সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৪৬)

আমার মেয়েবেলা

(বাবা চলে যাওয়ার পর)

বাবার বুকে মাথা রেখে,,,বাবাকে জড়িয়ে ধরে জীবনের প্রথম ব্যর্থতার যন্ত্রণা ভুলে ছিলাম।
বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল,””সব ঠিক হয়ে যাবে। কিচ্ছু হয় নি। আমি আছি তো? এর পরের বার পারবি।””
সেবার একটা গানের প্রতিযোগিতায় আমাকে অন্যায় ভাবে ডিসকোয়ালিফাই করা হয়ে ছিল। সেই অপমান সহ্য করার কষ্ট আমি ভুলতে পেরেছিলাম বাবার কোলে মাথা রেখে। পরের বার বাবার হাত ধরে অনায়াসেই প্রথম পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছিলাম।
বাবা,,,, এটা সম্ভব হয়ে ছিল শুধু তোমার জন্য।

“মামনি,, আজ ইন্ডিয়ার খেলা আছে। মাকে ম্যানেজ করিস।একসঙ্গে খেলা দেখব।”
মাকে সিরিয়াল দেখার জন্য পাশের বাড়িতে পাঠিয়ে আমি তুমি আর ভাই,,, টিভির সামনে। সঙ্গে সতু কাকুর দোকানের সিঙাড়া জিলিপি ।।
সর্ট বল,,গুড লেংথ,,ওয়াইড,,নো বল,,এলবিডব্লু,,সব কিছুই তুমি খেলা দেখতে দেখতে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলে।। আজ যখন মেয়ের সঙ্গে খেলা দেখি তোমার কথা বড্ড মনে পড়ে যায় বাবা।

অনেক রকম দুষ্টবুদ্ধি মাথায় আসত তোমাকে নকল করতে গিয়ে ।
ঠাকুমার বাড়িতে মানুষ হওয়ায় তোমার এবং তোমার ভাইদের দুষ্টুমির খবর আমার জানা ছিল।তাই হোস্টেলে সুপারের মাথা খারাপ করে দেওয়ার পর আমরা দুজন কত হাসাহাসি করে ছিলাম বলো?

ছোট থেকেই তুমি আমার মধ্যে,,, নাকি আমি তোমার মধ্যে ছিলাম,,,,,আজও বুঝতে পারি নি।। তুমি ছিলে আমার হিরো। নেভিব্লু টি শার্ট পরে যখন তুমি খেলতে নামতে,, আমি আর কারোর দিকেই তাকাতাম না। খুব ভাল ফুটবল খেলতে তুমি ।গোলকিপার ছিলে।। মাঠের বাইরে বসে তোমাকে খেয়াল করতাম। কিভাবে অনায়াসেই তুমি বলগুলো আটকাতে। ছেলে হলে আমি তোমার সঙ্গে বল খেলতাম ইইইইই।। যে সময় পায়ে বল দেওয়ার কথা,,, আমি মেয়ে বলে হারমোনিয়াম ধরিয়ে দিয়েছিলে,, তাইনা বাবা?
তুমি বুঝতে পার নি,,আমি তো খেলার মধ্যে দিয়ে তোমার সঙ্গেই থাকতে চেয়ে ছিলাম ।।

একবার আমার খুব জ্বর হয়ে ছিল। একমাস বিছানায় ছিলাম। মনে আছে এখনও,,,, আমি ভাত খেতে চাইতাম বলে তুমি অন্য সব খাবার দিয়ে ভুলিয়ে আমাকে কিভাবে খাওয়াতে,,, কারণ আমি মার কাছে খেতেই চাইতাম না।।

রাতে গান বাজনার আসরের কথা মনে পড়ে বাবা??কত গান বাজনা হত বাড়িতে? তুমি আমার গাওয়া গানগুলো কি মন দিয়ে শুনতে!! ক্লান্ত আছি বললেও ছাড়তে না। এখন আর কেউ গান করার কথা বলেই না।। আসলে তুমি যে বাবা।

কত রান্না শিখেছি তোমার কাছে!! হাতে ধরে শিখিয়েছ আমায়। গঙ্গার ইলিশ বাড়িতে আসা মানেই,”” মামনি চলে আয়”। বাড়ি থেকে বেড়োতে মামনি মামনি বলে।। আর ফিরে এসে যদি আমায় না দেখতে!! মামনি মামনি করে পাড়া মাথায় করতে।।

বাবা,,আর ভাল লাগে না। বড্ড একা লাগে। তোমার কাছে কখনও কিছু লুকোই নি। যে কথা মাকে বলার,,,সে কথাটাও আমি তোমায় বলেছি। প্রথম প্রেমে পড়ার কথাও তো তোমারই সঙ্গে,,,,মনে আছে? তুমি বলেছিলে,,””ছেলেটা কে দেখাস। তোকে কেমন ভালবাসে একবার যাচাই করে নি””।
ওকে দেখিয়ে বলেছিলাম,””দেখ বাবা একদম তোমার মতো দেখতে। তবে তুমি বেশি ভাল””। তুমি একটু মুচকে হেসেছিলে”।

যেদিন আমাদের বিয়ে ঠিক হল। তুমি আমাদের দুজনকে ডেকে বলছিলে,””তোদের বিয়ে ঠিক করে এলাম। আমাকে তোরা খাওয়াবি চল্””।আমরা সেদিন চাইনিজ পার্টি করে ছিলাম। ভাই মারা যাওয়ার পর তুমি চিংড়ি মাছ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলে। কিন্তু সেদিন তুমি খেয়েছিলে।। ওকে আমার পাশে দেখে কি ছেলের দুঃখ ভুলতে চেয়েছিলে?

বাবা ,,,প্রথম মা হবার খবর টা কিন্তু আমিইইই প্রথম,,, তোমাকেই দিয়েছিলাম। মনে পড়ে তোমার? ইনজেকশনে কি ভয় ছিল আমার!! তুমি হাতটা ধরে থাকতে। কাকুকে বলতে “”একটু আস্তে করে দাও। মামনির লাগবে””। এখনও ভয় পাই ইনজেকশন নিতে। কিন্তু তোমার মতো কেউ হাত ধরে থাকে না।

বাবা,,,প্রথম মা হওয়ার কষ্ট কত ইনিয়ে বিনিয়ে তোমাকে বলতাম। মনে আছে তোমার? মা হেসে বলেছিল,”” এটাও তোর বাবা জানবে”?
আমি বলেছিলাম,”” হ্যাঁ,,,আমার বাবা সব জানে””। এখন মনে করলে হাসি পায়।
মনে আছে বাবা? প্রথম মা হওয়ার আনন্দে আমাদের দুজনের চোখ কিভাবে ভিজে গিয়েছিল??তুমি বলেছিলে,”” ও বাবা, এ যে আর একটা মামনি এসে গেল”,,,,,

কত কথা বাবা!!!! কত কথা আছে,,, যা তোমাকে বলাই হয় নি। বুকের ভেতর চাপ হয়ে আছে। একবার যদি তোমায় পেতাম! একটু হালকা হতে পারতাম। ছোট ছোট সুখ দুঃখ আনন্দ,,মজার কথা যা তোমায় বলাই হয় নি।এত বছরে কত কথা জমে গেছে । কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আছে। আই মিস ইউ বাবা,,,

মনেহয় কোনও পাহাড়ের মাথায় উঠে বাবা বলে চিৎকার করে ডাকি। চারিদিক থেকে “বাবা” ডাকটা আমার কাছে ফিরে আসবে। তুমি শুনতে পাবে না?

আমি বুকভরে শ্বাস নিতে চাই। তোমার কাছে থাকতে চাই। তোমার কোলে মাথা রেখে জীবনের হিসেব মেলাতে চাই। ভুল ত্রুটি গুলো তোমার কাছে শুধরে নিতে চাই।উদ্দেশ্য হীন ভাবে চলেছি। ঠিক করছি না ভুল করছি,, কিছুই বুঝতে পারি না।।

তুমি কেন এত তাড়াতাড়ি আমাকে একা করে চলে গেলে?? আমার কথা একবার ও ভাবলে না?? এতটা স্বার্থপর তো কোনও দিন ছিলে না?
বাবা এখন বড্ড একা লাগে,,,,এতগুলো বছরেও তোমাকে ছেড়ে থাকার কষ্টটা মানিয়ে নিতে পারলাম না। তোমার কাছে যেতে চাই। আর পারছি না। খুব ক্লান্ত লাগে। হাঁপিয়ে উঠেছি। তোমাকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রণাটা যে আর সহ্য করতে পারছি নাআআআআআআ বাবা ,,,,,,,,,

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।