সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩৮)

আমার মেয়েবেলা

ভুল

ভুল তো সবার জীবনেই কোন না কোন সময়ে হয়েই যায়। আমারও হয়ে ছিল। তখন আমি কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।আমার জীবনে সবচেয়ে বড়ো ভুল ঐ সময়েই। অজান্তে আমি একটা বিরাট অন্যায় করে ফেলেছিলাম। পরে বয়স বাড়তে, একটু ম্যাচুইরিটি আসতেই বুঝতে পারি কতবড়ো ভুল হয়ে গেছে আমার।
সেদিন শ্যামলী যখন বলল একটা উপকার করতে হবে বন্ধু। কোন সাত পাঁচ না ভেবেই রাজি হয়ে যাই। ঐ সময়ে তখন বন্ধুই তো সব হয়। বন্ধুই তখন পরম আপন। বন্ধু মানে জীবন মরণ। বাবা মা আত্মীয়-স্বজন তখন বেকার। বয়োঃসন্ধির সময়। ‘আমি এখন অনেক বড়ো। কলেজে পড়ি। ভালো মন্দ বুঝতে শিখেছি। এখন যখন তখন সবেতেই অত গার্জেনগিরি ভালো লাগে না।’মনের ভেতর কথাগুলো তোলপাড় করছে।
সবসময় একটা সবজান্তা ভাব নিয়ে কলেজ যাচ্ছি আসছি। এতদিন একটা দমবন্ধ অবস্থায় ছিলাম। আমার স্কুল জীবনে আনন্দ বলে কিছু ছিল না। মায়ের অতিরিক্ত শাসনে ভেতরে ভেতরে আমি একটা প্রতিবাদী বেয়াড়া মেয়ে হয়ে উঠেছিলাম। মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ফুঁসতে থাকতাম। প্রতিবাদ করতাম। চীরকাল আমি ঘরে বাইরে প্রতিবাদী বলেই পরিচিত।
যাইহোক কাউকে কিছু না বলে কোন রকম চিন্তা ভাবনা না করেই ঠিক করলাম শ্যামলিকে আমায় সাহায্য করতেই হবে।
পরদিন খুব তাড়াতাড়িই কলেজ পৌঁছালাম। নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছে। হুঁ হুঁ বাবা আমি যে সে লোক না। বন্ধু আমার কাছে সাহায্য চেয়েছে। তার মানে আমি পারব বলেই না চেয়েছে? উত্তেজনায় প্রথম দুটো ক্লাসে ঠিক মতো মনই দিতে পারলাম না। এর পর আমাদের একটা পিরিয়ড অফ আছে। কমন রুমের একটা কোণায় বসব আমরা। শুনব কী বলতে চায় ও।
ক্লাস শেষ হতেই আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল কমন রুমে। আমি গুছিয়ে বসতেই ও আমার হাতটা খপ্ করে চেপে ধরে বলল বন্ধু এই কাজটা তোকে করতেই হবে। একমাত্র তুইই পারবি।
আমি বললাম কী কাজ? আরে বাবা কাজটা আগে বলবি তো? কী করতে হবে আমাকে? সেদিন থেকে বলে যাচ্ছিস টেনশনে আমার ঘুম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। ফ্যাচ্ ফ্যাচ্ করিস না তো বলে ফ্যাল।
হঠাৎ শ্যামলীর মুখটা কেমন লাল হয়ে গেল লজ্জায়। হঠাৎ কেন লজ্জা পেল বুঝতে না বুঝতেই ও বলে উঠল। বেশি কিছু করতে হবে না। শুধু চিঠি লিখতে হবে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। চিঠিইইইই!!! কী বলছে রে বাবা। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ও আমার মুখটা দেখেই বুঝতে পেরেছে সবকিছু আমার মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
এবার ও আঁচলটা ঠিক করে আমার আরও কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, বন্ধু প্রেমে পড়েছি। এই এক মাস হল। একদিন পাঁচ মিনিটের জন্য দেখাও হয়েছে। দিদির ক্লাসমেট। এই কলেজ থেকেই পাশ করল। বি কম। সোস্যালে দিদির সঙ্গে এসেছিলাম। প্রথম দেখাতেই আমরা লায়লা মজনু। প্রতিদিন বিকেল বেলা বাড়ির সামনে দিয়ে যায়। আমি ছাদ থেকে দেখি। ও উপরে তাকায়। ঐ এক ঝলক তাকাতাকি।’ ,,,,, এক নিমিষে কথাগুলো বলে শ্যামলী একটা বড়ো করে নিঃশ্বাস ফেলল।
আমি খুব মন দিয়ে কথাগুলো শুনলাম। আমাদের সময়ে এটাই স্বাভাবিক। দেখা করা অসম্ভব একটা ব্যাপার। বাড়িতে জানতে পারলে পড়া ছাড়িয়ে, কলেজ ছাড়িয়ে বাড়িতে বসিয়ে রেখে দেবে। প্রেম করা ছুটিয়ে দেবে এক্কেবারে। জানলা দরজা পারলে ঘরের ছোট্ট ফুটো দিয়ে প্রেম পালিয়ে যাবে। বাপরে ভাবলেই গা শিউরে উঠত। কিন্তু তবুও আমি,,,,,
পরে সেকথা বলছি। গোলাপের পাপড়ি একটা একটা করে ছিঁড়তেই ভালো লাগে। আচার খেতে হয় একটু একটু করে, তারিয়ে তারিয়ে। যাক সে কথা।
এবার আমি সরাসরি ওর চোখে চোখ রেখে বললাম আমাকে আরও পরিষ্কার করে বল। ঠিক ক্লিয়ার না হলে আমি তোকে হেল্প করতে পারব না।
হাতটা আরো ভালো করে চেপে বলল বন্ধু তোকে শান্তকে চিঠি লিখতে হবে।
মানে? আরে শোন শোন আমার দ্বারা ওসব চিঠি ফিটি লেখা সম্ভব নয়। পেন কামড়ে রাতের পর রাত জেগে চেষ্টা করে গেছি। কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না। কী যে লিখব ভেবেই পাচ্ছি না। সারাদিনে এক ঝলক দেখা। কখনো কলেজ ফেরত কখনো ছাদের উপর থেকে। কী বলব বল চিঠিতে। কলেজের পাশে আমাদের ঐ আম বাগানে দেখা করা যায় অবশ্য। কিন্তু সেখানেও তো রিস্ক। কে কখন দেখে ফেলবে। সবে এক মাস হল। এই একমাসে ভালো করে তো চিনিই না যে অনেক কথা বলব। আসলে শুরুটাই তো করতে পারছি না। বন্ধু তুই শুরু টা করে দে তারপর আমি চালিয়ে নেব। আমি বললাম আমি তো প্রেম করি না। ভালো বাসিনা কাউকে। আমার তো এসবের কোন অভিজ্ঞতাই নেই। আমি তাহলে প্রেমের চিঠি কেমন করে লিখব? একটু চেষ্টা কর বন্ধু তুই পারবি। আমার মনে হচ্ছে তুই পারবি। এত সুন্দর বেগম আখতারের গান গাস তোর মধ্যে প্রেম নেই বলছিস? কী মুশকিল রে বাবা আমি তোর প্রেমিককে চিনি না জানি না। কোনদিন চোখেও দেখিনি। জীবনে কোনদিন কারোর সঙ্গে প্রেম করিনি আমি লিখব প্রেমের চিঠি? তাও আবার তোর হয়ে তোর প্রেমিককে? একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? আমাকে পাগল পেয়েছিস? এটেনডেন্সে প্রক্সি দেওয়া যায় তাইবলে প্রেমে? উরে বাবা আমি নেই। বন্ধুর জন্য এটুকু করতে পারবি না? সামান্য একটা চিঠি লেখা তাও পারবি না বন্ধু? তোর মত আমার বাংলায় অত জ্ঞান নেই। তুই কী সুন্দর গুছিয়ে লিখিস! তাই বলে বন্ধুর প্রেমিককে প্রেমপত্র! ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে বল? কেউ যদি জানতে পারে সর্বনাশ হয়ে যাবে আমার। আরে বাবা কে জানবে? তুই লিখে আমাকে দিবি। আর আমি সেটা চোথা করে শান্তদাকে দেব। ব্যাস্ ক্লিয়ার এতে এত কথার কী আছে! প্রেমপত্র লিখিস নি কোনদিন তাইবলে পড়িস নি তা তো নয়? একটা আইডিয়া করে লিখে দেনা কিছু একটা। আরে মাইরি বলছি শান্তদা দু দুটো চিঠি পাঠিয়েছে কিন্তু একটারও উত্তর দেওয়া হয় নি।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। ব্যাপারটা মন্দ নয়। আর তাছাড়া বেশ নতুনত্বও বটে। এর আগে এমন কেউ করেছে বলে শুনিও নি। প্রেম না করেও, প্রেমপত্র লেখা। হেসে ফেললাম আমি। বলে বসলুম সেই চরম অমোঘ সত্য বচন। বলা যায় আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো।
জানাজানি হবে না তো ভাই? আর যদি সে কোনোদিন সত্যিকারের পত্রলেখিকার প্রেমে পড়ে যায়, খোঁজ করে তার কি করবি তখন?
আরে দূর শম্পু শান্তদা জানবে কী করে যে চিঠিটা তুই লিখেছিস। কেউ জানবে না তোকে কথা দিলাম তোকে কোনোদিনই আমি ফাঁসাবো না। তুই নিশ্চিন্তে থাক।
আমি ওর হাতে অল্প চাপ দিয়ে বললুম, ওকে ডান্। তবে একটা শর্ত আছে। আবার কী হল? আরে নানা সেরকম কিছু নয়। তোর শান্ত দাকে আমি একবার দেখতে চাই। জীবনে প্রথম বার প্রেমপত্র লিখছি যাকে তাকে একবার দেখব না? তবে পছন্দ না হলে আমি কিন্তু লিখব না। শ্যামলী বলল এই মরেছে এ আবার কী শর্ত?
আমার মোটামুটি পছন্দ হয়েছিল। তাই শুরু হল আমার নতুন অধ্যায়। একদম একটা যেন নতুন জীবন। শুরু করলাম লিখতে। জীবনের প্রথম প্রেমপত্র তাও আমার নয়। অন্য কারো হয়ে লেখা,,,,,,,,

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।