গদ্যের পোডিয়ামে শম্পা রায় বোস

মন
“মন” নিয়ে আমাদের মধ্যে কৌতূহলের যেন শেষ নেই।
আমাদের” মন” কে দার্শনিক এবং মনোবিদ রা নানা ভাবে বিশ্লষণ করেছেন।
প্লুটো এরিষ্টটল ও প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক দের সময় কাল থেকেই “মন” নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
দর্শনের কথায় “মন” হল দর্শন শাস্ত্রের অন্যতম একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা, কল্পনা র দ্বারা এই “মন” প্রকাশিত হয়।
মানে সোজা ভাষায় “মন” হল:—-” চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা এই সমস্ত রকম মানসিক কাজ গুলির সমষ্টিগত রূপ।”
অপরদিকে মনোবিজ্ঞানী রা কিন্তু একটু অন্য ভাবে আমাদের ” মন” কে বিশ্লষণ করেছেন।
মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড ( Sigmund Freud ) এর মতে মন দুই প্রকার।
১) টোপোগ্রাফিক্যাল ডিভিশন (topographical division )
২) স্ট্রাকচারাল ডিভিশন ( structural division )
এই topographical division (টোপোগ্রাফিক্যাল ডিভিশন )কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
ক) কনসাস মাইন্ড ( conscious mind) বা সচেতন মন।
খ) আনকনসাস মাইন্ড (unconscious mind) বা অবচেতন মন।
গ) প্রি কনসাস মাইন্ড ( preconscious mind )
এবার এই সমস্ত ভাগ গুলো কে নিয়ে একটু আলোচনা করি। তাহলে আমরা মনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পারব।
ক) কনসাস মাইন্ড বা সচেতন মন :-
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মানুষের এই সচেতন মন। স্ব- চেতন বা জাগ্রত অবস্থায় আমরা যা কিছুই করে থাকি। তা এই সচেতন মন বা কনসাস মাইন্ড এর জন্যই ।
খ) আনকনসাস মাইন্ড বা অবচেতন মন:—-
মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড এর মতে, মানুষের মনের যে জায়গা জুড়ে এই সচেতন মন রয়েছে । তার অনেক অনেক বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে এই অবচেতন মন ।
এই অবচেতন মন মানুষের মনের কত গভীরে অবস্থিত তা মানুষ ই টের পায় না। কি অদ্ভুত লাগে তাই না? কিন্তু এটাই সত্যি।
এই অবচেতন মনের সঙ্গে সচেতন মনের কোনও সম্পর্ক ই নেই। তবে এই অবচেতন মনের প্রভাব কিন্তু মানুষের সচেতন অবস্থা বা ব্যক্তিত্বের মধ্যে পরে।
এই অবচেতন মনের উপস্থিতি একমাত্র স্বপ্নের মাধ্যমে ( dream analysis ) বা বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল টেস্ট এর মাধ্যমে জানা যায় ।
গ) প্রি কনসাস মাইন্ড ( preconscious mind ):—–
মানুষের সচেতন এবং অবচেতন মনের সন্ধিক্ষণে এই মনের অবস্থান।এই মন ঠিক যেন দ্বার রক্ষক হিসেবে কাজ করে।
সোজা ভাষায় আমাদের অবচেতন মনের কথা মনের এই দরজা দিয়ে ই সচেতন মনে যেতে পারে। তার মানে এই প্রি কনসাস মাইন্ড ছাড়া আমাদের অবচেতন মনের কথা সচেতন মনে আবার সচেতন মনের কথা অবচেতন মনে আসতে পারে না।
এতক্ষণ আমরা মনের খুব ই গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় টোপোগ্রাফিক্যাল ডিভিশন নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার আসব আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।
২)স্ট্রাকচারাল ডিভিশন :—- structural theory of mind. মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড এই মন কে তিনটি ডায়ানেমিক স্ট্রাকচারে (dynamic structure ) বিভক্ত করেছেন।
১৯২৩ সালে প্রকাশিত ফ্রয়েডের বিখ্যাত বই ” The Ego and The Id” এর সহায়তায় এই বিভাজন টি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন যে তিনটি মানসিক শক্তি মানুষের ব্যক্তিত্ব বা আচরণের উপর প্রভাব ফেলে তা হল:-
ক) ইদ।
খ) সুপার ইগো।
গ) ইগো
ক) ইদ:—-
মানুষের জন্মের সময় থেকেই এই ইদের উপস্থিতি । মানুষের অবচেতন মনের পুরোটা ই জুড়ে ইদের অস্তিত্ব। ইদ হল মানুষের আদি কামনা বাসনার একটা অকৃত্রিম চাহিদা। ইদ কিন্তু ন্যায় অন্যায় বোঝে না। ইদ সচেতনে দুঃখ কে পরিহার করে, শুধু সুখ ই কামনা করে। জন্মকালীন অবস্থায় মানুষ এবং পশু শুধু মাত্র ইদের অস্তিত্বের কারণেই
সমগোত্রীয়।
Freud believed that the ID is based on our pleasure principle in other words, the ID wants whatever feels good at the time, with no consideration for the reality of the situation.
মানুষের মধ্যে দুটি খুবই সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে।
১) সেক্সুয়াল আর্জ( sexual urge) বা লিবিডো ( libido )। এবং
২) এগ্রেসন (aggression ) বা রাগের বহিঃপ্রকাশ ।
এই ইদ কিন্তু একটা প্লেজার প্রিন্সিপাল ( pleasure principle) নিয়ে চলে।
যেমন:– সোজা ভাষায় বলি আমার এটা এখন করতে ইচ্ছে করছে। সুতরাং আমি এটা এক্ষুনি করব। কে কি ভাবল, আমার যায় আসে না। অর্থাৎ ন্যায় অন্যায় বোঝার চেষ্টা ই করে না।
এই যে বাচ্ছারা টয়লেট পেলেই তক্ষুনি করে ফেলে বা ক্ষিদে পেলেই কান্নাকাটি জুড়ে দেয়।
এটা কিন্তু ইদের জন্য ই।
আবার সেক্সুয়াল আর্জ বা লিবিডো। এটাও কিন্তু আমরা বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ করি।
যেমন মেয়েরা বিভিন্ন সৃজনশীল ক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের সেক্সুয়াল আর্জ টা বের করে। যেমন নাচ, গান,আঁকা বা কোনও সমাজ সেবা মূলক কাজের মাধ্যমে আমরা সবাই ( ছেলে মেয়ে উভয় ) আমাদের সেক্সুয়াল আর্জ বার করে থাকি। এটা মানতে একটু খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি।
আবার কোনও কোনও ছেলেদের ক্ষেত্রে দেখা যায় একটু অন্য ভাবেও এরা সেক্সুয়াল আর্জ বা লিবিডো বার করছে।
যেমন কেউ কেউ এন্টিসোস্যাল এক্টিভিটি (antisocial activity ) বা ইভটিজিং এর মাধ্যমে সেক্সুয়াল আর্জ বা লিবিডো বার করে।
আবার কেউ কেউ যদি এগুলো না করতে পারে। তখন এরা স্বপ্নের মাধ্যমে তাদের সেক্সুয়াল আর্জ প্রকাশ করে।
খ) সুপার ইগো:—– এবার আসি সুপার ইগো তে।( super ego).
এখানে মরালিটি সেন্স( morality sense) টা খুব বেশিই কাজ করে।
ইদ বলছে আমার টয়লেট পেয়েছে সুতরাং আমি এক্ষুনি টয়লেট করব। বা আমার ক্ষিদে পেয়েছে আমি এক্ষুনি খাব।
কিন্তু সুপার ইগো বলে দেয় যেখানে সেখানে টয়লেট করতে নেই। বা ঠিক আছে একটু ধৈর্য ধর, খাবার আসছে। সোজা ভাষায় সুপার ইগো সমাজের কাছে একটা ইগো আইডিয়াল ( ego ideal) মানে ভাল সাজাতে পছন্দ করে।
সুপার ইগো মানুষকে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য করতে শেখায়। অন্যায় কে পরিহার করে ন্যায় কে গ্রহণ করতে সাহায্য করে।
সুপার ইগোর মেন্টালিটির মানুষ দের মধ্যে একটা ভাল সাজার প্রবণতা থাকে। চাইলেও এরা খারাপ কাজ করতে পারে না।। আমাদের স্কুল কলেজ এর জীবনে এই রকম সুপার ইগো মেন্টালিটির দু একজন বন্ধু বান্ধব কিন্তু থাকেই।।
কলেজ লাইফে ক্লাস বাঙ্ক করে আড্ডা সিনেমা দেখা আমরা কে না করেছি। আমি তো মনে করি এই আনন্দ টাও জীবনের একটা অঙ্গ ।
কিন্তু সুপার ইগোর মানুষ জন ইচ্ছে থাকলেও শেষ পর্যন্ত এরা এসব রসে বঞ্চিত ই থাকে।। কি করা যাবে আমরা তো সবাই মন দ্বারা ই পরিচালিত।
আবার সুপার ইগো যদি কোনও একটি মানুষের ইদের আদিম কামনা এবং অহংকারের নীতিহীন অথচ বাস্তব সমস্যার সমাধান কে সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে না পারে তাহলে সেই মানুষ টি কিন্তু আজীবন অপরাধ কর্মে নিয়োজিত থাকবে। অপরাধ কর্মে লিপ্ত মানুষদের ক্ষেত্রে সুপার ইগোর থেকে ইদ ই বেশি ক্ষমতাশালী। এদের মধ্যে সুপার ইগোর কোনও ভূমিকা ই নেই।
গ) ইগো:—– আমাদের মনের ঘরে ইগোর কিন্তু একটা বড় ভূমিকা আছে।
ইগো হল অহংকার বা অহং বোধ। এই অহংকার ভালো ও হতে পারে। আবার খারাপ ও হতে পারে।
যখন এই অহং বোধ নিজ কেন্দ্রীক হয়ে যায় এবং নিজেকে বড়ো বা সঠিক দেখানোর জন্য অন্যদের ছোট ভাবতে শুরু করি । তখনই তাকে ইগো বলে।
অর্থাৎ যখন ই আমার চিন্তা জুড়ে শুধু “আমি”,” আমার” এবং একান্তই ” আমার” অবস্থান থাকে তাকে “ইগো” বলে। আর “আমি” বা “আমার ” সঙ্গে যখন তুলনা যোগ হয়। তখনই কিন্তু ইগোর জন্ম হয়।
এই ইগো কিন্তু ইদ এবং সুপার ইগো কে ব্যালেন্স করে চলে।ইদ যেমন reality principle নিয়ে চলে। আবার defense mechanism ও মেনে চলে।
the ego control of the pleasure seeking activity of the ID in order to meet the dreams of the external world.
রিয়ালিটি প্রিন্সিপাল অর্থাৎ এরা একটা বাস্তব নীতি মেনে চলে।
কোনও ব্যক্তি যখন ব্যর্থতার সম্মুখীন হন তখন সেই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে নিজের অযোগ্যতাকে ঢাকার জন্য যে পথ তিনি অবলম্বন করেন তাকেই সাইকোলজির ভাষায় বলা হয় ডিফেন্স মেকানিজম ।
এই ধরনের মানুষ রা সব সময় ই যে কোনও বিষয়ে অযথা প্রতিবাদীর ভূমিকা নিয়ে থাকেন। যাকে আমরা সোজা ভাষায় বলি অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী ।
Neo-Freudian Yung এর মতে মানুষ যা কিছু করে তার নিজের ইচ্ছে অনুসারে ই করে।অনিচ্ছাকৃত ও যা করে , তাও কিন্তু তার ইচ্ছে অনুযায়ী ই করে। ভাবার বিষয় না?