সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ১১)

হায়দ্রাবাদের সালারজং মিউজিয়াম
যাদুঘর

হায়দ্রাবাদের সালারজং মিউজিয়াম নিয়ে বলছিলাম।

ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদ শহরের মুসি নদীর দক্ষিণ তীরে দার-উল-শিফায় অবস্থিত এই পৃথিবী বিখ্যাত যাদুঘর।
ভারতের উল্লেখযোগ্য জাতীয় জাদুঘরগুলির মধ্যে এটি অন্যতম আগেই বলেছি। সালারজং যাদুঘর দেখার সময় আমার যেটা মনে হয়েছে যে এটি মূলত সালার জং পরিবারের একটি ব্যক্তিগত শিল্প সংগ্রহ।

ইতিহাস বলছে সেইসময় দাক্ষিণাত্যে এই পরিবারটি ছিল সবচেয়ে খ্যাতিমান পরিবারগুলির মধ্যে একটি। হায়দ্রাবাদ-ডেকানের পূর্ববর্তী নিজাম শাসন আমলে এই পরিবারের পাঁচজন
প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় সালারজং এর মৃত্যুর পর
হায়দ্রাবাদের সালার জং পরিবারের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি নবাব মীর ইউসুফ আলী খান যিনি পরবর্তী কালে সালারজং তৃতীয় হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর সময় কালে অর্থাৎ ১৮৮৯ থেকে ১৯৪৯ এর মধ্যে ১৯১২ সালে নবাব মীর ওসমান আলী খান নিজাম সপ্তম কর্তৃক হায়দ্রাবাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু ১৯১৪ সালের নভেম্বরে দেওয়ান বা প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন এবং শুধু মাত্র তাঁর জীবন উৎসর্গ করেন ধন সম্পদ সমৃদ্ধ করার জন্য।

তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে তার আয়ের একটি বড়ো অংশ সারা বিশ্ব থেকে প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে ব্যয় করেন।
ধীরে ধীরে নবাব মীর ইউসুফ আলী খান প্রভূত সম্পদের অধিকারী হন এবং এই অসাধারণ সংগ্রহটিকে একটি শিল্প ভান্ডারে পরিণত করেন।

তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে ১৪৮০ বর্গমাইল জমিতে বিস্তৃত ৪৫০টি গ্রামের বিশাল সম্পত্তি পেয়েছিলেন। তখন তাঁর বার্ষিক রাজস্ব ছিল ২৩ লক্ষ টাকা, যা সেই সময়ে যথেষ্ট আয়ের একটা উৎস ছিল।

ভারত, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং সুদূর প্রাচ্যের দেশগুলির শিল্পকলার প্রতি তাঁর আগ্রহ এবং পরিমার্জিত রুচির জন্য সারা বিশ্বের বাজারে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল সারা বিশ্ব থেকে বিরল শিল্প সামগ্রী সংগ্রহ করা ।

তিনি শুধু প্রাচীন জিনিসপত্র, শিল্পকলা এবং দুর্লভ পাণ্ডুলিপির একজন মহান সংগ্রাহকই ছিলেন না, তিনি কবি, লেখক ও শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতেন। তাঁর নিজের পরিবারের সদস্যদের উপর আমৃত্যু প্রচুর বই প্রকাশের দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন।

দীর্ঘ চল্লিশ বছর এইভাবে চলার পর ২রা মার্চ ১৯৫৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সংগ্রহগুলি তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর পৈতৃক প্রাসাদ ‘দেওয়ান দেবতীতে’ রেখে দেওয়া হয়। এবং সেখানে ওনার সংগৃহীত সমস্ত শিল্প সম্পদের মাত্র অর্ধেক প্রদর্শিত হয় ব্যক্তিগত জাদুঘর হিসেবে। যার নাম হয় সালারজং মিউজিয়াম।

শিল্প সাহিত্য এবং ইতিহাসের প্রতি নবাবের আবেগের নিদর্শন হিসেবে ধরা হয় এই সালারজং মিউজিয়ামকে।
শিল্প এবং সাহিত্য বিশেষ করে শিল্পের প্রতি তাঁর অনুরাগী প্রেমের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল বহুদূরে এবং তাঁর পৈতৃক প্রাসাদ, দেওয়ান দেওদীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য বিক্রেতাদের ভিড় ছিল। বিদেশে তার এজেন্টও ছিল যারা তাঁকে সুপরিচিত এন্টিক ডিলারদের কাছ থেকে ক্যাটালগ এবং তালিকা পাঠাত। তিনি তাঁর কেনাকাটা শুধুমাত্র এই উৎসগুলিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে তাঁর বিদেশ সফরের সময় ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রচুর জিনিসপত্র কেনাকাটাও করেছিলেন।

সালারজং মিউজিয়াম সম্পর্কে সমস্ত তথ্য মিউজিয়াম এর ভেতরেই দেওয়া আছে। লেখাগুলি একদম কাঠের এবং সামনে কাচের ফ্রেমে আটকানো। এতটুকু নষ্ট হয় নি।
প্রতিটি কক্ষ, বারান্দা এবং প্রতিটি তলায় সবিস্তারে লেখা আছে। একটু সময় নিয়ে পড়লেই এই মিউজিয়ামের খুঁটিনাটি কারোর অজানা থাকবে না। তাড়াহুড়োয় আমি সমস্ত ছবি তুলে এনেছিলাম যা পরবর্তীতে এটি লিখতে আমাকে সাহায্য করেছে।

ভারতীয়, ইউরোপীয়, এশীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের শিল্পের বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং সময়কাল জুড়ে বিস্তৃত এই সংগ্রহশালাটি।

সালার জং তৃতীয় ইউরোপের বিখ্যাত ম্যানুফ্যাকচারিং হাউসগুলিকে বিশেষভাবে সোনার-ক্রেস্টেড কাটলারি এবং ক্রোকারিজ ডিজাইন করার জন্য ইউরোপীয় রাজপরিবারের ঐতিহ্যের অনুকরণ করেছিলেন। আজ যাদুঘরে অনেক গৃহস্থালীর জিনিস রয়েছে যা এর শুধু সাক্ষ্যই দেয় না আশ্চর্যাণ্বিতও করে।

সারা বিশ্ব থেকে বিরল শিল্প বস্তু সংগ্রহের জন্য সালার জং পরিবার সেই সময় থেকেই খুবই বিখ্যাত ছিল।

জাদুঘরটিতে জাপান , চীন , বার্মা , নেপাল , ভারত , পারস্য , মিশর , ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা থেকে ভাস্কর্য, পেইন্টিং, খোদাই, টেক্সটাইল, পান্ডুলিপি , সেরামিক , ধাতব নিদর্শন, কার্পেট, ঘড়ি এবং আসবাবপত্রের একটি বিশাল সংগ্রহ রয়েছে । এটি বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘরগুলির মধ্যে একটি।

তিনি তাঁর এই সমগ্র সংগ্রহটি উত্তরাধিকারী ছাড়াই রেখে যান। প্রয়াত নবাবের পরিবারের সদস্যরা যারা সারা পৃথিবীকে সংগ্রহটি উপহার দেওয়ার জন্য একত্রিত হয়েছিলেন তাঁদের জন্য শুভেচ্ছা অভিনন্দন ভালোবাসা জানাতে ইচ্ছে করে প্রতি মুহূর্তে। মিউজিয়ামের প্রতিটি ঘর প্রতি তলায় সংগ্রহিত শিল্প দেখতে দেখতে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধায় যেন মাথা নত হয়ে যায়।

তাঁর সংগ্রহগুলি ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৫১ সালে একটি জাদুঘর আকারে তাঁর প্রাসাদ দেওয়ান দেওদীতে, উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন।

সালার জং তৃতীয়ের মৃত্যুর পর এটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় ভারত সরকার।
পরিবারের সদস্যদের সম্মতিতে একটি আপস চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকার জাদুঘরটি গ্রহণ করে এবং জাদুঘরটি ভারত সরকারের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত হয়।

অবশেষে ১৯৬১ সালে, একটি “পার্লামেন্টের আইন” এর মাধ্যমে সালার জং জাদুঘর এবং তার গ্রন্থাগারটিকে “জাতীয় গুরুত্বের প্রতিষ্ঠান” হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

এ তো গেল গোড়ার কথা। বর্তমান জাদুঘর তৈরির আগের কথা। সেই জাদুঘর আমরা দেখিনি। এখন আর দেখাও সম্ভব নয়। এবার বর্তমান জাদুঘরের কথায় আসি।

প্রথম জাদুঘরটি পরে বর্তমান ভবনে অর্থাৎ দার- উল- শিফায়, আমরা এখন যেটা দেখতে চলেছি সেইখানে স্থানান্তরিত করা হয় জনগণের উদ্দেশ্যে।
রাষ্ট্র জাদুঘরটিকে যখন নতুন ভবনে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। একটি নকশা প্রতিযোগিতার পরে, মুহাম্মদ ফাইয়াজউদ্দিনকে নতুন ভবনের স্থপতি হিসাবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৩ সালে জওহরলাল নেহরু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং ১৯৬৮ সালে, জাদুঘরটি তার বর্তমান অবস্থান দার-উল-শিফাতে স্থানান্তরিত হয়।
এবং সেইসময় ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ জাকির হুসেন এটির উদ্বোধন করেন।

প্রশাসনকে একটি স্বায়ত্তশাসিত বোর্ডে স্থানান্তর করা হয়, যার চেয়ারম্যান ছিলেন অন্ধ্র প্রদেশের রাজ্যপাল। রাজ্যের বিভক্তির পর তেলেঙ্গানার রাজ্যপাল বোর্ডের চেয়ারম্যান হন।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।