সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৪১)

আমার মেয়েবেলা
আমার প্রথম প্রেমের গল্প
মেজদার (মেজ জ্যাঠা) ছোট্ট একটা রিপোর্টিং এর ফলস্বরূপ,, আমাকে আবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হল। সব রকমের অকাজ কুকাজ যে শুধুমাত্র আমিই করতে পারি সেই বদ্ধমূল ধারণাটা সেইসময় বাড়ির সবাই,, একে অপরের কানে,,মনে ঢুকিয়ে দিতে পেরে যে নিজেরা অতিশয় আনন্দিত এবং উৎফুল্লিত হয়েছিল সে ব্যাপারে আমার কোন রকম সন্দেহই ছিল না।
এখানে (ঠাকুমার বাড়িতে) সব সময় সব রকমের বাঁকা তীরের খোঁচা যে শুধু আমাকেই সহ্য করতে হবে সেটা ঐ সময় আমার মোটা মাথায় বেশ ঢুকেছিল। কারণ আমি ছিলাম অযথা তর্ক করা এক অবাধ্য স্বাধীনচেতা স্পষ্টবক্তা, তার উপর স্মার্ট সাহসী এবং অবশ্যই আকর্ষণীয়া।
তাই জীবনের সবথেকে সুন্দর দু দুটো বছর যে,, আমাকে একটা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে দিয়েই পার করতে হবে সেটা আমি বিলক্ষণ বুঝেছিলাম।
একা মানুষ হওয়া আমার যে এভাবে একটা একান্নবর্তী পরিবারে মানিয়ে চলতে কতটা অসুবিধে হতে পারে সেই কথাটা কেউ কোনদিন ভাবেই নি। যে কথা বাবা মা’র কাছে বললে কোনো অন্যায় ছিল না, সেটাকে নিয়ে এখানে যেন সমালোচনার ঝড় বয়ে যেত। আমাকেও তো সময় দিতে হতো! মানিয়ে নিতে ,,মেনে নিতে,,, বুঝতে, শিখতে।
একটা অন্য পরিবেশ,, হোক না সেটা আমার ঠাকুমার বাড়ি। কিন্তু আমি তো ওখানে মানুষ হই নি! আমাকে তো বোঝার সু্যোগ দিতে হবে এই পরিবেশে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। না,,,, আমাকে কখনোই সেই সুযোগটা দেওয়া হয় নি। তাই সবকিছু দোষের দায় আমার মাকেই নিতে হত। অবশ্য এখনও তাই। ছেলেমেয়েদের সব কাজের জন্য আঙ্গুলটা মায়ের দিকেই ওঠে।
আমি ফরাক্কায় বিকেলে সাইকেল চালাতাম। কোনরকম নিন্দের ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু এখানে কলেজ ছাড়া আর কোত্থাও যাওয়ার উপায় নেই। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নিন্দে। কোথাও বেরুলে রিক্সায় যেতে হবে তাও আবার পর্দা ফেলে। ওখানকার জীবনটাই শুরু হয়েছিল একটা ভালো খারাপের তুলনামূলক প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে একটা দম আটকানো পরিস্থিতি সামলে। কোনরকমে যেন বেঁচে থাকা। খোলা হাওয়া ছিল না। ছিল না খোলা আকাশ। সব সময় যেন একটা কেমন ভারি ভারি ভয় ভয় পরিবেশ। এই বোধহয় কিছু ভুল হয়ে গেল,এই বোধহয় কেউ আড়ালে কিছু বলছে!
আমি কোনদিনই আমার মন ভালো করার মতো কোনো পরিবেশ পাই নি। আমাকে প্রতিটি সময়ে প্রতিবন্ধকতা কেটে কেটে পার হতে হয়েছে। এখনও পার হতে হয়। অবশ্য সেইজন্য আমার কোন রকম আক্ষেপ নেই।
জীবনে উত্থান পতন, রোধ প্রতিরোধ না থাকলে আবার,,কিসের জীবন? একটা ম্যাড়ম্যেড়ে সাধারণ সুখী সুখী সুনুমুনু জীবন আমার পছন্দ নয়। নিজের বুদ্ধিতে, নিজের অসম্ভব একনিষ্ঠ কর্মে, অধ্যাবসায়ে প্রাপ্ত সাফল্য পেতে আমি সব সময়ই আগ্রহী। সহজলভ্যে কোন আকর্ষণ থাকে?
নিজের ইচ্ছে, নিজের ভালো লাগার জন্য আমি লড়তে ভালোবাসি। সেই ছোট্ট থেকে। হাত পেতে দান নেওয়ার থেকে লড়াই করে পাওয়াটাই আমার কাছে বেশি সম্মানের।তাই ভগবান সব সময়েই আমার জন্য একটা চিরস্থায়ী প্রচ্ছন্ন
রণক্ষেত্র তৈরি করেই রেখেছেন। এবং আমি তার জন্য proud for that.
আমি মনে করি ঈশ্বর আমাকে এমন ভাবে তিলতিল করে তৈরি করেছেন যাতে,, যে কোন যুদ্ধেই দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইটা আমি চালিয়ে যেতে পারব এবং শেষ পর্যন্ত জিতেও যাব। তাইতো আজ আমি নিশ্চিন্তে আমার কলম ধরতে পেরেছি। পারছি মেয়েবেলা লিখতে নির্ভয়ে ।
আসলে আমি কোনদিনই ভীতু ছিলাম না। যে কোন কষ্ট যন্ত্রণাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতাম। লড়তে লড়তে,, কষ্ট যন্ত্রণা পেতে পেতে নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করেছি যে,, আমাকে টলানো খুব মুশকিল।
ভগবান কে বিশ্বাস করে দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার পুকুরে ডুব সাঁতার কেটে এগিয়ে চলা মেয়ে আমি। আমাকে যন্ত্রণা দিতে হলে দুবার ভাবতে হবে ,,,,দুদণ্ড বসে উপায় বার করতে হবে। তবে একটা কথা এতসব জটিল পরিস্থিতিতেও কিন্তু আমি থাকতাম একদম বিন্দাস। সব কথা কানে গেলেও মাথা পর্যন্ত যেত না। খুব মন খারাপ হলে হিন্দি গানের সঙ্গে নেচে নিতাম। আর মন ভালো রাখার জন্য আশা ভোঁসলের গান ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারতাম না।
######
পাড়ায় ছেলেপুলেদের আসা নিয়ে যখন বাড়িতে একটা সন্দেহের ঘন কুয়াশা তৈরি হয়েছে,, আমি খুব স্মার্টলি বলেছিলাম পাড়ায় দুচারটে বাড়িতে অমন অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েটেয়ে থাকলে ছেলেদের ভীড় তো হবেই। এ আবার এমন কী? আসলে আমি যে কোন প্রতিকূল পরিবেশে নিজের প্রতি বিশ্বাসটা হারাতাম না। আর একটা ব্যাপার ছিল,,, কে কী বলল তাতে আমার কোনদিনই যায় আসত না। কারণ আমি ওখানে সারাজীবনের জন্য থাকতে যাই নি। শুধু কলেজ জীবন টুকু পার করতে গিয়েছিলাম।
ঠাকুমাকে একদিন আড়ালে ডেকে বললাম, ঠাকুমা নোওওও টেনশন।
তোমার মতো সুন্দরীর নাতনি বলে কথা। দু চারটে ছেলে ছোকরা যদি ঘোরাঘুরি করে করুক না। আমাদের কী? এটাকে এনজয় করো। আরে রাস্তায় বেরুব ছেলেপুলেরা যদি নাই দেখলো তাহলে জীবনে আর কী রইল বল? এই পানসে জীবন কারও ভালো লাগে ?
তবে আমি যে কোনও ফালতু বাজে কাজ করব না সে বিষয়ে কথা দিয়েছিলাম ঠাকুমাকে।
এইভাবে কিছুটা দুশ্চিন্তামুক্ত করতে চেয়েছিলাম আমার দাদু ঠাকুমাকে। বাবা মা থাকে না। আমার দায়িত্ব পুরোপুরি ওদের উপর। কিছু হলেই সবাই মিলে ক্যাঁক করে ধরবে। ‘আরে বাবা আমি চঞ্চল প্রকৃতির বলে সব কিছুতেই কী আমাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবে সবাই? কেন শান্ত মেয়েরা প্রেমে পড়ে না? ওদের দিকে ছেলেরা তাকায় না? নাকি ছেলেরা বেছে বেছে আমার মতো বজ্জাত চঞ্চলাকেই পছন্দ করে? কোন ছেলে যদি আমার দিকে তাকায়, সেখানে আমার দোষটা কোথায়?
আচ্ছা ওরা শান্ত বলে কী ওদের কোন সময় কোনো ছেলের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করে না? কোথাও কী এমন লিখিত নিয়ম বা নির্দেশ আছে? আর না তাকালে তাহলে তো ওদের ডাক্তার দেখানো দরকার! অসুস্থ ওরা, মানসিক এবং শারীরিক ভাবে! আরে এই বয়সে একটু আধটু ছেলে না দেখলে সংসারে থেকে কী হবে? কোনো ঠাকুরের আশ্রমে চলে যাই!’
যাকগে এত কথা শুধু চুপিচুপি ঠাকুমাকেই বলেছিলাম। আর ঠাকুমার যে মনের অবস্থা কী হয়েছিল সেসব কথা আর একদিন।
ঠাকুমা আমার ভীষণ ভালো বন্ধু ছিল। আমি সব কথা ঠাকুমাকেই বলতাম। একটা মাত্র নাতনি ছিলাম তো তাই কিছুটা ছিঁটে ফোঁটা আদর জুটেছিল এই পোড়া কপালে।
সবার অলক্ষ্যে সেদিন অনেক কথাই আমি ঠাকুমাকে বলেছিলাম। কারণ ওপেনলি বললে আমার অত্যন্ত কাছের বন্ধু মিঠুর (জ্যেঠিমার বোন)দিকেই আঙ্গুলটা উঠত। যেটা আমি চাই নি। তবে আমার থেকে মিঠু অনেক সুরক্ষিত ছিল। আর সেটা বড়ো জ্যেঠু জ্যেঠিমার জন্য। সে যাক্ আমি চিরকাল নিজের প্রোটেকশন নিজেই দিয়ে এসেছি। তখন থেকেই আমার এতটাই মানসিক জোর ছিল যে নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য কারোর সাহায্য নিতে হয় নি।
#####
দুর্যোগ তো আর বলে কয়ে আসে না। আসে যখন সবকিছু ওলোট পালোট করতেই আসে। এই রকম একটা অবস্থার মধ্যে বাবু হঠাৎ একটা ছুটির দিনে হৈ হৈ করতে করতে বাড়িতে ঢুকল। ওর পিসির বাড়ি(ওর পিসি আমার কাকিমা)অবারিত দ্বার।
একটা ব্যাপার ছিল ওর মধ্যে। খুব হৈহৈ করতে পারত। আসর জমানোর ওস্তাদ ছিল বলা যায়। আমার যে কী ভালো বন্ধু ছিল!
অনর্গল কথা বলত। এর তার পিছনে লাগত। ঠাকুমাও ছাড় পেত না। সবার সঙ্গেই ইয়ার্কি ফাজলামি করতে দ্বিধা করত না। বাড়িতে এমন একটা ছেলে থাকা মানে আনন্দ আর খুব হাসাহাসি। হাহা হিহি করতে করতে পেট ব্যথা হয়ে যেত। ছুটির দিনে আমরা বাড়ির সবাই ওর জন্য অপেক্ষা করতাম। সময়টা আমাদের দারুন কাটত।
তো যাইহোক একদিন এমন একটা গুরুগম্ভীর পরিবেশে হঠাৎ দুম করে বলে বসল,’কিরে মামনি তুই তো রঘুনাথগঞ্জ কাঁপিয়ে দিয়েছিস। কী একটা সবুজ শাড়ি পরে কলেজ গিয়ে ছেলেপিলেদের মাথাটা একেবারে ঘুরিয়ে দিয়েছিস। আমি কজনকে সামলাবো! বলেছি আমাদের বাড়ির মেয়ে ওদিকে চোখ দিস্ না ভাই।’
সেদিন যে এই পিছনে লাগার ব্যাপারটা আমার কপালে লেখা ছিল তার বিন্দুমাত্র পূর্বাভাস পাই নি। গোদের উপর বিষফোঁড়া। বলে কী ছেলেটা! সব গিয়ে সেই আমার ঘাড়েই পড়ল! কী যে মুশকিলে পড়লাম! মা বাবার কানে কথাটা গেল। শাসনের মাত্রা বেড়ে গেল। কদিন সব সামলাতে ঠাকুমার লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে গম্ভীর মুখে কলেজ যাওয়া আসা করলাম। সিনেমা দেখা বন্ধ হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে বেরুনো ঢোকা। বাড়িতে কড়া নির্দেশ ব্যালকনিতে দাঁড়ানো যাবে না। ছাদের মাঝে বসতে হবে কেউ যেন দেখতে না পায়।
তারপর কলেজেও কিন্তু,, খুব একটা স্বস্তিতে থাকতাম না। সেখানেও বড়ো পিসেমশাই। উনি তখন ঐ কলেজের পলিটিকাল সায়েন্সের প্রফেসর। সব মিলিয়ে এক্কেবারে টাইট অবস্থা। এত প্রতিকূল পরিবেশেও আমার জীবনে প্রেম কিন্তু আটকানো গেল না। প্রেমে আমি পড়লামই।
ক্রমশঃ