ক্যাফে ধারাবাহিকে সুকুমার রুজ (অন্তিম পর্ব)

ম্যারিটাল প্লাস্টার
সবাই ঘুমের জগতে। শুধু অনুরাধা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছেন। তড়িঘড়ি স্নান ও প্রসাধন সেরে ফেলেছেন।
এবার বেরোনোর প্রস্তুতি৷ ভোরে বুবাই, টুকুন যখন বিছানায়, আর কেসের বিবাদী পক্ষ ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে, তখন অনুরাধা লাল-পাড় গরদের শাড়ি পরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন।
তার আগে অবশ্য বাইরের গেট খোলার শব্দ পেয়ে বুবাই বিছানা থেকে মুখ বাড়িয়েছে। সদ্যস্নাতা মা-কে দেবী দেবী বেশে বেরোতে দেখে মুচকি হেসে বলে ওঠে — ওষুধ ধরেছে। জয় ঢাকা-কালিবাড়ির জয়।
অনুরাধা একা কখনও ট্যাক্সি চড়তে চান না, ভয় লাগে। যা দিনকাল পড়েছে। টুকুন একদিন বলেছিল, মা তোমার তো বয়স হয়েছে, বৃদ্ধা বললেই চলে। তোমার একা ট্যাক্সি চড়তে ভয়টা কিসের? অনুরাধা বলেছেন — বৃদ্ধ ট্যাক্সিওলারও কি অভাব আছে!
টুকুন ব্যাপারটা বোঝার পর হো হো করে হেসে উঠেছিল।
আজও যথারীতি একটা টানা রিকশা ডেকে, আসা-যাওয়া দুশো টাকায় রফা করে চড়ে বসলেন।
অনিমেষ বাথরুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে উঁকি মারেন। অনুরাধা নেই। পাশের বাথরুম খালি। তাহলে গেল কোথায়! বাধ্য হয়ে উনি ছেলেমেয়ের ঘরে আসেন। দুজনে দুটো বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। ডাকবেন কি ডাকবেন না ভাবতে কিছুটা সময় যায়। অবশেষে ডাকেন— বুবাই, টুকুন, তোদের মা-কে দেখেছিস?
বুবাই চাদর থেকে মুখ বাড়ায় — মা, মানে আমাদের মা-কে তো জন্মে থেকে দেখে আসছি। মানে নতুন কেউ!
না, এই বয়সে নতুন আর কোথায় পাবো! তোদের পুরোনো মায়ের কথাই বলছি। কোথাও দেখছি না। তোরা কিছু জানিস?
টুকুন ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে— মায়ের কী হয়েছে? কোথায় মা?
সেটাই তো তোদেরকে জিজ্ঞেস করতে এঘরে এলাম। তোরা জানিস কোথায় গেছে?
বুবাই বিছানায় উঠে বসে — বাইরে গেট খোলার শব্দ পেয়েছিলাম। দেখলাম, সেজেগুজে বেরিয়ে গেল। তুই দেখলি, অথচ আটকালি না!
আটকাবো কেন? দেখে তো মনে হল পুজো দিতে গেল।
ও পুজো দিতে গেল। তুই শিওর?
হ্যাঁ, মানে শিওর নই। তবে সাজগোজ দেখে তো মনে হল পুজো দিতেই গেল।
তুই জিজ্ঞেস করবি তো কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে!
আমি ভাবলাম, রোজই যায় হয় তো। বয়স হয়েছে। এ-বয়সে পুজোপাট করার বাতিকটা বাড়ে তো! তাই আর …।
টুকুন বলে — বাবা, তোমার কি মনে হচ্ছে, মা অন্য কোথাও চলে যেতে পারে? মানে বাপের বাড়ি?
বাপের বাড়ি কেন যাবে! সেখানে আছেটা কে! এগারো বছর হল বাপের বাড়ি যায়নি৷ তবে তুমি কি ভাবছ, বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও… মানে…।
সেটা ভাবা কি অন্যায়? ক’দিন ধরে যা ঝামেলা চলছে। কাল তো কোর্ট থেকে ফেরার পর থেকে আর কোনও কথা নেই। বুবাই সান্ত্বনা দেয় — বাবা, চিন্তা করো না। কাছেপিঠেই কোথাও গেছে। আমার মনে হয় ঢাকা-কালীবাড়ি গেছে। মা তো কোনও বিপদে পড়লেই মা-কালীর শরণ নেয়।
টুকুন বলে — সেটাই হবে বাবা। বাড়িতে ধর এখন বিপদ চলছে তো!
অনিমেষ বেশ ক্ষুব্ধ — তোরা বিপদ-বিপদ করে যাচ্ছিস! বিপদটা কোথায়?
মানে তোমার শরীর খারাপ তাই …।
শরীর থাকলেই খারাপ হয়। এ নিয়ে এত টেনশনের কী আছে! বয়স হয়েছে, একটু প্রেসার-হার্টবিট বাড়বে না তো কি কমবে? এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। তার জন্যে ..!
বুবাই আড়মোড়া ভাঙে — না, মানে বাড়িতে একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার চলছে তো! ওটাকেই আমাদের বিপদ মনে হচ্ছে আর কী! তবে তুমি চিন্তা কর না, একটু পরেই মা ফিরে যাবে।
টুকুন ওঠে— দাঁড়াও, আমি ঠাকুরঘরটা দেখলেই বুঝতে পারব পুজো দিতে গেছে কিনা। পুজো দেওয়ার জন্য মায়ের একটা স্পেশ্যাল রেকাবি থাকে ঠাকুরঘরে। সেটা না থাকলেই বুঝব …।
থাক, আর বাসি কাপড়ে ঠাকুরঘর ঢুকতে হবে না। তিনি এসে ঠিক বুঝতে পারবেন আর কুরুক্ষেত্র বাধাবেন৷ যে চুলোয় গেছে যাক! সকালে উঠে একটু যে চা-ফা পাওয়া যাবে, সেসব বন্ধ হতে বসেছে।
ও বাবা, তুমি চা খাবে বললেই তো পার। আমি বানিয়ে দিচ্ছি। চল! তুমি তোমার ঘরে গিয়ে বস। পেপার পড়। আমি পাঁচমিনিটের মধ্যেই চা-বিস্কুট নিয়ে আসছি।
সাত-সকালে মায়ের মন্দিরে ভক্তদের তেমন ভিড় হয়নি৷ অনুরাধা প্রায় দেবীর কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছেন। দেবীর চরণটা নাগাল পাননি এটুকুই যা। উনি গলবস্ত্র হয়ে, সাষ্টাঙ্গে শুয়ে কান্নাভেজা গলায় বলে ওঠেন — মা গো! তোমার কাছে একটাই প্রার্থনা— আমি যেন শাখা-সিঁদুর অক্ষত রেখে স্বামীর কোলে মাথা থুয়ে যেতে পারি। আমি পাপ করেছি মা, ও যে অক্সিজেনের অভাবে নাক ডাকে, বুঝিনি। তা নিয়ে কত গঞ্জনা দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা কর মা।
আরও কত কথা যে বিড়বিড় করে বললেন! সেসব বলতে সময় গেল অনেকখানি। পিছনের দর্শনার্থী যার পর নাই বিরক্ত। সে গজগজ করতে থাকে — অতিভক্তি চোরের লক্ষণ!
অন্য একজন বলে ওঠে— দাঁড়ান, সমস্ত পাপ জমা দিতে টাইম দিতে হবে তো!
কথাটা অনুরাধার কানে যায়। কিন্তু মায়ের মন্দির ব’লে সহ্য করে যান। তবুও মায়ের কাছে আর্জি জানান— মা, যারা ব্যাঙ্গ করছে, তাদের যেন সাজা দিও মা!
এতে আরও কিছুটা সময় যায়। অবশেষে পুরোহিতের প্রচেষ্টায় অনুরাধার পুজো দেওয়া, প্রার্থনা করা, এসবের ইতি হয়। তিনি যখন মন্দির থেকে বেরোলেন, তখন ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত এবং বিরক্তও।
অনুরাধা যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন সূর্য আকাশে চোখ রাঙাচ্ছে। টুকুন দরজা খুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করে — এত সকালে কোথায় গিয়েছিলে মা? মন্দিরে?
সে কৈফিয়ত কি তোমাকে দিতে হবে নাকি?
সরো, ছুঁয়ে দিও না আমাকে।
না, কৈফিয়ত চাইনি। কপালে ধ্যাবড়া লাল টিপ, সিঁথিতে মেটে সিঁদুর তাই ভাবলাম …!
সধবা মানুষের কপালে লালটিপ আর সিঁথিতে সিঁদুরই থাকে। তোমরা তো সেসব মানো না। সিঁথি-কপাল ফাঁকা রেখে হিল্লী-দিল্লী কর।
কথা বলতে বলতে শোয়ার ঘরে পৌঁছে যান অনুরাধা। অনিমেষকে খবরের কাগজ হাতে চেয়ারে দেখতে না পেয়ে বলে ওঠেন — তিনি কোথায় অধিষ্ঠান করছেন? টয়লেট তো দেখছি খালি।
বুবাই টেবিলে কনুই রেখে কপালে হাত দিয়ে বসে ছিল। মুখ তুলে বলে ওঠে — বাবা চলে গেল।
সে কী রে! কোথায় চলে গেল? — বলে প্রায় কেঁদে ওঠেন অনুরাধা।
বুবাই বলে — হ্যাঁ, তোমার আসা অবধি অপেক্ষা করা গেল না। বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এত হাঁফাচ্ছিল। অক্সিজেন প্রায় পাচ্ছিল না বললেই চলে। কাল রাতে নাক-ডাকাটা কষ্ট করে আটকে ছিল। তো! ডাক্তার কাকুকে ফোনে জানাতে সঙ্গে সঙ্গে অ্যামবুল্যান্স পাঠিয়ে নিয়ে গিয়ে, নার্সিংহোমে ভর্তি করে নিল। অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ষোলখানা টেস্ট লিখে দিয়েছে। সারাদিন ধরে একটার পর একটা হবে।
বুবাই আড় চোখে লক্ষ্য করতে থাকে মায়ের মুখের রেখার পরিবর্তন। দেখে, মায়ের কপাল ও থুতনির নীচের রেখাগুলো কেমন ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। হাতে ধরা প্রসাদীফুল ও পেঁড়া-ভরা টুকরিটা প্রায় হাত থেকে খসে পড়ে আর কী! যেহেতু ঢাকাকালীর প্রসাদ ও ফুল, সেহেতু খসে পড়ার আগেই সেটা টেবিলস্থ হয়। অনুরাধা কোনও রকমে চেয়ারের হাতলটা ধরে ফেলেন।
ইতিমধ্যে টুকুন ঘরে ঢোকে — মা, কী হয়েছে মা! মাথা চক্কর দিচ্ছে?
টুকুন কোনও রকমে মা-কে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
অনুরাধা কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন — আমার আসা অবধি তোরা অপেক্ষা করতে পারলি না? আমি সাত সকালে তার জন্যে পুজো দিতে গেলাম, আর …! আমাকে এখুনি নার্সিংহোমে নিয়ে চল!
বুবাই বলে — এখন দেখা পাবে না মা। বিকেলে গিয়ে দেখা করা যেতে পারে। এখন গিয়ে কোনও লাভ নেই।
টুকুন বলে — হ্যাঁ, হার্ট পেসেন্ট তো! সারাদিনে একবারই দেখা করতে দেবে। দাদা, বাবাকে নার্সিংহোমে কতদিন থাকতে হবে বলল ডাক্তার কাকু?
সপ্তাহ তিনেক তো বটেই৷
টুকুন ধুলো ঝাড়ার ভঙ্গিতে দু’হাতে শব্দ করে বলে — যাক বাঁচা গেছে।
অনুরাধা আগুনে দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন— মানে!
মানে ফ্যামিলি-কোর্টে ডেটটা পড়েছে তিন সপ্তাহ পরে। এ তিন সপ্তাহ মা-কে আর কষ্ট করে বাবার নাক-ডাকা সহ্য করতে হবে ঘুমটা ভালো হবে।
বুবাই বলে — কথাটা মন্দ বলিসনি৷ বাবাকেও এ তিন সপ্তাহ ওই সবুজ নখওয়ালা মেয়েটার রান্না করা ট্যাঁসটেঁসে ঝোল আর আধসেদ্ধ তরকারি খেতে হবে না। ডাক্তারকাকু বলেছে, নার্সিংহোমের বেস্ট ডিস বাবার জন্য বরাদ্দ। বাবার বুকের গন্ডগোল থাকলেও পেটের তো গন্ডগোল নেই।
অনুরাধা ছেলে ও মেয়ের দিকে কটমট করে তাকিয়ে দুম দুম করে পা ফেলে শোওয়ার ঘরে ঢোকেন। বুবাই ও টুকুনের কানে আসে ধপ করে একটা শব্দ ও সেই সঙ্গে মৃদু গোঙানি৷
টুকুন শোওয়ার ঘরের দিকে এগোতে গেলে বুবাই ফিসফিসিয়ে বলে — কষ্টটা গলে বেরিয়ে যেতে দে। তা না হলে মা-কেও হয়তো নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে হবে।
এগারো
চারটে বাজতে তখনও তের মিনিট দেরি। অনুরাধা ঘর আর বারান্দায়, বারান্দায় আর ঘরে আনাগোনা করছেন। ছ’মিনিট বাকি থাকতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে — হতচ্ছাড়া ড্রাইভারটাকে আর কক্ষনো নেবো না। সেন্টারের বিনুদা’কে বলে দেবো, ওকে যেন কখনও না পাঠায়। চারটে মানে কি ঠিক চারটেতেই আসতে হবে!
বুবাই মিহিসুরে বলে— বাঙালী না বিহারী?
অনুরাধা প্রশ্নটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। বুবাই আবার বলে — বলছি যে, ড্রাইভারটা বাঙালী না বিহারী?
বাঙালী বাঙালী। কাল যে ছিল সে-ই৷ বিহারীদের ভাষা বুঝতে পারি না, তাই সেন্টারে বলে দিয়েছি বিহারী যেন না পাঠায়।
ও! ওই চেনা ছেলেটা! বাঙালী। তাহলে আরও ছত্রিশ মিনিট। কেন না, বাঙালীর টাইম চারটে মানে সাড়ে চারটে। এই জন্যে আমাদের ওখানে কেউ বাঙালী ড্রাইভার রাখে না।
অনুরাধা দাঁত কিড়মিড় করেন— সেটাই যদি জানেন, তাহলে ড্রাইভারকে সাড়ে তিনটেয় টাইম দিলেই তো পারতেন।
তাতেও অসুবিধা ছিল। ড্রাইভারদের হিসেবে ‘সাড়ে’ বলে কিছু হয় না। তখন তিনটে থেকে ওর ডিউটি কাউন্ট করত। খামোকা এক ঘন্টার টাকা বেশি যেত।
তোমাদের কাছে টাকাটাই তো বড়। বিদেশে গিয়ে গাদাগাদা টাকা রোজগার করছ। অসুস্থ বাবাকে দেখতে যাওয়ার জন্যে একঘন্টার ড্রাইভার-ভাড়া বেশি গেলে তোমরা গরীব হয়ে যাবে যে!
অনুরাধা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় কলিংবেল বেজে ওঠে৷ অনুরাধা গাড়ি থেকে নেমে নার্সিংহোমে পৌঁছে, হন্তদন্ত হয়ে এগোচ্ছিলেন ছ’নম্বর কেবিনের দিকে। একজন নার্স পথ আটকে বলেন — এমন দুমদাম করে কেবিনে ঢুকবেন না। পেসেন্টের অবস্থা সিরিয়াস। দেখছেন না, কত সব যন্ত্রপাতি লাগানো বুকে, হাতের তালুতে, পায়ের পাতায়।
অনুরাধা আলতো হাতে কেবিনের কাচের দরজা ঠেলে ঢোকেন। কাছে গিয়ে হালকা গলা-খাঁকারি দেন। অনিমেষ চোখ খোলেন। মৃদু গলায় বলেন — অনু তুমি এসেছ?
অনুরাধার ধরা গলা — কী করে ভাবলে যে, আমি আসবো না। আমি না হয় বুঝতে পারিনি যে, ওটা শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট। তাই বলে …!
এমন সময় ডাক্তার সরখেল ঘরে ঢোকেন — বউদি, খারাপ লাগলেও বলতে হচ্ছে, দাদাকে আই সি ইউ-তে নিয়ে যেতে হবে। দেখছ তো হার্টের কী অবস্থা! ওই মনিটরের দিকে তাকাও। দেখ, হার্ট-বিট গ্রাফ কেমন ফ্লাকচুয়েট করছে। যেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কোনও কারণে প্রচণ্ড টেনশন হয়েছে নিশ্চয়!
অনুরাধা এবার ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন— ওরে বুবু, টুকু! তোদের বাবাকে কোথায় নিয়ে যাবে বলছে। আমি যে সেই বারোবছর বয়স থেকে …।
অনিমেষ গলায় একটু জোর এনে বলেন— অনু! ও গবেট ডাক্তারের কথা ছাড়ো৷ তুমি কিছু ভেবো না। আই সি ইউ মানে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট নয়। আই সি ইউ মানে আমি তোমাকে দেখব, এমন জায়গাতে, মানে বাড়িতে নিয়ে চল। ভালোমন্দ নিজে হাতে রেঁধে খাওয়াও। দেখবে সাতদিনে সুস্থ হয়ে যাবো।
ডাক্তার মনিটরের দিকে তাকিয়ে সোল্লাসে বলে ওঠেন — আরে! এ যে মিরাকল। দ্যাখো বুবাই, টুকুন দ্যাখো। মনিটরের দিকে তাকা। বউদির সঙ্গে কথা বলতেই দাদার হার্টবিট গ্রাফ কেমন নর্মালে রান করছে।
অনুরাধা গর্বের সঙ্গে বলে ওঠেন — হতেই হবে। ঠাকুরের কাছে এত বছর ধরে কামনা করার কি কোনও মূল্য নেই! এই শাঁখা-সিঁদুরের জোরে যমদূত ফিরে যেতে বাধ্য হবে।
ডাক্তার হেসে বলেন— শাঁখা-সিঁদুরের জোর কিনা জানি না। তবে, মিউজিক থেরাপি, স্মেল থেরাপির মতো স্পীচ-থেরাপিতেও অনেক সময় কাজ হয়। তুমি বরং দাদার সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ কথা চালিয়ে যাও। টেনশন থেকে রিলিফ মানেই জানবে, সব সমস্যার সমাধান। আধঘন্টা পর এসে হার্ট-বিট গ্রাফ অবজার্ভ করব। চল বুবাই, টুকুন আমরা বাইরে যাই।
ঘর ফাঁকা হলে অনুরাধা আরও একটু ঘনিয়ে বসেন। অনিমেষের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন— তুমি একদম টেনশন করো না। আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে এমন যত্ন করবো যে, তিনদিনে চাঙ্গা হয়ে যাবে।
সে না হয় করবে। কিন্তু আমার চিন্তা তোমার হাঁটু নিয়ে। পাঁচরকম রান্না করতে গেলে তো হাঁটু ফুলে ঢোল হবে।
কিচ্ছু হবে না। নুন-পুঁটুলির সেঁক নিলেই … আসলে দোষটা আমারই। নাক-ডাকার অভিযোগের বাহানা করে ডিভোর্স চাওয়া..। আসলে দোষটা ঠিক আমারও নয়, সেই লোকটার।
অনিমেষ কৌতূহলী — সে লোকটা আবার কে? এ বয়সে আবার কারও প্রেমে পড়লে নাকি? তার জন্যে ডিভোর্স চাইছ?
মরণ দশা! প্রেমে পড়ে ডিভোর্স চাইব কেন? বই পড়ে ডিভোর্স চাইছি।
বই পড়ে?
হ্যাঁ, সুকুমার সেন না কোন এক লেখকের লেখা ‘ভালোবাসা যারে কয়’।
সুকুমার সেন নয়, সুকুমার রুজ। তাঁর লেখা হার্ড-বোর্ড-বাইন্ডিং ল্যামিনেটেড সবুজ কভার দাম দু’শো। কভারে যুবক-যুবতী।
ঠিক বলেছ। আমাকে গিফট দিয়েছে মহিলা সমিতির লবঙ্গলতিকা। তুমি কী করে জানলে ওই বইয়ের কথা।
আমিও যে তোমার বালিশের তলা থেকে লুকিয়ে এনে বইটা পড়ে ফেলেছি। ওই বইটা পড়েই সবুজ-নখওয়ালা মেয়েটার রান্না খারাপ হয়ে গিয়েছে। ওটা তো আসলে বাহানা। কিন্তু বইটার উপসংহারটা আগে পড়লে আমাদের এ ভুল হতো না।
কেন! উপসংহারে কী লিখেছে?
লিখেছে, ডিভোর্স করার পর সেই দু’জন রি-ম্যারেজ করলে প্রেম আরও গাঢ় হয়। এটা ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়স অবধি যুবক-যুবতী, যারা শুধুমাত্র আই টি সেক্টরে কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তাহলে বইটার প্রথম পাতাতেই বি. দ্র. করে লিখে দেওয়া উচিত ছিল, ‘কঠোরভাবে যুবক-যুবতীদের জন্য’, তাহলে আমরা মিস গাইডেড হতাম না।
আমিও সেটা ভেবেছি।
তাহলে কোনও ছাড়ান-ছুড়োন নেই। বুঝলে বুবাইয়ের বাবা, ওই লেখক সুকুমার রুজের নামে আমি কেস করবো। ওঁর এ-বই সিনিয়র সিটিজেনদের পক্ষে ক্ষতিকর।
কাল নার্সিংহোমে আসার আগে উপসংহারটা পড়ে আমিও এমন ভেবেছিলাম। পরে মত পালটিয়ে একখানা চিঠি লিখলাম।
চিঠি!
হ্যাঁ, চিঠিটা পোস্ট করা হয়নি। আমার বিছানার তলায় রয়েছে।
কী লিখেছ চিঠিতে?
বেশ কড়া চিঠি। জোরে বলা যাবে না, কানটা কাছে আনো!
দাঁড়াও, ঘুরে বসি। বাঁ-কানটা ঠান্ডা লেগে ঝাঁপ ধরে আছে। ভালো শুনতে পাবো না।
তাই বসো।
হুম! এবার ডান কানে বল।
শোনো! লিখেছি, ওহে পেছন-পাকা লেখক! তোমার বয়স এখন পঞ্চাশের নীচে। বাহাত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় না ক’রে, ভালোবাসা সম্পর্কে জ্ঞান দিতে আসা মোটেও উচিত হয়নি। অনভিজ্ঞতার ফলে আমার ছেষট্টি বছরের স্ত্রী-কে বিপথগামী করে তুলেছ। তার সতীত্ব নষ্ট .. না না সতীত্ব নয়, সতী-লক্ষ্মী ভাব নষ্ট করে দিয়েছ। তোমার সাজা হওয়া উচিত। সে সাজা হল— তোমার বিবাহিতা স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য করা এবং তার সঙ্গে পুনর্বিবাহের অনুমতি না দেওয়া।
অনুরাধা হো হো করে হেসে ওঠেন — বেশ লিখেছ চিঠিখানা।
অনুরাধার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনিমেষও হেসে ওঠেন প্রাণখোলা হাসি।
এমন সময় ডাক্তার, বুবাই ও টুকুন ঘরে ঢোকে। বুবাই বলে — বাদী ও বিবাদী দু’জনে মিলে এমন হাসাহাসি করলে ডিভোর্স পেতে অসুবিধা হবে কিন্তু।
অনুরাধা বলে ওঠেন — এটা তোদের আমেরিকা নয়, এটা সতী-সাধ্বীর দেশ ভারত। এখানে কথায় কথায় ডিভোর্স হয় না৷
ডাক্তার বলেন— বাহ! হার্টবিট তো দেখছি একদম নরম্যাল। নার্স! ওসব নকল যন্ত্রপাতি, তার সব খুলে ফেল।
অনিমেষ বলে ওঠেন — কী বললে নকল যন্ত্রপাতি! আমাকে নিয়ে ধাষ্টামো!
দাদা, ধাষ্টামো নয়, এ হল ম্যারিটাল প্লাস্টার যন্ত্র। বিবাহ ঘটিত ভাঙাচোরা জোড়া লাগায়।
ডাক্তারের কথায় নার্স সহ ঘরের সবাই হো হো করে হেসে ওঠে৷ শুধু অনুরাধা মুখ গোমড়া করে বলে— ভাঙল কোথায়, যে জোড়া লাগাচ্ছ ঠাকুরপো!
শেষ