন দেহ..কিন্ত ততোটুকুই যতটা আমি চাই । “না” বললে ইতিটানার ক্ষমতা রাখুক অন্যেরা।আমি পুরুষ-শক্তি দেখানোর বস্তু নই,গণিকার মাটিতেই তৈরী হয় মহামায়ার কাঠামো….যা দেবী সর্বভূতেষু তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা !!
৩। আমি রাণী,আমার ঊরুসন্ধি আমায় নাম দেয় “বৃহন্নলা”। না আমি রাস্তায় দাড়িয়ে আপনাকে গালমন্দ করিনা ।জানেন,আমি এক মেয়ের মা,হৃদয়-প্রসূত সে । আপনাদের অযাচিত আড়-চোখ ওঁকে স্কুল করতে দিচ্ছে না । জানেন তো,আমাদের দৈহিক শক্তি কিন্চিৎ বেশি ।মা কালী নগ্ন দেহে চন্ডি রুপ ধারণ করেছিলেন ।বিপ্লবী দাবানল আমরা,উড়িয়ে দিতে পারি আপনাদের কৌতুহলের প্রাচীর ।আমরাও মানুষ,(হ্যা প্রাণী বললেও সম্মানের)…..যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেন সংস্থিতা !!
৪। আমি কালো,মোটা,সাধারণ চোখ-মুখ,অশিক্ষিত,মুসলিম। নামের আগে লোকে এটাই জানে।বাবা অখুশি মেয়ে হওয়ায়,পণ নেওয়া হলোনা।মা নাম রেখেছিল জন্নত ।আমার রেপ হয়েছে ক’দিন আগে,পাড়ার সৌগতদাদের গ্রুপটা সেদিন রাতে আমায় তুলে নিয়ে
গেছিলো ।শরীর জুড়ে কাঁটা ঝোপ,মাঝখান দিয়ে চেরা জিভের মতো সাইরেনের চোরাস্রোত,ফোটেনি তখনও গোলাপ পূর্ণরূপে,কুঁড়ি ছিঁড়ে নিয়ে শয্যা সাজায় পিশাচের দল।ভয়াবহ কোনো চিৎকারে কেঁদে ওঠে,মায়াহীন এক শূন্য বাসরঘর।আমার দোষ আমি কুৎসিত মুসলিম।আমার বয়স ১৪।এইকারণেই তোমরা ধর্মকে ভয় পেয়ে পুজো করো,যদি অভিশাপ লাগে।হ্যা আমি নামগুলো আদালতে বলবো,পড়াশুনা জানলে ঠিক আইন নিয়ে পড়তাম।কদিন আগে তোমরা ছুয়েছিলে নির্বাক পাঁচবছরকে,আমি স্বাক্ষী দেবো…..যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা!!
৫। আমি নীনাকে ভালোবাসি।আমি মীরা।”সখি হম,মোহন আভিসারে যাউ/বোলো হম এতত সুখ কাহা পাউ” । আমার পেন্সিল-স্কার্ট আর হাই-হীল তোমাদের পে-চেকে সাক্ষর করে,তাই তোমরা সামনে চুপ । কিন্ত নীনার টেবিলে রাখা আমাদের ফোটোটা তোমাদের চায়ের টেবিলের বস্তাপচা টপিক।তোমাদের অযাচিত কৌতুহল,”কিভাবে করে ওরা”!ঠিক তোমরা যেভাবে করো,ভালোবেসে পাশে থেকে,ব্যস্ত সারাদিনের পর হাতে হাত রেখে,আলতো চুম্বনে,বালির উপর পাশাপাশি আমাদের পায়ের ছাপ ,স্বপ্ন।
আখরোট ঠোঁট ,ভিজে বালি ,বালিঘর।
তোমরা বলো,”অসুখ এসব”-মুর্খামীর বীজ তোমাদের বসন্তে…যা দেবী সর্বভূতেষু লক্ষীরূপেণ সংস্থিতা !!
৬। আমি দূর্গা,বয়স ৩৫,আমি নাকি মা হতে চাইনি। কারণ আমি দত্তক নিয়েছি(প্রসঙ্গত আমি ঋতুমতি,শারীরিক দোষ নেই)!বন্ধুত্বের লিঙ্গ-বিচার হয় জানলাম ডিভোর্সের দিন।না পরকিয়া আইনসম্মত হোক না হোক আমার কিচ্ছু এসে যায়না ।পরকিয়া কি?সিলেবাসের বাইরে আমার।আমি প্রথাহীন,স্বাধীনচেতা,দৃড়,রোজ অফিস করা,ওয়াইন-পার্টিতে রবি ঠাকুরকে সঙ্গী করে,দেদার আড্ডা মারা ভীষণ সাধারণ একটা মেয়ে।অন্ধকারকে ভয় পেতাম জানেন! কিন্তু এখন কাঁচের ভিতর দিয়ে যখন দেখি,যতটা দূর চোখ যায় স্পষ্ট স্বচ্ছ ঝকঝকে অন্ধকার কি পরিপাটী !
আমি সিঙ্গল মাদার,মেয়ের বয়স এখন তিন,বেশ লাগে ওর সব ঝক্কি পোয়াতে,ওফিস থেকে আসতেই যখন কেউ বলে”মাম্মা ইজ বেস্ট” তখন বুঝি নাড়ীর টানটা ঠিক কোথায় ।ভালো আছি আমি,নিজের মতন করে,রাতে শান্তিতে যখন দু-পাতা নিমজ্জিত হয় তখন বুঝি আমি ভুল করলে শুধরাতে পারি…মাতৃত্ব চয়েস,সামাজিক আইন বা পরিপূর্ণ নারী হওয়ার সংজ্ঞা নয়…..যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা !!
সমাজে ভদ্র হওয়ার গন্ডিতে রোজ কাঁদে অনেক লক্ষী।শোষিত অত্যাচারীত হয় অনেক স্তব্ধ অন্নপূর্ণারা রোজ।শুধু সেই আদালতে স্বাক্ষী থাকে কান্নাভেজা বালিশ আর রক্তক্ষরণে বিছানার চাদর।বিচার কে করবে তার? খুন হয় কন্যাভ্রুণ।ভবিষ্যত্বের মাতৃত্ব ধারণ করতে পারার যন্ত্রটাকেই তো পুরুষশোষিত ভদ্র সমাজ গর্ভাশয়ে শেষ করে দেয়।কিন্তু এবার মহাশক্তির গর্ভ থেকে জেগে ওঠে আজকের দশভুজা।সে অপ্রতিরোধ্য,সে তীব্র,সে সুন্দর,সে নবরুপে আবির্ভূত এই ফ্যাসিবাদের দাবানলকে হেলায় হারাতে।সে শান্তি,সে আনন্দ,সে অট্টহাসে অবিচল….সে এযুগের নারী,সেই মহামায়া।
সে ত্রিনয়নী।সুন্দর কালো দুচোখের গভীর হাতছানিতে তার আঁচলে বাঁধা পড়ে সমাজ।তৃতীয় নয়নে সে সুবিচার প্রদান করে দুর্বলদের।ভাষা পায় নির্বাক,হাতে হাত রাখে নারী-জাগরণের সুস্থ কান্ডারি।
কলমে,মহামায়া_ডিকোডেড !!
পরণে রক্তে রাঙা শাড়ি/
স্থির বসে আছে ঋতুমতী/
নারীশক্তি আর মান-হুষ/
প্রথম হবে চাক্ষুষ।
চলুন রেডিওতে দেবীপক্ষের শুরু,
মহাকাল বিনাশে মহাভৈরব নৃত্যে শুদ্ধ হোক ধরা ।
শিউলি ফোটা শিশিরভেজা শারদ প্রভাতে মৃত্তিকা থেকে অবয়ব পাচ্ছে দেবী ।
শঙ্খধ্বনিতে দূরে শোনা যায় পুষ্পান্জলি…
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ !!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।