সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩)

হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ
হোটেলে লাগেজ রেখে আমরা মোটামুটি আধ ঘন্টার মধ্যেই ফুল এনার্জি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হায়দ্রাবাদ দর্শনে। প্রথমেই আমরা দেখব পৃথিবী বিখ্যাত সালার জং মিউজিয়াম। কলকাতা থেকে ফ্লাইটে এসেছি। কোনো পরিশ্রমই হয় নি। তাই আমাদের মধ্যে উৎসাহের কোন খামতি ছিল না।
যাইহোক হোটেলের সামনে থেকেই একটু হালকা দরদাম করে একটা অটো ঠিক করলাম।
কত কিছু দেখার আছে এই শহরকে ঘিরে। চারমিনার,কুতুব শাহর সমাধি, হুসেইন সাগর, ফলকনামা প্যালেস। রামোজি ফিল্ম সিটি তো দেখবই তাই ওটাকে এখন আপাতত বাদই দিচ্ছি লিস্ট থেকে।
ইতিহাস রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী আমি। বিশেষ করে সেই ছোট থেকে মোঘল সাম্রাজ্য,, দাক্ষিণাত্যের নিজাম,, শিবাজি, নানা সাহেব ,,রানী লক্ষ্মী বাঈ আমার প্রিয় অধ্যায় ছিল।
রাষ্ট্র বিজ্ঞান এবং ইতিহাস এই বিষয় দুটো আজও বড্ড টানে আমাকে। তাই এসব ইতিহাস প্রসিদ্ধ জায়গায় যেতে ও রাজনীতি বিষয়ক আলোচনা করতে আমার খুব ভালো লাগে।
আমার কত্তার অফিসে ছুটি কম। কত কিছুই হয়তো দেখা হবে না এবার সময়ের অভাবে। মাত্র তিনদিন থাকব এখানে।
গোলকোন্ডা ফোর্ট আর রামোজি দেখতেই লেগে যাবে দুদিন হাতে মাত্র একদিন তারমধ্যে সবটা দেখে নেওয়ার চেষ্টা। নিজামের শহর হায়দ্রাবাদের প্রতি আকর্ষণ সেই ছোট বেলা থেকে। তাই এবার যখন তিরুপতি যাওয়া ঠিক হল আমি রিকোয়েস্ট করেছিলাম ওকে যদি ছুটি ম্যানেজ করে হায়দ্রাবাদে আসা যায়। আজকাল বছরে তিন থেকে চার বার পুরী যাওয়ার জন্য এসব বাড়তি ট্যুরের কথা বলতে পারি না সাহস করে । যাইহোক ভগবানের কৃপায় এ যাত্রায় আসা হল আমার পছন্দের শহর হায়দ্রাবাদে।
মিউজিয়ামটা তালিকার প্রথমেই রেখেছি আমরা। কোন একটা জায়গায় গেলে মিউজিয়াম দেখাটা খুব জরুরি আমার কাছে। সেই জায়গার ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি জানতে হলে মিউজিয়াম দেখতেই হবে। তাই খুব উৎসাহের সঙ্গে চলেছি মিউজিয়ামের পথে।
১৫৯১ সালে কুতুব শাহি রাজ বংশের পঞ্চম সুলতান মহম্মদ কুলি কুতুব শাহ এই নগরীর গোড়াপত্তন করেন।
খলিফা আলী ইবনে আবী তালিব,, হায়দার নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে সম্মান জানাতেই এই শহরের নাম করণ হয় হায়দ্রাবাদ। হায়দার অর্থ সিংহ,, আবাদ অর্থাৎ শহর।
একটু পড়াশোনা করে এসেছি। যে জায়গায় যাচ্ছি তার সম্পর্কে কিছু না জানলে সেই জায়গাটার রসোস্বাদন করতে পারি না ঠিক মতো।
একসময় অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী ছিল হায়দ্রাবাদ। অন্ধ্রপ্রদেশ ভারতের একটি বড়ো রাজ্য। ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে হায়দ্রাবাদ তার সংস্কৃতি ঐতিহ্যে বিশেষ করে ঐতিহাসিক গুরুত্বে প্রধান আকর্ষণীয় জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র। তাই শহরটিকে ঢেলে সাজানো,,, গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এর উপর অনেকটা নির্ভর করছে রাজ্যের অর্থনৈতিক ভারসাম্য। আসলে পর্যটন শিল্পের উপর ভর করে পাশের রাজ্য উড়িষ্যা দেখিয়ে দিয়েছে উন্নয়ন কাকে বলে। সেখানে কোন বেকারত্ব বলে কিছু নেই। অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক পরকাঠামো এতটাই শক্তিশালী যে এই রাজ্যের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে অন্যান্য অঙ্গ রাজ্য গুলোর। পাশাপাশি রাজ্য তেলেঙ্গানা এবং অন্ধ্রপ্রদেশ একটু তো আঁচ আসবেই।
তাইতো হায়দ্রাবাদ কে সুরক্ষিত, সুসজ্জিত রাখতে আলাদা একটি রাজ্যের দরকার ছিল। তৈরি হল তেলেঙ্গানা। এবং রাজধানী হিসেবে স্বমহিমায় রয়ে গেল হায়দ্রাবাদ।
ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে এটাই মনে হয়েছে আমার। যেটা সুন্দর যেটা গুরুত্বপূর্ণ সব দিক দিয়ে সেটা মানসিক হোক শারীরিক হোক আর্থিক হোক শিল্প হোক বাণিজ্য হোক রাজনীতি হোক পর্যটন হোক বা সামাজিক হোক তার দেখভাল করা উচিৎ যত্ন করা উচিত। তাকে আলতো হাতের ছোঁয়ায় ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। না হলে তো কিছুই থাকে না। আমাদের বয়স্ক বাবা মাকে যেমন সেবা যত্নে বাঁচিয়ে রাখতে হয় তেমনই একটা রাজ্য দেশ রাষ্ট্রকে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
হায়দ্রাবাদ ঘুরতে ঘুরতে সেটাই মনে হয়েছিল কী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা শহর! এ তো একার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু একা প্রশাসন কতটা করতে পারে। হাত লাগাতেই হয় রাজ্যবাসীকে। আমার দেশ আমার রাজ্য এই অনুভূতিটা খুব প্রয়োজন একটা দেশের পক্ষে। তবেই তো দেশ এগোবে। আর এভাবেই ছোট ছোট গ্রাম থেকে শহর বন্দর রাজ্য দেশ এগোবে গড়গড়িয়ে। আমাদের সব্বাইকে একে অপরের হাত ধরে এগোতে হবে সামনের দিকে। তাহলে আর অন্য রাজ্য অন্য দেশ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে না আমাদের।
যাইহোক ১৫০ টাকায় পনেরো মিনিটের পথ পেরিয়ে যখন মিউজিয়ামের সামনে এলাম। দেখলাম মিউজিয়াম বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে মিউজিয়াম শুক্রবার বন্ধ থাকে। অটো ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করাতে বলল আমি ঠিক জানতাম না। অথচ সে ওখানকার লোকাল লোক। কি বলব নতুন অচেনা অদেখা শহরে পা দিয়েই এভাবে প্রতারিত হয়ে মনটা কেমন খারাপই হয়ে গেল।
হায়দ্রাবাদের কথা এত শুনেছি। নিজামের শহর। বীর শিবাজীর তৈরি গোলকোন্ডা ফোর্ট এই হায়দ্রাবাদ শহরের কাছেই। কত সুন্দর শহর।
ওসমান সাগর, হিমায়ত সাগরের মতো কিছু আশ্চর্যজনক কৃত্রিম হ্রদের আবাসস্থল এই শহর।
ইতিহাস বইতে পড়া নিজামের শাসনকালে নাসির জং মুজাফফর জং সালাবাত জং নিজাম -উল মুলুক সিকান্দার জাহ মাথার মধ্যে তখন গিজগিজ করছে। অথচ কিচ্ছু করার নেই আমাদের। অনেকেই এসে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারত তথা পৃথিবী বিখ্যাত এই সালারজং মিউজিয়াম! কী উত্তেজনা কী উদ্দীপনা আমাদের মধ্যে! এমন একটা দুর্দান্ত মিউজিয়াম দেখব। লাগেজ ফেলেই প্রায় দৌড়তে দৌড়তে এসেছি। একটুও সময় নষ্ট না করে। কারণ আমাদের হাতে সময় খুব কম। সেই মিউজিয়াম এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি অথচ দেখা হল না। কি যে খারাপ লাগছিল কী বলব। আগে থেকে জানলে সেইভাবে সাজাতাম আজকের দিনটা। অটো ড্রাইভার ও তো বলতে পারত!
একটা ফ্রেস মুড নিয়ে হোটেলে থেকে হৈহৈ করতে করতে বেরিয়ে পড়েছিলাম এই শহরের সবকিছু চেটেপুটে দেখব বলে। অটো ড্রাইভার জানত যে জুম্মাবারে মিউজিয়াম বন্ধ থাকে কিন্তু তা স্বত্তেও কিছু টাকার লোভে আমাদের সময় এবং অর্থ দুটোই নষ্ট করল। শহরে নেমেই এভাবে প্রথমেই প্রতারিত হওয়ার পর আমরা যেন একটু বেশিই সাবধান হয়ে গেলাম। শুক্রবার এখানের দোকানপাট সবকিছুই বন্ধ থাকে। এটা আমাদের জানা ছিল না।
অটো ড্রাইভার সব জেনে বুঝে ৫০ টাকার জায়গায় (পরে জেনেছিলাম) ১৫০ টাকায় আমাদের সালার জং মিউজিয়াম পৌঁছে দিল। রাস্তায় যেতে যেতে একবারও বলল না যে মিউজিয়াম বন্ধ আছে। বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থানই বন্ধ থাকে এই দিন। এটা আমাদের কলকাতা থেকেই জেনে আসা উচিত ছিল। তাহলে প্রোগ্রামটা অন্য ভাবে সাজাতাম। ভুল হয়েছিল আমাদেরই। পরের উপর দোষ চাপিয়ে লাভ কী? আমাদের মতো অনেকেই ফিরে গেল। আমার মনখারাপ ভালো করতে কত্তা বলল চলো কাল দেখব। এখন অন্য কিছু দেখি। চললাম স্নো ওয়ার্ল্ড দেখতে। তবে ঐ অটো ড্রাইভারকে আর নিলাম না। একটু হালকা ঝগড়া করতে করতে অটো ড্রাইভারটাকে মুখ বেঁকিয়ে অন্য অটোতে গিয়ে বসলাম। হুঁ হুঁ বাবা আমরা বাঙালি আমাদের সঙ্গে ঝগড়ায় পারবে? বাঙালির কদর গোটা পৃথিবীতে। ভ্রমণবিলাসী বাঙালি আছে বলেই না পর্যটন শিল্প এমন রমরমিয়ে চলছে গোটা বিশ্বে?
ক্রমশঃ