ক্যাফে ধারাবাহিকে সুকুমার রুজ (পর্ব – ২)

ম্যারিটাল প্লাস্টার

শুনেছি, কলকাতার সেরা হোমিওপ্যাথ ডক্টর, অথচ সামান্য নাক-ডাকা সারাতে পারছে না!
এই তো, দেখেছিস টুকুন! এসেই কিছু না জেনে বুঝেই উনি মায়ের দলে ভিড়েছেন।
দলাদলিটা এখানে কোত্থেকে এল বাবা!
কেন আসবে না বাবা! চিরদিনই তুমি …। যাক গে! এখন থাক সে-সব কথা। ওদিকে গাড়ি হর্ন দিচ্ছে আমাদের পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে।
টুকুন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় — তাহলে বাবা, তোমরা দু’জনে ডিভোর্স করতে কি একই গাড়িতেই যাচ্ছ?
তাছাড়া আর উপায় কী বল। তোমরা মা আর বাবার জন্য দু’খানা গাড়ি কি কিনে দিয়েছ? আমার তো বাসে উঠলে শ্বাস-কষ্ট হয়। আর তোমার মায়ের হাঁটু-ব্যথা, বাসে উঠতেই পারে না। তাই অগত্যা ..!
বুবাই বলে — ঠিক আছে, উপায় যখন নেই, একসঙ্গেই যেতে হবে। বলছিলাম কি, আমরা দু’জনেও তোমাদের সঙ্গে এক গাড়িতেই যাই। আমাদের গাড়ি তো আমেরিকায় পড়ে রয়েছে।
তোদের আবার যাওয়ার দরকার কী! মা-বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে যেমন সন্তানদের দেখতে নেই, তেমনি ডিভোর্সও দেখতে নেই।
বুবাই বলে ওঠে — না, ডিভোর্স দেখতেও চাই না। কিন্তু আমি যদ্দুর জানি, ‘ইন ক্যামেরা ট্রায়াল’-এ জজ সন্তানদেরও ওপিনিয়ন নিতে পারে। তাই আমরা না গেলে …।
তার মানে তোমরাও চাও যে, আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাক!
তা-ছাড়া আর উপায় কী! এমনিতেই আমরা তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারি না। বিদেশে থাকি। মা-বাবার একটা ছোট্ট ইচ্ছাও যদি যোগ্য ছেলেমেয়ে থাকতে পূরণ না হয়, তা হলে তো…!
বা বা!বেশ! তাহলে আর দেরি কেন? চল, গাড়িতে গিয়ে বস।
এমন সময় অনুরাধা ঘরে ঢোকেন — এই জন্যই তোমার সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। তোমার কান্ড-জ্ঞান বলে তো কিছু নেই।
ছেলেমেয়ে দুটো সেই কোন দূর দেশ থেকে সবে বাড়ি এসে পৌঁছোল, তাদের স্নান-খাওয়া তো দূরের কথা, হাতে মুখে জল অবধি দেয়নি। অমনি বলে দিল গাড়িতে গিয়ে বসো।
হাঁ-হাঁ করে ওঠেন অনিমেষ — এটাই তো তোমার দোষ! কিছু না জেনেবুঝেই কথা বলো। আমি কি ওকে গাড়িতে বসতে বললাম? ও নিজেই তো বলল, আমাদের সঙ্গে একই গাড়িতে কোর্টে যাবে।
টুকুন ঘরে ঢোকে — এই তো বুদ্ধিমানের কাজ! কাল থেকে তো আর ঝগড়া করার স্কোপ থাকবে না। দু’জন দু’জায়গায় থাকবে। তাই আজ দু’জনে জম্পেশ করে ঝগড়াটা করে নাও।
বুবাই বলে ওঠে — ইচ্ছে থাকলেও উপায় হবে না। এখন আর সময় নেই। ওদিকে গাড়ির ড্রাইভার হর্ন বাজিয়েই যাচ্ছে। এখন চলো, ঝগড়া করার জন্য না হয় জজের কাছে একদিন টাইম চেয়ে নিও।
দাদা, তোর খুব মজা লেগেছে দেখছি। এমন একটা সিরিয়াস অবস্থা, আর তুই…!
মজা দেখানোর জন্যই তো তুই আমাকে জোর করে কলকাতায় নিয়ে এলি। আমার যে কত ক্ষতি হলো!
এমন সময় ড্রাইভার হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকে — বাবু, আপনারা দেরি করবেন, আর শেষকালে আমাকে বকাবকি করবেন। আপনার স্বভাব তো আমি জানি।
শেষে তুইও আমার স্বভাব তুলে কথা বলছিস! তোকে না আমি…।
আঃ বাবা, ওকে বকাবকি করো না।
ও দাদাবাবু যে! কখন এলেন? ওমা! দিদিমণিও! বাঃ বাঃ! বেশ ভালো করেছেন এ সময়ে এসে। এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
অনিমেষ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ওঠেন — কী ঠিক হয়ে যাবে? অ্যাঁ, কী ঠিক হয়ে যাবে? কিচ্ছু ঠিক হবার নয়। যেটা ঠিক হয়েছে, সেটাই ঠিক হবে।
ওই শুরু হল গাঁক-গাঁক করে চিৎকার! চল, তোরা ও ঘরে চল। যা আছে চারটি খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নে। আমরা তিনটের মধ্যে ফিরে যাবো।
বুবাই ও টুকুন একযোগে বলে ওঠে — হ্যাঁ মা, যা আছে দাও, খুব খিদে পেয়েছে। তবে খাওয়ার পর বিশ্রাম নয়, তোমাদের সঙ্গে যাবো।
তিন
জজসাহেব নায়েকের বয়স বাহান্ন-তিপান্ন হবে। কিন্তু বড়সড় চকচকে টাক থাকার জন্য দেখে একটু বেশি-বয়সি মনে হয়। উনি গোল্ডেন ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে অনিমেষ রায় ও অনুরাধা রায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন — গোল্ডেন জুবিলি হয়ে গেছে?
অনুরাধা প্রশ্নের মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে না পেরে ভড়কে যান। অনিমেষ প্রশ্নটা বুঝতে পেরে বলেন — না, হয়নি, এখনও ন’বছর বাকি।
জাস্টিস নায়েক হালকা হেসে বলেন — হাফ সেঞ্চুরির কাছাকাছি। এখন একটু ধরে খেললেই তো পারতেন!
নাহ! আর সম্ভব নয়। এত অবহেলা সহ্য করা যাচ্ছে না।
আগের কথাগুলো না বুঝলেও, এ-কথাটা অনুরাধা রায়ের বুঝতে তেমন অসুবিধা হয় না। উনি বলে ওঠেন — কে কাকে অবহেলা করছে, তা পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ নিয়েই দেখুন না জজসাহেব।
অনিমেষের গলায় ঝাঁঝ — আলবত দেখবেন। হাতে-নাতে প্রমাণ পাবেন। জানেন, মোচার ঘন্ট, থোরের ডালনা, কাঁচকলার কোপ্তা, এঁচোড়রে চপ, চুনোমাছের চচ্চড়ি, এসব ও যা ভালো রান্না করে, না খেলে বুঝতে পারবেন না। একচল্লিশ বছর ধরে এসব খাইয়েছে। কিন্তু মাসখানেক হল, রান্নাঘরে ঢোকা বন্ধ করেছে। ওসবের স্বাদ ভুলতে বসেছি। এটা অবহেলা নয় তো কী! আপনিই বিচার করুন, রান্নার জন্য কোত্থেকে একটা মেয়েকে ধরে এনেছে। তার হাতে লম্বা-লম্বা নখ। সেগুলো আবার সবুজ রং করা। সে যা রান্না করে, তা কহতব্য নয়। রান্না তো নয়, জলে-সিজোনো, আর সে-সব খাওয়া তো নয়, গর্ত-বুজোনো। জানেন, এই এক মাসে আমার পাঁচকেজি ওজন কমে গিয়েছে।
জাস্টিস নায়েক অনিমেষবাবুর নাদুসনুদুস চেহারার দিকে তাকিয়ে বলেন — এ বয়সে একটু ওয়েট কমানো ভালো। পায়ের শক্তিটা কমে যায় তো, বেশি ওজন নিতে পারে না।
তা কি আর আমি জানি না! অনুকে দেখেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। পাঁচ মিনিটও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, এত পদ-মর্যাদা বেড়েছে। এত করে বলি মর্নিং-ওয়াক কর। কিছুতেই যায় না। আমি রোজ মর্নিং-ওয়াক করি।
অনুরাধা মুখ বেঁকান — মর্নিং-ওয়াক ব’লো না। বল নুন-ওয়াক। ন’টার আগে ঘুম ভাঙে না। চা-বিস্কুট খেয়ে সাড়ে নটায় বেরিয়ে, সাড়ে-এগারোটায় ফেরা হয় থলে-ভর্তি বাজার নিয়ে। সেটাকে মর্নিং-ওয়াক বলে কি না জজসাহেব বিচার করুন।
চার

সকাল সাড়ে নটা। ডাক্তার জি. ডি.সরখেলের ডিসপেনসারি। ডাক্তারবাবুর উঁচু গলা— কী রে ন্যাপলা? ক’জন হয়েছে?
এখন অবধি চারজন বাবু।
শোন! আর একজন হলেই বলবি। গিয়ে বসব। আজ আমার একটু তাড়া আছে।
ঠিক আছে বাবু।
একটু পরেই রুগি বসার ঘর থেকে আওয়াজ — ভাই! ডাক্তার কি বসেছেন?
উনি তো অনেকক্ষণ থেকে বসেই আছেন রুগী আসার জন্য। এবার উঠবেন।
কী আবোল-তাবোল বকছ! আমরাই তো অনেকক্ষণ থেকে বসে আছি। ডাক্তার আর কোথায় বসলেন?
উনিও বসে আছেন, পাশের ঘরে। আর দু’একজন পেশেন্ট এলেই উনি উঠে রুগি দেখার ঘরে আসবেন। ওই তো এমিলি দিদিমনি আসছে। বসুন। ডাক্তারবাবুকে খবর দিচ্ছি। বাবু! সেই এমিলি দিদিমনি এলেন। এবার…!
এমিলি দিদিমনি! সে আবার কে?
সেই যে পরশুদিন দেখাতে এসেছিল, গা থেকে জামাকাপড় খুলে ফেলতে চায়, শীতকালে জানলা খুলে রেখে হাওয়া খায়! চোখ-মুখ পাকা টমেটোর মতো হয়ে যায়!
ও! সেই আর্জ নাই-ল্যাকে-সাল্ফ সিম্পটম! এমিলিনাম নাইট্রোসাম দিয়েছিলাম যে মেয়েটাকে! ওর নাম তো এমিলি নয়, ওর নাম লক্ষ্মীমনি!
সে লক্ষ্মী-সরস্বতী যা হয় হোক; জানেন তো আমি ওষুধের নামে পেসেন্টকে মনে রাখি।
ওঃ! তুই বড্ড বাজে বকিস। তোকেই দেখছি এবার এক ডোজ কেলিফস খাওয়াতে হবে। যা, আমি যাচ্ছি। এক নম্বরকে পাঠিয়ে দে।
পর্দার ফাঁক দিয়ে মুণ্ডু বের করে নেপাল — তারাচাঁদ ধ্বজাধারি আসুন।
ডাক্তারবাবু নমস্কার!
হ্যাঁ, বসুন, নাম বলুন।
আজ্ঞে তারাচাঁদ ধ্বজাদারি।
তা-রা-চাঁদ ধ্বজা-ধারি! আপনি কি পাকিস্তানের লোক?
কী যা-তা বলছেন! পাকিস্তানের লোক হতে যাবো কোন্ আহ্লাদে?
না, তা নয়, এমনিই, জোক্‌ করছিলাম। তারা, চাঁদ-ওয়ালা ধ্বজা, মানে পতাকা ওদের কিনা তাই… হেঁ-হেঁ…!
না, না, এ কেমন জোক! মানুষকে ইনসাল্ট করছেন। আপনার নাম তো গোবর্ধন সরখেল। আমি যদি বলি আপনার ইয়েতে গোবর…। থাক, আর বললাম না, আপনি হলেন কলকাতার মধ্যে ফেমাস হোমোপাতি ডাক্তার! বললে আপনি কি রাগ করবেন না? তাছাড়া কথাটা ডেঞ্জারাসও বটে! এখন আই-এস-আইয়ের চর খুঁজতে খুব ধরাধরি চলছে। এরম সময়ে পাকিস্তানের লোক বললে…!
ডাক্তার সরখেল নিজের মনে বলেন — হুঁ, এনাকার্ডি কক্কিউল।
কী বললেন?
না-না, আপনাকে কিছু বলিনি। ওটা হল মেডিক্যাল টার্ম। তবে তারাচাঁদবাবু, আপনার পদবিটার বেশ অভিনবত্ব আছে।
ওটা পদবি নয়, উপাধি। আমার ঠাকুরদা’র ঠাকুরদা’ নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাদলে ধ্বজা ধরে থাকার চাকরি করতেন। সেই থেকে আমরা উপাধি পেয়েছি ধ্বজাধারি। ওটাই এখন পদবি হয়ে গেছে।
ও! এইবার বুঝেছি। নবাবের দেওয়া উপাধি। এতো বেশ গর্বের ব্যাপার! এবার আপনার অসুবিধাটা বলুন।
কিচ্ছু অসুবিধা নেই। পদবিটার নতুনত্ব আছে, নবাবি আমলের কৌলিন্যও আছে। তবে কেউ কেউ ধ্বজাধারিটা বিকৃত ক’রে…।
আরে মশাই! শারীরিক অসুবিধা কী, তাই বলুন।
ও! রক্ত, পাছা দিয়ে। মানে অর্শ আর কী!
আপনি কী করে জানলেন যে অর্শ? ভগন্দর, ফিসচুলা বা অন্য কিছুও তো হতে পারে!
না-না, অন্য কিছু হতেই পারে না। এ্যালোপ্যাথি ডাক্তার বলেছে অর্শ। কবিরাজ বলেছে অর্শ! ইউনানি, আকুপাংচার, নেচারোপ্যাথি সবাই বলেছে অর্শ।
ও! সব প্যাথিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শেষে এই হোমিওপ্যাথি।
না-না সব এখনও হয়নি। মিউজিক-থেরাপি আর অ্যারোমাথেরাপি বাদ আছে। ইচ্ছে করেই যাইনি। কান কিংবা নাক দিয়ে বেরোলে না হয়…! কিন্তু বেরোচ্ছে তো পাছা দিয়ে! আমার মামাতো ভাই বলল — ‘তারা! হোমিওপ্যাথি করা। ‘যার নাই কোনো গতি, তা সারায় হোমিওপ্যাথি।’ তাই শেষে আপনার কাছে…।
বাঃ বা-বাবা-বাঃ! বেড়ে বলেছেন তো আপনার মামাতো ভাই! এরকম লোক তো আমাদের চাই। তা ওই সব ডাক্তাররা রোগ বাতলে দিল; কিন্তু সারালো না কেন?
সারাতে দিলে তো?
এমন সময় বাইরে থেকে একটা কোলাহল কানে আসে। তা শুনে ডাক্তারবাবু বলেন— নেপাল, দ্যাখো তো বাইরে গোলামাল কীসের!
নেপাল, কম্পাউণ্ডার থেকে ডাক্তারে প্রমোশন পাওয়ার জন্য মরিয়া। তাই সে হাতে-কলমে ডাক্তারিটা শেখার জন্য রুগি দেখার সময় ডাক্তারের সামনের চেয়ারে ঠায় বসে থাকে। আজও ছিল। কিন্তু ডাক্তারবাবু আদেশে নেপাল বেরিয়ে যায়। ওর চলে যাওয়ার দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে, ডাক্তার তাঁরাচাঁদবাবুর দিকে মনোসংযোগ করেন — হ্যাঁ, কে সারাতে দিচ্ছে না? মানে না সারালে কার সুবিধা?
কারও সুবিধা নেই। বরং অসুবিধা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।