স্বপ্নটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে এল । ফুটপাতের একপাশে দাদুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল সে । সবার বাড়ির দরজা – জানালা, ব্যাল্কনি ভেদ করে দৃষ্টির উপস্থিতিগুলো ছিটকে আসতে লাগে । সামনে দিয়ে একটা মিছিল চিৎকার করে চলে গেল, দিয়ে গেল সাময়িক নিস্তব্ধতা ।
দাদুর চোখের কোনে জল দাঁড়িয়ে পড়ল । দশ বছরের ইপ্সিতাও সেই নিস্তব্ধতা গিলে খেল যদিও সে জানল না মিছিলটা কীসের ।
দাদু – (চোখের জল আড়াল করে দিয়ে) দিদিভাই, এটা শেষ বয়সের মিছিল ।
ইপ্সিতা – শেষ বয়সের মিছিল ? এটা আবার কোন ধরনের মিছিল, দাদ্দু ? কখনও –তো শুনিনি।।
দাদু – এই মিছিল শুধুমাত্র বুড়ো-বুড়িদের জন্য । যেসব বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা বেকার হয়ে পড়ে, সকলের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, নিজের বাড়িতেই কাজের লোকের মতো ব্যবহার হয়, নিজের বাড়িতে থাকার জন্য কান্না করে অথচ থাকতে পারে না এবং অচল হলে শেষমেশ যাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তাদেরকে নিয়েই এই মিছিল ।
ইপ্সিতা – দাদ্দু, বৃদ্ধাশ্রম মানে কি?
দাদু – যেসব বুড়ো – বুড়িদের নিজের বাড়িতে থাকার জায়গা হয় না তাদের সবাইকে নিয়ে একরকম থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থাকেই বৃদ্ধাশ্রম বলে ।
ইপ্সিতা – দাদ্দু, তুমিও কি তাহলে একদিন আমাদের ছেড়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাবে ? – আর চিৎকার করে হেঁটে যাবে মিছিলে ?
দাদু – (কিছুক্ষনের নীরবতার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছুঁড়ে দিয়ে ম্লান মুখে) জানি না, দিদিভাই । তবে তুমি যদি যেতে না দাওতো যাব না ।
ইপ্সিতা – (শক্ত করে দু’হাত দিয়ে দাদুর কোমর জড়িয়ে ধরে) আমি তোমাকে কোত্থাও যেতে দেব না, দাদ্দু । তুমি আমার কাছেই থাকবে ।
বাসের জানালার বাইরের আকাশে কালো মেঘ ছেয়ে গেছে । ইপ্সিতার স্বপ্নে তখন চড়া রোদের আবির্ভাব । বৃষ্টির কোনও চিহ্ন নেই । স্কুল থেকে গ্রীষ্মকালের ছুটিও নেই । তবুও বিকেল হলে লুটতে চায় খেলার মাঠের আনন্দ, ছুটতে চায় হাওয়ার মতো দ্রুত, ফিরতে চায় না সন্ধ্যা হওয়ার ঘরে, ফিরতে চায় না লেখাপড়ার দৌড়ে ।
ছুটির দিনগুলোতে দুপুরবেলা তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার চেষ্টা থাকে মায়ের । যদিও সে দুপুরের ঘুমে ফাঁকি দিতে সফল হয়ে যায় কিন্তু সেই বিছানা ছাড়ার কৌশলটায় ঠিক ধরা পড়ে যায় মায়ের হাতেই । কতবার যে এর জন্য বকাবকি ও মার খেয়েছে তার হিসেব নেই । দাদু এসেই বাঁচিয়ে দিয়ে যায় । দাদুকেও যে তার জন্য কম কথা শুনতে হয় না তা নয় !
বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিট দূরত্বে একটা পার্ক আছে । পার্কের নাম নেহেরু পার্ক । রোজ বিকেলে দাদু তাকে নিয়ে সেই পার্কে যায় । ইপ্সিতা একটু লাজুক প্রকৃতির বলেই বন্ধুত্ব করতে অনেকটা সময় লেগে যায় । আর একবার বন্ধুত্ব হয়ে গেলেই নিজের জিনিস দিয়ে দিতেও দ্বিতীয়বার ভাবে না । দাদুর একটা কথা সে স্পষ্ট মনে রাখে – কাউকে যদি উজাড় করে ভালবাসা দেওয়া যায় সেই ভালবাসা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে । তাই ভালবাসাই সব থেকে বুদ্ধিমানের কাজ ।
বিকেলের পড়া শেষ হলে তার মা ব্যস্ত হয়ে পড়ে টিভির পর্দায় । মায়ের সেই স্টার জলসার সিরিয়ালগুলোতে তার একটুও মন ভেজে না । ছোট্ট হলেও সে এইটুকু বুঝে গেছে সংসারে কি করে আগুন লাগে । টিভি সিরিয়ালগুলোতে সব কিছুই যে মিথ্যে দেখায় তা নয় । মায়ের ঠিক এই ব্যস্ততার সময়টাতেই সে দাদুর কাছে রোজ গল্প শোনার সুযোগ করে নেই । দাদুই হল তার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড । দাদুই হল তার প্রতিদিনের সান্তা ।
বাসের জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটারা কড়া নেড়ে যায় । বাসের গতিও এখন অনেকটা কম । ইপ্সিতার ঘুম এখনও ভাঙ্গেনি । তার স্বপ্ন ছুটে যাচ্ছে হাইওয়ে দিয়ে, লাল সিগন্যাল আসতে অনেক দেরি ।
ইপ্সিতা দ্রুত ব্যাল্কনিতে ছুটে এল । এসে দেখে দাদু আরাম কেদারায় দুলতে দুলতে গুনগুন সুরে কী যেন গান ধরেছে আর দাদুর চোখ আকাশের দিকে স্থির হয়ে আছে । অনেকটা অন্যমনস্ক । ভাবের ঘোরে ।
ইপ্সিতা – (গানের শেষে হাততালি দিয়ে) খুব সুন্দর গান । দাদ্দু, এটা কার গান ? রবি ঠাকুরের ?
দাদু – না, দিদিভাই । এটা কাঙাল হরিনাথের গান, যার পুরো নাম হরিনাথ মজুমদার । অবশ্য তিনি ফকির চাঁদ বাউল নামেই পরিচিত ।
বাইরের বৃষ্টি অনেকটাই কমে গেছে । যেটুকু পড়ছে ছিটেফোঁটা । তবে এখনও মেঘ পরিষ্কার হয়নি । সময় তখন দুপুর ছাড়িয়ে বিকেলের পথে । মেঘের কারণে বিকেলটা যেন আরও বেশি বুড়ো দেখাচ্ছে । বাসটিও তাদের গন্তব্য বাস-স্টপে এসে দাঁড়াল । বাস-স্টপের নাম “সবাই পর” । নামার সময় দাদুর কাছ থেকে ইপ্সিতাকে কোলে তুলে নিল তার মা । চারজনই বাস থেকে নেমে দাঁড়াল । চোখের সামনেই একটু দূরে একটি বটগাছ । তাতে একটা বড় হোর্ডিং ঝোলান, লেখা আছে – “শেষ বয়স” আর নিচে তীর চিহ্ন দিয়ে গলির দিক আঁকা আছে ।
এই সময়টা ইপ্সিতার খেলার সময় । আজকে সে আর ঘুমকে ফাঁকি দিতে পারেনি আর দাদুকেও তার মায়ের কাছ থেকে কথা শুনতে হয়নি । গভীর স্বপ্নে মগ্ন হয়ে আছে ।
তখনও স্বপ্নে দাদুর কোলে বসে গান আর গল্প শুনছিল ইপ্সিতা । দাদুর কণ্ঠে ভাসছিল মান্না দে’র সেই বিখ্যাত গান – “আবার হবে তো দেখা এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো” । গানটা শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে । দাদুও চুপ । তার মায়ের টিভি সিরিয়ালও শেষ ।
একটা মিছিল হাত পা ছুঁড়ে এগিয়ে আসছিল । এইবার সেটা স্বপ্নে নয় । সত্যি সত্যিই । মিছিলের চিৎকারে স্বপ্ন ছেড়ে বেরিয়ে এল সে । তবে সেটা বয়স্কদের মিছিল নয়, সকলের মিছিল, গাছ বাঁচানোর মিছিল । চোখ খুলেই দেখে সে মায়ের কোলে । পাশে তার বাবা আছে কিন্তু দাদু নেই । মায়ের কোলে ছটফট করছিল সে, দাদ্দু – দাদ্দু করে চিৎকার করছিল সে, কান্না করছিল, মিছিলের ভিড়ে খোঁজ করছিল ।
মিছিল সরে যেতেই কিছুটা দূরে দাদুকে দেখতে পেল । তার দাদু একটা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর বাম হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ডান হাত দিয়ে বিদায় জানাচ্ছে । দাদ্দু – দাদ্দু করে দু’হাত বাড়িয়ে চিৎকার করছিল সে । তার এই কান্না-চিৎকার মা-বাবার মন গলাতে ব্যর্থ হল ।
ইপ্সিতা – (মনে মনে সে বলতে লাগল) দাদ্দু যে বলেছিল, ভালবাসা দিলে ভালবাসা পাওয়া যায় । তবে দাদ্দুর কেন এইরকম দশা হল ? সব ভুল কথা । ভালবাসলেই শুধু কষ্ট পাওয়া যায় । আজ থেকে আর কাউকেই ভালবাসব না । দাদ্দু, ক্ষমা করে দিও আমায় । তোমাকে আমার কাছে রাখতে পারলাম না । তুমি খুব ভালো থেকো । শরীরের খেয়াল রেখো আর এইবার থেকে কারোর জন্য ভালবাসা রেখো না ।
একটা বাস এসে সামনে দাঁড়াতেই উঠে পড়ল তিনজন । আস্তে আস্তে তার দাদু আর বাসের দূরত্ব বাড়তে বাড়তে এক সময় বিলীন হয়ে গেল ।