সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩৫)

আমার মেয়েবেলা

কলেজ জীবন

জীবনের কোন না সময় বা কোন একদিন কোন দুর্বল মুহূর্তে কিছু না কিছু ভুল তো হয়েই যায়। সবার হয়। আমারও হয়েছিল। ভুল থেকেই তো সব শিখতে পারি। আমিও শিখে ছিলাম। শিখেছিলাম নিজের মন বিপন্ন করে কখনও কাউকে সাহায্য করতে নেই। সে আমার যত প্রিয় বন্ধুই হোক।
তখন আমি ষোড়শী। বারো ক্লাস পাশ করে কলেজে ঢুকেছি। ঠাকুমা দাদুর বাড়ি রঘুনাথগঞ্জে থাকি। শাড়ি পরে গঙ্গা পেরিয়ে জঙ্গিপুর কলেজে যাই। বিরাট ব্যাপার।
আমি অবশ্য খুব ছোট থেকেই শাড়ি পরি। ক্লাস নাইন টেনে সাদা নীল পাড়ের শাড়ি পরেছি। আর ইলেভেন টুয়েলভে লাল পাড়।
ইলেভেন টুয়েলভে কোন ইউনিফর্ম ছিল না আমাদের। যার যা খুশি শাড়ি পরত। আমি প্রতিদিনই মায়ের একটা করে শাড়ি পরি। আর ছিঁড়ে বাড়ি ফিরি। বাড়িতে অশান্তি। পড়াশোনা করব কি সন্ধ্যায় মন আলমারির শাড়ির দিকে। শাড়ি রিপিট করা চলবে না। সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড।
এভাবে তো চলতে পারেনা। পড়াশোনায় মন নেই শুধু শাড়িতে মন। একটা রাস্তা বার করতে হবে। সাপ ও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। নাইন টেন এর থেকে আলাদা কিছু পরতে হবে। আমরা তখন স্কুলের দিদি। একটা গেরম্বাজি চাল চলন (অহংকার অহংকার ভাব)। মাধ্যমিক পাশ করেছি। বিশেষ করে অঙ্কে ৫০ পেয়ে। ইয়ার্কি নয়। আমাদের সবার তখন মাটিতে পা পড়ছে না। ছেলেদের ও তাই অবস্থা। পুরো হিরো হিরো ব্যাপার আর কি। মুখে হালকা হাসি যেন সব সময় ই। বার বার চুল ঠিক করছে। মাঝে মাঝে এমন ভাবে কথা বলছে যেন কত বড়ো দাদা। কথাবার্তা, চালচলনে প্রাণপণ একটা পার্সোনালিটি আনার চেষ্টা। ক্লাসের ফাঁকে গুণগুণ করছে। একটা কেমন যেন প্রেমিক প্রেমিক ভাব। যে বন্ধু টা আমার পাশের কোয়ার্টার এ থাকত। সেটাও দেখি অমন।আমি তো অবাক। ব্যাটার হলোটা কি? সে আমাকে চিঠি দেয়। আমি তাকে দিই। আবার সে আমাকে দেয় আমি তাকে দিই। আমি তখন পিওন। খুব গর্বের সঙ্গে এ কাজটা করি। দুজনেই খুব ভালো ব্যবহার করে। আমি রেগে গেলেই মুশকিল। বেশ দাপটের সঙ্গে থাকি।
যা বলছিলাম ছোট থেকেই আমি মাতব্বর ছিলাম। আমার কথা বন্ধুরা শুনত। দুদিন চিন্তা ভাবনা করে ঠিক করলাম ইলেভেন টুয়েলভের ও ইউনিফর্ম হওয়া দরকার। সবার আর্থিক অবস্থা তো সমান নয়। সবাই যে ভালো ভালো শাড়ি পরতে পারবে তাওও নয়। বন্ধু দের মধ্যে একটা যেন কোথায় অসমতা টের পেয়েছিলাম। ভালো লাগছিল না। কেউ একটা ভালো শাড়ি পরলেই অন্যরা জুলজুল চোখে তাকিয়ে থাকত। আমিও তাকাতাম। সাতদিনে সাতটা শাড়ি পরার পর এবং তারমধ্যে চারটে ছেঁড়ার পর মা হাতে দুখানা ধরিয়ে দিয়ে বলে দিয়েছে। এই দুটো পরেই দু বছর চালাতে হবে। আসলে স্টাইল করে শাড়ি পরলে তো সে শাড়ি ছিঁড়বেই।
যাইহোক স্বাতী মধুমিতা আর কজন বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে লাল ব্লাউজ আর সাদা লাল পাড় শাড়ি ইউনিফর্মের জন্য ঠিক করে শুক্লাদির (শিক্ষিকা) কাছে গেলাম। চালু হয়ে গেল ইলেভেন টুয়েলভে এর ইউনিফর্ম।
কলেজে ঢুকে তখন তো আর ইউনিফর্ম ছিল না। এক একদিন এক একটা শাড়ি পরে, নৌকায় চেপে গঙ্গা পার করে কলেজ যাওয়া। নতুন নতুন বন্ধু। মানে ছেলে বন্ধু এবং মেয়ে বন্ধু।

                    ছেলেবন্ধু দের দেখলে একটা অন্য রকম অনুভুতি হতো। ওদের সঙ্গে তো আর ছোট থেকে খেলা করি নি। তাই ঠিক আমার স্কুলের বন্ধুদের মতো নয়। একটা জড়তা ,কথা বলতে গিয়ে কেমন যেন একটু লজ্জাই পেতাম। অত সহজ হতে পারতাম না ওদের সঙ্গে। আমার মেয়ে বন্ধুদেরই খুব ভালো লাগত। এখন ও আমি আমার বান্ধবী দের সঙ্গে ই ভালো থাকি।
                    সাতদিনের মধ্যে একটা গ্রুপ ও হয়ে গেল । ছ জনের গ্রুপ। দারুন কাটিয়ে ছিলাম আমরা। অফ পিরিয়ডে গান করতাম। সিনেমা যেতাম। আড্ডা দিতাম। কলেজের পাশে আমবাগানে ঘুরতাম। তবে আমার যে কলেজে খুব শান্তি ছিল তা তো নয়। ঐ কলেজেই আমার পিসেমশাই পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্রফেসর ছিলেন। তাই খুব রয়েসয়ে সমঝে চলতে হতো।
        কলেজে ঢুকে মন তখন উড়ুউড়ু। বুকের মধ্যে একটা সর্বক্ষণের ভালো লাগা। মনে যেন  খুশি উপচে উপচে পড়ছে। আমার প্রিয় বিষয় গুলো নিয়ে পড়ছি। অঙ্ক করতে হচ্ছে না। মন অসম্ভব ভালো। আমি কোনদিন কোনও ক্লাস বাঙ্ক করিনি। খুব ভালো লাগত ক্লাস করতে। পলিটিক্যাল সায়েন্স আমার প্রিয় বিষয় ছিল। দর্শন ও খুব ভালো লাগত।
        যাইহোক খুব অল্প দিনের মধ্যে ই আমি নতুন পরিবেশে বেশ ভালো ভাবেই মানিয়ে নিয়েছিলাম। দেখতে দেখতে অনেক বন্ধু হয়ে গেল আমার। আমি সব্বাইকেই খুব ভালোবাসি।
        এই রকমই এক প্রিয় বন্ধুর কথা বলব যাকে সাহায্য করতে গিয়ে আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। জীবনটা যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। ওকে সাহায্য করতে গিয়ে একটা অপরাধ বোধ একটা ভীষণ রকমের আপসোস নিয়ে সারাটা জীবন আমায় কাটাতে হল। অজান্তেই অপরাধ করেছিলাম। ভুল হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু সেই ভুলের শাস্তি স্বরূপ আমাকে সারাজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হল।

ক্রমশ..

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।