T3 || স্তুতি || শারদ বিশেষ সংখ্যায় সবিতা রায় বিশ্বাস

মুক্ত বলাকা

 

সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে ঠিক সেই সময় গ্রামে নদীর ধারে দাঁড়ালে বা মস্ত বড় মাঠের মাঝখানে দাঁড়ালে বোঝা যায় কেমন করে সন্ধ্যে নেমে আসে| এই দেখছো দিগন্ত জুড়ে লাল আলোর আভা হঠাতই কেউ যেন এক পোঁচ কালি মাখিয়ে দিল| ঝুপ করে চারদিক আবছা আধাঁরে ঢেকে গেল, সেই বিস্ময়ের পালা শেষ না হতেই আরো খানিকটা কালি মাখিয়ে দিল নদীর জলে, গাছপালার মাথায়, মাঠের সবুজ ঘাসে| যত রঙ ছিল সব ঢাকা পড়ে গেল, পড়ে থাকল অমাবস্যার নিকষ কালো আঁধার আর এক পৃথিবী শূণ্যতা|

প্রতিমার জীবনও এখন বিবর্ণ, ঘন অন্ধকারে ঢাকা| আলোর সন্ধান কি ও আর কোনদিনই পাবেনা!

মায়ের কাছে শুনেছিল ও জন্মালে হাসপাতালের নার্সরাই ওর নাম রেখেছিল প্রতিমা| অপুষ্টিতে ভোগা মা বাচ্চা হবার ধকল সামলাতে না পেরে তিনদিন অচেতন হয়ে ছিল| ওর মুখের গড়ন, গায়ের রঙ দেখে ডাক্তারও নাকি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন| কিন্তু ওর বাবা গোবিন্দ খুশি হয়নি| হাসপাতাল থেকে ওর মা ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরলে ওই দুর্বল শরীরের উপর অত্যাচার করেছিল ছেলে না হওয়ার অপরাধে| অত্যাচার সহ্য করে শুধুমাত্র মেয়ের মুখ চেয়ে আধপেটা খেয়ে, উপোস করে কোনরকমে ধুঁকতে ধুঁকতে বেঁচেছিল সাতটা বছর, তারপর আকাশের তারা হয়ে গেল| প্রতিমার মনে হল মা যদি আকাশের তারা না হয়ে জোনাকির মত মিটমিট করেও এই সংসারে থেকে আলো জ্বেলে ওকে পথ দেখাতো! আর কি স্কুলে যেতে পারবে কোনদিন? ওদের পাশের বাড়ির ফুলির মাকে বলতে শুনেছে আর দু-চার বছর পরেই নাকি ওকে বেঁচে দেবে ওর বাবা|

বাবা?

বাবারা কি অমন হয়? নাম গোবিন্দ, অথচ সারাক্ষণ খারাপ কথা বলে, বই নিয়ে পড়তে দেখলেই মারধোর করে| একদিন ওই ফুলির মা বলেছিল মেয়েটাকে মারলে গায়ে দাগ হয়ে গেলে দর পাবিনে বরং মেয়েটাকে একটু যত্ন করে ভালোমন্দ খাওয়া তাহলে তাড়াতাড়ি ডাগর হবে, দর পাবি| আর স্কুলে যাক, এখন সবাই একটু পড়ালেখা জানা মেয়েই পছন্দ করে|

ফুলি বলেছিল ওর মা নাকি মেয়ে পাচারের ব্যবসা করে| আসলে ওদের পাড়ার ছেলে-মেয়েরা সাত-আট বছরেই অনেক বড় হয়ে যায়| তাই প্রতিমা বুঝতে পেরেছিল ওর মা বেঁচে থাকলে হয়তো বাঁচার রাস্তা পেতো, এখন সামনে পিছনে আশেপাশে সবটাই নিকষ অন্ধকারে ঢাকা|

মায়ের শ্রাদ্ধ সারা হতেই নতুন মা(?) এল বাড়ি| গোবিন্দ প্রতিমাকে দেখিয়ে বলল, এ আমার দামী হাঁস| আর দু’বছর তারপরেই এই সোনার হাঁস বেচে তোমাকে গলার মালা গড়িয়ে দেব| একে অবহেলা করলে তোমার কপালে দুঃখু আছে| আর একটা কথা, আমার ছেলে চাই, মেয়ে হলে গলায় নুন দিয়ে মেরে ফেলবো|

কোমরে কাপড় জড়িয়ে নতুন মা বলে উঠল, “আমাকে তোমার পেথ্থম বউ পাওনি| আমিও কিছু পড়াশোনা জানি, ছেলে হবে কি মেয়ে হবে সে পুরুষ মানুষের উপর নির্ভর করে, বিশ্বাস না হলি ডাক্তারের কাছে যাও| আর একটা কথা, আজ থেকে আমি যখন প্রতিমার মা তখন মেয়ের ভালমন্দর দায়-দায়িত্ব আমার| আমার সাথে বেশি রোয়াব দেখালি এই সংসার আর তোমারে ত্যাগ দিয়ে চলে যেতি আমার এক মিনিটও লাগবেনা| গতর আছে, খেটে খাবো| কারো ধার ধারিনে, এই আমি পোষ্কের বলে দিলাম|”

প্রতিমা খুব ভয়ে ভয়ে ছিল, সৎ মা নাকি ভালো হয়না, মারধোর করে| ও নিজেও দেখেছে, ওদের পাড়ার ময়নার সৎমা ওকে পেট ভরে খেতেও দেয়না| কিন্তু এই মা তো খুব ভালো, ওকে ডেকে কাছে বসিয়ে তেল দিয়ে মাথার চুলের জট ছাড়িয়ে দু’পাশে দুটো কলা বিনুনি বেঁধে দিল| সকালে উঠে উঠোন ঝাঁট দিতে দেখে ঝাঁটা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘যা, মুখ ধুয়ে দুটো বিস্কুট-জল খেয়ে পড়তে বস|’

এবারে ফাইভে ভর্তি হবে প্রতিমা| যে দেখে সেই বলে লক্ষ্মী ঠাকুরের মুখ বসানো| একথা শুনলে নতুন মা খুব ভয় পায়| কি জানি কোনদিন চুপি চুপি গোবিন্দ মেয়েটাকে দালালের হাতে তুলে দেয়! প্রতিমার একটা বোন হয়েছে, বোনকে খুব ভালবাসে প্রতিমা| কিন্তু ওর বাবা আরো রেগে গিয়েছে কিন্তু নতুন মা’র সাথে পেরে ওঠেনি| নতুন মা জানে ফুলির মা ওর বাবাকে মন্ত্রণা দেয়, তাই আজকাল নতুন মা রাত্তিরে ওকে একা ঘরে রাখেনা|

সেদিন ফুলি এসে চুপি চুপি খবর দিয়ে গেল, সামনের বছর প্রতিমাকে বেচে দেবে| এ বছরই দিত কিন্তু প্রতিমা খুব রোগা বলে দালাল বলেছে, ‘মাছ-মাংস, টনিক খাওয়াতে|’ তার জন্যে গোবিন্দকে টাকাও দিয়েছে|

এবার প্রতিমা ব্যাপারটা বুঝলো, ওর বাবা, যে কোনদিন গালমন্দ না করে কথা বলেনা, সে একটা টনিক নিয়ে এসে মেয়ের কাছে বসে বলল, ‘মা’রে তোরে তো আমি কোনো যত্ন করতে পারিনা! মাস্টাররা বলে তোর খুব পড়াশোনার মাথা, তুই এইবার থেকে তিনবেলা ভাত খাওয়ার পর দুই চামচ করে এইটা খাবি| এবার বড় ইস্কুলে যাবি, সবার থেকে ভালো হতে হবে তো! তোর মায়েরে এই কথা বলার দরকার নেই, আসলে সামনাসামনি তোরে যতই ভালোবাসুক, সৎ মা তো!’

বাবা চলে যেতেই প্রতিমা ওর নতুন মাকে সব খুলে বলল, ফুলি যা বলেছিল তাও বলল| তারপর বলল, ‘মা এইটা তুমি খাও, তাহলে তোমার শরীর ভালো হবে|’

গোবিন্দ তিন-তিনটে টনিক এনে মেয়েকে দিল কিন্তু মেয়ে যেমন প্যাংলা তেমনি থাকলো| এদিকে নতুন বৌয়ের চেহারা ফিরে গিয়েছে| ব্যাপারটা কি? অবশ্য তাতে যে গোবিন্দ অখুশি হয়েছে তাও না| তবে একবার যখন মনের মধ্যে লোভ ঢুকে গিয়েছে তার থেকে বের হতেও পারছেনা| মাঝে মাঝেই কু-পরামর্শ দিচ্ছে ফুলির মা|

এদিকে প্রতিমার নতুন মা আরতি খুব চেষ্টা করছে একটা ভালো হোমে প্রতিমার থাকার ব্যবস্থা করতে| আরতি এর আগে এক দিদিমনির বাড়ি কাজ করতো, সেই দিদিমনি একদিন তার বন্ধুকে অনেক অনাথ মেয়েদের পড়াশোনা, হাতের কাজ এসব শেখানোর স্কুলের কথা বলছিল| সেকথা মনে পড়ায় আরতি সেদিনই ছোট মেয়েটাকে প্রতিমার কাছে রেখে দিদিমনির স্কুলে গিয়ে সব খুলে বলে| এ কথাও বলে আজ যদি হয় আজকেই যেন প্রতিমাকে ভর্তি করে নেয় নাহলে মেয়েটাকে বাঁচাতে পারবেনা|

পরের দিন সন্ধ্যেয় গোবিন্দ যখন মদের ঠেকে গিয়েছে চুপি চুপি দুই মেয়েকে নিয়ে আরতি বেরিয়ে দিদিমনির সাথে হোমে পৌঁছে দিয়ে এসেছে প্রতিমাকে| প্রতিমা নতুন মা আর বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছিল বলে দেরিও হয়ে গিয়েছিল অনেকটা| এর মধ্যে মদে চুর হয়ে দালাল সাথে করে বাড়ি এসে দেখে সব হাওয়া| ফুলির মা কান গরম করে দিয়েছে নানারকম খবর দিয়ে| দালাল গালমন্দ করে হুমকি দিয়ে চলে যেতেই ছোট মেয়েকে কোলে করে আরতি বাড়ি ঢুকতেই গোবিন্দ আরতির কোল থেকে মেয়েকে কেড়ে নিয়েই আছাড়| সামান্য কয়েক সেকেন্ডের জন্যে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল আরতি, তার পরেই মদের নেশায় টলমল গোবিন্দকে ঠেলে ফেলে দিয়ে বারান্দার উনোনের ধার থেকে আঁশবটি নিয়ে এসে গলায় কোপের পর কোপ, কোপের পর কোপ|

পুলিশ আসতেই পাড়ার অন্য কেউ কিছু বলার আগেই আরতি বলল, ‘এই বটি দিয়ে আমি ওই লোকটাকে খুন করেছি| কেন খুন করেছি জানেন? ওই দেখুন আমার ছোট মেয়ে, ওকে পাষন্ড লোকটা আছাড় মেরে চিরদিনের মত ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে| আমার অপরাধ আমি আমার সৎ মেয়েকে দালালের হাত থেকে বাঁচাতে একটা হোমে রেখে এসেছি| আমাকে নিয়ে চলুন কিন্তু আপনাদের কাছে অনুরোধ আমার মেয়ে প্রতিমাকে এসব কথা বলবেন না|’

মামলা কোর্টে উঠলে প্রতিমাকেও আসতে হল| সে বলল, ‘সৎ কি অসৎ আমি জানিনা| ঐখানে দাঁড়িয়ে আছে আমার মা আর মা কখনো অসৎ হয়না| আমার মায়ের কোনো দোষ নেই, মা ওই লোকটাকে না মারলে আমার মাকে মেরে ফেলত|’

এসব কথা কি কোর্ট আমল দেয়? উকিল নেই অতএব ঝুলে থাকলো মামলা| প্রতিমার নিজের সাথে লড়াই শুরু হল, যে করেই হোক ওকে আইনজীবী হতেই হবে|

কেটে গেছে ষোলো বছর| মাথা উঁচু করে সংশোধনাগার থেকে অ্যাডভোকেট কন্যা প্রতিমা মাহাতোর হাত ধরে মুক্ত পৃথিবীতে বেরিয়ে এল আরতি মাহাতো|

বাইরে অপেক্ষা করছিল ‘মুক্ত বলাকা’ হোমের সদস্যারা এবং সেই ম্যাডাম, যার কাছে প্রতিমাকে দিয়েছিল আরতি| আজ মায়ের মুক্তির দিন প্রতিমা হোমে রাত্রে গ্র্যান্ড ফিস্টের আয়োজন করেছিল, তাই সবাই চলল হোমে|

সন্ধ্যায় ‘মুক্ত বলাকা’র সদস্যাদের সাথে আরতিও মন্ত্র উচ্চারণ করল —

“অসতো সো সদ্গময়

তমসো মা জ্যোতির্গময়

মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়

ওম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ”

 

‘আমাকে নিয়ে চলো অসত্য থেকে সত্যে, অন্ধকার থেকে আলোকে, মৃত্যু থেকে অমৃতে| এই অনিত্য মৃত্যুময় জগৎ থেকে আমাকে শাশ্বত আনন্দের জগতে নিয়ে চলো| তোমার করুণার দীপ্তিতে আমার অন্তরাত্মা সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক| আমাকে জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে উদ্ধার করো এবং পুনর্জন্মের মূল যে কামনা বাসনা, তার বিনাশ ঘটাও|’

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।