সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ২)

হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ

হোটেলে লাগেজ রেখে আমরা মোটামুটি আধ ঘন্টার মধ্যেই ফুল এনার্জি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হায়দ্রাবাদ দর্শনে। কলকাতা থেকে ফ্লাইটে এসেছি। কোনো পরিশ্রম হয় নি। তাই আমাদের মধ্যে উৎসাহের কোন খামতি ছিল না।
যাইহোক একটু দরদাম করে একটা অটো ঠিক করলাম। প্রথমেই আমরা যাব মিউজিয়াম। তিনশো টাকায় আধ ঘন্টার রাস্তা পেরিয়ে যখন মিউজিয়ামের সামনে এলাম। দেখলাম মিউজিয়াম বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে মিউজিয়াম শুক্রবার বন্ধ থাকে। নতুন অচেনা অদেখা শহরে পা দিয়েই এভাবে প্রতারিত হয়ে মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। হায়দ্রাবাদের কথা এত শুনেছি। নিজামের শহর। বীর শিবাজীর তৈরি গোলকোন্ডা ফোর্ট এই হায়দ্রাবাদেই। কত সুন্দর শহর। একটা ফ্রেস মুড নিয়ে হোটেলে লাগেজ রেখে এতটুকু সময় নষ্ট না করে হৈহৈ করতে করতে একটা অটো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম এই শহরের সবকিছু চেটেপুটে দেখব বলে। অটো ড্রাইভার জানত যে জুম্মাবারে মিউজিয়াম বন্ধ থাকে কিন্তু তা স্বত্তেও কিছু টাকার লোভে আমাদের সময় এবং অর্থ দুটোই নষ্ট করল। শহরে নেমেই এভাবে
প্রথমেই প্রতারিত হওয়ার পর আমরা একটু সাবধান হয়ে গেলাম। শুক্রবার এখানের সবকিছুই বন্ধ থাকে।

অটো ড্রাইভার সব জেনে বুঝে ৫০ টাকার জায়গায় (পরে জেনেছিলাম) ৩০০ টাকায় আমাদের মিউজিয়াম পৌঁছে দিল। রাস্তায় যেতে যেতে একবারও বলল না যে মিউজিয়াম বন্ধ আছে। বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থানই বন্ধ থাকে। এটা আমাদের কলকাতা থেকেই জেনে আসা উচিত ছিল। তাহলে প্রোগ্রামটা অন্য ভাবে সাজাতাম। ভুল হয়েছিল আমাদের ই।

যাইহোক মেজাজটা আমাদের তিন জনেরই খিঁচরে গেল। শুরুতেই এতটা ঠকে যাব আমরা একদমই ভাবি নি। আমরা বড়ো ভালবেসে ছিলাম এই শহর টাকে। আগু পিছু না ভেবে!

এরপর অটোতে ফেরার সময় বেশ বার্গেনিং শুরু করলাম। কি করা যাবে। শহর টা সুন্দর হলেও মানুষজন ট্যুরিস্ট দের ঠকাতে ব্যস্ত।

মন খারাপ নিয়েই চললুম স্নো ওয়ার্ল্ড দেখতে। এই শহরের লোকেরা যাকে বলে ” মিনি কাশ্মীর”।

ওখানে গিয়ে কিন্তু মনটা ভাল হয়ে গেল।।
ওখানটা খুব জমজমাট। দোকানে দোকানে সব ভর্তি পুরো জায়গাটা।
এই প্রথম দেখলাম “ফিস স্পা”।১৫০ টাকায় ১৫ মিনিট। জলে পা ডুবিয়ে রাখতে হবে। আর শয়ে শয়ে মাছ এসে পায়ের চামড়া খুবলে খুবলে খাবে। ভেবেই গাটা কেমন কিলবিলিয়ে উঠল। আমাকে পুলের ছেলেটা প্রাণপণ বোঝাতে লাগলো খুব ভালো লাগবে। দারুন লাগবে মেমসাব। একবার ট্রাই করে দেখুন। দেখলুম ছোট্ট পুলের চারপাশে সবাই পা ডুবিয়ে বসে রয়েছে। কালো কালো বিভিন্ন সাইজের মাছ ওদের পা দুটো কে একেবারে ছেঁকে ধরেছে।ওরে বাবা ঐ দৃশ্য দেখেই আমার শরীরের মধ্যে কেমন যেন করে উঠল। বাপরে দরকার নেই বাবা আমার। তবুও একজন কে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম কেমন লাগছে। বলল দারুন।
খুব ভাল লাগছে। আমি কোন কথা না বলে
ছবি তুলে ওখান থেকে মানে মানে সরে আসলুম। বেশিক্ষণ তাকাতেও ইচ্ছে করছিল না আমার।

এবার ফটো সেশন শুরু হল। অনেকগুলো ছবি তোলার পর মনটা একদমই ভালো হয়ে গেল। ভুলে গেলাম একটু আগের ঘটনা। যাইহোক লোকপিছু ৫০০ টাকা মোট ১৫০০টাকার টিকিট কেটে আমরা তিনজন বরফ রাজ্যে ঢোকার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।টিকিট দেখিয়ে ঢুকলাম বরফ রাজ্যে। লাইন দিয়ে টুপি কোর্ট গ্লাভস মোজা জুতো পরে আমরা একদম রেডি।

এবারে সত্যি সত্যিই আমরা বরফের দেশ মিনি কাশ্মীরে প্রবেশ করলাম।

একটা বিরাট হল। কী ঠাণ্ডা!চারিদিকে বরফ আর বরফ। হলের শেষে চারপাশে কাশ্মীরের বরফে ঢাকা পাহাড়ের ছবি সাঁটা রয়েছে। দেখে গুলমার্গ সোনমার্গেরই ছবি মনে হল। হলের একদম উঁচু দেওয়ালের চারিদিকে বিরাট বিরাট এসি চলছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে হাড় হিম করা বাতাস। বাপরে
এক একটা জায়গা আবার বেশ উঁচু। বরফের আস্তরণ জমে জমে উঁচু হয়ে রয়েছে। সেখানে বাচ্ছা বুড়ো সবাই বল নিয়ে খেলা করছে। বরফের পুতুল বানাচ্ছে। তারপর তাকে টুপি পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা চলছে। চারপাশ শুধু
বরফে আর বরফ। কী ঠাণ্ডা!

চোখটা বুলিয়ে নিলাম ভালোকরে।কতগুলো যে এসি চলছে! তার উপর আরও নানা রকমের মেশিন যেগুলো আবার স্নো ফলের ও কাজ করছে। হলের একটা কোণে স্কি করার ও ব্যবস্থা রয়েছে। একটা কাশ্মীর কাশ্মীর ফিলিং আনতে কতৃপক্ষের যা যা করণীয় সবটাই মোটামুটি করার চেষ্টা করা হয়েছে তাই মোটামুটি সত্যিকারের কাশ্মীর দেখা আমরাও মানসিক ভাবে স্নো ওয়ার্ল্ড কে শেষমেশ মিনি কাশ্মীর ভেবেই ফেললাম।

একটু ধাতস্থ হতেই সঙ্গে সঙ্গে হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল। আমার ছোট কন্যা কোনও দিন বরফ দেখেনি। স্নো ফলও দেখে নি। অত বরফ দেখে ওর সে কী উত্তেজনা!! বড়ো বড়ো চোখ করে সব কিছু দেখে নিচ্ছে। এত আনন্দ কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

হঠাৎ করে দেখি স্নো ফল শুরু হল। বাপরে কী যে আনন্দ সবার! উত্তেজনায় হাততালি দিয়ে দিল কেউ কেউ। হলের মাঝে বিরাট বিরাট বক্স বাজিয়ে হালকা করে মিউজিক বাজছে।

উফ্ সে যে কী ভালো লাগা! আর্টিফিশিয়াল তবু যেন মন মানতে নারাজ। হলের বাইরে মে মাসের গরমের হলকানি। আর হলের মধ্যে বরফ নিয়ে খেলাধুলা এটা ভেবেই ভালো লাগছে। বুকের ভরে উঁচু থেকে বরফের ওপর দিয়ে স্কেটিং করতে করতে সোঁওওও করে নিচে নামলাম। সে এক দারুন অভিজ্ঞতা। ১৮ সালে যেটা করেছিলাম এখন হয়তো আর পারব না। কিন্তু এতদিন পরে সেই অনুভূতি টা কিন্তু টাটকা রয়েছে এটাই তো আজকের ভালোলাগা। যেটা এখন করতে পারব না শারীরিক অসুবিধা র জন্য সেটা ভেবে মন খারাপ করার মানসিকতায় বিশ্বাসী ন ই আমি। সেদিনের ভালোলাগা আমাকে আজকেও আনন্দ দেয়। এটাই তো অনেকটা পাওয়া।

স্নো ফল হল!
কিছুক্ষণ পর পরই স্নোফল হচ্ছে। আর স্নো ফল হলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে হৈ হৈ। নাচানাচি বরফ ছোঁড়াছুঁড়ি সে যে কী পরিবেশ আমি বলে বোঝাতে পারব না।

হায়দ্রাবাদ এ সেইসময় ৪০/৪৫ ডিগ্রির বেশি টেমপারেচার। আর স্নো ওয়ার্ল্ড এ সত্যি সত্যিই স্নো ফলের অনুভূতি!ভাবা যায়? কর্তৃপক্ষ কে ধন্যবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। মিনি কাশ্মীরের অনুভূতি আনাটা নেহাত সহজ ব্যাপার নয়। আর ১৮ সালে ৫০০ টাকা টিকিট ও কম নয়। ফ্যামিলি পিছু দু তিন চার হাজার টাকা তো খরচ হচ্ছে ই। আধঘন্টার জন্য এতগুলো টাকা খরচ হচ্ছে সেখানে সুধে আসলে উসুল না হলে মন ভরবে কেন? তবে এ ব্যাপারে একশো শতাংশ মন ভরবে এটা আমি বলতেই পারি। আমার খুব ভালো লেগেছিল। হায়দ্রাবাদের প্রধান আকর্ষণীয় দর্শনীয়
জায়গার মধ্যে এটা অন্যতম শুনেছিলাম বলেই আমরা গিয়েছিলাম। এবং খুবই সুখকর তৃপ্তিদায়ক অনুভূতি হয়েছিল আমাদের। তবে স্নো ওয়ার্ল্ড এখন কেমন সেটা বলতে পারব না। তবে আমার মনে হয় হায়দ্রাবাদে গেলে একবার দেখে আসাই যায়।

ফিরে আসি মিনি কাশ্মীরে। মিনিট দুয়েকের জন্য স্নো ফল শুরু হল। আবার স্নো ফল শেষ হল তো বক্সে জোরে জোরে হিন্দি বা পাঞ্জাবি গান আরম্ভ হল। আর নাচ কাকে বলে। বাঙালি পাঞ্জাবি বিহারি তামিল তেলেগু সব তখন মিলেমিশে একাকার। কী যে আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।
আর স্নো ফল ছাড়াও স্নো ম্যান ,, প্লাস্টিকের রঙ বেরঙের বল খেলা ,, বরফ হাতে নিয়ে ছবি তোলা, স্কেটিং করা সব ,,,সবই যেন তখন সত্যি বলে মনে হচ্ছে। যেন একটা গল্পের মতো।

বরফের দেশে যা যা হয়। আমরা সবাই তাই তাই করেছি।

আজ আমার ছোট্ট মেয়ে মেরী যে কত টা আনন্দ পেয়েছে সে সম্পর্কে আমি কি বলব ভেবে পাচ্ছিনা। এই পরিবেশে ওর প্রথম অভিজ্ঞতা!বরফ নিয়ে যা যা করার সব করেছে। একটা সময় দেখলাম বরফের উপর শুয়েই পড়ল। আমিও হাফ শুয়ে একটা ছবি তুললাম। আনন্দের জন্য ওখানে যেভাবে যা যা করার তার কিছুই বাদ দেওয়া হয় নি। জনপিছু ৫০০ টাকা টিকিট কেটে যা আনন্দ,যা অভিজ্ঞতা হল সে আর ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই আনন্দ পেতে হলে একবার অন্তত হায়দ্রাবাদে আসতেই হবে।

যাইহোক ওখানে থেকে অনেক আনন্দ মনের ব্যাগে ভরে লাঞ্চ খেতে গেলাম ” কাফে বাহারে”। অসম্ভব সুন্দর বিরিয়ানি খেলাম। সত্যিই হায়দ্রাবাদের বিরিয়ানি যে না খেয়েছে তার জীবন বৃথা। যেমন স্বাদ তেমনই সহজপাচ্য। খুব তাড়াতাড়ি হজম হয়ে যায়। এই বিরিয়ানি পেট রোগা বাঙালিদের যে কোনরকম অসুবিধেয় ফেলবে না এ আমি হলফ করে বলতে পারি। আমাদেরও কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি। অথচ বিরিয়ানি কিন্তু ছিল বেশ মশলাদার।
যাইহোক এবার আমরা আবার হোটেলে ফিরলাম।
বিকেল ৫ টায় হোটেলে ফিরে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট রেস্ট নিয়ে আবার পৌনে ৬ টায় বেরিয়ে,সোজা চলে গেলাম NTR গার্ডেন এ। সেরকম কিছু নয়। কলকাতায় এমন গার্ডেন দেখাই যায়। যেমন হয় আরকি।বাচ্চাদের আকর্ষণের জন্যই তৈরি হয়েছে এই এনটিআর গার্ডেন। ছোটদের জন্য বিভিন্ন রাইড,দোলনা, টয়ট্রেন এই সব রয়েছে গার্ডেনে।

আমরা আর ভেতরে ঢুকলাম না। ওখানে আর ট্রয় ট্রেনে চাপতেও ইচ্ছে করল না। যে একবার ট্রয় ট্রেনে কার্শিয়াং থেকে ঘুম হয়ে দার্জিলিং গেছে তার আর কোথাও ট্রয় ট্রেনে চাপতে ভাল লাগবে না।

এবার আমরা হুসেন সাগর লেকের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম লুম্বিনী পার্কে। সেখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখে মনে হল কলকাতা কত পিছনে! অসাধারণ বললেও কম বলা হবে।
তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। হালকা হাওয়া দিচ্ছে। গরম সেরকম নেই বললেও চলে। চারিদিকে আলো দিয়ে যত্নে সাজানো হয়েছে। সাধারণ একটা পার্ক কিন্তু সাজানোর জন্য কত ভালো লাগছে। আমি এসেছিলাম ২০১৮ সালের মে মাসে। এখন বোধহয় আরও উন্নতি হয়েছে। তবে সেই সন্ধ্যেটা কিন্তু খুব ভালো কেটেছিল আমার। এখনও বেশ মনে আছে আমার।

এবার কিছু মুক্তোর দোকান ঘুরে কিছু ফল কিনে হোটেলে ঢুকলাম। মুক্তো অবশ্য কিনলাম না। সবই কলকাতায় পাওয়া যায়। আসলে নতুন কিছু দেখলাম না তাই আর কেনার ইচ্ছেও হল না।

আজ আমরা কেউই ডিনার করলাম না। কিছু ফল খেয়েই পেট ভরিয়ে নিলাম। কাল আবার “রামোজি ফ্লিম্ সিটি” দেখতে যাওয়া। সকাল সকাল উঠতে হবে। আজকে হায়দ্রাবাদের প্রথম দিন খারাপ কাটল না। শুধু শুক্রবার ছুটির দিন বলে কিছু দোকান পাট বন্ধ। হায়দ্রাবাদের চার মিনার বন্ধ। এই আর কি। কাল সময় পেলে চলে যাব।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।